“নয়ন সম্মুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই”— পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের ভালোবাসায় মুগ্ধ,অভিভূত হয়েছেন যে কত মানুষ তার ইয়াত্তা নেই। ভারতীয় ডাকবিভাগও যে এই প্রভাবের অন্তর্ভুক্ত, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ডাকবিভাগ প্রকাশিত বেশ কয়েকটি ডাকটিকিট থেকে। ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ সালে ভারতীয় ডাকবিভাগ শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ সমদৃষ্টিতে সর্বমানুষের প্রতি প্রেম অর্পণ করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে তাঁর সংস্পর্শে আসা বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে ভারতীয় ডাকবিভাগ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।
শ্রদ্ধা নিবেদন নের তালিকায় প্রথম পাওয়া যায় স্বামী বিবেকানন্দকে। শ্রীরামকৃষ্ণএবং মা সারদাদেবীকে যদি কেউ বোঝবার চেষ্টা করেন তাহলে স্বামী বিবেকানন্দের আলোকপাত অনুসরণ না করলে বুঝতে পারা যাবেনা।রামকৃষ্ণের চোখে বিবেকানন্দ ছিলেন এক অমূল্য রতন যিনি জগৎ উদ্বারের কাজে তাঁর সহকারী হয়ে এসেছেন।

স্বামী বিবেকানন্দর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ১৭ জানুয়ারি ১৯৬৩ সালে ভারতীয় ডাকবিভাগ একটি বহুবর্ণের স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।” এই ডাকটিকিটে স্বামীজীর যে ছবিটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেটা আঁকা হয়েছিল ১৮৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের বিখ্যাত ফটোগ্রাফার টমাস হ্যারিসনের তোলা স্বামীজীর সুপরিচিত শিকাগো বক্তৃতার ছবির অনুকরণে।”
“এছাড়া ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৯৩ সালে ভারতীয় ডাকবিভাগ স্বামীজীর শিকাগো বক্তৃতার শতবার্ষিকীতে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেন। এই ডাকটিকিটেও স্বামীজীর সেই একই ভঙ্গিমার ছবি দেখানো হয়েছিল। এই ছবিটির পশ্চাৎপটে ছিলো শিকাগো ধর্মমহাসভা যে আর্ট ইনস্টিটিউটে হয়েছিল, তার আভাস। এই ডাকটিকিটের নক্সা করেছিলেন বিখ্যাত ডাকটিকিট নকশাকার সি.আর .পাকড়াশি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কন্যাকুমারীর শিলাখণ্ডে বিবেকানন্দ স্মারক মন্দিরটিকেও একটি সুন্দর সুরুচিসম্পন্ন বহুবর্ণের স্মারক ডাকটিকিটে প্রকাশ করে বিবেকানন্দ অনুরাগীদের সবিশেষ আনন্দিত করেছে ভারতীয় ডাকবিভাগ।”

১২ জানুয়ারি ২০১৩ সালে ১৫০তম স্বামী বিবেকানন্দর জন্মসার্ধশতবর্ষ উপলক্ষ্যে ভারতীয় ডাকবিভাগ বিশেষ চারটি ডাকটিকিটের সেট প্রকাশ করেন। স্বামীজীর ছবির সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী মন্দির ও উদ্বোধন পত্রিকার অফিসের ছবি।
ডাকবিভাগ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে আরো একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।
ভারতের সর্বকালের প্রভাবশালী মহিলাদের মধ্যে ভগিনী নিবেদিতা ছিলেন অন্যতম। শ্রীশ্রীমায়ের স্নেহধন্যা ‘খুকি’, স্বামীজীর ‘মানসকন্যা’, রবীন্দ্রনাথের ‘লোকমাতা’ অগ্নিকন্যা যদিও শ্রীরামকৃষ্ণের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসার সুযোগ পাননি, কিন্তু তিনি নিজেকে সকলের মনে তুলে ধরেছিলেন ‘রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের নিবেদিতা’ রূপে। নিবেদিতার মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ শুধুমাত্র সুকোমল নারীহৃদয়ের সন্ধানী পাননি, পেয়েছিলেন ভারত-আত্মার অস্তিত্বের সন্ধান। সার্থক সেবা নিবেদিতাকে মানবী থেকে দেবত্বে পৌঁছে দিয়েছিলো।
নিবেদিতার লেখা ‘মাতৃরূপা কালী’ বইটি পরে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতমাতার ছবিটি আঁকেন। বাংলায় ঋষি অরবিন্দের মতো তৎকালীন বহু বিপ্লবীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ইংরেজ সরকারের চোখে তাঁকে সন্দেহভাজন করে তুলেছিলো।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, সমাজসেবা ও স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে ভগিনী নিবেদিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ও তাঁর স্মৃতিরক্ষার্থে ভারতীয় ডাকবিভাগ ২৭ জুন ১৯৬৮ সালে তাঁর সুপরিচিত ভারতীয় সন্ন্যাসিনীর পোশাকে সজ্জিত ৪.০৬×২.২৮ সেন্টিমিটারের একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের অবতারপত্নী, জগজ্জননী, স্বামীজীর ‘জ্যান্ত দুর্গা’ মা সারদা রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের জন্মলগ্ন থেকেই ছিলেন অন্তরালে। অথচ পর্দার আড়ালে থাকা গিন্নিঠাকুরণটি ছিলেন ভক্তজনের সঙ্ঘজননী। মাসারদার লৌকিক শিক্ষালাভের সুযোগ যদিও কখনো হয়নি, নানান দিক থেকে বিচার করলে আধুনিক নারীর উত্তরণ ঘটেছিলো শ্রীশ্রী মায়ের মধ্যে দিয়ে। প্রকৃতপক্ষে মায়ের উদার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী তাঁকে সেই যুগের অন্ধ কুসংস্কার, জাতপাত, ছুঁতমার্গ, যুক্তিহীন প্রথানুগত্যের অনেক ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়েছিল।
ভারতীয় ডাকবিভাগ ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ সালে শ্রীরামকৃষ্ণের আবক্ষ প্রতিমূর্তি সমেত বহুবর্ণের একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে। বলাবাহুল্য, ডাকটিকিটটি ভক্তজনের কাছে খুবই আদরণীয় হয়েছিল।

দক্ষিণেশ্বরের কালিমন্দিদের রূপকার, ধর্মপ্রাণা, দানশীলা, পুণ্যবতী রানী রাসমণি তাঁর বিবিধ জনহিতৈষী কাজের জন্য সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সুবর্নরেখা নদী থেকে পুরী পর্যন্ত সড়কপথ নির্মাণ, কলকাতার বিখ্যাত বাবুঘাট, আহিরীটোলা ঘাট ও নিমতলাঘাট নির্মাণ করেন। অধুনা ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার (ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরী) এবং হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য পর্যাপ্ত অর্থসাহায্য করেছিলেন।
ভারতীয় ডাকবিভাগ তাঁর দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ৯ এপ্রিল ১৯৯৪ সালে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের পটভূমিকায় গঙ্গাতীরে ধ্যানমগ্ন অবস্থানে রানী রাসমনিকে দেখানো হয়েছে এই ডাকটিকিটে। (চলবে)
তথ্যসূত্র : শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত, শোভেন সান্যালের লেখা ডাকটিকিটের আড়ালে ও সম্পর্কিত তথ্য।
Darun darun lekha
সত্যিই খুব ভালো তথ্যসমৃদ্ধ উপস্থাপনা।
লেখার ভাবনাকে কুর্নিশ, সমৃদ্ধ হলাম, শুভেচ্ছা জানাই।
ধন্যবাদ জানাই সকলকে।
বাহ! চমৎকার তথ্যসমৃদ্ধ লেখা।
আলোকিত তথ্য বহন রচনা পাঠে।জ্ঞান বৃদ্ধি হলো।ধন্যবাদ লেখিকাকে।