মহাকাব্য রামায়ণের নায়ক-নায়িকা শ্রীরামচন্দ্র এবং সীতাদেবী। তাঁরা শুধু মহাকাব্যের নায়ক-নায়িকা নয় এই সমগ্র বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ভগবান শ্রী বিষ্ণু এবং মা লক্ষীর রূপ। কবি কৃত্তিবাস তার রামায়ণ পাঁচালীতে লিখেছেন —
শ্রীরাম ভরত আর শত্রুঘ্ন লক্ষণ।
এক অংশ চারি অংশ হৈলা নারায়ণ।।
লক্ষ্মীমূর্তি সীতা দেবী বসেছেন বামে।
স্বর্ণছত্র ধরেছেন লক্ষণ শ্রীরামে।।

সমাজে ধর্মের প্রতিষ্ঠা এবং মানবজাতিকে পুনঃরুদ্ধারের জন্য তারা মর্ত্যধামে মানব রূপে এসেছিলেন। গৃহজীবনে আদর্শ স্বামী-স্ত্রীর কথা বলা হলে আজও রাম-সীতার উদাহরণ দেওয়া হয়। তাই ভক্তদের কাছে রাম-সীতার বিবাহ খুবই পবিত্র বিষয়। হিন্দুদের বিশ্বাস ত্রেতাযুগে রাম-সীতার বিবাহ হয়েছিল অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে। প্রতি বছর মার্গশীর্ষ মাসের এই তিথিকে বলা হয় বিবাহ পঞ্চমী। কথিত আছে, এই দিন তুলসীদাস রচিত রামচরিতমানসের রচনাও সম্পন্ন হয়েছিলো।
এই বছর বিবাহ পঞ্চমী ১৬ ডিসেম্বর রাত ০৮ টায় শুরু হবে এবং ১৭ ডিসেম্বর বিকেল ০৫ টা ৫৩ মিনিটে শেষ হবে। উদয় তিথি অনুসারে, বিবাহ পঞ্চমী শুধুমাত্র ১৭ ডিসেম্বর পালিত হবে। ১৬ ডিসেম্বর সূর্য দেবতা মকর রাশি থেকে বেরিয়ে ধনু রাশিতে প্রবেশ করবেন এবং এই কারণে খরমাস শুরু হবে এবং এই সময়কালে কোনও শুভ কাজ করা হবে না।
রাম-সীতার বিবাহের দিনটি আজও একটি উৎসব হিসাবে পালিত হয় ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশের মিথিলা, নেপালের জনকপুরে, বিহারে।

রামচরিত মানসে কথিত আছে, মহামুনি বিশ্বামিত্র একবার রাক্ষসদের অত্যাচারের হাত থেকে তার যজ্ঞকর্মকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সাহায্য চাইতে গেলেন অযোধ্যায় রাজা দশরথের কাছে। গুরু বশিষ্ঠের নির্দেশে বিশ্বামিত্রকে সাহায্য করার জন্য তরুণ রাম ও লক্ষণকে পাঠালেন রাজা দশরথ। রাম লক্ষণের কড়া পাহারায় সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলো যজ্ঞকর্ম।
এরপর দুই ভাইকে নিয়ে বিশ্বামিত্র বেরিয়ে পড়লেন বিশ্বভ্রমণে। শোনা যায় সেই সময় ছিল অগ্রহায়ণ মাস। মিথিলার রাজা জনক তার কন্যা সীতার বিবাহের জন্য স্বয়ংবর সভার আয়োজন করেছেন। দেশ-বিদেশের রাজা মহারাজারা যুবরাজরা সমবেত হয়েছেন সেই স্বয়ম্বরে। সভায় বিশ্বামিত্র রাম লক্ষণকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। বিবাহের শর্ত অনুযায়ী হরধনু ভঙ্গ কেউই করতে পারছেন না। এমন সময় রামচন্দ্র অবলীলাক্রমে সেই হরধনু ভঙ্গ করলেন এবং সীতা বরমাল্য পরিয়ে দিলেন শ্রীরামের গলায়। সেদিন ছিল মার্গশীর্ষ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথি। তাই আজও রাম-সীতা মন্দিরগুলিতে এই তিথিতে বিবাহ পঞ্চমী উৎসব পালিত হয়।

উৎসব উপলক্ষে রাম সীতার মন্দিরগুলিতে ফুল আর আলোর মালায় সাজানো হয়। রামমূর্তিকে বিবাহের সাজ পড়িয়ে সীতামন্দিরে শোভাযাত্রা সহকারে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রাম সীতার মূর্তিকে বিবাহের আসরে বসিয়ে বৈদিক আচার রীতিনীতি ও লোকাচার মেনে বিবাহ দেন ভক্তরা। রাম জন্মস্থানেও এই উৎসব পালিত হয় জাঁকজমক সহকারে। রাম সীতা মূর্তিকে বিবাহের সাজ করিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বেরোয় নানা সংস্কৃতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় অনুষ্ঠিত হয় রামলীলা নাট্যাভিনয়। এদিন বিপুল সংখ্যক ভক্তের সমাগম ঘটে। অনেক যুবক-যুবতী এই বিশেষ দিনটির তাৎপর্যকে মনে রেখে এই দিনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।
ভারতের বাইরে নেপালের মধ্যপ্রদেশের রাজধানী জনকপুরকে সীতার জন্মস্থান এবং প্রাচীন মিথিলার রাজধানী বলে মনে করা হয়। জনকপুর এমনিতেই মন্দিরময় নগরী এখানে বিবাহ পঞ্চমী উপলক্ষে সাতদিনের উৎসব পালিত হয়। জনকপুরে সীতাকে উৎসর্গ করা জানকী মন্দিরটি মুঘল এবং রাজপুত স্থাপত্যের একটি বিরল মিশ্রণ। মন্দিরে একটি মনোরম বাগান রয়েছে, রয়েছে রামমন্দির, হনুমান মন্দির, লক্ষণ মন্দির, দশরথ মন্দির ও বিবাহ মণ্ডপ-সহ নানা দেবদেবীর মন্দির। জনকপুরের মূল উৎসবগুলি হল বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষে নবমীতিথিতে অনুষ্ঠিত জানকীনবমী, চৈত্র মাসের রামনবমী পরিক্রমা ঝুলন আর বিবাহ পঞ্চমী। এই বিবাহ পঞ্চমীতে রামসীতার বিবাহ দেখতে দেশ বিদেশ থেকে হাজির হয় অসংখ্য তীর্থযাত্রীএবং পর্যটক। বিবাহ পঞ্চমী উপলক্ষে জনপ্রিয় বিরাট মেলা বসে।

অনেকে বিশ্বাস করেন বাংলায় রামভক্তিবাদ অর্বাচীনকালের। কৃত্তিবাসী রামায়ণ আর টেরাকোটা মন্দিরে রামায়ণ অলংকরণ এই দুটি বাদ দিলে রামভক্তিবাদ বাংলায় মূলত অবাঙালি রামায়েতদের দ্বারা সৃষ্ট, তবে তথ্যটি সর্বাংশে সত্য নয়।
হিন্দু বিবাহ রীতির একটি অন্যতম স্ত্রী আচার হলে পানখিলা। সাধারণত বিবাহের লগ্নপত্রের পর পাত্র- বা কনের উভয়পক্ষেই একটি প্রথা হল দুটি পান পাতা খিল দেওয়া হয় অর্থাৎ খড় দিয়ে বাঁধা হয়। আর এই সময় গাওয়া হয় রামসীতার বিয়ের গান। তবে অনুষ্ঠানটির প্রায় এখন অবলুপ্ত।
সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে মেয়েলী ব্রতে স্থান লাভ করেছে রামায়ণ সংস্কৃতি। কার্তিক মাসের সেঁজুতি ব্রতে কিম্বা বৈশাখ মাসে দশপুতুল কুমারী ব্রতে রামায়ণ প্রসঙ্গ লক্ষণীয় —
রামের মতো পতি পাব।
সীতার মতো সতি হব।।
লক্ষণের মতো দেবর পাব।
দশরথের মত শ্বশুর পাব ।।
কৌশল্যার মত শাশুড়ি পাব।

ব্রতের মধ্য দিয়ে কুমারী মেয়েদের সনাতন নারীর আদর্শ চরিত্রগুলি সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো যাতে তাদের ভবিষ্যতে বাস্তবকে মেনে নিতে কোন সংকোচ না হয়। এবং বাস্তব সংসারে এদের মতো স্বামী শ্বশুর-শাশুড়ি দেবর যেন পায় এই ভেবেই ব্রতের ছড়াগুলো তৈরি করা হতো। বাংলার পুরনারীদের পালিত ব্রত গুলির মধ্যে সে যুগের সমাজের এক বাস্তব করুন চিত্র ফুটে উঠতে দেখা যায়। সেকালে পুরুষদের মধ্যে বহুবিবাহপ্রথা প্রচলিত ছিল। তাই কুমারী মেয়েরা রামের মতো যাতে স্বামী পায় তার প্রার্থনা করতো।
কুমারী মেয়েদের বিয়েতে বাধা দূর করতে এই বিবাহ পঞ্চমীতে উপবাস করে একটি চৌকিতে ভগবান রাম এবং মা সীতার মূর্তি স্থাপন করে কুমারী মেয়েরা জানকী মন্ত্র ১০৮ বার জপ করতে হয়।
জানকী বল্লভয় নমঃ
ওম জনকনন্দিনয়ি বিদমহে, ভূমিজয়ই ধীমহি
তন্নো সীতাঃ প্রচোদয়াৎ।
দাম্পত্য জীবনে মধুরতা ফেরাতে এই দিন তুলসীর জপমালা দিয়ে ‘ওম জানকীবল্লভয় নমঃ।’ বলে ভগবান শ্রীরাম ও মাসীতার নামজপ করুন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘প্রাচীন সাহিত্যে’র ‘রামায়ণ’ প্রবন্ধে যথার্থই লিখেছেন–’রামায়ণের প্রধান বিশেষত্ব এই যে তাহা ঘরের কথাকে অত্যন্ত বৃহৎ করিয়া দেখাইয়াছে। পিতাপুত্রে, ভ্রাতায় ভ্রাতায়, স্বামী-স্ত্রীতে যে ধর্মের বন্ধন, যে প্রীতি ভক্তির সম্বন্ধ রামায়ণ তাহাকে এত মহৎ করিয়া তুলিয়াছে যে তাহা অতি সহজেই মহাকাব্যের উপযুক্ত হইয়াছে।’ এই সূত্র ধরেই বাংলা সংস্কৃতিতে রাম সীতার বিবাহ লক্ষ্য করা যায়।।
তথ্যঋণ: দেবদেবীর বিয়ে স্বপন কুমার ঠাকুর, হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা এবং অন্যান্য।।
ভালো লেখা
থ্যাঙ্ক ইউ