নয়.
অবতারবাদ, ষষ্ঠীদেবী, ভৌতিক ব্যাপার, তন্ত্র-মন্ত্র, কর্ণভেদ প্রথা, মূর্তিপূজা, সরস্বতীদেবীকে ফুল-ফল দ্বারা নৈবেদ্য প্রদান, বর্ণমালা শিক্ষা প্রভৃতি পরবর্তীকালের অনেক ঘটনা বাল্মীকি রামায়ণে প্রবেশ করেছে। যথোচিত বিচার না করে অনেকে সেইগুলিকে বাল্মীকির রচনা বলে গ্রহণ করেছেন এবং সেইভাবে রামায়ণের ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন না করলে বাল্মীকির প্রতি অবিচার করা হবে। ভারতীয় সাহিত্যে প্রক্ষিপ্ততার অত্যাচার লক্ষ্য করেছিলেন প্রাচ্যতত্ত্ববিদ বেন্টলি। তিনি বলেছিলেন যে সাহিত্যের জালিয়াতি ভারতে এত অধিক প্রচলিত ছিল যে কোন গ্রন্থ কৃত্রিম আর কোনটা অকৃত্রিম তা বোঝার উপায় ছিল না। ভারতে এমন কোন বিধান নেই যাতে জালিয়াতরা বুঝতে পারে এই interpolation অন্যায়।
বিলাতের ‘ওয়েস্টমিনিস্টার রিভিউ’ পত্রিকায় এই প্রক্ষিপ্ততার আলোচনা করে বলা হয়েছে :
“রামায়ণের আদি রচনার ভিতরে যুগে যুগে বহু পরবর্তী সাময়িক চিন্তা ও ভাব প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। বিশেষ যত্নের সঙ্গে তা বিচার করে পরিত্যাগ করলে তবেই কবির প্রাচীন মৌলিক সম্পদ লাভ করা যেতে পারে। কিন্তু এই রকম পরীক্ষার ব্যাপার অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এবং প্রায় অসম্ভব। ঠিক হোমারের রচনা উদ্ধারের মতো অসম্ভব।”
ব্যাপারটা অসম্ভব হলেও প্রক্ষিপ্ততা উদ্ধারের চেষ্টা দরকার। কিন্তু ভারতীয়দের মধ্যে সেই চেষ্টা দেখতে না পেয়ে উক্ত পত্রিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে :
“যখন আদি সংগীতগুলি সংগৃহীত ও গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হয়েছিল, তখন সেই অকৃত্রিম গাথার সঙ্গে বহু কৃত্রিম গাথাও তার ভিতরে যুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই যে একটা অন্যায় কাজ হয়েছিল, কোন ভারতীয় সমালোচকই এর সংস্কারের জন্য অনুমাত্র সচেষ্ট হলেন না।”
মনিয়র উইলিয়ামসও বলেছেন যে বৌদ্ধমতের আলোচনা ও রামের অবতারবাদের মতো বহু পরবর্তী চিন্তা রামায়ণের ভিতর প্রচুর পরিমাণে থাকার ফলে রামায়ণের সময় নিরুপণের চেষ্টা অসাধ্য হয়েছে। তবে সহমরণ প্রসঙ্গে কোন উল্লেখ না থাকায় এবং দাক্ষিণাত্য জনপদে আর্যবসতির চিহ্ন লক্ষিত না হওয়ার ফলে রামায়ণের রচনাকাল সম্বন্ধে একটা সাধারণ ধারণায় উপনীত হওয়া যায়।
পরবর্তীকালের কবি ও লেখকরা রামায়ণের উপর এই যে প্রক্ষেপ আরোপিত করেছেন, অধিকাংশস্থলেই তাঁরা জাতির অথবা সম্প্রদায়ের ধর্মের অনুকূলে এবং রুচির অনুকূলে তা করেছেন। সেই জন্য তা অনিষ্টকারী হলেও, জাল-জুয়াচুরি হলেও সমাজের প্রতিবাদের বিষয় হয় নি। এরকম কাজকে সমাজ দূষনীয় বলে নির্দেশ করে নি। একে আমরা কৃত্রিম উপায়ে উদ্দেশ্য লাভের চেষ্টা বলতে পারি।
কেদারনাথ বলেছেন :
“কৃত্রিম উপায়ে উদ্দেশ্য লাভের যে চেষ্টা, সেই চেষ্টা উচ্চ উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হয় না, বরং তাতে অপকারই হয়ে থাকে অধিক। রামায়ণে পরবর্তীকালের যে সকল সাময়িকভাব প্রক্ষিপ্ত হইয়াছিল, তাহা দ্বারা সমাজ বা সম্প্রদায় সাময়িকভাবে উপকৃত হইলেও রামায়ণের প্রাচীনত্বের গৌরব সাধারণ শিক্ষিত সমাজের নিকট প্রভূত পরিমাণে হ্রাস হইয়াছে এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রক্ষিপ্ত বিষয়সমূহও জগতের সম্মুখে হেয় এবং অর্বাচীন বলিয়া শ্রদ্ধা হারাইতে বসিয়াছে।
“রামায়ণের প্রাচীন রচনার ভাব পরিবর্তন ও প্রাচীন রচনার মধ্যে নতূন রচনার সমাবেশ যাঁহারা করিয়াছেন, নিন্দুকের নিকট এবং সাধারণ পাঠকের নিকট রামায়ণের গৌরব তাঁহারাই হ্রাস করিয়াছেন। সাধারণ পাঠক বা ছিদ্রান্বেষী সমালোচকের অপরাধ তাঁহাদের তুলনায় সামান্য। অকৃত্রিমতা গৌরবের এবং সম্মানের নিদান, কৃত্রিমতা তাহার বিরোধী।”
রামায়ণের প্রাচীন রচনার ভিতরে প্রক্ষিপ্ত রচনা প্রবেশ করানোর ব্যাপারে খুব যে যত্ন ও কৌশল অবলম্বিত হয়েছিল তা নয় এবং তার স্পষ্ট প্রমাণ আছে। সেজন্য প্রক্ষিপ্ত রচনা চিহ্নিত করা খুব কষ্টকর নয়। তাই কেদারনাথ বলেন :
“যেমন যত্ন, চেষ্টা ও কৌশল প্রয়োগ প্রাচীন ও নূতন ভাবের অভিজ্ঞতা প্রদর্শনে প্রয়োজন, তেমন যত্ন, চেষ্টা ও কৌশল অবলম্বন করিয়া এই সকল পরিবর্তন করা হয় না; সুতরাং এইরূপ চিন্তাহীনতার পরিচায়ক যে পরিবর্তন ও সংযোজন তাহা সহজেই ধরা পড়ে।’’ (ক্রমশ)