চার.
রাম-রাজনীতির এই প্রেক্ষাপটে আমরা কেদারনাথ মজুমদারের রামায়ণের পর্যালোচনা তুলে ধরতে চাই। আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে ময়মনসিংহের মতো ছোট শহরে বসে তিনি অপক্ষপাত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি নিয়ে বিচার করছেন বাল্মীকির মহাকাব্যের। এ কথা ভাবলে অবাক হতে হয়। অবাক হতে হয় কারণ একশো বছর পরেও দেখছি যুক্তির স্থান দখল করে বসেছে ভক্তি। না, শুধু ভক্তি নয়, একে অন্ধভক্তি বলা যায়। আর এই অন্ধভক্তির জোয়ারে ভেসে মাতাল করা যায় মানুষকে, জেতা যায় নির্বাচনে।
কেদারনাথ মজুমদার ১৩১০ বঙ্গাব্দে ‘রামায়ণের সমাজ’ লেখার কাজ শুরু করেন। প্রথমে তিনি দুটি রামায়ণের বঙ্গানুবাদ করেন, তারপরে আলোচনার ধারা ও বিষয়সূচি প্রস্তুত করেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ‘রামায়ণ তত্ত্ব’ তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করে। ১৩১৪ বঙ্গাব্দে ‘রামায়ণের সমাজে’র কিছু অংশ লিখিত হয় এবং সুরেশচন্দ্র সমাজপতির আগ্রহে ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ১৩১৭ বঙ্গাব্দে আরও কিছু অংশ হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষের ‘আর্য্যাবর্তে’ প্রকাশিত হয়। কেদারনাথের এই রচনার সমালোচনাও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এতে কেদারনাথ উৎসাহিত হন। এই প্রবন্ধগুলিকে গ্রন্থাকারে রূপ দেবার পরিকল্পনা করে তিনি। তাই তিনি ১৩২১ সালের অগ্রহায়ণ মাসে কলকাতা যাত্রা করেন। উদ্দেশ্য উমেশচন্দ্র বিদ্যারত্নের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তাঁর পরামর্শ প্রার্থনা।
উমেশচন্দ্র পণ্ডিত মানুষ। বেদ, মহাভারত, পাণিনি, ব্রাহ্মণ্যসূত্র তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল। কিন্তু তাঁর মতের সঙ্গে কোনদিন অন্য কারোর মতের মিল হত না। কেদারনাথ জানতেন সে কথা। কিন্তু তিনি যদি বিরুদ্ধ কথা বলেন, তাহলে কেদারনাথ নিজের ভুল-ভ্রান্তি সম্বন্ধে অবহিত হতে পারবেন, নিজের লেখা সংশোধন করে নিতে পারবেন। তাই প্রতিদিন সকালে কেদারনাথ উমেশচন্দ্রের সিমলা স্ট্রিটের বাড়িতে হাজির হতে লাগলেন। নিজের লেখা-পড়ার কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় উমেশচন্দ্র বিরক্ত হলেও কেদারনাথের রচনাগুলি পাঠ করে নিজের মতামত জানিয়েছিলেন উমেশচন্দ্র।
উমেশচন্দ্রের পরামর্শ অনুযায়ী কেদারনাথ নতুন করে বেদ সংহিতা ও সূত্রগ্রন্থগুলি পড়তে শুরু করেন এবং নিজের লেখা সংশোধন করেন। কিন্তু পরবর্তী সাত বছর নানা সমস্যায় বিব্রত ছিলেন বলে কেদারনাথ ‘রামায়ণের সমাজ’ গ্রন্থাকারে প্রকাশ করতে পারেন নি। ১৩২৮ সালে বন্ধুবর্গের পরামর্শে আবার নতুন করে সেই বইএর কাজ শুরু করেন।
পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত হবার পরে সুসঙ্গের মহারাজা, কেদারনাথের হিতৈষী ভূপেন্দ্রচন্দ্র সিংহ তাঁকে বলেন, ‘আপনার প্রবন্ধগুলি খুব interesting হচ্ছে বটে কিন্তু প্রচলিত সমাজধর্মের বিরোধী হচ্ছে। আপনি হিন্দুশাস্ত্রে বিশ্বাসী একজন সুপণ্ডিত ব্যক্তিকে আপনার বইএর পাণ্ডুলিপি দেখিয়ে নিন।’
মহারাজার বক্তব্যের মধ্যে ‘প্রচলিত সমাজধর্মের’ বিরোধিতার কথাটি উল্লেখযোগ্য। তার মানে এতাবৎ রামায়ণকে যে ভাবে দেখা হচ্ছিল, কেদারনাথের দেখা তার বিপরীত। একদম সঠিক কথা। কেদারনাথের রামায়ণ বিচার প্রসঙ্গে তাঁর ব্যতিক্রমী দৃষ্টির পরিচয় লাভ করব আমরা। মহারাজার প্রস্তাব শুনে কেদারনাথের মনে পড়ে পণ্ডিত দুর্গাদাস রায়ের কথা। মেদিনীপুর সাহিত্য সম্মেলনে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল কেদারনাথের। দুর্গাদাস রায় কেদারনাথের পাণ্ডুলিপি পাঠ করে লিখলেন :
“আপনার এই গ্রন্থ বাঙ্গালা সাহিত্যে সম্পূর্ণ নতুন গ্রন্থ হইয়াছে। কাহাকেও এই গ্রন্থ দেখাইয়া কোন ফল পাইবেন না। কেন না, আপনি যেরূপ একাগ্র সাধনার সহিত রামায়ণ পাঠ করিয়াছেন ও তাহা হইতে ভাব উদ্ধার করিয়াছেন, অন্য কেহ তেমনভাবে তাহা পাঠ করেন নাই।”
দুর্গাদাস রায় মুক্তকণ্ঠে কেদারনাথের স্বতন্ত্রদৃষ্টির কথা স্বীকার করেছেন :
“আপনি অপরের মতের প্রতি লক্ষ্য না করিয়া যে নিজের স্বাধীন মত প্রচার করিতে চেষ্টা করিয়াছেন — আমার মতে তাহা ভালোই করিয়াছেন। আপনি এই সিরিজ শেষ করিয়া যাইতে পারিলে বাঙ্গালা সাহিত্যে প্রকৃতই রিসার্চ করিয়া যাইতে পারিলেন।”
কিন্তু ‘রামায়ণের সমাজে’র অর্ধাংশের কিছু বেশি মুদ্রিত হওয়ার পরেই কেদারনাথ প্রয়াত হন। ‘প্রকাশকের নিবেদনে’ নরেন্দ্রনাথ মজুমদার লিখেছেন :
“তাঁহার স্বহস্তে লিখিত পাণ্ডুলিপি অবলম্বনে অবশিষ্টাংশ মুদ্রিত হইয়াছে। পাণ্ডুলিপির হস্তাক্ষরের অস্পষ্টতা হেতু স্থানে স্থানে মুদ্রণ কার্যে ভুল ভ্রান্তি ঘটিয়াছে। এই ত্রুটি অনিবার্য। গ্রন্থকার নিবেদনে বলিয়াছেন যে একটি শুদ্ধিপত্র প্রদান করা হইল। কিন্তু সেরূপ শুদ্ধিপত্র প্রস্তুত করিয়া যাইতে পারেন নাই। ইহা আমার ক্ষমতার অতীত, আর অপরের দ্বারা সম্ভবপরও নহে।
গৌরচন্দ্র নাথ কেদারনাথের এই গ্রন্থের নামকরণ সম্বন্ধে একটি নতুন তথ্য যোগ করেছেন। ‘সৌরভ সাহিত্য সংঘে’র উৎস সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন :
“সৌরভ সাহিত্য সংঘের প্রথম অধিবেশনের প্রায় এক ঘন্টা পূর্বে কেদারনাথ আমাকে রামায়ণের সমাজের প্রথম অধ্যায় পড়িতে দিলেন। তখন গ্রন্থের নাম ছিল ‘রামায়ণী সমাজ’। আমি শিরোনাম দেখিয়াই বলিলাম, রামায়ণী সমাজ কথাটা ব্যাকরণসঙ্গত নহে। কারণ, প্রথম শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ, দ্বিতীয়টি পুংলিঙ্গ ; গ্রন্থের নাম ‘রামায়ণের সমাজ’ হইলেই ভালো হয়। তিনি তৎক্ষণাৎ আমার হাত হইতে কপি নিয়া ‘রামায়ণী সমাজে’র পরিবর্তে ‘রামায়ণের সমাজ’ লিখিয়া লইলেন।” [ক্রমশ]