অবতরণিকা
ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব (১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৬ – ১৬ আগস্ট ১৮৮৬)
স্বামী বিবেকানন্দ (১২ জানুয়ারি ১৮৬৩–৪ জুলাই ১৯০২)
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু (২৩ জানুয়ারি ১৮৯৭ – ?)
যুগপুরুষ নেতাজী সুভাষচন্দ্রের জন্ম কোন আকস্মিক ঘটনা ছিল না, তা হয়েছিল যুগের প্রয়োজনে, দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের উদ্দেশ্যে।
স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের মন্ত্রশিষ্য ও মানসপুত্র। আর সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের ভাবশিষ্য এবং উত্তরসাধক। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জনক ইতিহাসপুরুষ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর কথা বলতে গেলে তাই ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব আর স্বামী বিবেকানন্দের নাম চলে আসবেই। শ্রী অরবিন্দ এক জনসভায় বলেছিলেন যে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলার নেতৃত্ব দিচ্ছেন দক্ষিণেশ্বরের ঐ অর্ধ-নগ্ন পুরোহিত শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র থাকাকালীন বেলুড়মঠে এক জনসভায় সুভাষচন্দ্রও বলেছিলেন যে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিবেকানন্দ-রামকৃষ্ণের প্রভাব অনস্বীকার্য।
শ্রী সুভাষচন্দ্র বসু উদ্বোধন পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক স্বামী সুন্দরানন্দকে ৬ই এপ্রিল ১৯৩৬-এ লেখা এক চিঠিতে লিখেছিলেন, “রামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের কাছে আমি যে কত ঋণী তাহা ভাষায় কি করিয়া প্রকাশ করিব? … যতদিনে জীবিত থাকিব ততদিন ‘রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের’ একান্ত অনুগত ও অনুরক্ত থাকিব — একথা বলা বাহুল্য”।

আমরা নেতাজীর ‘অসমাপ্ত জীবনী’ বা ‘ভারত পথিক’ থেকে জানতে পারি যে তিনি যখন প্রথম স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি আকৃষ্ট হন তখন তাঁর বয়স পনেরো বছর। তিনি লিখেছেন, “আমার এক আত্মীয় (সুহৃদচন্দ্র মিত্র), যিনি শহরে নতুন এসেছিলেন এবং পাশের বাড়ীতেই থাকতেন, তাঁর কাছে আমাকে যেতে হত। তাঁর বইগুলোর উপর চোখ বোলাতে বোলাতে নজরে পড়ল স্বামী বিবেকানন্দের রচনাবলী। কয়েক পাতা উল্টিয়েই বুঝতে পারলাম যে এতে এমন কিছু আছে যা এতদিন আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি। বইগুলো বাড়ি নিয়ে এসে সাগ্রহে পড়তে শুরু করলাম। পড়তে পড়তে আমার হৃদয়-মন আচ্ছন্ন হয়ে যেতে লাগল।…বিবেকানন্দ থেকে ক্রমে ক্রমে তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রতি আকৃষ্ট হলাম।”
এখানে আমাদের থামতে হচ্ছে। সুভাষের কিশোর-বয়সের অন্তরঙ্গ বন্ধু হেমন্তকুমার সরকার লিখেছেন, “সুভাষদের বাড়ীতে সাহেবী চাল-চলনের প্রাদুর্ভাব খুবই ছিল। ধর্মপ্রাণা মাতা এজন্য একটু ক্ষুণ্ণ ছিলেন। আটটি ছেলের মধ্যে সুভাষই তাঁর প্রিয়তম ছিল। সুভাষের ধর্মপ্রাণতা সে মায়ের নিকট থেকেই পেয়েছিল। মায়ের কাছে রামকৃষ্ণ কথামৃত পাঠ করতে তার বড় ভাল লাগত।” বাড়ীতে যে রামকৃষ্ণ কথামৃত ঢুকে গিয়েছিল তা আমরা শরৎচন্দ্র বসুর কন্যা শ্রীমতী গীতা বিশ্বাসের একটা লেখায় (সুভাষের মেজবৌদি, জয়শ্রী, পৌষ ১৩৯০)ও পাই। তিনি লিখেছেন, “মা’র অসীম ভগবৎভক্তি ছিল, কিন্তু বাহ্যিক আড়ম্বর ছিল না। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত ও স্বামী বিবেকানন্দের রচনাবলী তাঁর নিত্যপাঠ্য ছিল। বিবেকানন্দের দুটি ছত্র তিনি বারবার আমাদের কাছে উদ্ধৃত করতেন: ‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর,/জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর’।”
এছাড়া ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের গরমের ছুটিতে সুভাষচন্দ্র যখন বন্ধুর সাথে উত্তর ভারতে গুরুর খোঁজে যান তখন শেষ পর্যায়ে তাঁরা বেনারসে পৌঁছান। প্রফেসার হেমন্তকুমার সরকার ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘সুভাষের সঙ্গে বারো বছর’ বইতে লিখেছেন, “পরদিন গেলাম ‘রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম’ দেখতে। স্বামী ব্রহ্মানন্দের সঙ্গে দেখা করলাম। সুভাষকে স্বামীজী আগে হতেই চিনতেন এবং তার বাবার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। স্বামীজী আমাদের আশ্রমে এসে থাকতে বললেন। স্বামীজী সাধারণতঃ ‘রাখাল মহারাজ’ নামে সুপরিচিত ছিলেন।…” এর আগে, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে (১৯২৭/১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে) ‘সুভাষচন্দ্র’ নামক বইতে লিখেছিলেন, “বারাণসীতে তাঁরা কিছুদিন রামকৃষ্ণ মিশনের ব্রহ্মানন্দ স্বামী ওরফে রাখাল মহারাজের নিকট থাকেন। তিনি বলেন বাপ-মাকে না বলে পালিয়ে এসেছ…বাড়ি ফিরে যাও।” এসব থেকেও বোঝা যায় যে রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে শ্রীজানকীনাথ বসুর কোনভাবে সামান্য হলেও যোগাযোগ ছিল।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মননে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ চেতনা সঞ্চারিত করার মহান দায়িত্বটুকু অতি নিষ্ঠার সাথে পালন করেছিলেন তাঁর মহীয়ান পিতৃদেব শ্রীজানকীনাথ বসু আর রত্নগর্ভা মহীয়সী মাতৃদেবী শ্রীমতী প্রভাবতী বসু। এমন ক্ষণজন্মা পুরুষ শুধু এমন মহান মাতাপিতার গৃহেই জন্মাতে পারেন। এই প্রবন্ধের ক্ষুদ্র পরিসরে আমরা বুঝতে চেষ্টা করব যে আসলে কোন পথে প্রথমে বসু-বাড়িতে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভাবধারার ‘অনুপ্রবেশ’ ঘটেছিল।
ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস (১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৬–১৬ আগস্ট ১৮৮৬)
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবনী বিশদভাবে লিখে এই লেখাটা দীর্ঘ করব না। কামারপুকুরের শ্রীগদাধর চট্টোপাধ্যায় কিভাবে ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব হয়ে উঠলেন, সেসব কাহিনী অল্পবিস্তর সকলেরই জানা। তবু পরে যে তথ্য আমি উপস্থাপন ও প্রতিষ্ঠা করতে চলেছি তার প্রয়োজনে পাঠকদের পরমহংসদেবের জীবনের কিছু অধ্যায় খুব সংক্ষেপে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ১৮৭৫ সালে নববিধান ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী কেশবচন্দ্র সেন প্রথম ঠাকুরের সাক্ষাৎ লাভ করেন। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দেই কেশবচন্দ্রই ‘ইন্ডিয়ান মিরর’ পত্রিকাতে প্রথম ভারত ও বিশ্ববাসীর কাছে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কথা প্রকাশ করেন। তারপর বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ও আরও অনেকে পরমহংসদেবের কাছে যাতায়াত শুরু করেন। এঁদের প্রচারের ফলে বেশী করে পরমহংসদেবের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পরে। ১৮৭৯ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যে বিশিষ্ট অনেক মনীষীরা তাঁর কাছে যেতে শুরু করেন। ১৮৮৫ সালে ঠাকুরের গলায় যে রোগ হয়েছিল, তা পরে গলার ক্যান্সারে পরিণত হয়। এসময় ডাক্তারের বারণ না মেনে তিনি ভক্তদের সাথে অবিরল কথা বলে যেতেন। চিকিৎসার সুবিধার্থে প্রথমে তাঁকে ২ অক্টোবর ১৮৮৫ কলকাতার নিকটে শ্যামপুকরে ভাড়াবাড়ীতে স্থানান্তরিত করা হয় এবং ৭০ দিন সেখানে থাকার পরে ১১ ডিসেম্বর ১৮৮৫ তারিখে তাঁকে উত্তর কলকাতার কাশীপুর বাগান বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে ১৬ আগস্ট ১৮৮৬ তারিখে তাঁর মহাসমাধি হয়।
পরমহংসদেবের মহাপ্রয়াণের প্রায় এক বছর পর ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ২৪ বছরের যুবক বিবেকানন্দ যখন একা ভারত-পরিব্রাজনে বের হয়েছিলেন তখন দেখা হলে হাতরাসে শ্রীশরৎচন্দ্র গুপ্তকে বলেছিলেন, “আমার জীবনে একটা মস্ত বড় ব্রত আছে। অথচ আমার ক্ষমতা এত অল্প যে আমি ভেবেই আকুল – কি করে এটা উদযাপিত হবে। এ ব্রত পরিপূর্ণ করবার আদেশ আমি গুরুর কাছে পেয়েছি – আর সেটা হচ্ছে মাতৃভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করা।” শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ভারতবর্ষ সম্পর্কে ঠিক কিভাবে ব্রতপালনের আদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন তা আজও গুপ্তই থেকে গেছে। এই ঘটনাও আমাদের শ্রীঅরবিন্দ আর নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর পূর্বোক্ত বাণী স্মরণ করিয়ে দেয়।

বলরাম মন্দির
কলকাতার বাগবাজারের তদানীন্তন ৫৭, রামকান্ত বসু স্ট্রীটে এবং অধুনা ৭, গিরিশ এ্যাভিনিউতে অবস্থিত এই বাড়ি প্রায় শতাধিকবার পরমহংসদেবের চরণস্পর্শে ধন্য হয়েছে। এই বাড়িতে সপরিবারে থাকতেন রামকৃষ্ণদেবের অন্যতম গৃহীভক্ত ও রসদ-যোগানদার শ্রী বলরাম বসু। বাড়ির মালিক কিন্তু ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠতাত ভ্রাতা। এই ভবন ধন্য হয়েছে শ্রীশ্রীমা সারদাদেবী এবং স্বামী বিবেকানন্দের অবস্থান আর চরণস্পর্শেও। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে ঠাকুরের এই ভবনে আগমনের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১১ মার্চ ১৮৮২ তে। তার আগেও বহুবার রামকৃষ্ণদেবের এই গৃহে শুভাগমন হয়েছিল। লীলাবসানের আগের শেষ কয়েক বছর কলকাতায় রাত্রিযাপন করতে হলে রামকৃষ্ণদেব এখানে থাকতেই পছন্দ করতেন। চিকিৎসার সুবিধার্থে শ্যামপুকুর বাটীতে বাসের আগে এই বলরাম ভবনেই ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে সাতদিন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এখানে থেকে গেছেন। এই বলরাম-ভবনেই সন্ন্যাসী এবং গৃহী ভক্তদের এক সভায় ১ লা মে ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে (অর্থাৎ আজ থেকে ঠিক ১২৬ বছর পূর্বে) স্বামী বিবেকানন্দ ‘রামকৃষ্ণ মিশন এ্যাসোসিয়েশন’ বা ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বলরাম-মন্দিরে যে ‘সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ টাঙ্গানো আছে, এই অংশটা সংক্ষিপ্তসারে সেখান থেকে এবং শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত থেকে নেওয়া হয়েছে। স্থানাভাবে অনেক কথা বাদ গেল। তবে শেষ তিনটি বাক্য হুবহু নীচে দিচ্ছি। “শ্রীম ‘কথামৃত’-এ এই বাড়িকে বলেছেন – বলরাম মন্দির। আজ জগতের আধ্যাত্মিক শক্তিকেন্দ্র এই ভবন। স্বয়ং শ্রী রামকৃষ্ণ বলতেন, দক্ষিণেশ্বর হলো মা ভবতারিণীর প্রথম কেল্লা, আর দ্বিতীয় কেল্লা বলরাম-ভবন।”
শ্রীজানকীনাথ বসু (২৮ মে ১৮৬০–২ ডিসেম্বর ১৯৩৪)
সুভাষচন্দ্রের যেকোনো জীবনীগ্রন্থ শুরু হয় তাঁর বংশ পরিচয় দিয়ে। তাই শ্রী জানকীনাথ বসুর কথাও সবার জানা। শ্রী জানকীনাথ বসুর জন্ম হয়েছিল ২৮ মে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার দক্ষিণে অনতিদূরে কোদালিয়া গ্রামে। আর তাঁর মৃত্যু হয় ২ ডিসেম্বর ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে রাতে বা হয়ত পাশ্চাত্য সময় অনুযায়ী ৩ ডিসেম্বরের প্রথম প্রহরে। সুভাষচন্দ্র পিতার মৃত্যুর প্রায় ৪০ ঘণ্টা পর ইউরোপ থেকে কলকাতা ফিরতেই ৪ ডিসেম্বর ১৯৩৪ তাঁকে গ্রেপ্তার করে প্যারোলে ছেড়ে গৃহবন্দী করা হয়। সে সময় তিনি “স্বর্গীয় জানকীনাথ বসুর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত” বলে একটা প্রবন্ধ লেখেন। তাতে সুভাষচন্দ্র লিখেছেন, “কলকাতার এলবার্ট স্কুল (Albert School) হইতে এন্ট্রান্স (Entrance) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া তিনি St. Xavier’s ও General Assembly কলেজে কিছুকাল পড়িয়া, অবশেষে তাঁহার জ্যেষ্ঠভ্রাতা স্বর্গীয় দেবেন্দ্রনাথ বসু মহাশয়ের সহিত কটকে যান। বৃত্তি পাইয়া, কৃতিত্বের সহিত তিনি কটক Ravenshaw কলেজ হইতে এফ্, এ ও বি, এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।… বি, এ উপাধি লাভ করিয়া তিনি কলকাতায় আসেন — আইন পরীক্ষা দিবার জন্য — এবং সেই সময়ে ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেন, তদীয় ভ্রাতা কৃষ্ণবিহারী সেন, সিটি কলেজের প্রিন্সিপ্যাল উমেশ চন্দ্র দত্ত প্রভৃতির সহিত পরিচিত হইবার সৌভাগ্য লাভ করেন। কৃষ্ণবিহারী সেন মহাশয়ের সৌজন্যে তিনি এলবার্ট কলেজে কিছুকাল অধ্যাপকতা করেন এবং তাহার পর প্রায় ৯ মাস চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত জয়নগর গ্রামে হাই-স্কুলের প্রধান অধ্যাপকের কাজ করেন। এই সময়ে তাঁহাকে প্রবল অর্থকষ্ট ভোগ করিতে হয়।
“১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার নিকটবর্তী বরানগর অধিবাসী স্বর্গীয় কাশীনাথ দত্তের পৌত্রী ও স্বর্গীয় গঙ্গানারায়ণ দত্তের কন্যা শ্রীমতী প্রভাবতীর সহিত তাঁহার বিবাহ হয়। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতার মেট্রোপলিটন (Metropolitan) কলেজ হইতে বি, এল্ উপাধি প্রাপ্ত হইয়া তিনি পুনরায় কটকে যান এবং তদানীন্তন গভর্মেন্ট প্লীডার (Government Pleader) স্বর্গীয় রায়বাহাদুর হরিবল্লভ বসু মহাশয়ের সাহায্যে ওকালতী ব্যবসায় আরম্ভ করেন। অল্পদিনের মধ্যে ওকালতীতে তাঁহার বিশেষ পসার ও প্রতিপত্তি হয়। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁহার পিতা হরনাথ বসু মহাশয় পরলোকগমন করেন। এই ঘটনার কয়েক বৎসর পরে — অর্থাৎ ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে — তিনি কটকের পাবলিক প্রসিকিউটর (Public Prosecutor) নিযুক্ত হন। রায়বাহাদুর হরিবল্লভ বসুর দেহত্যাগের পর — ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে — তিনি গভর্মেন্ট প্লীডার নিযুক্ত হন। … সেই বৎসরই (১৯১২ খ্রিস্টাব্দে) রায়বাহাদুর উপাধি প্রাপ্ত হন।…১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে ডিষ্ট্রিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেটের সহিত মতান্তর উপস্থিত হওয়াতে তিনি গভর্মেন্ট প্লীডার পদ ত্যাগ করেন এবং প্রায় ১৩ বৎসর পরে – অর্থাৎ ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে সরকারের দণ্ডনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাইয়া তিনি রায় বাহাদুর উপাধি ত্যাগ করেন।”

এখানে উল্লেখযোগ্য যে জানকীনাথ বসু প্রথমবার কটকে এফ-এ এবং বি-এ পড়তে বৈমাত্রেয় জ্যেষ্ঠভ্রাতা স্বর্গীয় দেবেন্দ্রনাথ বসুর সাথে কটকে গিয়েছিলেন। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ বসু সরকারী শিক্ষা দপ্তরে বদলীর চাকরী করতেন। পরে অধ্যক্ষের পদে উন্নীত হয়ে তিনি কৃষ্ণনগর কলেজে বদলী হন এবং অবসর গ্রহণের পর কলকাতার বাদুড়বাগানে বসবাস শুরু করেন। তাই ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে পূজার ছুটির পর জানকীনাথ যখন ওকালতি করতে আবার কটকে যান তখন তাঁকে পিসেশ্বশুর রায়বাহাদুর হরিবল্লভ বসুর সাহায্য গ্রহণ করতে হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে জানকীনাথ বসুকে তখন খুব আর্থিক কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছিল এবং তা জানতে পেরে শ্রীমতী প্রভাবতী বসুর পিসামশাই শ্রী হরিবল্লভ বসু তাঁকে কটকে এসে আইন ব্যবসা করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কটকে যাবার পর শ্রী জানকীনাথ বসু ১৫ জানুয়ারি ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ওকালতি শুরু করেন। তিনি সপরিবারে কটকে গিয়ে শুরুতে রায়বাহাদুর হরিবল্লভ বসুর বাড়ীতেই উঠেছিলেন।
শ্রী সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর “স্বর্গীয় জানকীনাথ বসুর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত” প্রবন্ধে আরও লিখেছেন, “জানকীনাথ চিরকাল ধার্মিকচিত্ত ছিলেন। বহুকাল যাবৎ তিনি কটকের Theosophical Lodge-এর সভাপতি ছিলেন। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে বাগবাজারের স্বর্গীয় পণ্ডিত শ্যামনাথ ভট্টাচার্য মহাশয়ের নিকট তিনি সস্ত্রীক প্রথমে দীক্ষা গ্রহণ করেন। প্রথম গুরুর স্বর্গপ্রাপ্তির কয়েক বৎসর পর তিনি পুনরায় সস্ত্রীক হিমাইতপুরের ঠাকুর শ্রীঅনুকূলচন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয়ের ‘সৎ-সঙ্গে’ যোগদান করেন এবং সেইখানে দীক্ষা গ্রহণ করেন। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার ধর্মপ্রবৃত্তি আরও বলবতী হইয়াছিল। তাঁহার কর্মবহুল ও সংগ্রামরত জীবনে ধর্মের প্রেরণাই ছিল তাঁহার সবচেয়ে বড় সহায় ও শক্তির উৎস। যৌবনে তাঁহাকে সাংসারিক অভাবের সহিত যুঝিতে হইয়াছিল এবং কেবলমাত্র স্বীয় কর্ম প্রচেষ্টা ও ভগবদ্ বিশ্বাসের বলেই তিনি লব্ধপ্রতিষ্ঠ হইতে পারিয়াছিলেন।…”
মা-জননী প্রভাবতী দেবী (২৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৯ – ২৮ ডিসেম্বর ১৯৪৩)
শ্রীমতী প্রভাবতী দেবীর জন্ম হয়েছিল ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে। উপরেই বলা হয়েছে যে তাঁর বিবাহ হয়েছিল ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে। তখন তাঁর বয়স ১১ বছর আর তাঁর স্বামীর বয়স ছিল ২০ বছর। তাঁর প্রথম সন্তান প্রমীলার জন্ম হয়েছিল ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে বরানগরে পিতা শ্রী গঙ্গানারায়ণ দত্ত আর মাতা বিশ্বেশ্বরী দেবীর বাড়িতে। তাঁর পরের কন্যাসন্তান সরলারও জন্ম হয় বরানগরে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে। এর পরের ১২ জন সন্তানের জন্ম অবশ্য কটকেই হয় [প্রফেসর গর্ডন]।
সুভাষচন্দ্রের ১৯১২–১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ১৫-১৬ বছর বয়সে লেখা পত্রাবলীর ষষ্ঠ চিঠিতে গুরুদেবের মৃত্যুর জন্য মাকে শ্রীমদ্ভগবদগীতার একাধিক শ্লোক উল্লেখপূর্বক প্রবোধ দেওয়া থেকে বোঝা যায় যে দীক্ষা নেবার অল্প কিছুদিনের মধ্যে গুরুদেবের মৃত্যুতে মা-জননী প্রভাবতী দেবী খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। এর কয়েক বছর পর তাঁর মা-বাবা আবার ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের কাছ থেকে দীক্ষা নেন। ভিয়েনা থেকে বন্ধু দিলীপকুমার রায়কে ২৩ ডিসেম্বর ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজিতে লেখা একটা চিঠিতে শ্রীসুভাষচন্দ্র বসু লিখেছেন, “আমার নিজের মার, যাঁর অকৃত্রিমতা সম্বন্ধে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, একজন গুরুদেব আছেন যাঁকে তিনি মূর্ত ভগবান বলে গণ্য করেন।” [My own mother — whose sincerity I cannot doubt — has a Guru whom she regards as God incarnate.”] এতে মা-জননী প্রভাবতী দেবীর গুরুভক্তি প্রমাণিত হয়।

রায় বাহাদুর হরিবল্লভ বসু : মা-জননীর পিসেমশাই
শ্রীমতী গীতা বিশ্বাস “স্মৃতির আলোয়” বইতে লিখেছেন, “আমাদের ঠাকুমার — যাকে আমরা ‘মা জননী’ বলে সম্বোধন করতাম – পিসেমশাই হরবল্লভ বসু কটকের লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকিল ছিলেন। তিনি জানকীনাথ বসুকে কটকে গিয়ে ওকালতি শুরু করার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। জানকীনাথ বসু এই সুযোগ গ্রহণ করে কটকে গিয়ে তাঁর আইন ব্যবসা শুরু করলেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি আইনব্যবসায়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।” শ্রীমতী গীতা (বসু) বিশ্বাস শ্রীজানকীনাথ বসুর দ্বিতীয় পুত্র শ্রীশরৎচন্দ্র বসুর পঞ্চম সন্তান ও দ্বিতীয়া কন্যা। তাঁর জন্ম ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে । [প্রফেসর চিত্রা ঘোষ এবং প্রফেসর গর্ডন] তাই তিনি যা লিখেছেন তা বাড়ির গুরুজনদের কাছে শুনে লিখেছেন। হরিবল্লভ বসুকে তিনি হরবল্লভ বসু বলে উল্লেখ করেছেন।
শ্রীমতী গীতা বিশ্বাস “স্মৃতির আলোয়” বইতে অন্যত্র আরও লিখেছেন, “মাজননীর পিসেমশাই হরবল্লভ বসুর কোন পুত্র সন্তান ছিল না। বাবার কাছে গল্প শুনেছি তিনি বাবাকে দত্তক নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দাদাভাই (জানকীনাথ বসু) রাজি হন নি। যদিও তাঁর আট পুত্র ছিল নিজের পুত্রকে কারো কাছে দিতে তিনি ইচ্ছুক ছিলেন না। বাবা ঠাট্টা করে আমাদের বলতেন, ‘বাবা ভুলই করেছেন, হরবল্লভ বসুর পোষ্যপুত্র হয়ে থাকলে আমাকে আর কাজ করতে হত না। পায়ের ওপর পা দিয়ে চিরকাল বসে খেতে পারতাম।’ হরবল্লভ বসু তাঁদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন। সকলেই তাঁর অনুরক্ত ছিলেন। হরবল্লভ বসু তাঁদের জিজ্ঞেস করতেন, ‘তোদের দন্তদাদু ভালো না দেড়েল দাদু ভালো?’ তাঁর বড়ো বড়ো দাঁত ছিল, তাই নিজেকে দন্তদাদু বলতেন। মাজননীর বাবার (কাশীনাথ দত্ত) দাড়ি ছিল তাই তিনি দেড়েল দাদু। কাশীনাথ দত্ত কলকাতায় বরাহনগরে থাকতেন। সেজন্য তাঁর সঙ্গে নাতিদের ঘনিষ্ঠতা ছিলনা। হরবল্লভ বসু কটকে থাকতেন, তাই তিনি অনেক কাছের লোক।” এখানেও শ্রীমতী গীতা বিশ্বাস মা-জননীর বাবার নাম গঙ্গানারায়ণ দত্ত না লিখে ভুলে কাশীনাথ দত্ত লিখেছেন। শ্রীকাশীনাথ দত্ত ছিলেন শ্রীগঙ্গানারায়ণ দত্তের পিতৃদেব অর্থাৎ মা-জননীর পিতামহ।
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে হরিবল্লভ বসু যখন হঠাৎ মারা যান তখন জানকীনাথ বসুর সন্তানদের বয়স নিম্নরূপ — প্রমীলা (বসু) মিত্রের ২১, সরলা (বসু) দে-র ২০, সতীশের ১৮, শরৎ-এর ১৬, সুরেশের ১৪, সুধীরের ১৩, সুনীলের ১১, তরুবালার ১০, সুভাষের ৮ বছর, ইত্যাদি [প্রফেসর গর্ডন]। তাই বড় ছেলে-মেয়েদের হরিবল্লভ বসু ওরফে দন্তদাদুর কথা মনে থাকাই স্বাভাবিক।
রায় বাহাদুর হরিবল্লভ বসুর অন্য পরিচয়
এইবার আমরা এই সন্দর্ভের মুল বিষয়ে আসি। রায় বাহাদুর হরিবল্লভ বসু ছিলেন ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের অন্যতম প্রধান গৃহীভক্ত বলরাম বসুর জ্যেষ্ঠতাত ভ্রাতা। এবং তিনিই ছিলেন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতে বর্ণিত বলরাম মন্দিরের প্রকৃত মালিক। তাঁর পিতার নাম ছিল শ্রী বিন্দুমাধব বসু (মতান্তরে শ্রী বিন্দুমোহন বসু)। তিনিই ছিলেন সুভাষচন্দ্রের মা-জননীর পিসেমশাই। প্রথমে তিনি যখন জানতে পারেন যে বলরাম আবার কোন শাক্ত সাধুর কাছে যাতায়াত করেন এবং বাড়ির মহিলাদেরও সেখানে নিয়ে যান, তখন হরিবল্লভ অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে দর্শন করার পর তাঁর আমূল পরিবর্তন হয় এবং তিনিও ঠাকুর রামকৃষ্ণের ভক্ত হয়ে পড়েন। মূল ৫ খণ্ড কথামৃতের চতুর্থ ভাগে তিন দিন তাঁর শ্যামপুকুর বাটীতে পরমহংসদেবের কাছে যাওয়ার এবং দু’দিনের কথোপকথনের বিবরণ আছে। (এই লেখাটার নীচে তার কিছুটা সংযোজন করা হ’ল।)

তাছাড়া শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতের পরিশিষ্টে যে ব্যক্তিপরিচয় আছে তাতে রায়বাহাদুর হরিবল্লভ বসু আর ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বলরাম মন্দিরে একটা সুন্দর সাক্ষাৎকারের বিরল বর্ণনা রয়েছে। সেটা নিম্নরূপ — ‘শ্রীশ্রীলাটু মহারাজের স্মৃতিকথা’ হইতে জানা যায়, একদিন ঠাকুর বলরাম-মন্দিরে শুভাগমন করিলে পর গিরিশচন্দ্রের ব্যবস্থামত হরিবল্লভবাবু আসিয়া ঠাকুরের নিকট বসেন এবং উভয়ই উভয়কে দেখিয়া কাঁদিতে থাকেন, কোন কথা হয় নাই।
রায়বাহাদুর হরিবল্লভ বসুর যৌথ পরিবারের সকলে বৈষ্ণব ভাবাপন্ন ছিলেন। তাঁর খুড়তুতো ভাই শ্রী বলরাম বসু ঠাকুরের খুব প্রিয় গৃহীভক্ত ছিলেন। শ্রী বলরামের স্ত্রী শ্রীযুক্তা কৃষ্ণভাবিনী দেবীও শ্রীরামকৃষ্ণ-সারদা মার ভক্ত ছিলেন। তাঁদের একমাত্র সন্তানের নাম রেখেছিলেন রামকৃষ্ণ। সেও ঠাকুর রামকৃষ্ণের ভক্ত হয়েছিল। এছাড়া নিজের পিতৃদেব রাধামোহন বসুকেও বলরাম বসু ঠাকুরের সান্নিধ্যে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। শ্রীযুক্তা কৃষ্ণভাবিনী দেবীর ছোটভাই বাবুরাম ঘোষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের পরম আপনজন ছিলেন এবং পরে বাবুরাম মহারাজ (স্বামী প্রেমানন্দ) নামে প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন।
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত এবং তার প্রকাশকাল
প্রথমে শ্রীম (মহেন্দ্রলাল গুপ্ত) তাঁর লেখা ডায়েরী থেকে বিস্তারিত লিখে শ্রীশ্রী মায়ের কাছে কথামৃতের দু’একটা অধ্যায় পাঠ করে শুনালে শ্রীমা তাঁকে আরও লিখতে উৎসাহিত করেন। শ্রীমায়ের আদেশে শ্রীম ১৮৯৭ সালে প্রথমে দুই খণ্ডে ইংরেজিতে পুস্তিকাকারে কথামৃত (Gospel) প্রকাশ করেন। এবং পরে শ্রীমায়ের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে ধারাবাহিকভাবে ইংরেজি ব্রহ্ম্ববাদিন পত্রিকায় ‘Leaves from the Gospel of the Lord Sri Ramakrishna’ নাম দিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করতে থাকেন। স্বামী বিবেকানন্দ তা পড়ে খুব খুশী হন এবং শ্রীম-কে উৎসাহ দিয়ে আরও লিখতে এবং বই আকারে প্রকাশ করতে পরামর্শ দেন। তারপর শ্রীম বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় (উদ্বোধন, প্রবাসী, অনুসন্ধান, আরতি, তত্বমঞ্জরী, পুণ্য, প্রদীপ, আলোচনা, প্রয়াস, বামাবোধিনী, সাহিত্য, সাহিত্য-সংহিতা, হিন্দুপত্রিকা, ইত্যাদি) বিভিন্ন অধ্যায় ছাপাতে শুরু করেন।

স্বামী চেতনানন্দ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতের ইতিবৃত্ত প্রবন্ধে আরও লিখেছেন যে শ্রীম এই অধ্যায়গুলো কালক্রমানুযায়ী সাজিয়ে ১১ মার্চ ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে উদ্বোধন প্রেস থেকে স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দের তত্বাবধানে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতের প্রথম ভাগ প্রকাশ করেন। এরপর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতের দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশ হয় ১৯০৪ সালে, তৃতীয় ভাগ ১৯০৮ সালে, চতুর্থ ভাগ ১৯১০ সালে এবং পঞ্চম ভাগ ১৯৩২ সালে। এই পাঁচ খণ্ডে ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২ থেকে ১০ মে ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দের শ্রীরামকৃষ্ণের জীবৎকালের ১৭৭ দিনের বিবরণ এবং তিরোধানের পর বরানগর মঠের আট দিনের বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়েছে।
উপসংহার
রায়বাহাদুর হরিবল্লভ বসু খুব সম্ভবতঃ ১৮৮৫ সালের পূজার ছুটির সময় (তখন কোর্টেরও লম্বা ছুটি হ’ত এবং ইউরোপিয়ান সাহেবরাও ছুটি কাটাতে বিলেতে বা নিজেদের দেশে যেতেন) অবতারশ্রেষ্ঠ পরমহংস শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের সাক্ষাৎ লাভ করেন। তার প্রায় এক বছর আগে, ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের পূজার ছুটির পর, জানকীনাথ বসু সপরিবারে হরিবল্লভের আহ্বানে কটক গিয়েছিলেন এবং ওকালতি শুরু করেছিলেন। আগেও বলা হয়েছে যে জানকীনাথ বসু সপরিবারে প্রভাবতীর পিসেমশাই হরিবল্লভের বাড়িতেই প্রথমে উঠেছিলেন। দুঃখের বিষয় এসব কথা বিস্তারিত কেউ লিখে যান নি। তবে শ্রীমতী গীতা বিশ্বাসের এবং অধ্যাপিকা চিত্রা ঘোষের বই থেকে অনেক কথা জানা যায় এবং প্রথম জনের বই থেকে একথা স্পষ্ট বোঝা যায় যে দুই পরিবারের মধ্যে আত্মীয়তা এবং হৃদ্যতার সম্পর্ক প্রথম থেকে শেষ অবধি অটুট ছিল।
আর একটা কথা এখানে বলা আবশ্যক। মা জননীর পিসিমা, তাঁর পিসেমশাই থেকে সম্পর্কে বেশী আপন ছিলেন কিন্তু কেউ সেই পিসিমার নাম লিখে যাননি বা অন্ততঃ আমি তা কোথাও এখন অবধি পাইনি। আর শ্রীমতী গীতা বিশ্বাসের বই পড়ে মনে হয় যে হরিবল্লভ-বাবুর এক বা একাধিক কন্যাসন্তান ছিল। হরিবল্লভ বসুর জন্মতারিখ বা সাল-টাও নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে অনুমান করা যায় যে তখন (১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে) হয়তো তাঁদের মেয়ে(দে)র বিয়ে হয়ে গিয়েছে।

সেসময় অসুস্থ ঠাকুর রামকৃষ্ণের সাথে হয়তো শ্রীহরিবল্লভ বসুর অনেক কথা হয়নি কিন্তু তিনি যে শাক্ত শ্রীরামকৃষ্ণের ঐশ্বর্যে আপ্লুত হয়ে গেছেন তা কথামৃত পড়লেই বোঝা যায়। তাছাড়া সেখানে তাঁর সাথে স্বামী বিবেকানন্দ (তখন নরেন্দ্রনাথ), স্বামী ব্রহ্মানন্দ (তখন রাখালচন্দ্র ঘোষ), মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, প্রভৃতি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তাবড় তাবড় গুণীজনদের সাথে আলাপ-পরিচয় হয়েছিল। গিরিশচন্দ্র ঘোষের সাথে তাঁর আগেই পরিচয় এবং হৃদ্যতা ছিল। তাই এটা সহজেই অনুমেয় যে তিনি এইসব দর্শনের কথা এবং গুণীজনদের সাথে তাঁর আলাপ-পরিচয়ের কথা জানকীনাথ এবং প্রভাবতীকে সবিস্তারে বলেছিলেন এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের লীলার কথাও আলোচনা করেছিলেন। কাজেই এটা স্বাভাবিক যে সুভাষ-জনক আর সুভাষ-জননী জানকীনাথ আর প্রভাবতী রামকৃষ্ণের আদর্শে তখনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পূর্বে তিনি গ্রন্থাকারে শ্রীম লিখিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতের শুধু দুই ভাগ দেখে যেতে পেরেছিলেন যাতে অবশ্য তাঁর নাম ছিল না কিন্তু বলরাম বা বলরামের পিতৃদেবের নাম ছিল। কিন্তু সেসময়কার ইংরেজি বা বিভিন্ন বাংলা পত্র-পত্রিকায় কথামৃতের যেসব অধ্যায় বের হয়েছিল, তাতে তাঁর নাম থাকা সম্ভব। তবে তাঁর বাড়ি বলরাম-মন্দিরের নাম যে সেগুলোতে ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাছাড়া তিনি সর্বদা রামকৃষ্ণ অনুরাগীদের সংস্পর্শে ছিলেন এবং নানাভাবে সেই সংস্থাকে অর্থ সাহায্য করেছেন। খুবই দুঃখের কথা যে শ্রী হরিবল্লভ বসুর কোন ছবি আমি আজ অবধি পাই নি।
অন্যান্য বইতে হরিবল্লভ বসুর উল্লেখ
শ্রী পবিত্রকুমার ঘোষ-এর লেখা ‘সুভাষচন্দ্র’ বইটার প্রথম খণ্ডে হরিবল্লভ বসুর উল্লেখ আছে। তিনি যে জানকীনাথ বসুর পিসাশ্বশুর এবং পরে যে তিনি রামকৃষ্ণ ভক্ত হয়েছিলেন তারও উল্লেখ আছে। এছাড়া শ্রীম-রচিত “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত” থেকে হরিবল্লভ বসুর সাথে পরমহংসদেবের সেই সাক্ষাৎকারের অংশগুলোর উদ্ধৃতিগুলোও আছে। কিন্তু তারপর তিনি লিখেছেন, “জানকীনাথ বসু হরিবল্লভের নিকট কী পরামর্শ পেয়েছিলেন জানিনা, তবে তাঁর জীবনে ধর্মভাব অনেকখানি স্থান জুড়েছিল।”
ড. হেমেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত তাঁর ইংরেজিতে লেখা ‘সুভাষচন্দ্র’ বইতে লিখেছেন, — “কটকে ছাত্রাবস্থায় তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সেবার চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন, যাঁরা (রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা) প্রায়ই কটকের বাবু হরি বল্লভ বসু এবং তাঁর ছেলে রাম কৃষ্ণ বসুর বাড়িতে আসতেন, যাঁদের সাথে জানকী বাবুর খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল।” “রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী তাঁর বাবা জানকীবাবুর অন্তরঙ্গ বন্ধু (?) হরিবল্লভ বসু আর তাঁর পুত্র রামকৃষ্ণ বসুর কাছে আসতেন। (As a student in Cuttack he was inspired by the spirit of service as followed by the Sanyasees of the Ramakrishna Mission who now and again came to the house of Babu Hari Ballav Bose and his son Ram Krishna Bose of Cuttack with whom Janaki Babu was very intimate.)
একই তথ্যসূত্র উল্লেখ করে শ্রী বলাই মণ্ডলও “Contemporary Events & Politics: Subhas Chandra Bose : Presidency College to Presidency Jail” বইতে লিখেছেন, “(কটক)শহরের শ্রী হরি বল্লভ বসু এই ধরনের সাধুদের সাদর আপ্যায়ন করতেন এবং তাঁদের সঙ্গ উপভোগ করতেন। জানকী নাথ বসু তাঁর ছেলে রাম কৃষ্ণ বসুকে চিনতেন। এভাবে সুভাষ হিন্দু সাধুদের সংস্পর্শে আসেন ” [“Mr. Hari Ballabh Bose of the town entertained and enjoyed company of such saints. Janaki Nath Bose knew his son, Ram Krishna Bose. Thus Subhas came in contact with the Hindu missionaries.”] এখানে তিনি হিন্দু মিশনারি বলতে রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের বুঝিয়েছেন। আর তথ্যসূচী দিয়েছেন Hemendra Nath Das-gupta: “Subhaschandra” (Calcutta, Jyoti Prakashalaya, 1946)। স্বামী বিদেহাত্মানন্দ মহারাজের পুস্তিকাতেও একই তথ্যসূত্র দিয়ে লেখা হয়েছে, “রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের সঙ্গেও সুভাষের বাড়ির কিছু সম্পর্ক ছিল। … রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী তাঁর বাবা জানকীবাবুর অন্তরঙ্গ বন্ধু হরিবল্লভ বসু আর তাঁর পুত্র রামকৃষ্ণ বসুর কাছে আসতেন।”
মনোযোগী পাঠক উপরের বর্ণনায় একটা অসঙ্গতি নিশ্চয়ই দেখে থাকবেন। উপরে আমারা দেখেছি যে রায়বাহাদুর হরিবল্লভ বসুর কোন পুত্র-সন্তান ছিল না, আর রামকৃষ্ণ বসু ছিলেন বলরাম বসুর পুত্র। তবে কি রায়বাহাদুর হরিবল্লভ বসু পরে তাঁর খুড়তুতো ভাই শ্রী বলরাম বসুর পুত্র রামকৃষ্ণ বসুকে দত্তক নিয়েছিলেন? শুধু একটা বইতে (ড. হেমেন্দ্রনাথ দাসগুপ্তের লেখা) এ তথ্য পেয়ে অন্য প্রমাণ ছাড়া একথা অবশ্য জোর দিয়ে বলা যায় না।
যাই হোক, আমার এই প্রবন্ধের উপপাদ্য বিষয় (যে রায়বাহাদুর হরিবল্লভ বসুর মাধ্যমেই কটকে জানকীনাথ বসুর পরিবারে রামকৃষ্ণ-চেতনার উন্মেষ হয়েছিল) নতুন কোন সিদ্ধান্ত নয়। তবে আমার মতে শ্রীমতী গীতা বিশ্বাসের ‘স্মৃতির আলোয়’ বই থেকে এই থিওরির সত্যতা নিশ্চিত প্রমাণিত হয়।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতে তাঁর কথা এবং শ্রীমতী গীতা বিশ্বাসের লেখা বর্ণনা পাঠ করে কটকের জানকীনাথ বসু পরিবারের সাথে রায়বাহাদুর হরিবল্লভ বসুর অন্তরঙ্গতা এবং তার ফলস্বরূপ সে পরিবারে রামকৃষ্ণ চেতনার অঙ্কুরোদগম এবং উন্মেষ সম্বন্ধে জানার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে যুগপুরুষ সুভাষচন্দ্রের জীবনীতে হরিবল্লভ বসুর যে স্থান প্রাপ্য ছিল তা থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন।
বিশেষ বিজ্ঞপ্তি:
মূল লেখাটা সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১লা মে ২০১৯ তারিখে; সে সময় অবধি পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। লেখাটার পরিশেষে নিবেদিত হয়েছিল যে তদতিরিক্ত তথ্য পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে লেখাটা আরও বিশদভাবে লিপিবদ্ধ হবে। যেহেতু লেখাটা মূলত: ফেসবুকে দেওয়া হয়েছিল, তাই মাঝে মাঝে এডিট করে কিছু অতিরিক্ত তথ্য সংযোজিত হয়েছে। ইদানীং আরও সামান্য কিছু তথ্য সংগৃহীত হওয়ায় এবং মূল লেখাটায় কয়েকটা ত্রুটি পরিলক্ষিত হওয়ায় লেখাটা পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন মনে হয়েছিল। তাই আজ রামকৃষ্ণ মিশনের ১২৬-তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে লেখাটা পুনর্লিখিত এবং পুনঃ-প্রকাশিত
১লা মে ২০২৩