অফিসে বসে লিখছিলাম। হঠাৎ ফোন—
অনি তুই কোথায় রে?
অফিসে। কেনো?
এখুনি একবার হাওড়া স্টেশনে চলে আয়।
কেনো? আপনার কিছু হয়েছে!
না। আমি সোমনাথ (শিল্পী সোমনাথ হোড়) আছি। তুই এখুনি চলে আয়।
বুঝলাম শক্তিদা (শক্তি চট্টোপাধ্যায়) কোথাও যাবেন, আমি চেলা। জলটা এনে দে, পেঁয়াজ এনে দে, লঙ্কা এনে দে। শঁসাটা একটু কুঁচিয়ে দে।
আমার পকেটে একটিও পয়সা নেই—
আমারও নেই, তাতে কি হয়েছে।
আমি তখন সবে মাত্র গ্র্যাজুয়েসন কমপ্লিট করেছি। কাঁচা মন। এদের সান্নিধ্যে এসে সব কিছু যেনো গিলে খাচ্ছি। আমার অবস্থা অনেকটা অপুর মতো। লোভও হচ্ছে তারপর ভাবলাম দুর যাবো না।
গেলাম।
স্টেশনের বড়ো ঘরির তলায় সোমনাথদা, শক্তিদা। আমায় দেখে সেমনাথদা হেসে ফেললেন।
আমি তো ভাবলাম তুই আসবি না।
দাদা ডাকলেন—
ওঃ সোমনাথ বেশি বকিস না। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুই আমার সঙ্গে আয়।
আমি পেছন পেছন, সামনে একটা সিগারেটের দোকানে গিয়ে বললেন ভাই একটা খালি সিগারেটের প্যাকেট দাও তো। ভদ্রলোক কেমনভাবে তাকালেন তারপর একটা খালি সিগারেটের প্যাকেট দিলেন।
একটা পেন হবে।
না।
পেন্সিল।
আছে।
দাও।
উনি কট কট করে শক্তিদার দিকে তাকিয়ে আছেন, পেন্সিলটা দিলেন। শক্তিদা খশ খশ করে লিখলেন,—
সোমনাথ, অনিকে পাঠালাম, ওর হাতে দুশোটা টাকা দাও, শান্তিনিকেতন যাবো পকেটে একটা পয়সাও নেই। টিকিট কাটবো না। তোমার লোকজনকে একটু বলে দিও। শক্তিদা।
আমার হাতে প্যাকেটটা দিয়ে বললেন, ছুটে চলে যা দোতলার ওই কোনের ঘরটায়। হাতে সময় বেশি নেই।
আমি মার টেনে ছুট।
সোমনাথদার (সেমনাথ মুখার্জী, এজিএম সাউথ ইস্টার্ন রেলওয়ে, এখন উনি রিটায়ার করেছেন) ঘরের সামনে আসতেই তার সিকুরিটি আটকালো, সব বললাম ভেতরে ফোন গেলো। প্রবেশাধিকার পেলাম। সিগারেটের প্যাকেটটা এগিয়ে দিলাম। সোমনাথদা ঠোঁটের তলা দিয়ে হাঁসলেন।
তুইও দাদার পাল্লায় পরেছিস, লিখিস টিকিস নাকি?
হ্যাঁ।
তুই একা না আর কেউ আছে?
সোমনাথদা আছেন।
আর্টিস্ট?
হ্যাঁ।
সেমনাথদা বেল বাজালেন, একজন ভেতরে এলেন। বললেন, শান্তিনিকেতনের তিনটে টিকিট আনুন।
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ পর ঘুরে এলেন। হাতে টিকিট। এই নে—মানি পার্টস থেকে একশো টাকার পাঁচটা নোট দিলেন।
জিনিসপত্র কেনা হয়েছে?
না।
যা সময় হয়ে গেছে। দৌড়ো।
আবার দৌড়।
হাঁপাতে হাঁপাতে এসে শক্তিদার সামনে দাঁড়ালাম। টাকাটা দিলাম। টিকিটটা দিলাম। শক্তিদা হাসলেন। দেখলি, এর নাম হচ্ছে শক্তি।
আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি।
মালের ঠেকাটা চিনিস?
চিনি।
যা তিনটে পাঁইট নিয়ে আয়। বাংলা। আর কিছু বলতে হবে।
না। ওখান থেকে কিনলে হতো না।
পাবি না। পৌঁছতে রাত হবে।
আমি গঙ্গার ধারে চলে এলাম। পাঁইট নিয়ে ফিরলাম। শক্তিদার মুখে সে কি হাসি, যেনো বিশ্বজয় করেছে।
ট্রেনে অনেক ঘটনা ঘটলো। শান্তিনিকেতন যখন পৌঁছলাম তখন আটটা বাজে।
স্টেশনের বাইরে এসে শক্তিদা রিক্সা ধরলেন। অনি তুই একা একটা রিক্সায় ওঠ, আমি আর সোমনাথ একটা রিক্সায়।
কিছু নেবেন না।
ঠিক মনে করেছিস।
আবার পকেট থেকে একশোটাকা বার করে দিলেন। আমি শসা, কলা, পেঁয়াজ, লেবু, লঙ্কা, আপেল, আঙুর কিনলাম। খিদে পেয়েছিলো। দুটো রুটি কিনে খেলাম। আমি একটা রিক্সায় জিনিসপত্র নিয়ে, আর সোমনাথদা শক্তিদা একটা রিক্সায়। পথ প্রদর্শক শক্তিদা। বেশ কিছুক্ষণ পর গ্রামের রাস্তায় চলে এলাম। একটা মাটির দেওয়াল খড়ের বাড়ির কাছে এলাম।
কিরে সোমনাথ দাদা মনে হয় নেই।
কি করে বুঝলি।
দেখছিস চারদিক অন্ধকার।
একবার ডেকে দেখ না।
রিক্সা ওয়ালাদের বললো, তোরা বাবা একটু দাঁড়া। যদি দাদা থাকে তোদের বিদায় করবো, না হলে ফিরে গিয়ে স্টেশনে পরে থাকবো।
শক্তিদা কাঁটা বাঁশের তৈরি গেটটা একটু ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। চারিদিক নিঝুম অন্ধকার। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। জনমানব শূন্য। দূরে কয়েকটা ঘর দেখা যাচ্ছে। সেখানে লম্ফের আলোর ক্ষীণ রেখা দেখতে পাচ্ছি।
কিঙ্করদা ও কিঙ্করদা আছো নাকি।
ভেতর থেকে শব্দ ভেসে এলো।
কে-রে, শক্তি এলি।
ফ্যাঁস ফেঁসে গলার আওয়াজ।
হ্যাঁ কিঙ্করদা।
দাঁড়া দাঁড়া যাচ্ছি।
চারিদিক অন্ধকার কেনো।
দুর আর বলিস না। মেয়াটা আজ আসে নি। কে লম্ফ জ্বালবে। অন্ধকারে শুয়ে আছি।
দরজা খুললো। কিঙ্করদা (রামকিঙ্কর বেইজ) বেরিয়ে এলেন। মাটির নিকোনো উঠোনে এসে দাঁড়ালেন।
ওরে বাবা তোর সঙ্গে আরো কে এসেছে মনে হয়।
হ্যাঁ সোমনাথ আছে। আর একে তুমি আগে দেখো নি।
ওটা আবার কে রে।
অনি।
সেটা আবার কে।
একটু আধটু লেখা লিখি করে।
পদ্যলেখে না গদ্যলেখে।
কি লেখে ওইই জানে।
বড়ো খারাপ রোগ। খেতে পাবে না। আয় আয় ভেতরে আয়।
আমরা ভেতরে এলাম। কিঙ্করদা একটা হেরিকেন জ্বাললেন।
আমরা একটা মাদুর পেতে বসলাম।
আমার কাছে আজ নেই।
আমি নিয়ে এসেছি।
বেশ করেছিস।
সবার খোঁজ খবর নিলেন। বুঝলাম শক্তিদা প্রায়ই কিঙ্করদার কাছে আসেন। সোমনাথদাও আসেন। কে বাদ আছে। আমি সর্বশেষ সংযোজন।
অনি যা ওগুলো রেডিকর।
কিঙ্করদা ওকে একটা বঁঠি দাও।
বঁঠি তো নেই একটা চাকু আছে। বাইরের জানলার ওপর।
যা হারিকেনটা নিয়ে গিয়ে খুঁজে নে।
আমি উঠে গেলাম। চারিদিকে স্কাল্পচার। কোনোটা ভাঙাচোড়া কোনোটা গোটা। একটা সাঁওতাল মেয়ের ফিগার দেখতে পেলাম। অসমাপ্ত। তাড়াহুড়ো করে আমার কাজ সারলাম। সব গুছিয়ে নিয়ে এলাম।
দেখেছো কিঙ্করদা, কেমন করিতকর্মা ছেলে।
কিঙ্করদা হো হো করে হেসে ফেললেন। বুঝলি শক্তি একটু মাংসো হলে ভালো হতো।
কোথায় পাওয়া যায় ওকে বলে দাও, ও ঠিক নিয়ে আসবে।
কিঙ্করদা আমার দিকে তাকালেন।
মনে মনে বললাম, পৃথিবীর যে প্রান্তেই পাওয়া যাক আমি নিয়ে আসবো। এমন একজন ব্যক্তিত্ব যাঁকে স্পর্শ করা যায় না, আর আমি কিনা তাঁর সামনে বসে আছি, উনি একটু মাংস খেতে চাইছেন আমি আনতে পারবো না।
তুই এই পাশের লালা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যা সামনে শবর পাড়া পরবে। দেখবি ওরা মাংস পোরাচ্ছে। দুটো পয়সা দিয়ে নিয়ে আয়। আমার কাছে যে সাঁওতাল মেয়েটা থাকে, ও থাকলে তোকে কষ্ট দিতুম না।
আমি বেরিয়ে এলাম। ওই নিঝুম অন্ধকারে শবরপাড়া থেকে মাংসো নিয়ে এলাম।
আমাকে দেখে কিঙ্করদার মুখে শিশু সুলভ হাঁসি।
দে দে শক্তি ওকে একটু দে।
ও এসব ধেনো খায় না।
ধেনো না খেলে লেখা বেরোবে না। যা-তো বাবা ওখান থেকে রং-এর আর একটা ভাঁড় নিয়ে আয়।
তাকিয়ে দেখলাম তিনজনে কিঙ্করদার ছবি আঁকার রং-এর ভাঁড়ে বাংলা ঢেলে খাচ্ছে। আমি উঠে গিয়ে একটা ভাঁড় নিয়ে এলাম। কিঙ্করদা নিজের বোতল থেকে আমাকে একটু ঢেলে দিলেন। চারিদিক ম ম করছে গন্ধ। মাথা ধরে যাবার অবস্থা।
শুরু হলো কবিতা দিয়ে আলোচনা চললো অনেক রাত পর্যন্ত। শেষ হলো স্কাল্পচারে এসে। আমার মাথায় কিছু ঢুকলো কিছু ঢুকলো না, কপালে ধাক্কা খেয়ে মাথার ওপর দিয়ে চলে গেলো। যেটুকু বুঝলাম তাতে মনে হলো তিনজনের শৈল্পিক স্বত্তার আদান প্রদান হচ্ছে। আমি যেনো সঙ্গমে ডুব দিয়েছি। তল খুঁজে পাচ্ছি না। তখন মোবাইলের যুগ নয় যে ক্যামেরা বন্দি করে রাখবো। একে একে তিনজনে বেহুঁশ হয়ে ওই ঘরে শুয়ে পরলো। আমি একা।
অনেকক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে ঠায় বসে রইলাম। হ্যারিকেনটা দপ দপ করে নিভে গেল। বুঝলাম তেল নেই। অন্ধকার হাতড়ে লম্ফ জাললাম। লম্ফের আলো সাপের শরীরে মত লক লক করে কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা আলো ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এক মায়াবী অন্ধকার আমার শরীর মনকে গ্রাস করলো। বার বার কানের কাছে তিনজনের কথা ভেসে আসছে। বাইরের বারান্দায় এসে একটা মাদুর জোগাড় করে শুয়ে পরলাম। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে।
কখন ঘুমিয়ে পরেছি জানি না। হঠাৎ মশার কামরে ঘুম ভাঙল। চোখে একটা লম্ফের শিখা এসে পড়েছে। এঁকে বেঁকে থিরি থিরি কাঁপছে। সামনে একজন বসে।
ভয় পেয়ে উঠে বসলাম।
কে ওখানে! এই গভীর রাতে—
সম্বিত ফিরতে দেখলাম কিঙ্করদা। সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় সেই নগ্ন সাঁওতাল মেয়েটার অসমাপ্ত শরীরে মাটির প্রলেপ দিচ্ছেন। চোখ স্থির। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য। ধ্যানমগ্ন কোনও মহাপুরুষ। লম্ফের আলো থিরি থিরি কাঁপছে। আমার চোখের পলক পরে না। অনেকক্ষণ বসে বসে মাটির প্রলেপ দেওয়া দেখলাম। কি যত্ন নিয়ে স্নেহের পরশে কিঙ্করদা মাটির প্রলেপ দিচ্ছেন। নিটোল বুকে মাটির প্রলেপ দেন আর অবাক হয়ে কিছুক্ষণ মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। বোঝার চেষ্টা করেন মেয়েটা কতটা লজ্জা পেল। বুক থেকে পেট ধীরে ধীরে শরীরের নিম্নাংশের অবয়ব নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুললেন। মনে হলো মেয়েটা কিঙ্করদার হাতের পরশে কেঁপে কেঁপে উঠছে। যেন লজ্জা পাচ্ছে। মেয়েটার নুয়ে পড়া চোখেমুখে অদ্ভূত এক লজ্জার প্রতিচ্ছবি। ওই ঘুট ঘুটে অন্ধকারে লম্ফের ওই লকলকে শিখায় আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
আমি স্থানুর মত কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। লম্ফের শিখা কাঁপছে। সেই কাঁপা কাঁপা আলোর শিখা ছড়িয়ে পরছে নগ্ন সাঁওতাল মেয়েটার সারাটা অবয়বে। ভাললাগা ভালবাসার রং মেশা মিশি হয়ে একাকার।
অসাধারন। অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে পড়লাম যা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই।
আমি এটা নিয়ে প্রায় ১০ বার পরলাম, প্রত্যেকবার মোহ জেগে ওঠে নতুন করে, অদ্ভুত প্রাণ আছে আপনার লেখাতে ????????
এবার এখানে কমেন্ট করা যেতে পারে
কি গভীর উপলব্ধি। এমন করে কে ভেবেছে! ❤️
মুগ্ধ হলাম।
Jyoti Bandopadhyay had an opportunity to make a memorable journey. That was besically a pilgrimage for him. He saw Ramkinkar in the mood of devine madness.
And finally this extraordinary write-up!
সত্যি সাত্যকি আমি ঈশ্বরের সান্নিধ্যে কিছুটা মুহূর্ত কাটিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই মুহূর্তটাকে ধরে রাখার জন্য আমার কাছে কোন সরঞ্জাম ছিলনা। তাই মন, স্মৃতি দিয়ে সেই মুহূর্তটুকু ধরে রেখেছি।
হ্যাঁ ঠিক বলেছেন, এখনও সেই স্মৃতিটুকু আঁকড়ে ধরে রয়েছি। আর একটা জিনিস উপলব্ধি করেছিলাম নিবেদিত প্রাণ, একশোভাগ নিবেদিত প্রাণ না হলে আপন সৃষ্টির মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
অদ্ভুত লেখা। প্রথমবার পড়লাম। আপ্লুত।
প্রণাম, ভালো থাকবেন, আমাদের সঙ্গে থাকুন।
কিছু জায়গায় বানান ভুল আছে, জানিনা এটা নেটওয়ার্ক এর কারণে না অন্য কিছুর জন্য, কিন্তু অনবদ্য।
সুপ্রভাত, ভালো থাকুন। অনবদ্য কিছু আরো পোস্ট করে আমাদের মতো প্রবাসী দের আরো ভালো রাখুন।
প্রণাম নেবেন।
দেবকুমার, আপনিও ভালো থাকবেন, সময়পাইনা লেখার তার মধ্যেও লেখার চেষ্টা করি। খুঁজলে আরও অনেক ভালো লেখা কিন্তু আছে। পড়তে পারেন।
এক কথায় তুলনাহীন। এমন গদ্য অনেক দিন পড়িনি।
প্রণাম
একটা খুব ভাল লেখা পড়লাম।।
যতবার পড়ি, ততবারই নতুন লাগে।
অনেক ধন্যবাদ জ্যোতি’দা।
কি দারুণ লিখেছেন। একেবারে স্পষ্ট যেন দেখা যাচ্ছে পুরো জার্নিটা। আন্তরিক শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি
হ্যাঁ, দেবতাদের সান্নিধ্য পেয়েছি। তখন কাঁচা বয়েস, অত বুঝতাম না। এখন স্মৃতি ঝারা দিলে ঝরঝর করে অনেক কিছু বেরিয়ে আসে।
Remarkable experience ta ke apni apnar upanyas e dhukiye niye take lifetime memorable korechen!!!salute to you!!!
তা ঠিক। লোভ সামলাতে পারি নি।