শান্তি মৈত্রী প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ রাখিবন্ধনের উৎসব। যার পরতে পরতে লেগে থাকে প্রাণের স্পন্দন। পারস্পারিক রক্ষার অঙ্গীকার থেকেই রাখিবন্ধনের সূত্রপাত। ভাইয়ের হাতে রাখি সুতো বেঁধে দিয়ে কোন বোন একে অপরের পাশে থাকতে প্রতিশ্রুত বদ্ধ হয়। যে উপলব্ধির প্রতিফলনে থাকে স্নেহ ভালোবাসা নৈকট্য। ভাই বোনের সম্পর্কে মধ্যে আত্মিক বন্ধনের যাবতীয় মঙ্গলাচরণ এর মধ্যে দিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রাখী পূর্ণিমাকে ঘিরে রয়েছে নানান পৌরাণিক কাহিনি। রামায়ণ অনুযায়ী, ভগবান রাম সমস্ত বানর সেনাদের ফুল দিয়ে রাখি বেঁধে ছিলেন। এছাড়া, লক্ষ্মী বলিকে ভাই হিসেবে মেনে রাখি পরিয়েছিলেন যাতে সে উপহার স্বরূপ বিষ্ণুকে স্বর্গে তার কাছে ফিরে যেতে বলে।
মহাভারতে কথিত আছে, একটি যুদ্ধে কৃষ্ণের কবজিতে আঘাত লেগে রক্তপাত শুরু হলে দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির আঁচল খানিকটা ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাতে বেঁধে দেন। এতে কৃষ্ণ অভিভূত হয়ে পড়েন। দ্রৌপদী তাঁর অনাত্মীয়া হলেও, তিনি দ্রৌপদীকে নিজের বোন বলে ঘোষণা করেন এবং দ্রৌপদীকে এর প্রতিদান দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। বহু বছর পরে, পাশাখেলায় কৌরবরা দ্রৌপদীকে অপমান করে তাঁর বস্ত্রহরণ করতে গেলে কৃষ্ণ দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করে সেই প্রতিদান দেন। এইভাবেই রাখীবন্ধনের প্রচলন হয়।
রাখিবন্ধন মূলত অবাঙালি সম্প্রদায়ের উৎসব যা পরিচিত রক্ষাবন্ধন নামে। বাঙালির জীবনেও রাখি বন্ধনের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। তবে সে ক্ষেত্রে ধর্মীয় কোন পর্ব লক্ষ্য করা যায় না। শ্রাবণী পূর্ণিমা তিথিতে রাখি বন্ধন পালন করা হয়। অবাঙালি সমাজে রাখি বন্ধনের সূচনা হয় ঈশ্বরের আরাধনার মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে থালির প্রয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ধাতব থালায় স্বস্তিকা চিহ্ন এঁকে সিদ্ধিদাতা গণেশকে স্মরণ করা হয়। এর সঙ্গে থাকে সিঁদুর মাখানো চাল দই ফুল পান চন্দন প্রদীপ, নানা রকমের মিষ্টি এবং রাখি।
উৎসবের দিন সকালে স্নান সেরে মহিলারা গৃহ দেবতার পূজা করে তারা হাতে রাখি বেঁধে দেন। এরপর ভাইয়ের কপালে সিঁদুর মাখা চাল ও দইয়ের তিলক এঁকে তার হাতে রাখি বেঁধে দেন বোনেরা। প্রবাদ অনুযায় এই তিলক নাকি ‘আজ্ঞা চক্র’কে রক্ষা করে। সবশেষে প্রদীপ জ্বেলে ভাইকে আরতি করা হয়। এরপর চলে মিষ্টিমুখ ও উপহার আদান প্রদানের পর্ব। মূলত পিতল বা তামার থালাতেই থালি প্রস্তুত করা হয় কারণ এই দুটি ধাতু অত্যন্ত শুদ্ধ।
ভারতে নানা রাজ্যে রাখি বন্ধন কে কেন্দ্র করে নানান আঞ্চলিক উৎসব পালন করা হয় দক্ষিণ ভারতে এই দিনটিকে বলা হয় অবনী অবিত্তাম বা উপক্রমম, এদিন যজুর্বেদ পঠনকারী ব্রাহ্মণকে যজ্ঞপবীত ধরণের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ তারা ধর্মীয় জীবনে ব্রতী হয়ে ওঠেন, আসলে এই উপবীত তাদের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত করে। উপবীত ধারণের পর তাদের একনাগাড়ে ছ’মাস যজুর্বেদ পাঠ করতে হয়।
মধ্যভারতে রাখি বন্ধনের দিন পালন করা হয় ‘কাজরী পূর্ণিমা’। এদিন কৃষকের ভালো ফসলের আশায় দেবী ভগবতীর পুজো করেন। সধবা মহিলারা আমাবস্যা তিথির ঠিক ন’দিন পর কাজরী নবমী তিথিতে অন্ধকার ঘরে কচু পাতা সহ একটি পাত্র রেখে দেন। এরপর ৭ দিন ধরে অর্থাৎ কাজরী পূর্ণিমা অব্দি পাত্রটি পুজো করা হয়। শেষ দিনে মহিলারা পাত্রটি জলে ভাসিয়ে দেন।
গুজরাতে এদিন পবিত্র পণ বা পুত্রদা একাদশী পালিত হয়। লম্বাটে পাকানো কাপড়ের টুকরো ঘি দুধ দই গোমূত্র মধু দিয়ে তৈরি করে পঞ্চব্যতে ভিজিয়ে সেগুলি শিবলিঙ্গ স্পর্শ করিয়ে ভাইয়ের হাতে বেঁধে দেয়া হয়। এদিন মহিলারা সন্তান লাভের আশায় সারাদিন না খেয়ে রাত জেগে থাকেন। পুরানে বলা হয়েছে মহিষ্মতী পুরীর রাজা মহীজিৎ তার পূর্ব জন্মের তৃষ্ণার্ত বাছুরকে জল পান করাতে না দিলে সেই অপরাধের তিনি সন্তান লাভে বঞ্চিত হন। পরবর্তীকালে লোমশ মুনির পরামর্শ মত পুত্রদা একাদশী পালন করলে তিনি সন্তানে জন্ম দিতে সমর্থ হন। তখন থেকেই পুত্র লাভের আশায় একাদশী পালনের প্রচলন হয়।
এদিন মহারাষ্ট্রতে পালন করা হয় ‘নারিয়ল পূর্ণিমা’। এই দিন জেলেরা জলের দেবতা বরুণের পুজো করেন। তারা সুসজ্জিত নৌকায় নারকেল সাজিয়ে রাখেন। সাময়িক অনুষ্ঠানের শেষে বরুণ দেবের উদ্দেশ্যে জলে নারকেল ছড়া হয়। এদিন প্রতিটি খাবারেই নারকেল ব্যবহার করা হয়।
বাঙালি হোক বা অবাঙালি প্রায় সব বাড়িতেই ভাইয়ের জন্য রাখির দিন থাকে এলাহি আয়োজন। দিদিরা কে কত ভালো রাঁধতে পারে ঘরে ঘরে রীতিমতো চলে
তাঁর প্রতিযোগিতা। ঘরে তৈরি মুচমুচে আর মশলাদার খাবার খাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না কেউই।রাখি স্পেশাল মেনু ও অফার নিয়ে রেস্তরাঁর অপশন তো রয়েছেই। তবে যদি নিজের হাতে আর যত্নে পাত সাজিয়ে ভাত বেড়ে খাওয়াতে চান আদরের ভাই ও দাদাটিকে। কী কী রাখতে পারেন তালিকায় সেই হদিশ রইলো আজকের লেখায়।
পূর্নিমা থাকায় অধিকাংশ বাড়িতেই সেদিন নিরামিষ খাবারের আয়োজন করা হয়। খুব সহজেই বানিয়ে নেয়া যাবে এমন কটা আইটেমের কনসেপ্ট দিলাম রেসিপি গুগল সার্চ করলেই পেয়ে যাবেন তাই আর দিলাম না।
১। তন্দুরি আলু টিক্কা : তন্দুরি আলু টিক্কা একটি মুচমুচে এবং সুস্বাদু খাবার যা সকলেরই পছন্দ হবে। কে আলুকে “না” বলতে পারে? হয়তো কেউই না। সবচেয়ে ভালো দিক হলো এটি খুব কম সময়েই তৈরি করা যায়।
২। টক সেভ পুরি : পৃথিবীর সেরা খাবার হল স্ট্রিট ফুড। সত্যিই মুখরোচক এবং জিভে জল আনা। যদি ভাই রাস্তার খাবার পছন্দ করেন, তাহলে রাখি বন্ধনে তাদের মুম্বাই স্টাইলের সেভ পুরি দিয়ে আপ্যায়িত করুন। তারা শেষ পর্যন্ত আঙুল চেটে খেতে বাধ্য।
৩। আম লেবু কুলার : গ্রীষ্মকালে রসালো ফলের চাহিদা থাকে। আপনার ভাইবোনদের ঠান্ডা মকটেল এবং ককটেল পরিবেশন করে তাদের বন্ধন এবং মেজাজকে সতেজ করুন। ‘আয়া মৌসম ঠাণ্ডে ঠাণ্ডে মকটেল কা’।
৪। ছোলে ভাটুরে : ছোলে-ভাটুরে হল উত্তর ভারতে রাখি বন্ধনের একটি বিশেষ খাবার। ভাই-বোনেরা অধীর আগ্রহে রাখি বন্ধনের জন্য অপেক্ষা করে, কেবল ছোলে ভাটুরের জন্য, একে অপরকে ভালোবাসে বলে নয়।
৫। শাহী পোলাও : ‘শাহী খানা কা আন্দাজ হি আলাগ হ্যায়’, মূল খাবারের সাথে শাহী পোলাও যোগ করুন। তৈরি করা সহজ এবং খেতেও দারুণ, একই সাথে পেটও ভরে। শুকনো ফল এবং জাফরান যোগ করে ঐতিহ্যবাহী পোলাওকে আরও টেস্টি করে তুলুন।
৬। কেশর খির : মিষ্টি সুস্বাদু খাবার ছাড়া রাখী অসম্পূর্ণ। মিষ্টি ভারতীয় উৎসব উদযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খুশি কে মৌকে পে কুছ মিঠা তো বান্তা হ্যায়। ক্ষীর সবারই প্রিয়, তাই বানিয়ে ফেলুন ক্ষীর ঘরেতেই।
৭। বাদামের হালুয়া : রাখি বন্ধনের জন্য আরেকটি সুস্বাদু মিষ্টি খাবার, বাদামের হালুয়া। হালুয়ার মিষ্টি স্বাদ এবং বাদামের মুচমুচে ভাব কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই প্লেট থেকে উধাও হয়ে যায়।
৮। একটু অন্যরকম মিষ্টির আয়োজন করতে চাইলে রাজস্থানী মিষ্টি ঘেভর কিনে আনতে পারেন বা ঘরেই তৈরি করতে পারেন।
৯। বাঙালির অত্যন্ত প্রিয় মিষ্টি মোয়া ও নাড়ু। রাখীতেও মোয়া, নারকেল নাড়ু করে দেওয়া যেতেই পারে। টেবিলে এত সুস্বাদু এবং মিষ্টি খাবারের ব্যবস্থা থাকায়, আমরা নিশ্চিত যে আপনার রাখী বন্ধন আনন্দের সাথে কাটবে! আপনার কোন রেসিপিটি সবচেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে তা আমাকে বলবেন। যাদের ভাই বোন কাছাকাছি নেই,আপনি রাখী অনলাইনে পাঠাতে পারেন এবং এর সাথে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি বা চকলেট পাঠালে কেমন হয়? দূরত্বকে বাধা হতে দেবেন না এবং আনন্দ উৎসাহের সাথে উৎসবটি উদযাপন করুন।
খুব ভালো লাগলো লেখাটা,
Dhonyobad ????