হিসাব অনুযায়ী আজ থেকে ঠিক ১০ দিনের মাথায় ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন। অন্যদিকে ৪ অক্টোবর মানস ভুঁইঞার ছেড়ে যাওয়া রাজ্যসভার আসনে উপ নির্বাচন। তৃণমূল আগেই প্রার্থী নাম জানিয়ে দিয়েছিল। এবার সেই আসনে প্রার্থী দেবে না বিজেপি, টুইটে এমনটাই জানিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি আরও জানিয়েছেন, তার বদলে বিজেপি ভবানীপুরে নন এমএলএ মুখ্যমন্ত্রীকে ফের হারানোর দিকে মন দেবে। টুইটের শেষে ‘জয় মা কালী”ও লিখেছেন নন্দীগ্রামের বিধায়ক।
সোমবার যখন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ পদপ্রার্থী মনোনয়ন পত্র জমা দিলেন। তখন বিজেপির বিধায়ক, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী টুইটারে জানালেন, ‘রাজ্যসভায় আমরা কোনও প্রার্থীর মনোনয়ন জমা দেব না।’ কারণ হিসাবে, শুভেন্দু জানান, ‘ভোটের ফলাফল পূর্ব নির্ধারিত। বরং আমাদের লক্ষ্য এখন একজন হেরে যাওয়া মুখ্যমন্ত্রীকে আবারও হারানো। জয় মা কালী।’ শুভেন্দুর এই ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবানীপুর কেন্দ্রে উপনির্বাচনে জোর দেওয়া নাকি রাজ্যসভায় শাসক দলের প্রার্থীকে হারানোর মতো ক্ষমতা না থাকার কারণেই বিজেপি পিছু হটলো?
বাংলা জয়ের পর তৃণমূল উত্তর-পূর্ব ভারতে মাটি তৈরি করতে বদ্ধপরিকর। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের আগে ত্রিপুরা, অসম একের পর এক রাজ্যে নিজেদের জমি তৈরির চেষ্টা করছে ঘাসফুল শিবির। কিছুদিন আগেই কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন প্রাক্তন সাংসদ সুস্মিতা দেব। সেই সুস্মিতাকেই এবার রাজ্যসভায় পাঠাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। গত ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁর নাম ঘোষণা করেছে দল। সোমবার বিধানসভায় সরকার পক্ষের মুখ্য সচেতক নির্মল ঘোষের ঘরে নথিপত্র সই করে নিজের মনোনয়ন জমা দেন সুস্মিতা। সুস্মিতা দেবকে প্রার্থী ঘোষণা করার পর পরই তৃণমূলের অফিশিয়াল টুইটার হ্যান্ডেলে লেখা হয়েছিল, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লক্ষ্যই হল মহিলাদের ক্ষমতায়ণ এবং তাঁদের রাজনীতিতে আরও বেশি করে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কারণ এর হাত ধরেই আমাদের সমাজ আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।”
এদিন মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার পর সুস্মিতা দেব বলেন, “একজন উত্তর পূর্ব ভারতের রাজনীতিককে রাজ্যসভায় জায়গা করে দিয়েছেন মমতাদি। নতুন ইতিহাস হল। আমি মনে করি এর জন্য গোটা উত্তর-পূর্বে একটা আলাদা ইমপ্যাক্ট পড়বে। আমার চেষ্টা থাকবে তৃণমূল কংগ্রেসকে ত্রিপুরা ও অন্যান্য রাজ্যে আরও শক্তিশালী করা। আজ থেকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেও আমার একটা নতুন সফর শুরু হল। আশা করছি সবার জন্য ভাল হবে।”
অন্যদিকে; ভবানীপুরে প্রথম দিকে বিজেপি মমতার বিপক্ষে প্রার্থী খুঁজতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। নিজেদের দলের কাউকেই ভবানীপুরে প্রার্থী হতে রাজি করাতে না পেরে নিজেদের অস্বস্তি ঢাকতে নির্বাচন কমিশনকে তীব্র সমালোচনা করে। প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশন ভবানীপুর কেন্দ্রে উপনির্বাচন আর দুই কেন্দ্রে নির্বাচনের কথা জানালে ভোটের বিরোধিতায় বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ প্রশ্ন তোলেন, ‘লোকাল ট্রেন চলছে না। বাজার-হাট বন্ধ। লকডাউন আছে। রাতে কারফিউ আছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন কী করে মেনে নিচ্ছে যে, ভোটের উপযোগী পরিবেশ আছে?
বলাই বাহুল্য যে ভবানীপুর বিধানসভা মমতার পুরানো কেন্দ্র। সেখান থেকে মমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা খুব একটা সহজ কাজ যে নয় বিজেপিও সেটা খুব ভালো করে জানত। তাই কাকে মমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামালে যুদ্ধ জেতা না গেলেও কিছুটা হলেও বেগ দেওয়ার চেষ্টা করে। শেষমেশ প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালের নামে শিলমোহর দেয় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। ভবানীপুর কেন্দ্রে প্রার্থী হিসেবে এই আইনজীবীর নাম নাকি শুভেন্দু অধিকারীও বলেছিলেন। এ বিষয়ে শাহ-নাড্ডার সঙ্গে আলোচনা করতে তিনি দিল্লি পৌঁছেছিলেন। তারপরই নাকি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শিলমোহর দিয়েছে।
ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ থেকে এখানে তৃণমূল প্রার্থী জিতেছে অন্তত ২৫ হাজারের বেশি ভোটে। প্রিয়াঙ্কা কি এবার তার ব্যতিক্রম ঘটাবেন। বরং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী হিসাবে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে একটা রেকর্ড তৈরি করবেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ।
২০১১ সালে এই কেন্দ্রে তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি পেয়েছিলেন ৮৭ হাজার ৯০৩ ভোট। তিনি সিপিএমের নারায়ণ প্রসাদ জৈনকে হারিয়েছিলেন ৪৯ হাজার ৯৩৬ ভোটে। ২০১১ সালে বিধানসভা ভোটে জিতে প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময়ে তিনি ছিলেন সাংসদ। উপনির্বাচনে তিনি ভবানীপুর কেন্দ্রটিকেই বেছেছিলেন। প্রথমবার বিধানসভা নির্বাচনে লড়ে তিনি সিপিএম প্রার্থী নন্দিনী মুখোপাধ্যায়কে ৫৪ হাজার ২১৩ ভোটে হারান। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটেও এই কেন্দ্রেই প্রার্থী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেবারও তিনি কংগ্রেস জোটের প্রার্থী দীপা দাশমুন্সিকে ২৫ হাজার ৩০১ ভোটে হারিয়েছিলেন। এবারও যে মমতা বড় ব্যবধানেই জিতবেন সেকথা বিজেপিও জানে। তাই গতবারের মতো এবারও রাজ্যসভার নির্বাচনে প্রার্থী না দিতে পারার লজ্জা ঢাকতেই বিজেপির বিধায়ক, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী হাওয়া গরম করার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন।