পাঁচ.
কেদারনাথের ‘রামায়ণের সমাজ’ দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে সাধারণভাবে রামায়ণের বিভিন্ন দিকের আলোচনা আছে। উপক্রমণিকায় (১ম অধ্যায়) তিনি রামায়ণকে ধর্ম, কাব্য ও ইতিহাসের ত্রিবেণীসঙ্গম বলেছেন। তাঁর মতে রামায়ণ এক কল্পতরুসদৃশ :
“রামায়ণ ধর্মগ্রন্থ, রামায়ণ মহাকাব্য, রামায়ণ ইতিহাস। আমরা দেখাইব রামায়ণ প্রকৃতই কল্পতরুসদৃশ। আমরা এই কল্পতরুসদৃশ রামায়ণের নিবিড় শাখা পল্লবাভ্যন্তর হইতে অমৃতফল চয়ন করিতে চেষ্টা করিব। সহৃদয় পাঠক, সেই অমৃত ফলের রসাস্বাদনে আপনাদের অতীত জাতীয় জীবনের প্রকৃত ঐতিহাসিক তত্ত্বের অনুরেণুও কিছু পাইয়াছেন মনে করিলে পরিশ্রম সার্থক মনে করিব।”
‘রামায়ণের সমাজে’র প্রথম ভাগের মোট অধ্যায় ১২টি। প্রথম অধ্যায় উপক্রমণিকা। দ্বিতীয় অধ্যায়ে কবি ও কাব্যের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। লেখকের মতে বাল্মীকির কাব্যের নাম ছিল ‘পৌলস্ত্যবধ’ এবং তাঁর রচনার পরিমাণ অজ্ঞাত। তৃতীয় অধ্যায়ে লেখক বলেছেন বাল্মীকি যেমন আদি কবি নন, তেমনি রামায়ণও আদি কাব্য নয়। চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচিত রামায়ণের সমাজ ও রামায়ণের কবির সমসাময়িকতা। পঞ্চম অধ্যায়ে রামায়ণের ছন্দ ও রচনারীতির আলোচনা করা হয়েছে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে রামায়ণে আর্ষপ্রয়োগ, সপ্তম অধ্যায়ে রামায়ণের উপাদান, অষ্টম অধ্যায়ে রামায়ণোক্ত ঘটনাসমূহের ব্যাপ্তিকালের আলোচনা আছে।
রামায়ণে বাল্মীকির রচনার পরিমাণ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন লেখক নবম অধ্যায়ে। দশম অধ্যায়ে আছে রামায়ণের প্রক্ষিপ্ত রচনার কথা। এই অধ্যায়ে অবতারবাদ নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা আছে। একাদশ অধ্যায়ের শিরোনাম হল : প্রক্ষিপ্ততায় ক্ষতি কি? দ্বাদশ অধ্যায়ে বিভিন্ন অঞ্চলে (ভারত ও ভারতের বাইরে) রামায়ণ কথার প্রচার ও প্রসার নিয়ে আলোচনা করেছেন কেদারনাথ।
গ্রন্থের দ্বিতীয় ভাগে রামায়ণের সমাজের আলোচনা আছে মোট সাতটি অধ্যায়ে। প্রথম অধ্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ। এতে কেদারনাথ আলোচনা করেছেন রামায়ণের ঐতিহাসিকতা নিয়ে। তাঁর মতে কবির কাব্য নিখুঁত ইতিহাস নয়, তবে তার ভিতর থেকে ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহ করা যায়।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে রামায়ণের সমাজধর্ম নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যার মধ্যে আছে পণপ্রথা, স্বয়ম্বর প্রথা, বিবাহের বয়স, বিধবার অবস্থা, দেবর-ভাসুর সম্পর্ক, অবরোধ প্রথা, বহুবিবাহ, সতীদাহ প্রথা, সহমরণ, সপত্নী পীড়ন প্রভৃতি।
চতুর্থ অধ্যায়ে সামাজিক ক্রিয়া ও অনুষ্ঠানের কথা আছে। যেমন — উপনয়ন, আহ্নিকতত্ত্ব, কন্যাসম্প্রদান, মাতৃবাচ্যা ও পিতৃবাচ্যা পরিবার, বধূবরণ, অভিষেক, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, শবানুগমন, নবান্ন, পুত্রেষ্টি যজ্ঞ, বাস্তু শান্তি, বলি, প্রত্যুপবেশন, প্রায়োপবেশন।
পঞ্চম অধ্যায়ে সমাজের দেবতাদের নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন লেখক। বেদে দেবতা বলত কি বোঝায়, রামায়ণের দেবতা কারা, শিব অনার্য দেবতা কি না, রামায়ণে ঈশ্বরজ্ঞানের অভাব, লিঙ্গপূজা, পুরাণে ভগবতীর আরাধনা, সূত্রযুগে দেবীকথা প্রভৃতি এই অধ্যায়ের বিষয়।
পঞ্চম অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয় আহার্য্য ও আহার। এই অধ্যায়ে ঋষি, সাধারণ মানুষ, বানর, রাক্ষসদের খাদ্য ও পানীয়ের উল্লেখ করেছেন লেখক। তাঁর দুটি মত উল্লেখযোগ্য। প্রথমত রামায়ণের সমাজ চাতুবর্ণসমাজের প্রাথমিক অবস্থার সমাজ। এখানে পানীয় হিসেবে মদের ব্যাভিচার ছিল না, যা পরবর্তীকালে মহাভারতের যুগে আমরা দেখতে পাই। দ্বিতীয়ত বৈদিক যুগের শেষভাগে ও কৃষিকাজের বিস্তৃতির জন্য গোরক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেইজন্যই বোধ হয় তৎপরবর্তীকালের ঋকসমূহে গো-কে ‘অঘ্ন্য’ ও রামায়ণে ‘গোঘ্নে’র অর্থ অন্যরূপ হয়।
ষষ্ঠ অধ্যায়ের বিষয় সামাজিক নিয়ম ও লৌকিক আচরণ। সপ্তম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে শাস্ত্রানুশাসন। [ক্রমশ]