দুই.
ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৭ সালে। তার দু’বছর পর ১৯৪৯ সাল থেকে শ্রীরামচন্দ্রের দুর্ভা্গ্যের শুরু। ১৯৪৯ সালের ২২ নভেম্বর। সেদিন গভীর রাতে আটটি ধাতুতে তৈরি রামলালার ৭ ইঞ্চি মূর্তি স্থাপন করা হয় বাবরি মসজিদের ভিতর। সে লোমহর্ষক কাহিনির কথা আমি সবিস্তারে বর্ণনা করেছি আমার ‘ইতিহাসের অন্তরালে : বাবরি মসজিদ :রামমন্দির’ বইতে ( পৃঃ ১৬-১৭ )। কিন্তু কে এই রামলালা? বাল্মীকির রামায়ণে আমরা তো শিশু রামের দেখা পাই না। আসলে এই রামলালা কবি তুলসীদাসের সৃষ্টি। বৈষ্ণবীয় ধ্যান-ধারনা ও অধ্যাত্ম রামায়ণের প্রভাবে তুলসীদাস শিশু রামের মূর্তি অঙ্কন করেন পরম মমতায়। একালের রামলালার ভক্তরা তুলসীদাসকে নিয়ে মাতামাতি করেন, কিন্তু তুলসীদাসের ঐকান্তিক ভক্তি ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাব তাঁদের বিন্দুমাত্র নেই। তাঁরা বোধহয় জানেন না যে তখনকার কাশীর গোঁড়া পণ্ডিতরা তুলসীদাসের উপর কম অত্যাচার করেন নি। হাজারিপ্রসাদ দ্বিবেদী বলেছেন, ‘কাশীকা পণ্ডিতোঁ নে উনকো বড়া তঙ্গ কিয়া থা, গালি-গালৌজ, ডাঁট-ফাটকার….’। তাঁরা জানেন না যে আকবরের মন্ত্রী ও সেনাপতি আবদুর রহিম খান-ই-খানখানা পরম মিত্র ছিলেন তুলসীদাসের। তাঁরা এও জানেন না যে তুলসীদাস জাতপাত মানতেন না, ভিখ মেগে খেতেন, শুয়ে থাকতেন মসজিদে –‘মাঁগি কৈ খৈব, মসীতক সোইব’।
বাবরি মসজিদের ভিতরে স্থাপন করা হল রামলালার মূর্তি। ছড়িয়ে দেওয়া হল এই তথ্য যে মাটি ফুঁড়ে উঠেছেন রামলালা, তাঁর জন্মভূমিতে। ঠিক যেন শিবরাম চক্রবর্তীর ‘দেবতার জন্ম’ গল্পের বাস্তব রূপ। দিকে দিকে এই বার্তা রটি গেল ক্রমে। আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক বিশ্বাস মানুষের অবচেতনায় ক্রিয়াশীল। সিগমুণ্ড ফ্রয়েড যাকে বলেছেন half-belief . তখনকার উত্তরপ্রদেশের (ইউনাইটেড প্রভিন্স) মুখ্যমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহেরু মসজিদ থেকে মূর্তি অপসারণের পরামর্শ দিলে হিন্দু জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রীর যে দৃঢ়তা প্রত্যাশিত ছিল, তা সেদিন দেখা যায় নি। এর পরে হিন্দু-মুসলমানের আইনি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। রামচন্দ্র প্রবেশ করলেন আদালতের অঙ্গনে।
প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তাতে নতুন মাত্রা যোগ করলেন ইতিহাসের অচেতন হাতিয়ার হিসেবে। মসজিদের প্রধান ফটকের তালা খুলে দেওয়া হল। রামভক্তরা প্রবেশ ও পূজার অধিকার পেলেন। শাহাবানু মামলায় মুসলমানদের বিরাগভজন হয়ে রাজীব হিন্দুদের মন জয় করতে চেয়েছিলেন। রাজীবের আগ্রহে দূরদর্শনে শুরু হল রামানন্দ সাগরের রামায়ণ সিরিয়াল। অনুঘটকের কাজ করল সেই সিরিয়াল। বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন রামানন্দ তুলসীদাসী রামায়ণকেও নিজের রঙে রঞ্জিত করেছেন। রামকে বিষ্ণুর অবতাররূপে দেখিয়ে, অলৌকিক আবহ সৃষ্টি করে, দেশবাসীর অবচেতন সংস্কারকে তিনি উদ্দীপিত করে তুলেছেন রামের প্রতি। তার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন হিন্দি সিনেমার আনুষঙ্গিক বৈশিষ্ট্য ; ঝলমলে নজরকাড়া উত্তরভারতীয় পোশাক, নানা রঙের দ্যুতি, ক্যামেরার কৌশল, আবেগবিহ্বল সংগীত। এমন কি রামজন্মভূমি উদ্ধারের কথাও। একটি দৃশ্যে দেখা যায় জন্মভূমির মাটি হাত নিয়েছেন রামচন্দ্র। এই সিরিয়ালের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করেছেন অনিন্দিতা বসু। তিনি বলেছেন, ‘An ideal Hindu nation needs an ideal Hindu man to lead the way — so who is going to be? Who, else but the ideal Hindu man Rama himself? Valmiki’s Ram travels from being the ideal man to the ideal guru in Tulsidas, who is finally translated into the ideal Hindu man in Sagar’s televised versions.’ (Ramananda Sagar’s Ramayana : a tool for Propaganda)
রামায়ণ সিরিয়াল দেশজুড়ে যে রাম-জ্বর সৃষ্টি করেছিল, হিন্দুত্ববাদীরা তার সুযোগ গ্রহণ করলেন; তাঁরা রামকে হিন্দুদের নেতা ও নায়করূপে প্রচার করতে লাগলেন। সেই সূত্র ধরে উঠল ‘রামজন্মভূমি’র দাবি। ১৯৯০ সালে লালকৃষ্ণ আদবানির রথযাত্রা রামজন্মভূমির দাবিকে জনমানসে প্রতিষ্ঠিত করল। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর করসেবকরা ধ্বংস করল বাবরি মসজিদ। রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ভারতের রাজনতিক রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব ঘটল ভারতীয় জনতা দলের।
নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন রামজন্মভূমি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর সেই প্রতিশ্রুতি পালনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিলেন মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট। বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল যে ২.৭৭ একর জমি, তার অধিকার পেলেন হিন্দুত্ববাদীদের রামচন্দ্র। ২০২০ সালর ৫ আগস্ট সেই জমিতে শিলান্যাস করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মসজিদ ভেঙে ফেলার ব্যাপারে যে ৪৯ জন অভিযুক্ত ছিলেন তাঁরা বেকসুর খালাস পেলেন। রাম হয়ে উঠলেন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মুখ। [ক্রমশ]