দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে সপ্তম জ্যোতির্লিঙ্গ “সেতুবন্ধে রামেশ্বরম” দক্ষিণ ভারতে অবস্থিত। মর্যাদা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীরাম এই জ্যোতির্লিঙ্গ স্থাপন করেন। রামচন্দ্র বৈষ্ণবদের আরাধ্য দেবতা। নররূপী নারায়ন তিনি। যেহেতু রামেশ্বরমে শিব পূজা করেছিলেন রাম, তাই এই তীর্থ বৈষ্ণবদের কাছেও পুণ্যভূমি।
হাওড়া থেকে যেতে হলে প্রথমে মাদুরাই বা কন্যাকুমারী আসতে পারেন। সেখান থেকে ট্রেনে করে রামেশ্বরম স্টেশন। চেন্নাই থেকে মাদুরাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রায় ১৭৯ কিলোমিটার দূরে। রামেশ্বর চেন্নাই ও মাদুরাইয়ের রেলপথের টার্মিনাস। মাদুড়াই থেকে বাসে করে গেলে এম জি আর বাসস্ট্যান্ড থেকে ৪ ঘন্টা লাগবে রামেশ্বরম যেতে। অথবা ভুবনেশ্বর চলে যান ভুবনেশ্বর থেকে অনেক ট্রেন রামেশ্বরমে যাচ্ছে।
রামেশ্বর দ্বীপের পশ্চিমাংশে ধনুষ্কোটি। মাইল দুয়েক এলাকা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে একটি ত্রিভুজ। এখানে ভারত মহাসাগরের মিলন ঘটেছে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে। পৌরাণিক যুগে এই ধনুষ্কোটিতে শ্রী রামচন্দ্র বানর সেনাদের সাহায্যে ভারতের সঙ্গে লঙ্কাপুরি তথা আজকের শ্রীলংকার সেতুবন্ধন ঘটান বালি আর পাথর দিয়ে। তবে সেতুর উৎপত্তি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে প্রচুর। প্রজেক্ট রামেশ্বরম নামে একটি গবেষণা চালানো হয় এই সেতু নিয়ে। বাল্মিকী রামায়ণে যুদ্ধ কান্ডের দ্বাবিংশ সর্গে সেতুর বর্ণনা দেওয়া আছে। বর্তমানে নাসার (NASA) স্যাটেলাইটে তোলা বিস্ময়কর কিছু আলোকচিত্র, কি অদ্ভুত ভাবেই না মিলে গেছে বর্ণনার সাথে। স্বল্প পরিসরে সেতুর আলোচনা সম্ভব নয়, অন্য সময় করা যাবে।
রামেশ্বর মন্দিরের প্রবেশপথে শিল্পসম্ভারে ভরা বিশাল তিনটি গোপুরম। প্রায় ১২০ ফুট উচ্চতার দ্রাবিড়ীয় স্থাপত্য শিল্পের অতুলনীয় নিদর্শন এই গোপুরমগুলি। এই দুপাশে অলিন্দের মধ্যে ডান দিকে সুব্রহ্মণ্যস্বামী (কার্তিক)

আর বামদিকে দশহাত গণেশের সুদর্শন মূর্তি। গোপুরমগুলি বিভিন্ন স্তরে স্তরে ক্রমশ উঠে গিয়েছে বারোতলা নহবতখানার মত। এগুলি চারকোনাকৃতি এবং কারুকার্যখচিত। প্রত্যেকটি তলা নিচের তলার তুলনায় পরিসরে ছোট। একেবারে শেষ তলায় সাতটি পিতলের কলস।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে সেতুপতি বংশের রাজা উদয়নের অবদানে নির্মিত এই গোপুরমগুলি। মন্দিরের ভেতরের প্রাকারগুলি নির্মাণ করেন মাদুরার নায়ক রাজবংশ। রামেশ্বর মন্দিরটি নির্মাণ করেন সিংহলের কান্ডির বরশংকর রাজা। তিনি নির্মাণের পাথরগুলি এনেছিলেন লাক্ষাদ্বীপ থেকে। কুড়ি ফুট উঁচু পাথরের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা রামেশ্বর মন্দির, মন্দিরের সামনে অতলান্ত সাগর।
মন্দিরের সামনে বিস্তৃত প্রাঙ্গনে মহাদেবের বিশাল বাহন নন্দীর মূর্তি — উচ্চতায় প্রায় ১৫ এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬ ফুট। মূর্তিটি ‘সুদাই’-এর তৈরি। তামিল শব্দ সুদায়ের অর্থ হল চুন, পাথরকুচি প্রভৃতির সংমিশ্রণ। নাট মন্দিরের সামনেই একটি স্তম্ভ যার গোটা দেহটি সোনার পাতে মোড়া। মন্দিরের পাশে আছে একটি জলাশয়। নানা তীর্থের জলে পবিত্র হওয়া কূপের সংখ্যা এখানে ২১টি। নন্দী মূর্তির ডান দিকে নবগ্রহ মন্দির।
মন্দিরের গর্ভগৃহে অজস্র প্রকম্পিত দীপশিখার মধ্যে শ্রীরামনাথস্বামী সগৌরবে বিরাজমান। শ্রীরামেশ্বরলিঙ্গ উত্তরমুখী। চন্দনচর্চিত পাথরের আড়াই তিন ফুট উঁচু শিবলিঙ্গ। সোনার তৈরি সিংহাসনে অবস্থান করছেন রামেশ্বর সেই রামায়নী যুগ থেকে। লিঙ্গমূর্তির উপরে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে পঞ্চমুখী সোনার কালসাপ। দূর থেকে পিঙ্গল বর্ণের শিবলিঙ্গ দেখতে লাগে। রামেশ্বরে মহাদেবের অভিষেক হয় গঙ্গোত্রীর জলে।
প্রথমে পঞ্চামৃত দিয়ে মহেশ্বরের পুজো শুরু হয়। তারপর তার উপর জলধারা প্রদান। একদিকে অষ্টোত্তর শতমন্ত্র পাঠ, অন্যদিকে এই জলধারার সাহায্যে নির্গুণ অথচ গুণরূপী শিবের পূজা। চন্দন, অখন্ডিত তন্ডুল, তিল এই সকল বস্তু নিবেদন করে দেবাদিদেবের পূজা অর্চনা। পদ্মফুল ও করবী ফুলে শিব তুষ্ট। কিন্তু জানকী দেবীর শাপে কেতকী ফুলে শিব পূজা নিষিদ্ধ। আটটি নাম মন্ত্রের সাহায্যে শিবলিঙ্গের উপরিভাগে পুষ্প অর্পণ প্রক্রিয়া করা হয়। এরপর ধুপ, দীপ ও নৈবেদ্য নিবেদন।

রামেশ্বর মন্দিরের ডানদিকে রামেশ্বরী পার্বতী মন্দির। সুবিশাল মন্ডল আর সুদৃশ্য কারুকার্যখচিত স্তম্ভের বারান্দা চলে গেছে সমুদ্রের দিকে একেবারে গোপুরাম পর্যন্ত। পার্বতী মন্ডপটি ২৪টি স্তম্ভ শোভিত। বিভিন্ন দেবদেবীর বিগ্রহ খোদিত স্তম্ভগুলি অপূর্ব। সুদর্শনা দেবী রামেশ্বরীর অবস্থান গর্ভ মন্দিরে।
এবার আসি রামেশ্বর মহাদেবের প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে। ত্রেতাযুগে শ্রী রামচন্দ্র রাবণ বধের পর সীতা-সহ পুষ্পক রথে চড়ে এলেন। পিতা দশরথের উদ্দেশ্যে চালের অভাবে পিণ্ড দিলেন বালি দিয়ে। এবার শিব পূজার ইচ্ছা হল জানকী নন্দিনী সীতার। শ্রীরামের আদেশে হনুমান গেলেন বিশ্বনাথকে আনতে বারানসীতে। এদিকে প্রহর গড়িয়ে চলে অথচ হনুমানের ফেরার নাম নেই। বিলম্বে অধৈর্য হলেন জানকী, দেরি না করে রামচন্দ্রের অনুমতি নিয়ে সমুদ্রের বালি দিয়ে একটি শিবলিঙ্গ গড়ে পূজা করলেন ভক্তি ভরে। সমুদ্র তীরে এই শিবলিঙ্গই প্রসিদ্ধি লাভ করলেন রামলিঙ্গেশ্বরম নামে। জনকনন্দিনী সীতা পর্বতবর্ধিনী নামে এক দেবীকেও প্রতিষ্ঠা করলেন একই সঙ্গে।
এদিকে বারাণসী থেকে মহাবীর হনুমানজি ফিরে এলেন বিশ্বনাথকে নিয়ে। সমস্ত কিছু দেখে জানকীর আচরণে দুঃখিত হলেন হনুমান। ভক্তের মনের দুঃখের কথা বুঝে রামচন্দ্র হনুমানকে বললেন তুমি লাঙ্গুলে করে এই বালির শিবকে সমুদ্রে বিসর্জন দাও। শত চেষ্টা করেও হনুমান এই বালির শিবকে উৎখাত করতে পারলেন না।
ভক্তের দুঃখ মোচন করলেন জানকী। কাশি থেকে হনুমান বাহিত শিবকেও প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি। ‘বিশ্বনাথ স্বামীন’ নামে প্রসিদ্ধ হলো শিবলিঙ্গটি। একই সঙ্গে বিশালক্ষী নামে প্রতিষ্ঠা করেন এক দেবীকেও। অজ্ঞাত কোন কাল থেকে প্রচলিত আছে, আগে বিশ্বনাথ স্বামীন’ আর বিশালক্ষীকে পুজো করতে হবে, পরে পুজো দেওয়ার বিধি রামলিঙ্গেশ্বরম ও পর্বতবর্ধিনীকে।
পৌরাণিক এই কাহিনী নিয়েও মতান্তর আছে। এই দ্বীপে এলে রামচন্দ্রের মনে কোন আনন্দ ছিলনা। কারণ তিনি ব্রাহ্মণ হত্যা করেছেন এবং মন্দোদরী-সহ অন্যান্য রাক্ষস পত্নীদের চোখের জল হাহাকারে ব্যাকুল করে তুলেছিলেন লঙ্কাপুরিকে। তাই সাধুগণের সঙ্গে পরামর্শের পর স্থির করলেন সর্বপাপহরী মঙ্গল মূর্তি শিবের প্রতিষ্ঠা ও আরাধনা করে পাপমুক্ত হবেন। তিনি হনুমানকে পাঠালেন হিমালয় থেকে শিবলিঙ্গ জাগ্রত করে আনতে কিন্তু সময় পার হলেও হনুমান না ফেরায় লক্ষণ বালি দিয়ে একটি শিব তৈরি করলেন। রামচন্দ্র সেই শিবকে যথাবিধি অনুসারে প্রতিষ্ঠিত করলেন। রামের প্রতিষ্ঠা করার শিব বলেই তিনি রামেশ্বর।

জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করতে যারা রামেশ্বর তীর্থে আসেন, তারা দ্বীপের মধ্যে অবস্থিত রামঝাড়ুকায় যান। শক্তিশেলের আঘাতে লক্ষণকে বাঁচাতে বিশাল্যকরনীর খোঁজে হনুমান গন্ধমাদন পর্বত উপড়ে নিয়ে আসেন।
বিশাল্যকরনী প্রাণ বাঁচালো লক্ষণের গন্ধমাদনকে তখন ফেলে দেয়া হয় সমুদ্রগর্ভে। তাই থেকেই দ্বীপ। গন্ধমাদনের পতিত অংশই রামঝারুকা। রামেশ্বর মন্দির থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার। মন্দির মধ্যে পাথরে খোদাই শ্রীরামচন্দ্রের দুখানি চরণচিহ্ন।
১৫১০ খ্রিস্টাব্দে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য রামেশ্বরে রামলিঙ্গেশ্বর মহাদেব দর্শনে আসেন। এখান থেকেই তিনি চলে যান নীলাচলে রথযাত্রার আগে। মহাপ্রভুর মতো আচার্য শংকরের পদধূলিতে ধন্য হয়েছে রামেশ্বরের বালুকণা। হিন্দু ধর্মের পুনরুত্থান কল্পে আচার্য চারটি মঠ স্থাপন করেন ভারতের চার প্রান্তে। আচার্য শঙ্করের মঠটি নির্মিত রামেশ্বর মন্দিরের পাশেই।
১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে পাশ্চাত্য ভ্রমণ করে স্বামী বিবেকানন্দ এসেছিলেন সেতুবন্ধে রামেশ্বরমে। আধ্যাত্মবাদের উপরে একটি সুন্দর ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি এই মন্দিরে দাঁড়িয়ে। সেই ভাষণের একটি শিলালিপি রয়েছে তোরণ দ্বারে।১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দের ২৮ সেপ্টেম্বর শিলালিপিটি স্থাপন করেন তৎকালীন ভারতের রাষ্ট্রপতি ড. এস রাধাকৃষ্ণন। এভাবেই যুগ যুগ ধরে অগণিত ভক্ত, সাধক, মহাপুরুষদের আগমনে সর্বদাই আনন্দে মুখরিত রামেশ্বরমের আকাশ, বাতাস, সাগরের ঢেউ।।