আট.
রামায়ণে প্রক্ষিপ্ত রচনার বিচার করেছেন কেদারনাথ। লঘু রামায়ণের রচয়িতা আদি কাণ্ডকে প্রক্ষিপ্ত রচনা বলে মনে করেন, কিন্তু কেদারনাথ সে মত গ্রহণ করেন নি। তবে তিনি মনে করেন যে আদি কাণ্ডের মূল ঘটনাবলি প্রক্ষিপ্ত না হলেও অনেক উপঘটনা প্রক্ষিপ্ত।
১৫শ সর্গ থেকে রাম প্রভৃতির জন্মকথার সূচনা হয়েছে। এই পর্বে রাম, লক্ষণ, ভরত, শত্রুঘ্নকে বিষ্ণুর অবতার বলে প্রচার করার চেষ্টা হয়েছে। এই অবতারবাদকে প্রক্ষিপ্ত বলে রা্য় দিয়েছেন কেদারনাথ। তাঁর যুক্তি : ‘রামকে অবতার প্রতিপন্ন করিবার ইচ্ছা বাল্মীকির থাকিলে, তাঁহার অন্তরের ভাব রামায়ণের সর্বত্র সমানভাবে ফুটিয়া উঠিত।’ এই সর্গের ৮, ৯, ১০ শ্লোকে রাম, লক্ষণাদির জন্মের যে লগ্নমান প্রদত্ত হয়েছে, তা প্রক্ষিপ্ত।
২০ ও ৭৫ সর্গে দশরথের চরিত্রে যে হীনভাব প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তিনি কম্পিত কলেবরে রামের জীবনভিক্ষা প্রার্থনা করেছেন, তা তাঁর ক্ষত্রিয়োচিত চরিত্রের বিরোধী। এই কারণে এই অংশ প্রক্ষিপ্ত।
৩৮ থেকে ৪৪ সর্গে সগর বংশের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। পদ্মপুরাণ, মহাভারত ও রামায়ণে সগর বংশের বিবরণ তিনভাবে বিবৃত হয়েছে। এই কাহিনিটি নিশ্চয়ই প্রাচীন। কিন্তু কপিলের অবতারত্বসহ অনেক ঘটনা প্রক্ষিপ্ত।
৪৮ ও ৪৯ সর্গে আছে ইন্দ্র-অহল্যা সংবাদ। কেদারনাথের মন্তব্য, ‘রাম যে বিষ্ণুর অবতার তাহা প্রমাণের জন্য এই গল্পটি কল্পিত হইয়াছে। চেষ্টা সফল হয় নাই। কেবল সমসাময়িক সামাজিক রুচিরই পরিচয় দেওয়া হইয়াছে মাত্র। অবতারবাদ কল্পনাটি যেমন ১৮ সর্গে তিনটি মাত্র পংক্তিতে প্রাণহীনভাবে উক্ত হইয়াছে, এই গল্পটিও ঠিক সেইরূপ হইয়াছে। গল্পের কোন স্থানেই উজ্জ্বল ভাব ফুটিয়া উঠে নাই।’ কেদারনাথ বলেছেন, ‘রামায়ণের এই অহল্যাকথা পুরাণে আছে। পুরাণের পক্ষে এ গল্প পুরাতনই বটে, কিন্তু রামায়ণের পক্ষে তাহা নহে। অহল্যার পুত্র শতানন্দ বিদেহ রাজজনকের পুরোহিত, রাম-লক্ষণাদির বৈবাহিক ব্যাপারের প্রধান কর্মকর্তা। এরূপ সাক্ষাৎ একজন ঋষির মাতার সম্বন্ধে বক্তা বিশ্বামিত্রই বা এসকল অপবাদ কথা প্রকাশ করেন কিভাবে?’
রামায়ণে জাতিবিদ্বেষের ভাব প্রক্ষিপ্ত। কেদারনাথের মত এই যে রামায়ণের আদি স্তরের রচনায় জাতিবিদ্বেষের ভাব নেই, স্মৃতিতে নিম্ন-জাতিসমূহের কোন উদ্ভবের আভাস নেই। যে সময়ের ঋষি অযোধ্যার রাজা রামচন্দ্র দ্বারা তাঁরই রাজধানীর অদূরবর্তী নিষাদজাতীয় রাজাকে আলিঙ্গনে বদ্ধ করিয়েছেন, সে সময়ের রচনায় জাতির উচ্চ-নীচ বিষয়ক কোন মাপকাঠি ছিল না, চণ্ডাল বলে কোন শ্রেণি ছিল না।
হরধনু ব্যাপারটিকে প্রক্ষিপ্ত মনে করেন কেদারনাথ। কারণ বাল্মীকির যুগের দেবতা বরুণ। বৈদিক দেবতা তিনি। বাল্মীকি বরুণের ধনুর কথাই বলতে চেয়েছেন। শৈবমতের প্রভাবে বরুণধনু রূপান্তরিত হয়েছে হরধনুতে ; ঠিক যেমন বৈষ্ণবপ্রভাবে রাম হয়েছিলেন বিষ্ণুর অবতার। বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠ ঋষির কথা রামায়ণে আছে। কিন্তু কেদারনাথের মতে বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠ কোন নাম নয়, উপাধি। বেদে তার প্রমাণ আছে।
৭৪ ও ৭৫ সর্গে রাম ও পরশুরামের কাহিনি আছে। কেদারনাথের ধারণা ব্রাহ্মণ অপেক্ষা ক্ষত্রিয়ের প্রভাব অধিক প্রমাণের জন্য রামায়ণে বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্রের গল্পের মতো রাম-পরশুরামের প্রতিযোগিতার কথা প্রবেশ করানো হয়েছিল। কেদারনাথের উক্তি, ‘ভারতবর্ষ বিরোধেরই দেশ। দেশে যখন শৈব ও বৈষ্ণব প্রভাব বৃদ্ধি হইয়াছিল, তখন এই উভয় ভক্তদলের মধ্যে ভীষণ প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাইয়াছিল। এই সর্গগুলিতে সেই যুগপ্রভাবের চিহ্ন, রুদ্র-বিষ্ণুর বিরোধের বর্ণনায় প্রকাশিত হইয়াছে।’
অযোধ্যাকাণ্ডের ১০৮ ও ১০৯ সর্গে বর্ণিত রাম-জাবালির কথাকে প্রক্ষিপ্ত মনে করেন কেদারনাথ। এই কাহিনিতে যে যুক্তিবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তা রামায়ণী যুগের ধর্ম হতে পারে না। এতে যুক্তির অবতারণার দ্বারা বুদ্ধের মতকে নিন্দা করা হয়েছে। এক জায়গায় ‘তথাগত’ নামটিও স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে। অযোধ্যাকাণ্ডের অন্যান্য সর্গের ভিতরেও বহু প্রক্ষিপ্ত শ্লোক ও শব্দ প্রবেশ করেছে।
এর পরে উত্তরকাণ্ডের কথা। এটি যে বাল্মীকির রচিত নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যাবে ৪৮ সর্গ পাঠ করলে। শত্রুঘ্ন বাল্মীকির আশ্রমে গিয়ে রামায়ণ গান শুনে এসেছিলেন; রামায়ণ পূর্বে রচিত না হলে তিনি রামায়ণ গান শুনতে পারেন কিভাবে ?
তাছাড়া, উত্তরকাণ্ডের বহু বর্ণনার সঙ্গে মূল রামায়ণের কোন ঐক্য নেই, যেমন অহল্যা উদ্ধার।
মহাভারতের বনপর্বে বর্ণিত রামায়ণ কথায়ও উত্তরকাণ্ডের বর্ণিত বিষয়ের কোন আভাস নেই। যাঁরা রামায়ণকে মহাভারতের পূর্বের রচনা বলতে দ্বিধাবোধ করেন, তাঁদের পক্ষে এই বিষয়টি লক্ষ্য করার মতো। আসলে মহাভারতে রামায়ণের কাহিনি গৃহীত হবার পরে উত্তরকাণ্ড রামায়ণে যুক্ত হয়। [ক্রমশ]