কতকাল আগের কথা সে সব। সে ছিল ত্রেতাযুগের কথা। অযোধ্যানগরে ইক্ষ্বাকু বংশে জন্ম নেন রাজা দশরথের পুত্র রাম! বাল্মীকির প্রশ্নের জবাবে নারদ মুনি রামের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “তিনি সর্বগুণান্বিত, কৌশল্যার আনন্দবর্ধন, গাম্ভীর্যে সমুদ্রতুল্য, ধৈর্যে হিমালয়তুল্য।” (রামায়ণ, রাজশেখর বসু)। হিন্দু বিশ্বাস ও ইতিহাসের টানাপোড়েনে ‘রামচন্দ্র’ এখন হিন্দুত্বের এক প্রকল্প। জীবিত জনের চেয়েও সজীব, সচল এক মায়াকল্প। এই প্রকল্পে রাম কে বাদ দিয়েই রামায়ণ লেখার প্রচেষ্টা চলছে।
‘রামায়ণে’ রাম আছেন, কিন্তু সর্বত্র তিনি একভাবে চিত্রিত নন। এক ভারত বহু সংস্কৃতি — এই আমাদের ঐতিহ্য। রাম কাহিনী এর বাইরে নয়। ভারতে এবং ভারতের বাইরে দক্ষিন পূর্ব এশিয়ায় রাম কাহিনী এসেছে, মূল কাহিনি বৃত্তে বৃহত্তর রামচরিত আখ্যাত হয়েছে। বাল্মিকীর আগেও রামায়ণ ছিল, পরেও আছে। এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে বিপুলায়তন এক সাহিত্য সম্পদ — অজস্র গল্প, উপকথা, স্থানীয় বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস মিলেমিশে রামায়ণের এক মহাকাব্যিক বয়ান, ‘রামকথা’।
পাঠভেদ রামায়ণের এক বৈশিষ্ট্য। বাল্মিকি রামায়ণ ছাড়াও সংস্কৃত ভাষায় আছে আনন্দ রামায়ণ, আধ্যাত্ম রামায়ণ, ভুশুণ্ডি রামায়ণ। আধ্যাত্ম রামায়ণের মূল কথক মহাদেব বা শিব। এই রামায়ণেই আছে দস্যু রত্নাকরের বাল্মীকি হয়ে ওঠার কাহিনী, যা বাল্মীকি রামায়ণে অনুপস্থিত। সম্ভবত বাল্মীকি রামায়ণের বঙ্গীয় পাঠ এবং পূর্ব ভারতে প্রচলিত রামকাহিনী — এ দুয়ের সমন্বয়ে আনন্দ রামায়ণের উদ্ভব। আরো কথা, আনন্দ রামায়ণ সপ্তকান্ড নয়, নয়কান্ড। ভূশুন্ডি রামায়ণের কথন বাল্মীকি অনুসারী হলেও এর কাহিনী বিন্যাস, কাঠামো ও গাথাসমূহ ভিন্ন চরিত্রের।
বাঙালির ঘরের সম্পদ কৃত্তিবাসের রামায়ণ। কৃত্তিবাস ভক্তিরসে সিক্ত করেছেন তাঁর রামকাহিনী। বাল্মিকীর রাঘব কেবল মহাশক্তিধর নয়, তাঁর হাত বজ্রকঠিন, শত্রুসংহারে কঠোর, নির্মম। আর কৃত্তিবাসের লেখায় রাম করুণার উৎস, ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণে উদার — “রাম নাম স্মরণেতে পাপের বিনাশ।” রামনবমীর মত উৎসবে রামও নয়, রামায়ণও নয়; অস্ত্রের তান্ডব আর বাহুবলী উল্লাসে কৃত্তিবাসের স্থান কোথায়?
বৌদ্ধ ‘দশরথ জাতকে’ রামসীতা ভাই বোন। এই কাহিনীতে দশরথ বারানসীর রাজা। রাম পন্ডিত, লক্ষন পন্ডিত, ও সীতা তাঁর বড় রাণীর গর্ভে জন্ম নেন। বড় রানির মৃত্যু হলে দশরথ আবার বিবাহ করেন এবং নতুন রানির আবদারে ভাইবোনদের হিমালয়ে নির্বাসনে পাঠাতে বাধ্য হন। এ কাহিনীতে মুনি-ঋষি নেই, দণ্ডকারণ্য নেই, বানররা নেই, রাবণ নেই, সীতা হরণ নেই — নেই এমন অনেক কিছু। জাতক কাহিনী মেনে নিলে সীতা রামের বোন, আবার স্ত্রীও বটে! যম্বুদ্বীপের প্রচলিত রামায়ণ কাহিনীতে এ ধরনের সম্পর্কের কথা জানা যায়। ‘জাভাযাত্রীর পত্রে’ রবীন্দ্রনাথ এ বিষয়ে আলোকপাত করেছিলেন। আর কৃষিনির্ভর মাতৃতান্ত্রিক সমাজে এমন সম্পর্ক অজ্ঞাত ছিলনা।
আবার পূর্ববাংলায় আমরা পাই ‘চন্দ্রাবতী রামায়ণ’-এর কথা। চন্দ্রাবতী পুরুষকারকে চুপ করিয়ে নারীর কথা বলছেন — সীতার কথা, তার জীবনকথা, নারীত্বের অবমাননার কথা। এ একান্তই নারীর পাঠ, পুরুষ প্রাধান্যের রামায়ণ কথায় এক বিকল্প প্রবর্তক।
ভারতীয় সংস্কৃতি যে একশৈলী নয়, বহুত্ববাদী সমাজ ও সংস্কৃতির গঠনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত; ইতিহাসকে মিলিয়ে পড়লে তা অজানা থাকেনা। রামকথাই এর বড় উদাহরণ। আধুনিক রাম যত না মানুষের তার চেয়েও বেশী রাজনীতির। রামরাজ্য থেকে রামলালার মন্দির নির্মাণ প্রকল্পে রামকেন্দ্রিক এক অলীক স্বপ্ন বিহ্বলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত। এই এজেন্ডায় রাম হলেন অবতার, পবিত্র গ্রন্থ হল রামায়ণ, পবিত্র তীর্থস্থান হল অযোধ্যা! আধুনিক এই ‘রামচন্দ্র’ নির্মাণে রামকথা-সহ রাম কোথায়!
ভালো লেখা।একটা নতুন দৃষ্টিকোন।