দশ.
রামায়ণসহ বিশ্বের প্রাচীন গ্রন্থগুলি কেন প্রক্ষেপকণ্টকিত হয়, তার কারণ বিশ্লেষণ করেছেন কেদারনাথ। প্রথমত, বর্তমান যুগের লেখকদের মতো সেকালের লেখকদের নাম প্রচার করে খ্যাতি অর্জনের স্পৃহা না থাকলেও নিজের রচনাকে সাধারণের মধ্যে প্রচার করার স্বাভাবিক ইচ্ছা ছিল। রামায়ণের উত্তরকাণ্ডের অজ্ঞাতনামা লেখক এই কারণে তাঁর বিরাট শ্রমকে বাল্মীকির নামে প্রচার করে কৃতার্থ হতে চেয়েছিলেন। ঠিক একই কারণে ‘হরিবংশে’র লেখক হরিবংশকে ‘মহাভারতে’র পরিশিষ্টরূপে প্রচার করে ধন্য হতে চেয়েছিলেন; ‘গীতা’র রচয়িতাও তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ দার্শনিক যুক্তিবাদকে ব্যাসের নামে প্রচার করেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, সম্প্রদায়গত স্বার্থসাধনের প্রশ্নটিও উথ্থাপিত হয়। আপন সম্প্রদায়গত স্বার্থসাধনের জন্য প্রাচীন গ্রন্থে সেই সম্প্রদায়ের মত ও ভাবনা সন্নিবিষ্ট করানো হয়। রামায়ণের বহু অংশে এই রকম সাম্প্রদায়িক স্বার্থসিদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘চৈতন্যভাগবত’, ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থও এইভাবে প্রক্ষেপকণ্টকিত হয়েছে।
তৃতীয়ত, দেশ-কাল-পাত্রের প্রভাবে মানুষের মনের ভাব পরিবর্তিত হয়। পুরাতন গ্রন্থ যখন পরবর্তীকালের নবীন লেখক রচনা করেন, তখন তাঁর সমকালের চিন্তা-ভাবনা সেখানে সংযুক্ত হয়। এই রকম পরিবর্তন সম্প্রদায় বিশেষের ইচ্ছায় হয়, ব্যক্তিগত স্বার্থসাধনের জন্য হয়, ব্যক্তিগত অজ্ঞতার জন্য হয় কিংবা ব্যক্তিগত কবিত্বের প্রভাবে হয়। মুদ্রাযন্ত্র প্রচলনের পূর্বে হস্তলিখিত পুঁথির অনুলিপি প্রস্তুত করে প্রচারিত হত। অনুলিপিকারদের জ্ঞান, বুদ্ধি ও কবিত্ব যে অন্ধভাবে মূল লিপিরই হুবহু অনুলিপি করতো, তা নয়। লিপিকারকদের রুচির আদর্শও কখনও কখনও কবিত্বে উৎসারিত হয়ে অনুলিপিকে প্রক্ষেপকণ্টকিত করত। এইভাবে বাংলা কৃত্তিবাসী রামায়ণকে জয়গোপাল তর্কালঙ্কারের হাতে পড়ে আপন মৌলিকত্বকে বিসর্জন দিতে হয়েছে।
চতুর্থত, আদর্শ লিপির অক্ষরদোষ আর একটি কারণ। মূল রচনার হস্তাক্ষর স্পষ্ট ও পাঠ্য না হলে অনুলিপিতে ত্রুটির মাত্রা বৃদ্ধি পেত। হস্তাক্ষর অপাঠ্য বা অস্পষ্ট হলে অনুলিপিকারদের জ্ঞান-বিশ্বাসের প্রভাবে মূলের শব্দ পরিবর্তিত হয়ে অনুলিপিতে স্থান লাভ করত।
কেদারনাথ অক্ষর দোষের ফলে পরিবর্তনের একটা চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন বঙ্গীয় সংস্করণ ও বোম্বাই সংস্করণ থেকে। বঙ্গীয় সংস্করণের রামায়ণে ( অযোধ্যাকাণ্ডের ৪৮ শ্লোক) আছে, যেদিন রাম বনবাসে যাত্রা করলেন, সেদিন —
ন চাহ্যাষ্যন্ন চামোদন বণিজো ন প্রসারয়ন।
ন চাশোভন্ত পণ্যানি নাপঠন গৃহমেধিনঃ।। (৪/২/৪৮)
এই শ্লোকের দ্বিতীয় পংক্তির ‘নাপঠন’ কিন্তু বোম্বাই সংস্করণে নেই। ‘নাপঠন’এর পরিবর্তে সেখানে আছে ‘ন পচন’। এই শব্দ পরিবর্তনের ফলে অর্থেরও পরিবর্তন হয়েছে :
বঙ্গীয় সংস্করণের অর্থ : রামচন্দ্র যেদিন বনগমন করেছিলেন, সেদিন দুঃখদীর্ণ অযোধ্যের মানুষ পঠন অর্থাৎ বেদপাঠে বিরত ছিলেন।
বোম্বাই সংস্করণের অর্থ হল : রামচন্দ্রের বনগমনের দিন অযোধ্যার দুঃখদীর্ণ মানুষ রন্ধনকর্মে বিরত ছিলেন।
রামায়ণের যে তিনটি সংস্করণ প্রচলিত আছে তা হল : ১] কাশী সংস্করণ বা উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের রামায়ণ। ২] বোম্বাই সংস্করণ। ৩] গৌড়ীয় বা বঙ্গদেশীয় সংস্করণ।
কেদারনাথ লিখেছেন, “এই তিন সংস্করণের পাঠে বিস্তর প্রভেদ আছে। এতদ্ব্যতীত এই তিন প্রদেশের তিনটি সংস্করণ হইতে যে বহু উপসংস্করণ বাহির হইয়াছে, তাহাতে মূল সংস্করণগুলির সহিত ইহাদের রচনার দূরত্ব আরও বৃদ্ধি পাইয়া গিয়াছে। ফল এখন এমন দাঁড়াইয়াছে যে, কোনোটির সহিত কোনোটির মিল নাই; এবং কোনটি যে বিশুদ্ধ সংস্করণ তাহা আর বুঝিয়া লইবার উপায় নাই।” [ক্রমশ]