এক.
বাল্মীকি রাচিত ‘রামায়ণ’-এর জনপ্রিয়তা অন্ত্যহীন। বিশেষজ্ঞরা একে স্বতঃস্ফূর্ত মহাকাব্য বলেছেন। ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, ‘ইলিয়াদ’, ‘অদিসি’ — এই চারটি হল স্বতঃস্ফূর্ত মহাকাব্যের উদাহরণ। ‘রামায়ণ’-এর জনপ্রিয়তার ব্যাপ্তি বোঝা যাবে ‘গিলগামেশ’, ভার্জিলের ‘আইনেইদ’, দান্তের ‘লা দিভিনা কম্মেদিয়া’, বৈয়ার্দোর ‘অর্লান্দো ইন্নামোরাতো’, লুডভিকো আরিওস্তোর ‘অর্লান্দো ফুরিওসো’, তাসসোর ‘জেরুজালেম লিবেরাতা’, এরসিলার ‘লা আরাউকানা’, লুই দ্য কামোয়েসের ‘ওস লুসিয়াডাস’, জন মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’, ফেরদৌসির ‘শাহনামা’র সঙ্গে তুলনা করলে।
রামায়ণকে পরিবারজীবনের কাব্য বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেটা তার জনপ্রিয়তার একটা কারণ হতে পারে। আর একটা কারণ হল করুণ রসের প্রস্রবণ। সেই যে কবি বলেছেন — our sweetest songs are those that tell of saddest thoughts. নায়ক চরিত্রের আকর্ষণও একটা কারণ হতে পারে। রাম সুদর্শন, সুভদ্র, শান্ত, বিনীত, মার্জিত, ত্যাগব্রতী। পিতার আদেশ শিরোধার্ষ করে বনবাস গমন, রাজপুত্রের বনবাসের দুঃখ, সীতাহরণ, প্রজার মনোরঞ্জনের জন্য আপন পত্নীর নির্বাসন-এ সবই দুঃখদায়ক উপাদান। ট্রাজেডির এই উপকরণগুলিও আকর্ষণের কারণ।
সম্প্রতি ডি শাহি ও আর দুয়ার একটি গবেষণাপত্রে (Ramayana : The Indian Epic and Its Relevance to Global IR ) বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের (IR) বিচারেরও রামায়ণের জনপ্রিয়তা প্রমাণিত : “The Indian narrative tradition of Ramayana offers an equally insightful yet far more succinct viewpoint to understand various aspects of the ‘interntional’” তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মহাভারতের চেয়ে রামায়ণের প্রভাব অনেক গভীর। ইতিহাসের অধ্যাপক সন্তোষ এন দেশাই বলেছেন স্থলপথে পঞ্জাব ও কাশ্মীর হয়ে চিন –তিব্বত ও তুর্কিস্তানে ; জলপথে গুজরাত ও দক্ষিণ ভারত হয়ে জাভা-সুমাত্রা ও মালয়ে ; বাংলা হয়ে বার্মা, থাইল্যাণ্ড ও লাওসে ; জাভা থেকে ভিয়েতনাম ওক্যাম্বোডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
বাল্মীকির রামায়ণ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। দক্ষিণ-পূর্বসহ বিশ্বের নানাদেশে সন্ধান পাওয়া যায় রামায়ণের। ঐতিহাসিক এ কে রামানুজম বলেছিলেন ২২ ভাষায় লেখা ৩০০ রামায়ণের কথা ; তা নিয়ে হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। মহাভারত, বিষ্ণুপুরাণ, ভাগবতপুরাণ, পদ্মপুরাণ, স্কন্দপুরাণে উল্লেখ আছে রামায়ণের। এটা রামায়ণের প্রাচীনত্বের প্রমাণ। ব্রাহ্মণ্যযুগের পুনঃপ্রতিষ্ঠার যুগে ৩৭৫০০ টি টীকাগ্রন্থ রচিত হয় রামায়ণের। তার মধ্যে ঈশ্বরদীক্ষিত টীকা, উমা-মহেশ্বর টীকা, গোবিন্দরাজ টীকা প্রভৃতি মাত্র ২৮টি টীকাগ্রন্থ বেঁচে আছে কালের প্রহার সহ্য করে। রচিত হয়েছে নানা আঞ্চলিক রামায়ণ, যেমন : তামিলের ‘কম্ব রামায়ণ’, ওড়িয়ার ‘জগমোহন রামায়ণ’, অবধিভাষায় রচিত ‘রামচরিতমানস’, বাংলার ‘রাম পাঁচালী’।
এই যে সব রামায়ণ, এগুলি হুবহু বাল্মীকি রামায়ণের অনুবাদ নয়। বাল্মীকি যখন তাঁর রামায়ণ রচনা করেন, তখন লিপিবিদ্যা প্রচলিত হয় নি। রামায়ণও ছিল শ্রুতিকাব্য। লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছিল রামায়ণ। জীবিত ছিল লোকশ্রুতিতে, যেমন লোকসাহিত্যের নানা উপকরণ জীবিত থাকে। এক বা একাধিক সংগ্রহকারক সেইসব শ্লোক সংগ্রহ করে লিপিবদধ করেন অনেক পরে। পাদপুরণ করতে গিয়ে তাঁরা নিজেদের রচনাংশও সন্নিবিষ্ট করে দেন। সে কাজ করেন পুঁথির নকলকারীরাও। ফলে রামায়ণ স্বাভাবিকভাবে প্রক্ষেপকণ্টকিত হয়। ক্রমাগত গ্রহন-বর্জনের ফলে রামায়ণ নতুন নতুন রূপ লাভ করতে থাকে। প্রাদেশিক ভাষায় যখন রচিত হতে লাগল রামকথা, তখন সে কালের রুচি ও প্রবণতার ছাপ পড়ল তার উপর। স্বদেশ ও বিদেশ সর্বত্র এ রকম রূপান্তর ঘটেছে। যেমন, থাইল্যাণ্ডের রামায়ণে সীতা রাবণের কন্যা, মালেশিয়ার রামায়ণে দশরথ আদমের প্র্পৌত্র, মঙ্গোলিয়ার রামায়ণে রামের পিতা জীবক। কৃত্তিবাস ওঝা লিখেছেন রামের অকালবোধনের (দুর্গাপূজা) পুরোহিত ছিলেন রাবণ। গুণভদ্রের উত্তরপুরাণ, জৈন রামায়ণ ও অদ্ভুত রামায়ণে সীতা হলেন রাবণ ও মন্দোদরীর কন্যা।
এই রূপান্তর, এই জনপ্রিয়তা রাম ও রামায়ণের সৌভাগ্যের কারণ। সেই সঙ্গে আছে রামচন্দ্রের দুর্ভাগ্য। পুরাণবিশেষজ্ঞ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী মশায় বলেছেন, ‘ধরণীর নাম মর্ত্যভূমি। এখানে ভগবানও দুর্দৈবের হাত থেকে রেহাই পান না। ’ বক্তব্যটি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘মনুষ্যলীলায় লীলায়িত রামচন্দ্র সারা জীবনভর বহু অবিচার, বহু যন্ত্রণা ভোগ করে শেষ পর্ষন্ত অতি আধুনিক এবং প্রগতিশীল কৃপামৃত্যু বরণ করলেন সরযূ নদীতে দেহপাত করে। কিন্তু তবু তাঁর জীবনের গল্প শেষ হল না। ত্রেতা যুগের পর দ্বাপর যুগ পেরিয়ে এসে এই কলিকালের ভক্তদের পাল্লায় পড়ে তিনি শেষ পর্ষন্ত এক জাতিবোধক মামলায় জড়িয়ে পড়লেন। এ এমন এক মামলা, যেখানে সরযূ নদীতে দেহশান্তির পরেও তাঁকে বায়ুভূক নিরালম্ব অবস্থায় এক তথাকথিত বাল্যবন্ধুর ঘাড়ে চেপে মামলার পার্টি হয়ে যেতে হয়েছে।’ [ক্রমশ]