কী সেকাল কী একাল মানুষ এরকমই। কৃপণ, অলস, কোপন, পরশ্রীকাতর, উদ্যোগহীন, ঈর্ষাপরায়ণ এবং সর্বোপরি মিথ্যাবাদী। কারণ এই হচ্ছে কলিকাল। “জীবের অন্নগত প্রাণ, আয়ু কম, দেহবুদ্ধি, বিষয়বুদ্ধি একেবারে যায় না।” দেহবুদ্ধি থাকলেই বিষয়বুদ্ধি থাকবে। “আমি দেহ নই, আমি মন নই… আমি সুখ দুঃখের অতীত…” কলিতে এসব হওয়া খুব কঠিন এ কথা তিনিই বলে গেছেন। খুব ভালো করে মানুষ চিনতেন বলেই বলে গেছেন। সব দেখতে পেতেন মানুষের ভিতরে কি চলছে, কাচের আলমারির মধ্যে যেরকম জিনিস দেখতে পাওয়া যায়। তাই বলেছিলেন, “যতই বিচার কর, কোনখান থেকে দেহাত্মবুদ্ধি এসে দেখা দেয়। অশত্থ গাছ এই কেটে দাও, মনে করলে মূলশুদ্ধ উঠে গেল, কিন্তু তার পরদিন সকালে দেখ, গাছের একটি ফেঁকড়ি দেখা দিয়েছে। দেহাভিমান যায় না।”
তাঁর নরেন বলত, “তোমার নিজের আত্মা ব্যতীত তোমার অপর কোন শিক্ষাদাতা নেই।” আমরা যখন ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করি, তা আর কিছুই নয়, তা প্রকৃতপক্ষে সেই আত্মাই। যা থেকে আমরা নিজেদের পৃথক করে ফেলেছি। আবার আমাদের থেকে পৃথক বলে উপাসনা করছি। তিনি নরেনকে একবার দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন, এই সেই, যার জন্য এতকাল তিনি অপেক্ষা করে ছিলেন। পশ্চিমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গঙ্গার দিকে মুখ করে কেঁদে কেঁদে যাকে ‘আয়, আয়’ বলে ডেকেছেন। নরেনের ভেতরটা তিনি পরিষ্কার দেখতে পেলেন। কাচের দেয়াল ভেদ করে যেমন স্পষ্ট দেখা যায়, তেমনি। ভিতরে জ্বল জ্বল করছে দশটি সূর্য।
বিবাদ কি নিয়ে? একজন বলছেন পূবমুখো হয়ে বসে ভগবানকে ডাকলে তাঁকে পাওয়া যায়। আর একজন বলছেন, না, পশ্চিমমুখো হয়ে বসে তাঁকে ডাকলে তবে পাওয়া যায়। হয়ত কেউ একজন বহুকাল আগে পূবমুখো বসে ধ্যান ভজনা করে ঈশ্বরলাভ করেছিলেন। তাই তাঁর চেলারা ঐ মত গ্রহণ করে বললে পূবমুখো হয়ে না বসলে ঈশ্বরলাভ হয় না। আর এক দল লাফিয়ে বললে, কি! পশ্চিমমুখো হয়ে না বসলে কখনো ভগবান লাভ হয় না। এইভাবে বাঁধল গোল। এইভাবে তৈরি হয় দল। আসল জিনিস হল ‘শ্রদ্ধা’। একাগ্রনিষ্ঠার সহিত যে পথেই এগোনো যাক মনের গতি একত্বের দিকেই চলে।
গুরুও বললেন অশত্থের সব উপড়ে দিলেও পরদিন দেখি আবার ফেঁকড়ি বেরিয়েছে। মানুষের মনের সেই দশা। একদিন মঠে বসেই গঙ্গার বাতাসে হঠাৎই মনে হল কি সংসার! কিসের সংসার! কে প্রিয়জন? তারপরই বাড়ি ফিরে সব ভুলে এটা করতে হবে, সেটা কিনতে হবের মধ্যে মন জড়িয়ে গেল। ঐ অশত্থের ফেঁকড়ি আবার বেরিয়ে গেল। গুরুর মতো নরেনও বলছেন, “আগাছাগুলো উপড়ে ফেলতে হবে। সকল মতে সকল পথেই দেশকালাতীত সত্য পাওয়া যায় বটে, কিন্তু সেগুলোর উপর অনেক আবর্জনা পড়ে গেছে। সেগুলি সাফ করে ঠিক ঠিক তত্ত্বগুলি লোকের সামনে ধরতে হবে। তবেই তোমার ধর্মের ও দেশের মঙ্গল হবে।”
নরেন খাপ খোলা তরোয়াল — এ কথা ঠাকুর বলেছেন বহুভাবে। একথাও বলেছেন — ওর ভেতরে প্রবল শক্তি। ওকে তাই চোখে চোখে রাখি। একবার পড়ে গিয়ে নরেন্দ্রর মাথা কেটে বেশ খানিকটা রক্ত বেরিয়ে যেতে ঠাকুর তা শুনে বললেন — বেশ হয়েছে। ওর খানিক শক্তি কমে গেছে। অর্থাৎ অত শক্তি ভিতরে থাকলে সেটির মুখ ঠিক দিকে ঘুরিয়ে দিতে না পারলে অনর্থ ঘটতে পারে। সব ভালো, দিক পরিবর্তন হয়ে অভিমুখ পাল্টে যেতে পারে।
নরেন্দ্রনাথ ফ্রিম্যাসনারি গুপ্ত সমিতির সদস্য হয়েছিলেন। ১৮৮৪ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি তিনি ফ্রিম্যাসনে যোগ দেন, আর মাত্র তিন মাস যেতে না যেতেই তিনি “মাস্টার ম্যাসন” হয়ে যান। এটি কোন ধর্ম নয়। ভ্রাতৃত্ববোধের উপরে এই ফ্রিম্যাসন দাঁড়িয়ে থাকে। এটি ওইসময় গোটা বিশ্ব জুড়ে ছিল গুপ্তভাবে। এটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি, পারস্পরিক সহযোগিতার ও সৌভ্রাতৃত্ববোধের দিশা দেখায়। এটি সদস্যদের জন্য গুপ্ত চিহ্ন ও পাশওয়ার্ড ব্যবহার করত।
Becoming a Freemason requires being a man, believing in a Supreme Being, and having a desire to improve oneself and contribute to society.
যাঁর ভিতরে অসীম ক্ষমতা, ঠাকুরের কথায় নররূপী নারায়ণ, সেই নারায়ণ তখন পিতৃবিয়োগে, আত্মীয় স্বজনের কুটিল ব্যবহারে অস্থির। অসহায়ের মতো ছুটে বেড়াচ্ছেন একটি দিশা পাবার আশায়। কখনও তাঁর নিজেকে মনে হচ্ছে নাস্তিক আবার কখনও এঁর ওঁর কাছে গিয়ে শুধোচ্ছেন, “আপনি ঈশ্বর দেখেছেন? প্রমাণ দিতে পারবেন?” কেউ তার প্রশ্ন এড়িয়ে ‘তার চক্ষুদুটি যোগীর ন্যায়’ বলে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু যাঁর ভিতরে অত শক্তি তিনি তো নিজের প্রকাশের ক্ষেত্র খুঁজবেনই।
এইরকম সময়েই নরেন ফ্রিম্যাসনারিতে যোগ দেন। দক্ষিণেশ্বরে আর যাচ্ছেন না অনেকদিন। ওদিকে সেই মুকখু বামুনের সাংঘাতিক অবস্থা। যাকে পান তাকেই শুধোন, “হ্যাঁ গা! তোমরা আমার লরেনের খবর জানো? লরেন অনেকদিন আসেনি, দেখতে ইচ্ছে হয়েছে একবার আসতে বলো।” কলকাতা থেকে কেউ গেলে জিজ্ঞেস করছেন, “তুমি কি ঘুমোচ্ছ?” যাঁকে ডাকা হল তিনি বললেন, “আজ্ঞে না।” অমনি পরমহংস মহাশয় বলতে লাগলেন, “দেখো লরেনের জন্য প্রাণের ভেতরে যেন গামছা নেংড়ানোর মতো মোচড় দিচ্ছে!” যিনি নরেন্দ্রনাথের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবেন, তাঁর এই অবস্থা নরেনের না আসায়। ঠাকুর জানতেন যে তাঁর লরেন নিজেই একটা সংঘ হয়ে উঠবে। তাঁর গড়ে তোলা সংঘ বছরের পর বছর মানুষকে দিশা দেখাবে। তাই তাঁকে এই ফ্রিম্যাসনারির ছোট্ট গন্ডীতে আবদ্ধ রাখা যাবে না। তাই গুরুর শিষ্যকে চোখে চোখে রাখা এবং সঠিক পথের দিশা দেখানো।
গুরু যদি বা মেলে ঠিকঠাক শিষ্য কোটিতে গুটিক মেলে। একথার প্রমাণ বারবার মিলেছে এই গুরু শিষ্যের কান্ড দেখে। যেখানে শিষ্য প্রথম দিকে গুরুকে ‘পাগল বামুন’, ‘মুকখু’ ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করেছেন, সেখানে গুরু প্রথমেই শিষ্যের হাত ধরে তাঁকে মাখন মিছরি সন্দেশ জোর করে মুখে গুঁজে দিচ্ছেন। হাতজোড় করে বলছেন, “কোথায় ছিলে প্রভু এতদিন। তুমি যে নররূপী নারায়ণ।” কখনো আদর করে বলছেন “শুকদেব”, আবার পরে কখনও বলছেন ওর ভিতরে দশটা সূর্যের শক্তি। সকলে গুরুদেবকে ভক্তি করে, সেবা করে তুষ্ট করে। আর এই ক্ষেত্রে গুরু সর্বদা শিষ্যকে চোখে হারাচ্ছেন, চোখে চোখে রাখছেন পাছে শক্তির অপব্যবহার হয়ে যায়। তাহলে মানব কল্যাণের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।
পুরোপুরি ধরা দেবার আগে শিষ্য গুরুকে নানাভাবে পরীক্ষা করে নাস্তানাবুদ করতে চেয়েছেন, পারেন নি অবশ্য। ঠাকুর আলাভোলা হলেও ঠিক জায়গায় মাত করতে জানতেন। তারপর যখন নরেন ঠাকুরের আকর্ষণে ধরা পড়লেন তখনও কি ঠাকুরের শান্তি আছে? পদে পদে চোখে চোখে রাখতেন এই অমূল্য সম্পদটিকে। কারণ তাকে যে খাপখোলা তরবারিতে পরিণত করে যেতে হবে — এ দায় যে তাঁরই। পঞ্চবটীতে ধ্যান করছেন সবকটি শিষ্য। ধ্যান জমে উঠেছে, দিলেন এক শিষ্যকে স্পর্শ করে। যাঁকে ছোঁয়া হল তিনি যেন ইলেকট্রিক শক খেলেন। শিক্ষক ঠাকুর ছুটে গেলেন পঞ্চবটীতে। এইবার লরেনকে দিলেন বকুনি, “কি রে! একটু জমতে না জমতেই খরচ করে ফেললি? আর দিলি তো ওর ভাবটি নষ্ট করে!” যাঁর ভাব নষ্টের কথা বললেন ঠাকুর তিনিই পরে স্বামী অভেদানন্দ নামে সুবিখ্যাত।
গুরুর কাছে সম্পূর্ণ নিবেদিত হয়েও, গুরুর কালীকে মেনেও শিষ্য মাঝে মাঝেই বেগ দিয়েছেন। এক কথায় মেনে নেওয়ার জন্য তিনি আসেন নি। গুরুর শরীর চলে যাবার পর শিষ্যেরা গৃহ ছেড়ে অজানার পথে পা রাখলেন। নেতা সেই ‘শুকদেব’। ঠাকুর তাঁর হাতেই সঁপে দিয়ে গেছেন বাক্স ভর্তি দায়িত্ব আর চাবি রেখেছেন নিজের কাছে। দেহ চলে যাবার পরেও গুরু সবসময় তাঁর অমূল্য রতনকে চোখে চোখে রেখেছেন। পরিব্রাজক হয়ে বেড়িয়ে পরার পরেও শিষ্যের মনে হয়েছে অন্য কোন সাধুর কাছে আবার দীক্ষা নিলে কেমন হয়। ঠাকুর স্বপ্নে এসে করুণ চোখে তাঁর দিক চেয়ে থেকেছেন। তাতেও মন গলেনি শিষ্যের। নিজের মনেই ঠিক করেছেন আবার যদি স্বপ্ন দেখেন তবে ভেবে দেখবেন। যখন পরপর কয়েকদিন স্বপ্নে ঠাকুর এলেন তখন শিষ্য জেদ ছাড়লেন।
পরবর্তীতে ঠাকুরের লরেন যখন বিবেকানন্দে রূপান্তরিত, তখনও এই শক্তির প্রকাশ তাঁর প্রতিটি বাক্যে প্রতিটি কার্যে। অলস অকর্মা বাঙালিদের বারে বারে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন। পাশ্চাত্য আর প্রাচ্যের মধ্যে উদ্যমের কতখানি তফাৎ বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। কারণ ঠাকুর যে তাঁকে সকলের শিক্ষক করে বসিয়ে গেছেন, সে তো এমনি নয়। “উত্তিষ্ঠত জাগ্রত” — এই অভয় বাণী শোনাতেই তাঁর এই পৃথিবীতে আসা। আবার কাজ শেষ হলেই তাঁর প্রস্থান মাটির পৃথিবী থেকে।