| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ভক্ত-হৃদয়ের বাঞ্ছাপূরণ : প্রণবেশ চক্রবর্তী

Reporter
প্রণবেশ চক্রবর্তী / ১৬৪৬ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

১৮৬৮ সাল। বাংলা ১২৭৫ সালের আশ্বিন মাস। হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায় তাঁর সিহড় গ্রামের বাড়িতে সে বছর দুর্গাপূজা করবেন বলে স্থির করেছেন। তাই হুগলি জেলার ওই গ্রাম থেকে তিনি অনেক আশায় বুক বেঁধে দক্ষিণেশ্বরে এসেছেন শ্রীরামকৃষ্ণকে পরম সমাদরে আমন্ত্রণ জানাতে। তিনি পূজায় উপস্থিত না হলে মাতৃপূজার সব আনন্দই ম্লান হয়ে যাবে।

অবতারবরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণের মহাজীবন-লীলায় তাঁর ভাগ্নে হৃদয়রাম এক বিশিষ্ট ভূমিকায় উদ্ভাসিত। দোষে গুণে গড়ে ওঠা এই মানুষ অবতার-জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সিহড় গ্রামের দুর্গাপূজা প্রসঙ্গে যাওযার আগে আমরা দক্ষিণেশ্বর-মন্দির কাহিনীর ঘটনাবলী একটু স্মরণ করে নিতে পারি।

১৮৫৫ সালের ৩১ মে জানবাজারের অশেষ পুণ্যবতী রানী রাসমণি দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীর মন্দির প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক কাজ সুসম্পন্ন করেন। সেদিন ছিল বাংলা ১২৬২ সালের ১৮ জ্যৈষ্ঠ—পুণ্য স্নানযাত্রার দিন। রানীমা এই মন্দিরের পূজকপদে নিযুক্ত করেছিলেন কামারপুকুর গ্রামের নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের জ্যৈষ্ঠপুত্র এবং শ্রীরামকৃষ্ণের অগ্রজ রামকুমার চট্টোপাধ্যায়কে। রামকুমারের সঙ্গেই এই মন্দিরে আসেন গদাধর। তাঁর দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে আসার মাত্র কয়েকদিন পরেই জীবিকার সন্ধানে বর্ধমান হয়ে হৃদয়রাম এসে উপস্থিত হন দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে। সেই থেকে তিনি দিনে-রাতে ছায়ার মত মামার সঙ্গে অবস্থান করতে থাকেন। বস্তুত, শ্রীরামকৃষ্ণের ৫১ বছরের নরলীলায় হৃদয়রাম ১৮৫৫ থেকে ১৮৮১ সাল—অর্থাৎ প্রায় ২৬ বছর ছিলেন মামার সর্বক্ষণের সঙ্গী। সেদিক থেকে তিনি ছিলেন এক দুর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী। কারণ, শ্রীরামকৃষ্ণের অন্য কোন আত্মীয়-স্বজন বা অন্য কোন লীলা পার্ষদও এত দীর্ঘকাল তাঁর পুণ্যসঙ্গ লাভ করার সুযোগ পাননি সেইজন্য মামার উপর তাঁর দাবিটাও বেশি। নিজের বাড়িতে তিনি দুর্গাপূজা করবেন—তারজন্য মামার কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা যেমন তাঁর প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পূজার ক’দিন মামাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া। তাই তো তিনি অনেক আশা নিয়ে দক্ষিণেশ্বরে ছুটে এসেছেন।

মামা-ভাগ্নের সম্পর্ক তো সেই ছোটবেলা থেকেই। শ্রীরামকৃষ্ণের পিসিমা রামলীলাদেবীর একমাত্র কন্যা হেমাঙ্গিনীদেবীর তৃতীয় পুত্রের নাম হৃদয়রাম। অন্য ভাইরা হলেন রামরাঘব, রামচরণ এবং রাজারাম। রাজারামই কনিষ্ঠ। তাঁদের পিতার নাম কৃষ্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। বাঁকুড়া জেলার সিহড় (শিহড়?) গ্রামে ১৮৪০ সালে হৃদয়রামের জন্ম। তাঁদের কোন বোন ছিল না। এই সিহড় গ্রামেই ছিল জননী সারদামণির মামাবাড়ি। পিসতুতো বোনের পুত্র হিসেবেই হৃদয়রাম সম্পর্কে ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের ভাগ্নে।

এই সিহড় গ্রামে পিসতুতো বোন হেমাঙ্গিনীর বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ শৈশবে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। সেই সময় এবং সুবাদে প্রায় সমবয়সী ভাগ্নে হৃদয়রামের সঙ্গে তাঁর একা আন্তরিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল—যার সূত্র ধরেই হৃদয়রাম জীবিকার অন্বেষণে একদিন দক্ষিণেশ্বরে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া বর্ণনা থেকে দেখা যাচ্ছে, হৃদয়রামের দেহ ছিল দীর্ঘাকৃতি। তিনি ছিলেন সুপুরুষ, বুদ্ধিমান ও সাহসী। মামার দুশ্চর সাধনকালে তিনি ছিলেন তাঁর মামার প্রধান সহচর ও রক্ষক। তিনিই ছিলেন সেবক ও সহায়ক। দক্ষিণেশ্বর মন্দির যে বছর প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই বছরই মাত্র ১৫/১৬ বছর বয়সে হৃদয়রাম একা কাজের সন্ধানে দক্ষিণেশ্বরে আসেন। তিনি লোকমুখে শুনেছিলেন, তাঁর মামারা এখানে আছেন। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনীকাররা মনে করেন, হৃদয়রাম সর্বক্ষণ ছায়ার মত সঙ্গে সঙ্গে না থাকলে কঠোর সাধনায় আত্মমগ্ন শ্রীরামকৃষ্ণের শরীরকে বাঁচানোই যেত না।

সেই হৃদয়রাম নিজের প্রথমা স্ত্রী বিয়োগের পর নিজের বাড়িতে দুর্গাপূজা করবেন স্থির করেছেন। এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই শ্রীরামকৃষ্ণের সম্মতিও পেয়েছেন। কিন্তু যদি তাঁর মামা সেই পূজায় উপস্থিত না হন, তাহলে দুর্গাপূজা করার কোন সার্থকতাই নেই তাঁর কাছে। হৃদয়রাম শ্রীরামকৃষ্ণের চাইতে বয়সে প্রায় চার বছরের ছোটো, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই দু’জনে সমবয়সীর মত মেলামেশা করতেন। বাল্যকালে শ্রীরামকৃষ্ণ যখন হৃদয়দের গ্রাম সিহড়ে বেড়াতে যেতেন, তখন থেকেই দু’জনের মধ্যে খুব ভাব। তিনি তাঁর সহচর-ভাগ্নেকে আদর করে কখনও ‘হৃদে,’ কখনও ‘হৃদু’ বলে ডাকতেন, অন্যদিকে হৃদয় তাঁকে ‘মামা’ বলেই সম্বোধন করতেন।

সেই হৃদয়ের বাড়িতে দুর্গাপূজা হবে, শ্রীরামকৃষ্ণ কি না গিয়ে থাকতে পারেন? আবার যাবেনই বা কি ভাবে? জানবাজারের রাজবাড়িতে দুর্গাপূজা। রানী রাসমণির জামাতা মথুরবাবুর বাসনা, পূজার ক’দিন তিনি জানবাজারেই থাকুন। মথুরবাবু শ্রীরামকৃষ্ণকে গুরুর মতই শ্রদ্ধা-ভক্তি করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ পড়লেন উভয় সঙ্কটে।

দুই

একদিন দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরে শ্রীরামকৃষ্ণ য়খন নিজের ভাবে কালীপূজায় মগ্ন ছিলেন, সেই সময় সেখানে মথুরনাথ বিশ্বাস এবং হৃদয়রাম গিয়ে উপস্থিত হন। হঠাৎই শ্রীরামকৃষ্ণ পূজার আসন থেকে উঠে এসে হৃদয়রামের হাত ধরে সেই আসনে বসিয়ে দেন। তারপর মথুরনাথকে বলেন, “আজ থেকে হৃদয় পূজা করবে। মা বলেছেন, আমার পূজার মত হৃদয়ের পূজাও তিনি গ্রহণ করবেন।”

শ্রীরামকৃষ্ণের এই কথা মথুরনাথের কাছে ছিল দৈবাদেশ। তিনি সেইদিন থেকে হৃদয়কে কালীপূজার ভার অর্পণ করেন। আর সেদিন থেকেই শ্রীরামকৃষ্ণ পূজার কাজ থেকে অব্যাহতি পান।

কিন্তু পূজার কাজ ছাড়ার পর দেখা দিল অন্য সমস্যা। শ্রীরামকৃষ্ণ দিনরাত সাধন-ভজনে মত্ত হয়ে গেলেন—শরীরের প্রতি তাঁর কোন খেযালই থাকত না। একটানা নিদ্রাহীনতা এবং দেহের সর্ব অঙ্গে প্রচণ্ড জ্বালা দেখা দিল। তবে কি এটা বাযুরোগ? চিন্তিত হলেন মথুরবাবু। তিনি নানাপ্রকার চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন, কিন্তু তাতে কোন ফল হল না। শ্রীরামকৃষ্ণের মন সদাই দিব্যভূমিতে অবস্থান করছে—সেখান থেকে মনকে এই মাটির পৃথিবীতে নামিয়ে আনা যায় কিভাবে? মথুরবাবু এ নিয়ে শলাপরামর্শ করলেন হৃদয়রামের সঙ্গে। শেষপর্যন্ত হৃদয়ের পরামর্শে শ্রীরামকৃষ্ণের মনকে দিব্যভূমি থেকে নামাবার জন্য একটা উপায় ঠিক করা হল, ঠিক করা হল, শ্রীরামকৃষ্ণের মনে প্রলোভন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একজন সুন্দরী মহিলাকে নিযুক্ত করা হবে। করা হলও তাই। কিন্তু দেব চরিত্রের অধিকারী শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে এই কৌশল অনিবার্যভাবেই ব্যর্থ হয়।

শ্রীরামকৃষ্ণের অধ্যাত্ম সাধনার পরবর্তী প্রতি পদক্ষেপেই সাক্ষী ও সহযোগী ছিলেন হৃদয়রাম। ১৮৬১ সালে ভৈরবী ব্রাহ্মণীর কাছে তন্ত্রসাধনা, ১৮৬৩ সালে দাস্য ও মধুর ভাবের সাধনা এবং ১৮৬৪ সালে তোতাপুরীর কাছে সন্ন্যাসগ্রহণ—প্রতি ক্ষেত্রেই হৃদয় উপস্থিত। শুধু তাই নয়, শ্রীরামকৃষ্ণ পঞ্চবটী তৈরি করেছিলেন হৃদয়ের সাহায্যেই।

শ্রীরামকৃষ্ণরূপ মহাজীবনে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই, পরবর্তীকালে শ্রীরামকৃষ্ণ যখন স্বগ্রাম কামারপুকুরে অবস্থান করছিলেন, তখনও হৃদয়ের অনুরোধে তাঁদের সিহড়ের বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ বেড়াতে গিয়েছিলেন। এই সময় সিহড় ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের অনেক বৈষ্ণবের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের পরিচয় ঘটেছিল এবং এ ব্যাপারে হৃদয়ের আগ্রহ ছিল অপরিসীম। হৃদয়ের মা হেমাঙ্গিনীদেবীও শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখে মুগ্ধ হন। বিশেষ করে তিনি তাঁর সম্পর্কিত ভাই-এর মধ্যে মহাভাব প্রত্যক্ষ করেন, যদিও সেই ভাই বয়সে ছোটো—তবুও তিনি ফুলচন্দন দিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের চরণপূজা করেন এবং কাশীতে যেন তিনি দেহত্যাগ করতে পারেন, সেই বর লাভ করেন।

হৃদয়রাম শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বক্ষণের ও সর্বকর্মের সঙ্গী। ১৮৬৮ সালে মথুরবাবুর সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ যখন কাশী সহ অন্যান্য তীর্থ দর্শনে গিয়েছিলেন, তখন হৃদয়রাম ছিলেন সঙ্গে। আবার শ্রীরামকৃষ্ণ যখন কাশীর চলমান শিব তৈলঙ্গস্বামীকে দর্শন করতে যান, তখনও হৃদয়রাম ছিলেন সঙ্গে। সেইসময় একদিন মণিকর্ণিকা ঘাটের কাছে শ্রীরামকৃষ্ণ যখন নৌকায় বিহার করছিলেন, তখন হঠাৎই তিনি দাঁড়ানো অবস্থায় শিবদর্শন করে সমাধিস্থ হয়ে গঙ্গায় পড়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ঠিক সময়ে হদয়রাম তাঁকে ধরে ফেলায় সেই বিপদ আর ঘটতে পারেনি।

শ্রীরামকৃষ্ণের তীর্থ পরিক্রমায় সদাই সঙ্গী হৃদয়রাম। বৃন্দাবনে নিধুবনের কাছে বৃদ্ধা তাপসী গঙ্গামায়ীর সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের পরিচয় হওয়ায় গঙ্গামায়ী তাঁকে বৃন্দাবনেই রাখতে চেয়েছিলেন এবং শ্রীরামকৃষ্ণও সেই প্রস্তাবে এককথায় রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিদায়কালে হৃদয় তাঁকে ফিরিয়ে আনার জন্য হাত ধরে টানাটানি করতে থাকেন, অন্যদিকে গঙ্গামায়ীও শ্রীরামকৃষ্ণকে বৃন্দাবনেই ধরে রাখার উদ্দেশ্যে তাঁর হাত ধরে টানাটানি করতে থাকেন। হৃদয়রাম এই টানাটানিতে সুবিধে করতে না পেরে, বিশেষ করে তিনি যখন বুঝলেন, শ্রীরামকৃষ্ণও বৃন্দাবনেই থেকে যেতে চান, তখন তিনি মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। পরম মাতৃভক্ত শ্রীরামকৃষ্ণকে তিনি স্মরণ করিয়ে দিলেন দক্ষিণেশ্বরে তাঁর গর্ভধারিণী মাতা চন্দ্রমণি তাঁরই মুখ চেয়ে অপেক্ষা করে আছেন, সঙ্গে সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে ভাবান্তর দেখা দিল। তিনি বৃন্দাবনের মায়া কাটিয়ে আবার দক্ষিণেশ্বরে ফিরে আসেন।

১৮৭০ সালে মথুরবাবু ও হৃদয়ের সঙ্গেই শ্রীরামকৃষ্ণ বৈষ্ণব তীর্থ কালনা ও নবদ্বীপ দর্শনে গিয়েছিলেন। তীর্থপরিক্রমা থেকে ফিরে আসার কিছুদিন পরেই হৃদয়ের স্ত্রী দেহত্যাগ করেন। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। এই ঘটনায় হৃদয়ের মনে সাময়িক একটা বৈরাগ্যের ভাব দেখা দেয়। তারপর থেকেই মা ভবতারিণীর পূজা-অর্চনায় তিনি গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। শুধু তাই নয়, সংসারের অসারতা সম্পর্কেও তাঁর মনে কতকগুলি ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায়। অবশ্য সব কিছুই ছিল সাময়িক। তিনি মামাকে অনুসরণ করে মাঝে মাঝে পরনের কাপড় খুলে রেখে ও পৈতা সরিয়ে দিয়ে ধ্যান করতে শুরু করেন। একদিন তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে নিজস্ব আধ্যাত্মিক উপলব্ধির জন্য প্রার্থনা জানালেন। শ্রীরামকৃষ্ণ শুনেও না শোনার ভান করলেন, রইলেন উদাসীন। কিন্তু হৃদয় নাছোড়বান্দা—একটানা কাকুতি-মিনতি করতে থাকেন। শেষপর্যন্ত শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, “দেখ হৃদয়, মায়ের ইচ্ছা হলেই সব হবে।”

প্রকৃতপক্ষে এই সমযায় হৃদয় এক ভিন্ন জগতে চলে যান—সদাই পূজা ও ধ্যানের সময় অর্ধবাহ্যদশায় তিনি নানারকম দেব-দেবীর মূর্তি দর্শন করতে থাকেন।

সেই সময়ই একদিন এক অদ্ভূত কাণ্ড ঘটলো।

সেদিন রাত্রে হৃদয়রাম দেখলেন, মামা হঠাৎ শয্যাত্যাগ করে পঞ্চবটীর দিকে যাচ্ছেন। মামার যদি কোনও প্রয়োজন হয়—সে কথা ভেবে হৃদয়রাম গাড়ু ও গামছা নিয়ে চুপচাপ মামার পিছনে পিছনে হাঁটতে লাগলেন। কিছুদূর যেতে না যেতেই হৃদয়রাম এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে অবাক-বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি দেখলেন, শ্রীরামকৃষ্ণ আর স্থূল রক্তমাংসের দেহধারী সাধারণ মানুষ নন, তাঁর দেহ থেকে এক অপূর্ব জ্যোতি বেরিয়ে আসছে। সেই জ্যোতিতে পঞ্চবটী হয়ে উঠেছে আলোকিত। শুধু তাই নয়, হৃদয় লক্ষ্য করে দেখলেন, শ্রীরামকৃষ্ণের জ্যোতির্ময় পদযুগল ভূমি স্পর্শ করছে না—শূন্যপথে তিনি এগিয়ে চলেছেন।

এমন অভাবিত দৃশ্য দেখে হৃদয়রাম প্রথমে ভাবলেন, তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়েছে, তিনি সব ভুল দেখছেন। তাই বারবার নিজের দুই চোখ রগড়ে নিয়ে গঙ্গা নদী, কুটির ইত্যাদি সব চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলেন, না, চারপাশের গাছপালা ইত্যাদি সবই তো তিনি ঠিক ঠিক দেখছেন। এবার নিজের দৃষ্টিশক্তির উপর বিশ্বাস ফিরে এল। তিনি যতবার মামার দিকে তাকাচ্ছেন, ততবারই একই দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন।

তখন বিস্মিত হৃদয় কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে ভাবতে থাকেন, তাহলে আমার মধ্যেও কি কোন পরিবর্তন ঘটছে, যার জন্য আমি এরকম অদ্ভূত দৃশ্য দেখতে সক্ষম হচ্ছি। এ-কথা ভাবতে ভাবতেই তিনি নিজের দেহের দিকে তাকালেন এবং নিজেকে দেখে চমকে উঠলেন। তিনি দেখলেন, তিনিও দিব্যদেহধারী জ্যোতির্ময় দেবানুচর। তাঁর মনে হল, তিনিও শ্রীরামকৃষ্ণের “জ্যোতিঃঘন—অঙ্গসম্ভূত অংশবিশেষ” এবং শ্রীরামকৃষ্ণের সেবার জন্যই তিনি ভিন্ন শরীর ধারণ করে পৃথক অস্তিত্ব নিয়ে অবস্থান করছেন। এইসব দেখেশুনে এবং স্বীয় জীবনের এই রহস্য হৃদয়ঙ্গম করে হৃদয়ের অন্তরে আনন্দের প্রবল বন্যা বয়ে গেল। তিনি ভুলে গেলেন নিজেকে, ভুলে গেলেন সংসার-জগৎকে, পৃথিবীর মানুষ যে তাঁকে পাগল ভাবতে পারে, সে-কথাও ভুলে গেলেন—সবকিছু ভুলে গিয়ে অর্ধবাহ্যদশায় তিনি চিৎকার করে বারবার বলতে থাকেন, “ও রামকৃষ্ণ, ও রামকৃষ্ণ, আমরা তো মানুষ নই, আমরা এখানে কেন ? চল দেশে দেশে যাই, জীবোদ্ধার করি। তুমি যা, আমিও তাই-ই।”

এই ঘটনার কথা উল্লেখ করে শ্রীরামকৃষ্ণ পরবর্তীকালে বলতেন, “তাকে ওইরকম চিৎকার করতে শুনে বললাম, ওরে থাম, থাম, অমন বলছিস কেন, কি একটা হয়েছে ভেবে এখনই লোকজন সব ছুটে আসবে।” কিন্তু কে কার কথা শোনে? হৃদয়রাম উন্মত্তের মত চিৎকার করেই চলেছেন। তখন তাড়াতাড়ি শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর কাছে এসে হৃদয়রামের বুক স্পর্শ করে বললেন, “দে, মা, শালাকে জড় করে দে।”

এই ঘটনার কথা স্মরণ করে হৃদয়রাম পরে বলেছেন, শ্রীরামকৃষ্ণ যে-ই বললেন, “দে, মা, শালাকে জড় করে দে,” অমনি তাঁর ওই অলৌকিক দর্শন ও আনন্দ কোথায় যেন লুপ্ত হয়ে গেল এবং তিনি আগে যেমন ছিলেন, তেমনই হয়ে গেলেন। ওইরকম অপূর্ব আনন্দ থেকে সহসা বিচ্যুত হয়ে তাঁর মন বিষাদে পূর্ণ হয়ে গেল। তিনি কাঁদতে কাঁদতে শ্রীরামকৃষ্ণকে বলতে থাকেন, “মামা, তুমি কেন অমন করলে, কেন জড় হতে বললে, ওইরকম দর্শনের আনন্দ আর আমার হবে না।”

শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে বুঝিয়ে বললেন, সামান্য দর্শন লাভ করেই তুই যে গোলমাল শুরু করে দিলি, তাই তো আমাকে ওরকম বলতে হল। আমি যে চব্বিশ ঘণ্টা কত কি দেখি, আমি কি ওরকম গোলমাল করি ? তোর এখনও ওরকম দর্শন করার সময় হয়নি, এখন স্থির হয়ে থাক, সময় হলে আবার কত কি দেখবি।

কিন্তু কার কথা কে শোনে ? হৃদয়রাম তাঁর অহংকার ত্যাগ করতে পারলেন না। তাই, শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশে তেমন কোন কাজও হল না। তিনি ভাবলেন, যে ভাবেই হোক, ওরকম দর্শন লাভের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। হৃদয়রাম ধ্যানজপের মাত্রা বাড়িয়ে দিলেন এবং রাত্রে শ্রীরামকৃষ্ণ যেখানে বসে আগে ধ্যানজপ করতেন, পঞ্চবটীর সেই জায়গায় গিয়ে তিনিও মা জগদম্বাকে ডাকবেন—স্থির করলেন।

একদিন গভীর রাতে হৃদয়রাম শয্যাত্যাগ করে সটান চলে গেলেন পঞ্চবটী তলে। তারপর শ্রীরামকৃষ্ণের আসনে বসে ধ্যান করতে উদ্যত হলেন। ওদিকে কিছুক্ষণ পরে শ্রীরামকৃষ্ণও কি ভেবে পঞ্চবটীর দিকে এগিয়ে চললেন। সেখানে পৌঁছতে না পৌঁছতেই তিনি হৃদয়রামের আর্ত চিৎকার শুনতে পেলেন, “মামা গো পুড়ে মরলাম, পুড়ে মরলাম।” শ্রীরামকৃষ্ণ তাড়াতাড়ি হৃদয়ের কাছে গিয়ে উপনীত হলেন, জানতে চাইলেন, হৃদয় ওরকম চিৎকার করছেন কেন? উত্তরে মা দগ্ধ হৃদয়রাম বললেন, “মামা, এখানে ধ্যান করতে বসামাত্র কে যেন এক মালসা আগুন গায়ে ঢেলে দিল, অসহ্য দাহ যন্ত্রণা হচ্ছে।”

শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর ভাগ্নের দেহে হাত বুলিয়ে দিলেন, বললেন, “যা, ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। তুই কেন এরকম করিস বলতো? তোকে বলেছি, আমার সেবা করলেই তোর সব হবে।” এরপর হৃদয়রাম আর কোনওদিন পঞ্চবটীতে ধ্যান করতে যাননি। তিনি বুঝলেন, মামার কথা মেনে না চললে তাঁর বিপদ হবে।

মোট কথা, শ্রীরামকৃষ্ণের কথায় হৃদয়রাম অনেকটা শান্তিলাভ করলেও আগের জীবনে তিনি আর ফিরে আসতে পারছিলেন না। অর্থাৎ, ভবতারিণী মন্দিরের পূজাপাঠে তিনি আর মন লাগাতে রাজি হচ্ছিলেন না। তাঁর মনটা দারুণ রকম চঞ্চল হয়ে উঠেছিল।

সেই সময় তাঁর মন নতুন কোন কর্মের মাধ্যমে নতুন করে আনন্দের সন্ধানে ব্যাপৃত ছিল। কিন্তু কি সে কর্ম? সেই সময়টা ছিল বাংলা ১২৭৫ সাল। আশ্বিন মাস সমাগত। তাই হঠাৎই তিনি ঠিক করে ফেললেন, তাঁর গ্রামের বাড়িতে তিনি এ বছরই শারদীয় দুর্গাপূজার আযোজন করবেন। কিন্তু মামাকে না পেলে পূজার সব আনন্দই যে মাটি হয়ে যাবে।

তিন

তাই তিনি সিহড় থেকে দক্ষিণেশ্বরে এলেন মামাকে নিয়ে যেতে। আমরা যে-সময়ের কথা বর্ণনা করছি, তার আগেই হৃদয়রামের জ্যেষ্ঠ বৈমাত্রেয় ভ্রাতা গঙ্গারামের মৃত্যু হয়েছে। আর হৃদয়রামের জ্যেষ্ঠ সহোদর রামরাঘব মথুরবাবুর জমিদারিতে খাজনা আদায়ের কাজে নিযুক্ত থেকে বেশ দু’পয়সা উপার্জন করছেন। আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায়, তাঁদের সিহড়ের বাড়িতে এক নতুন চণ্ডীমণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে।

এই নতুন চণ্ডীমণ্ডপ যখন তৈরি হচ্ছিল, তখনও জ্যেষ্ঠ বৈমাত্রেয় ভাই গঙ্গানারায়ণ বেঁচেছিলেন। তিনি তখনই এরকম বাসনা প্রকাশ করেছিলেন যে, চণ্ডীমণ্ডপ তৈরি হয়ে গেলে সেখানে জগদম্বাকে এনে বসাবেন। কিন্তু তাঁর সেই মনোবাসনা পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে পৃথিবী থেকে চলে গেলেন। তাই হৃদয়রাম জ্যেষ্ঠ বৈমাত্রেয় ভাইয়ের মনোবাসনা পূর্ণ করার কাজে এগিয়ে এলেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ সবকিছু শুনে হৃদয়রামকে শারদীয় দুর্গাপূজা আয়োজনের ব্যাপারে নানাভাবে অনুপ্রাণিত করলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বুঝেছিলেন, হৃদয়ের অস্থির কর্মী হৃদয় এই দুর্গাপূজার মাধ্যমে শান্তিলাভ করবে। তাই, তিনি এককথায় এ পূজায় সম্মতি দিলেন।

কিন্তু বিপদ বাঁধালেন মথুরবাবু। তিনি পূজার সময় কিছুতেই শ্রীরামকৃষ্ণকে যেতে দেবেন না। শ্রীরামকৃষ্ণ মথুরবাবুর মনে কষ্ট দিতে রাজি হলেন না। তবে মথুরবাবু হৃদয়রামের দুর্গাপূজায় আর্থিক সহায়তা করতেও বিলম্ব করলেন না। মোট কথা, মথুরবাবু স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন, সিহড় গ্রামে দুর্গাপূজা করতে যে টাকা পয়সা খরচ হবে, তা’ তিনি দিতে প্রস্তুত আছেন, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণকে যেতে দিতে রাজি নন।

শ্রীরামকৃষ্ণ পড়লেন উভয় সঙ্কটে। আর হৃদয়রামের যাবতীয় উৎসাহ এক মুহূর্তেই স্তিমিত হয়ে গেল। মামা যখন যাবেনই না—তখন ক্ষুণ্ণ হৃদয়ে হৃদয়রাম ঠিক করলেন, একাই দেশে ফিরে যাবেন। পূজার তো আর বেশি দেরি নেই।

বিষণ্ণ বদনে হতাশ হৃদয়রাম দেশে ফিরে যাচ্ছেন দেখে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে পরম আদরে অনেক সান্ত্বনা দিলেন, অনেক কিছু বোঝালেন। তারপর বললেন, “তুই শুধু শুধু দুঃখ করছিস কেন? আমি প্রতিদিনই তোর পূজায় উপস্থিত থাকব—তবে স্থূল দেহে নয়, সূক্ষ্ম শরীরে। যখনই সূক্ষ্ম শরীরে আমি তোর পূজা দেখতে যাব—তখন আমাকে আর কেউ দেখতে পাবে না, কিন্তু তুই স্পষ্টই দেখতে পাবি।”

মামার এ-সব কথাবার্তা শুনে হৃদয়রাম কিছুটা শান্ত ও ধাতস্থ হলেন। এবার শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর প্রিয় ভাগ্নেকে পূজা সংক্রান্ত ব্যাপারে কতকগুলি উপদেশ দিলেন। বললেন, “তুই অপর একজন ব্রাহ্মণকে তন্ত্রধারক রেখে নিজে আপনার ভাবে পূজা করিস এবং একেবারে উপবাস না করে মধ্যাহ্নে দুধ, গঙ্গাজল ও মিছরির শরবত পান করিস। ওইভাবে পূজা করলে মা জগদম্বা তোর পূজা নিশ্চয়ই গ্রহণ করবেন।”

এখানেই শেষ নয়, হৃদয়রামের দুর্গাপূজা যাতে সার্থক ও সফল হয়, সে-ব্যাপারে শ্রীরামকৃষ্ণ বিভিন্ন নির্দেশ ও উপদেশ দিতেও দ্বিধা করলেন না। তিনিই ভিন্ন করে বলে দিলেন, কোন মৃৎশিল্পীর দ্বারা প্রতিমা তৈরি করাতে হবে, কাকে তন্ত্রধারক নিযুক্ত করতে হবে, কিভাবে পূজা-সংক্রান্ত অন্যান্য কাজ করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি সকল খুঁটিনাটি বিষয়।

হৃদয়রামের প্রতি শ্রীরামকৃষ্ণের হৃদয়ে অপার স্নেহ সঞ্চিত ছিল—তা’ এই ঘটনাতেই প্রমাণিত। মামার সহৃদয়তা এবং আন্তরিকতা হৃদয়রামকে যথেষ্ট পরিমাণে উৎসাহিত করে তুলল। তিনি এবার মামার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মহানন্দে সিহড় যাত্রা করলেন। পূজার তো আর দেরি নেই।

চার

দামোদর নদের দুই ধারে কাশ ফুলের সমারোহ, আকাশের নীল সাগরে ভেলার মত ভেসে বেড়াচ্ছে পেঁজা পেঁজা মেঘ, শিউলি ফুল ঝরে পড়ছে কাঁকুড়ে মাটির বুকে—বাতাসে ভেসে আসছে পূজার গন্ধ। হুগলি ও বাঁকুড়া জেলার গ্রামগুলিতে এক আনন্দের সমারোহ।

শ্রীরামকৃষ্ণের পুণ্য জন্মভূমি কামারপুকুর গ্রাম থেকে পাঁচ মাইল (আট কিলোমিটার) উত্তর-পশ্চিমে হৃদয়রামের গ্রাম—সিহড় (শিহড়?) অবস্থিত। একবার পালকিতে কামারপুকুর থেকে সিহড় যাওয়ার পথে শ্রীরামকৃষ্ণ দেখেছিলেন, তাঁর দেহ থেকে দু’টি কিশোর বয়স্ক সুন্দর বালক বার হয়ে মাঠের মধ্যে বন ফুল খুঁজে বেড়াচ্ছে, কখনও বা পালকির কাছে এসে হাস্য-পরিহাস করছে কথাবার্তা বলছে—আবার পালকির সঙ্গে সঙ্গে চলছে। অনেকক্ষণ পর্যন্ত এভাবে আনন্দ করে তাঁরা আবার শ্রীরামকৃষ্ণের দেহে ঢুকে গেলেন। পরবর্তীকালে যেগেশ্বরী ভৈরবী ব্রাহ্মণী এই দর্শনের কথা শ্রীরামকৃষ্ণের মুখে শুনে তাঁকে বলেছিলেন, “এইবার নিত্যানন্দের খোলে চৈতন্যের আবির্ভাব—শ্রীনিত্যানন্দ ও শ্রীচৈতন্য এইবার একসঙ্গে একাধারে এসে তোমার ভিতর রয়েছেন।” প্রকৃতপক্ষে ভৈরবী ব্রাহ্মণীই প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণের অবতারত্ব স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

আবার দেখি, এই সিহড় গ্রামের অধিবাসীদের জীবনে গৌরাঙ্গ-প্রেমের ধারা প্রবাহিত হয়েছিল শ্রীরামকৃষ্ণ উৎস থেকে। সেখানকার সাধারণ মানুষ তাঁর শ্রীমুখের কীর্তন শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন। অক্ষয়কুমার সেন রচিত শ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথিতে বলা হয়েছে, এই গ্রামের লোক গৌর-নিতাই সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানতেন না। শ্রীরামকৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়েই সেই গ্রামে সংকীর্তন বার হত।

“শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পুঁথি” অনুসরণে জানতে পারি, সিহড়ের নিকটবর্তী মেমানপুর গ্রাম থেকে বিখ্যাত কীর্তনীয়া গোপাল সদলবলে সিহড়ে এসেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণকে কীর্তন শোনাতে।

আবার ঈশ্বরপ্রেমকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার পথ যিনি দেখিয়েছেন, যিনি “শিবজ্ঞানে জীবসেবার” মন্ত্র আধুনিক বিশ্বকে শিখিয়েছেন, সেই শ্রীরামকৃষ্ণ সিহড় গ্রামেই নরনারায়ণ সেবার এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। “শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত” অনুসরণে দেখি (২।৬।২) শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, “সিহড়ে রাখাল ভোজন করালুম। তাদের হাতে হাতে সব জলপান দিলুম! দেখলুম, সাক্ষাৎ ব্রজের রাখাল। তাদের জলপান থেকে আবার খেতে লাগলুম।”

এইসব বর্ণনা থেকেই বোঝা যায়, সিহড় গ্রামের প্রতি শ্রীরামকৃষ্ণের আকর্ষণ কতটা তীব্র থাকার কথা। অথচ সেই গ্রামে এবার হৃদয়রাম দুর্গাপূজা করছেন, কিন্তু স্থূল শরীরে শ্রীরামকৃষ্ণ আসতে পারলেন না।

পাঁচ

সিহড়ে ফিরেই হৃদয়রাম মামার নির্দেশ ও উপদেশ মত পূজার আয়োজন করতে উদ্যোগী হলেন। তিনি তাঁর সাধ্যমত সবকিছু করলেন। গ্রামের সবাই যখন শুনলেন, দুর্গাপূজায় শ্রীরামকৃষ্ণ আসবেন না, তখন স্বাভাবিকভাবেই সকলে একটু হতাশ হলেন। কিন্তু হৃদয়রাম জানতেন, তাঁর মামা যখন কথা দিয়েছেন, তখন তিনি ঠিকই আসবেন, স্থূল শরীরে না এলেও সূক্ষ্ম শরীরে অবশ্যই আসবেন। তবে এ ব্যাপারে তিনি আর কারোর কাছেই কোনরকম উচ্চবাচ্য করলেন না।

ষষ্ঠীর দিন দেবীর বোধন, অধিবাসাদি—ইত্যাদি সকল শুভ কাজ সম্পন্ন করে হৃদয়রাম মামার নির্দেশমত স্বয়ং দেবীপূজায় ব্রতী হলেন।

পরদিন মহাসপ্তমী। সকাল থেকেই পূজার যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করার কাজ শুরু হল। গ্রাম-গ্রামান্তরের মানুষ পূজা দেখতে এসে ভিড় করেছেন। ঢাকের শব্দে সৃষ্টি হয়েছে এক আনন্দময় পরিবেশ। সপ্তমী বিহিতা পূজা সাঙ্গ করে রাত্রে মা দুর্গাকে আরতি করার সময় হৃদয়রাম যখন নীরাঞ্জন করছেন, তখনই তিনি সবিস্ময়ে দেখতে পেলেন, শ্রীরামকৃষ্ণ জ্যোতির্ময় শরীরে দেবী প্রতিমার পাশেই ভাবাবিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এই দৃশ্য দেখে তিনি এমনই অভিভূত হয়ে গেলেন যে, কথা বলার মত ক্ষমতাও তাঁর অবশিষ্ট ছিল না।

পরবর্তীকালে হৃদয়রাম বলতেন, দুর্গাপূজার অবশিষ্ট প্রতিদিনই ওই একই সময়ে এবং সন্ধি পূজাকালে তিনি দেবী প্রতিমার পাশে তাঁর মামাকে জ্যোতির্ময় শরীরে দেখতে পেতেন। এভাবে প্রতিদিন দিব্যদর্শন লাভ করার ফলে মহানন্দে ও মহোৎসাহে হৃদয়রাম দুর্গাপূজা সম্পন্ন করেছিলেন।

বিজয় দশমীর কিছুকাল পরেই হৃদয়রাম আবার দক্ষিণেশ্বরে ফিরে এলেন। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে তাঁর দুর্গাপূজার অভিজ্ঞতা ও প্রতিদিন জ্যোতির্ময় শরীরে শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করার কথা জানালেন। সবকিছু শুনে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে বলেছিলেন, “আরতি ও সন্ধি পূজা়র সময় তোর পূজা দেখবার জন্য বাস্তবিকই প্রাণ ব্যাকুল হয়ে উঠত এবং তারই ফলে আমার ভাব হয়ে গিয়েছিল। তখনই আমি অনুভব করতাম, যেন জ্যোতির্ময় শরীরে জ্যোতির্ময় পথ দিয়ে তোর চণ্ডীমণ্ডপে উপস্থিত হয়েছি।”

কল্পতরু শ্রীরামকৃষ্ণ এভাবে ভক্ত-হৃদয়ের বাঞ্ছা পূরণ করেছিলেন।

হৃদয়রাম বলতেন, শ্রীরামকৃষ্ণ এক সময়ে ভাবাবিষ্ট হয়ে তাঁকে বলেছিলেন, “তুই পরপর তিন বছর পূজা করবি।” অদ্ভূতভাবে ঘটনাও ঘটেছিল তা-ই। হৃদয়রাম শ্রীরামকৃষ্ণের কথাকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে নিজের বুদ্ধিতে চতুর্থবার পূজার আয়োজন করতে উদ্যত হয়ে চরম বিপদের মধ্যে পড়েছিলেন। পূজা অনুষ্ঠানের পথে এমনই বিঘ্ন পরম্পরা উপস্থিত হয়েছিল যে, পরিশেষে একান্ত বাধ্য হয়ে তাকে পূজা বন্ধ করতে হয়েছিল।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, প্রথমবার দুর্গাপূজা করার কিছুকাল পরই হৃদয়রাম দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। তারপর তিনি আবার দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীর মন্দিরে পূজার কাজ এবং মামা শ্রীরামকৃষ্ণের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ভাগ্যের এমনই নির্মম পরিহাস যে, শ্রীরামকৃষ্ণের পূতসঙ্গে যখন বহু মানুষ উন্নততর জীবনের অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন, ঠিক তখনই লক্ষ্য করে দেখি, দীর্ঘকাল সঙ্গলাভ করেও হৃদয়রাম শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবধারাকে ঠিকমত গ্রহণ করতে পারেননি। বরং শেষের দিকে তাঁর মধ্যে নানারকম স্বেচ্ছাচারিতার ভাব প্রকট হতে থাকে। তারই অনিবার্য় পরিণামে ১৮৮১ সালে হৃদয় এক অসমীচীন কাজ করার দায়ে মন্দির থেকে বিতাড়িত হন। তারপর ১৮৮৪ সালের ২৬ অক্টোবর শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরে হৃদয়ের শেষ দেখা। আর কখনও তিনি মামার কাছে আসেননি। ১৮৯৯ সালে প্রায় ৫৯ বছর বয়সে হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায় সিহড় গ্রামেই পরলোক গমন করেন।

অবতারবরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনলীলায় তিনটি ফোটগ্রাফ গ্রহণ করা হয়েছিল বিভিন্ন সময়ে। তার মধ্য একটি তোলা হয়েছিল ১৮৭৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনের বাড়ি “কমল কুটিরে”। সেই ফোটগ্রাফটিতে মামার পাশেই হৃদয়রাম স্থান পেয়েছেন। হলেন অমরত্বের অধিকারী।

*** প্রথম ছবিটি সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী উপবিষ্ট শ্রী রামকৃষ্ণের এই বিখ্যাত ছবিটি ক্যামেরায় তোলার ব্যবস্থা করেছিলেন রামচন্দ্র দত্ত। ছবি তুলেছিলেন আলোকচিত্রী অবিনাশ চন্দ্র দাঁ। ছবি তোলার স্থান দক্ষিণেশ্বর মন্দির চত্বর। ক্যামেরা রক্ষিত আছে শ্যাম পুকুর বাটিতে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev