ছয়.
এবার অবতারের কথা। ভাগবতপুরাণ, গরুড়পুরাণ প্রভৃতিতে রামকে বিষ্ণুর অবতাররূপে কল্পনা করা হয়েছে। তুলসীদাস ও কৃত্তিবাসের রামায়ণেও রাম বিষ্ণুর অবতার। কেদারনাথ বলেছেন বাল্মীকির কাব্যে রাম একজন মহৎ মানুষ, কোন অবতার নন। বেদে অবতারের কথা নেই। অবতার কথার প্রথম আভাস পাওয়া যায় শতপথব্রাহ্মণে। সেখানে আছে : মৎস্য মনুকে সাবধান করে দিয়েছিলেন জলপ্লাবনের ব্যাপারে। তদনুসারে মনু মৎস্যের শরণাগত হয়ে সৃষ্টি রক্ষা করেন। শতপথের এই কাহিনি অন্যান্য পুরাণে পল্লবিত হয়ে প্রকাশ পায়।
কেদারনাথের মতে ব্রাহ্মণ্যগ্রন্থে প্রজাপতির মৎস্য, কূর্ম প্রভৃতি রূপে প্রকাশিত হবার ভাব অপেক্ষা মানব সমাজে ভগবানের অবতাররূপ পরিগ্রহ করে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের ভাব বহু পরবর্তী। গীতায় শ্রীকৃষ্ণের একটি উক্তিকে আশ্রয় করে মহাভারত ও পুরাণগুলিতে বিষ্ণুর অবতাররূপে জন্মগ্রহণের কল্পনা বিকশিত হয়। কালে কালে মূল বাল্মীকি রামায়ণে প্রবেশ করে অনেক প্রক্ষিপ্ত বিষয়। অবতারবাদও এমনিভাবে পরবর্তীকালে প্রবিষ্ট হয়েছে।
দেবতারা যজ্ঞস্থলে ষজ্ঞভাগ গ্রহণ করতে সমবেত হয়েছেন, এ রকম কলপনা বৈদিক হওয়া অস্বাভাবিক নয় ; আর এরকম সময়ে দেবতাদের মন্ত্রণাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেখানে পৌরাণিক দেবতা ব্রহ্মা-বিষ্ণু প্রভৃতির আবির্ভাব মোটেই স্বাভাবিক নয়। কারণ এই সব দেবতা বেদের দেবতা নন।
তাছাড়া, দেবতাদের মন্ত্রণার বিষয় ও কার্যপ্রণালী একেবারেই অস্বাভাবিক। বর্ণনাটা এই রকম :
দেবতারা যজ্ঞস্থলে সমবেত হয়ে ব্রহ্মাকে বললেন, ‘ভগবান! আপনার বর লাভ করে রাবণ নামে এক রাক্ষস আমাদের পীড়িত করছে। আপনি তার নিধনের উপায় নির্ধারণ করুন।’ তখন ব্রহ্মা রাবণ বধের উপায় নির্দেশ করেন। ইত্যবসরে বিষ্ণু সেখানে উপস্থিত হলে দেবতারা তাঁকে রাজা দশরথের পত্নীদের গর্ভে চারভাগে জন্মগ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। এর ফলে রাম বিষ্ণুর অর্ধাংশরূপে, ভরত সিকি অংশরূপে, লক্ষণ ও শত্রুঘ্ন মিলিতভাবে বাকি সিকি অংশরূপে আবির্ভূত হন।
এই বর্ণনার মধ্যে কেদারনাথ ভাবের অসামঞ্জস্য দেখে একে প্রক্ষিপ্ত বলে মনে করেছেন। রামায়ণের ১৫শ সর্গ থেকে ১৮শ সর্গ পর্যন্ত এই রকম প্রক্ষিপ্তভাব বিস্তৃত।
রাম যে বিষ্ণুর অবতার এ কথা যদি বাল্মীকির কথা হত তাহলে ৯ম সর্গে সুমন্ত্র যখন দশরথকে তাঁর পুত্রপ্রাপ্তির কল্পিত প্রাচীন ইতিহাস বিবৃত করছিলেন, তখনই তার আভাস পাওয়া যেত। কিন্তু সে আভাস পাওয়া যায় নি। যেমন আভাস পাওয়া যায় নি ১২শ সর্গেও। এই সর্গে ঋষ্যশৃঙ্গ রাজা দশরথকে বলেছিলেন তিনি বিক্রমশালী চারটি পুত্রের জনক হবেন। সেখানে বিষ্ণুর অবতারের কোন কথা নেই।
কেদারনাথ বলেছেন :
“রামকে অবতার প্রতিপন্ন করিবার ইচ্ছা বাল্মীকির থাকিলে, তাঁহার অন্তরের ভাব রামায়ণের সর্বত্র ফুটিয়া উঠিত। অধ্যাত্ম রামায়ণের কবির মনে সেরূপ ভাব ছিল, তাঁহার গ্রন্থে তাহা ফুটিয়া উঠিয়াছে। কৃত্তিবাসের হৃদয়ে যে প্রকৃতই রাম-সীতা প্রভাব বিস্তার করিয়া বসিয়াছিলেন, তাহার নিদর্শন কৃত্তিবাসী রামায়ণের পাতায় পাতায় বিদ্যমান রহিয়াছে। তাহার প্রভাবে সরল বিশ্বাসী বাঙ্গালি পাঠকের হৃদয়েও কৃত্তিবাসী রাম-সীতা লক্ষ্মী-জনার্দন রূপে আসন পাতিয়া বসিয়া আছেন। বাল্মীকির রাম-সীতা তাঁহার রচনায় আদর্শ দম্পতিরূপে প্রদর্শিত হইয়াছেন।”
কেদারনাথের মতে ভারতীয় আর্য সাহিত্যে অবতারবাদের কল্পনা প্রাচীন হলেও রামকে অবতাররূপে প্রচার করার ভাব খুব প্রাচীন নয়। বুদ্ধদেব যখন হিন্দুর চিন্তায় অবতারের মধ্যে পরিগণিত হন, রামও তখন অবতার বলে গৃহীত হন। বৌদ্ধযুগের পূর্বে আর্য সাহিত্যে রাম অবতার বলে গৃহীত হন নি।
সাত.
রামায়ণ কি নিছক কবি-কল্পনার ফসল ? না কি এর মধ্যে ঐতিহাসিক উপাদান আছে ?
নিছক কবি-কল্পনা বলে কিছু নেই। কবি হয়তো দাবি করেন যে তিনি অপূর্ববস্তু নির্মাণ করেছেন। কিন্তু সন্ধান করলে দেখা যাবে সেই অপূর্ববস্তুর কোন না কোন উপাদান পৃথিবীতে আছে। একজন শিল্পী পক্ষীরাজ ঘোড়ার ছবি এঁকে দাবি করেছিলেন তিনি এক সম্পূর্ণ নতুন প্রাণীর ছবি এঁকেছেন। কিন্তু আখেরে তাঁর দাবি ধোপে টিকল না। দেখা গেল তাঁর পক্ষীরাজ আসলে পাখি ও ঘোড়ার সম্মিলিত রূপ। বাস্তব জগতের কোন না কোন উপাদান অবলম্বন করে শিল্পী অপূর্ববস্তু নির্মাণ করেন। বাস্তবের অনুকরণকারী বলে দার্শনিক প্লেটো তাঁর রিপাবলিক থেকে শিল্পীদের নির্বাসন দিয়েছিলেন।
ঠিক একই কথা বলেছেন কেদারনাথ মজুমদার :
“ কাব্য কল্পনার সৃষ্টি হইলেও কল্পনা যে প্রকৃত সৃষ্টিকে বা দেশকালপাত্রকে অতিক্রম করে না, ইহা অস্বীকার করা যাইতে পারে না। স্বপ্ন যেমন দ্রষ্টার চিন্তার বা্হিরের কোন অদৃষ্টপূর্ব অপ্রত্যক্ষ পদার্থের কল্পনা করিতে অসমর্থ, কবিও সেইরূপ তাঁহার কল্পনাকে অবাস্তবের উপর প্রতিষ্ঠিত করিতে পারেন না। আকাশকুসুম কল্পনায় উপনীত হইতে হইলে আকাশর সহিত ও কুসুমের সহিত পরিচয় থাকা প্রয়োজন। ইহার পর এই কল্পনা এই দুই পদার্থের সামঞ্জস্যে অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য হইয়া প্রকাশিত হইতে পারে—ইহা অসম্ভব নহে। ”
রামায়ণের মূল আখ্যানভাগ বাল্মীকি সংগ্রহ করেন নারদের কাছ থেকে। কেদারনাথের সিদ্ধান্ত রাম এবং বাল্মীকি সমসাময়িক মানুষ। বাল্মীকির প্রামাণ্য জীবনী পাওয়া গেলে রামের ঐতিহাসিকতার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যেত। কিন্তু সে আশা আর পূর্ণ হবার নয়। তবে বাল্মীকি রামের জীবনের ব্যাপ্তিকালের কিছু প্রমাণ দিয়ে গিয়েছেন তাঁর কাব্যে :
ক] আদিকাণ্ডে রামের জীবনের ১৫-১৬ বছরের কথা বিবৃত। রামের জন্ম সম্বন্ধে বলা হয়েছে : যজ্ঞের পর ছয় ঋতু অতীত হলে চৈত্রের নবমী তিথিতে পুর্নবসু নক্ষত্রে, রবি-মঙ্গল-শনি-বুধ-শুক্র এই পক্ষগ্রহের মেষ-মকর-তুলা-কর্কট-মীন এই পঞ্চরাশিতে সঞ্চার হলে এবং বৃহস্পতি চন্দ্রের সঙ্গে কর্কটরাশিতে উদিত হলে কৌশল্যার গর্ভে রাম জন্মগ্রহণ করেন।
খ] অযোধ্যাকাণ্ডে রামের জীবনের আনুমানিক ১ সপ্তাহের কথা বিবৃত হয়েছে।
গ] অরণ্যকাণ্ডে রামের জীবনের ১৩ বছরের কথা বিবৃত হয়েছে।
ঘ] কিষ্কিন্ধাকাণ্ডে আনুমানিক ১০ মাসের কথা বিবৃত হয়েছে।
ঙ] সুন্দরকাণ্ডে আনুমানিক এক মাসের কথা বিবৃত হয়েছে।
চ] লঙ্কাকাণ্ডে বিবৃত হয়েছে মাসাধিককালের কথা।
রামায়নের ছয়টি কাণ্ডে বাল্মীকি রামের ৩০-৩২ (বা, ৪০-৪২) বৎসরের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। [ক্রমশ]