বহরমপুর শহর থেকে ভাগীরথীর ব্রিজ পেরিয়ে দক্ষিণ দিকে ১০ কিলোমিটার দূরে একটি প্রত্নক্ষেত্র, যেখানে শশাঙ্কের রাজধানী ও একটি বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ আছে।
হাওড়া-কাটোয়া-আজিমগঞ্জ-মালদহ রুটে কর্ণসুবর্ণ স্টেশন, যেখানে কোনও এক্সপ্রেস ট্রেন থামে না। তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেস কিংবা কামরূপ এক্সপ্রেস কর্ণসুবর্ণ ছেড়ে আরও মিনিট দশেক এগিয়ে খাগড়াঘাট রোড স্টেশনে থামে। খাগড়াঘাট স্টেশন হলো বহরমপুর শহরের প্রবেশদ্বার।
আমাদের ছেলেবেলায় এই স্টেশনের নাম ছিলো ‘ছিরুটি’। একটু দূরে ছিরুটি নামে একটি গ্রাম আছে, তাই স্টেশনের নাম ওরকমই ছিলো। ছোট্ট স্টেশন, নেই উঁচু প্ল্যাটফর্ম, সারাদিনে একটা-দুটো ট্রেন থামে। আমার বাবা আজীবন বাড়ি থেকে বেরিয়ে ৫ মাইল পথ পায়ে হেঁটে ‘ছিরুটি’তে ট্রেন ধরতে যেতেন।

কিন্তু দুপুরবেলায় আমার মা যখন গৃহকর্ম সেরে বিশ্রাম নিতেন, তখন গ্রামের মহিলারা এসে মায়ের সঙ্গে গল্প জুড়তেন, তখন তাঁদের মুখে শুনতাম “আরোঁয়া” স্টেশনের কথা।
“আরোঁয়া” স্টেশন আবার কোথায় ? আমার প্রশ্নের উত্তরে মা বলেছিলেন, ছিরুটি স্টেশন। স্টেশনের খুব কাছের গ্রাম আরোঁয়া, তাই স্থানীয় মানুষেরা ছিরুটি না ব’লে ‘আরোঁয়া’ বলতেন।
তারপর আমরা একটু বড় হয়ে উঠতেই ছিরুটি স্টেশনের নাম পালটে গেল, নতুন ফলক বসল — কর্ণসুবর্ণ।
স্টেশনের চারপাশে জনসংখ্যা খুব কম। দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু ঘুমন্ত গ্রাম। যেমন, যদুপুর, মধুপুর, গোবিন্দপুর, মাঝিড়া, চাঁদপাড়া, ডাবকই, কোদলা, ভরাট, ছিরুটি, আরোঁয়া …
চার কিলোমিটার পূর্বদিকে হাঁটলেই ভাগীরথী নদী।

ভাগীরথী একসময় কর্ণসুবর্ণের গা দিয়েই বইত, তাই বন্যায় খুব ক্ষতি হতো রক্তমৃত্তিকা বৌদ্ধ বিহারের। … ক্রমশ নদী সরে গেছে পূর্বদিকে।
ষাটের দশকের প্রথমদিকে পার্শ্ববর্তী মধুপুর হাইস্কুলে পড়াতে এসেছিলেন এক শিক্ষক, তাঁর নাম যতোদূর সম্ভব মৃণাল গুপ্ত। তিনি সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় কর্ণসুবর্ণ বা রাজবাড়ি ডাঙা বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লিখে ইতিহাসবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। স্টেশনের অদূরে পড়ে ছিলো কয়েক একর ধু-ধু মাঠ, লোকেরা বলে রাজবাড়িডাঙা। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।
এর ফলে ১৯৬২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুধীররঞ্জন দাসের নেতৃত্বে রাজবাড়িডাঙায় খনন চালানো হয়, তাতেই বিভিন্ন প্রত্নবস্তু উঠে আসে।
তাঁরা সিদ্ধান্তে উপনীত হন, এখানেই ছিলো হিউয়েন সাং কথিত বৌদ্ধবিহার “লো-তো-মি-চি” — যার অর্থ রক্তমৃত্তিকা। এখানকার মাটির রঙ রক্তের মতো লাল, তাই এর নাম রক্তমৃত্তিকা !

হিউয়েন সাং কর্ণসুবর্ণকে লিখেছেন — কি-লো- না-সু-ফা-লা-না।
এই বৌদ্ধবিহার পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্তযুগে স্থাপিত হয়েছিল এবং এটি নাকি নালন্দার চেয়েও বড় ছিলো। বিভিন্ন সময়ে গঙ্গার প্লাবনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তাই বিভিন্ন সময়কালে নতুন করে বিহারের পুনর্নিমাণ ঘটেছে।
চারটি স্তরে মোট পাঁচটি পর্যায়ের নির্মাণের নির্দশন এখানে পাওয়া গেছে। একটি বৌদ্ধবিহারের মেঝে, সিঁড়ি ও গোলাকার স্তূপের ভিত, ইঁদারা, একটি শস্যভাণ্ডারের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। ইঁদারাটি একদম বুঁজে গেছে। গভীরতা সামান্য তিন-চার ফুট। এর বৃত্তাকার দেওয়ালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে স্থানীয় লোকজন।

এখন জায়গাটি চারপাশে অসমাপ্ত দেওয়াল দিয়ে ঘেরা আছে। ভারত সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সর্বেক্ষণের বোর্ড লাগানো আছে। কিন্তু পুরো মাঠ স্থানীয় মানুষের পশুচারণ, খেলাধূলা ও বৈকালিক আড্ডার স্থান হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
মৃণাল বাবু রাজা শশাঙ্ক বিদ্যাপীঠে পড়াতে এসেছিলে বিংশ শতকের পাঁচের দশকে।