এগার.
পুরাণ ও প্রাচীন কাব্যাদিকে যথার্থ অর্থে ইতিহাস বলা যায় না; কিন্তু এদের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ইতিহাসের অনেক উপাদান। কেদারনাথ বলেছেন, ‘কতকগুলি রাজার নাম, ঘটনার সন-তারিখ বা যুদ্ধের বিবরণ ইতিহাস নহে। … সমাজের রীতিনীতির ইতিহাসই প্রকৃত ইতিহাস।’ সেদিক থেকে পুরাণ ও প্রাচীন কাব্যাদির যথেষ্ট মূল্য আছে। কেদারনাথের বক্তব্য বেদ, ব্রাহ্মণ, সূত্র, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতিতে ভারতের বিভিন্নযুগের বিভিন্ন সমাজের রীতিনীতির ও সমাজধর্মের ইতিহাস যত অধিক আছে, অন্য কোন প্রাচীন দেশের বা প্রাচীন জাতির কোন কিছুতে তত অধিক নেই।
কেদারনাথের এই উক্তির সমর্থন পাওয়া যায় রমেশচন্দ্র দত্তের বক্তব্যে :
‘The two together ( Ramayana and Mahabharat ) give us a true and graphic picture of ancient Indian life and civilization; and no nation on earth has preserved a more faithful picture of its glorious past.’ (The Epic of Rama …)
পুরাণ ও প্রাচীন কাব্যাদি থেকে ঐতিহাসিক তত্ত্ব সংকলনের দুটি পদ্ধতির কথা বলেছেন কেদারনাথ — আরোহ প্রণালী ও অবরোহ প্রণালী। আরোহ প্রণালীতে অকপট বিচার-বুদ্ধির প্রভাবে সদযুক্তির আশ্রয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হবার চেষ্টা করা হয়। প্রথম পদ্ধতির কথা বলতে গিয়ে কেদারনাথ বলেন : রামায়ণ পাঠ করে যদি কেউ অকপটভাবে বিশ্বাস করেন যে রামায়ণ পৌরাণিক যুগের রচনা এবং এই বিশ্বাসে তিনি যুক্তিমার্গের আশ্রয় নিয়ে তাঁর সেই সরল বিশ্বাসে স্থিরীকৃত সিদ্ধান্ত প্রমাণের চেষ্টা করেন তাহলে সেটা তাঁর পক্ষপাত চেষ্টা হলেও উত্তম চেষ্টা। আবার যিনি রামায়ণ পাঠ করে তার মধ্যে ব্রাহ্মণ যুগের নিদর্শন লাভ করে সেই সমুদয়ের সমর্থনে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তাহলে তাকেও প্রশংসিত চেষ্টা বলা যাবে।
নিজ উদ্দেশ্যসিদ্ধির মানসে নিজ কল্পিত সিদ্ধান্ত প্রমাণের চেষ্টা হল অবরোহ পদ্ধতি। যেমন ঐতিহাসিক হুইলারের রামায়ণ আলোচনা। হিন্দুরা গোমাংসভোজী –এই বিশ্বাস নিয়ে তিনি রামায়ণের সমাজ বিচারে অগ্রসর হয়েছেন। ‘গো’ শব্দের ভিন্ন অর্থ কল্পনা করে রামায়ণে গো মাংস ভোজনের সিদ্ধান্ত করেছেন।
কেদারনাথ বলেছেন, ‘ঐতিহাসিক নিজেকে কাব্যপ্রভাব ও ধর্মপ্রভাব হইতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত রাখিয়া কাব্য হইতে ঐতিহাসিক উপকরণ চয়ন করিবেন। পর্বতের পক্ষ ছিল কি না, বানরী সংগীত গাহিতে পারিত কি না, শিলা জলে ভাসিত কি না — এই সকল বিষয়ে গবেষণায় নিযুক্ত হইয়া ঐতিহাসিক যদি কেবল ধর্মভীরুতা ও ভাবপ্রবণতার প্রভাবে বিনা বিচারে তাহা সত্য বলিয়া ঘোষণা করেন, এই যুক্তির যুগে যে তাঁহার এই ঘোষণা অতি অশ্রদ্ধার সহিত অবহেলিত হইবে, তাহা বলাই বাহুল্য।
‘রামায়ণের কবি একটা জাতির বা দেশের বা সমাজের ইতিহাস লিখিবেন মনস্থ করিয়া রামায়ণ রচনা করেন নাই। তেমন উদ্দেশ্যে রচিত কবি কলহন মিশ্রের ‘রাজতরঙ্গিনী’তেও অলীক ও অস্বাভাবিক বর্ণনার অভাব নাই। কবির লেখনী মুখে সেরূপ বর্ণনা অবশ্যম্ভাবী। বাল্মীকি, কবির সেই নিরঙ্কুশ আসনে বসিয়া কল্পনার দিব্যদৃষ্টিতে কাব্য লিখিয়াছিলেন — এ কথা স্পষ্টাক্ষরে স্বীকার করিয়া লইয়াই আমরা বলিতেছি, রামায়ণ কাব্য হইলেও তাহা ইতিহাস, সেই কাব্যের প্রতি কথায় যুগধর্মের আভাস বিদ্যমান রহিয়াছে। বাল্মীকি যে সমাজ অধ্যয়ন করিয়াছিলেন, তাঁহার কলপনামুখে সেই সমাজেরই জ্বলন্ত চিত্র প্রতিফলিত হইয়া তাঁহার কাব্যে বা গীতে প্রচারিত হইয়াছিল।’ [ক্রমশ]