| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

রামমোহন — পুবের সূর্য পশ্চিমে অস্তাচলে গেলেও শেষ জীবনে পিছু ছাড়েনি বিতর্ক : মোহন গঙ্গোপাধ্যায়

Reporter
মোহন গঙ্গোপাধ্যায় / ৬২৮ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২২ মে, ২০২৫

শেষ জীবনেও পিছু ছাড়েনি বিতর্ক। ভারতের নব জাগরণের স্রষ্টা ও ভারত পথিকেও শেষ জীবনে বিতর্ক আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। রেহাই পাননি রাজা রামমোহন রায়ের মতো মনীষিও। কিছু তথ্য বা ঘটনা তুলে ধরলেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে। যেমন রিফর্ম বিল প্রসঙ্গে রামমোহন ঘোষণা করেছিলেন, ‘সংস্কার বিল পরাজিত হলে আমি এই দেশের সঙ্গে আমার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করব।’ তিনি বলেছিলেন ইংল্যান্ড তো বটেই এমনকি ইংরেজের উপনিবেশ ভারতের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করে তিনি অন্য কোনো দেশে চলে যাবেন। রামমোহন যখন ইংল্যান্ডে পৌঁছলেন তখন রিফর্ম বিল নিয়ে সেখানে যথেষ্ট উত্তেজনা। ১৮৩১ সালের মার্চ মাসে লর্ড জন রাসেল সংসদের নিম্ন কক্ষ হাউস অফ কমন্স-এ প্রথম রিফর্ম বিল পেশ করেন। এপ্রিল মাসে সেটি পরাজিত হয়। তার পর ২২ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিলটি নিম্ন কক্ষে পাশ হলেও উচ্চকক্ষ হাউস অফ লর্ড-এ ৮ অক্টোবর তা প্রত্যাখ্যাত হয়।

১৮৩২ খ্রিস্টাব্দের মার্চে তৃতীয় বিলটি সংসদের নিম্ন কক্ষে খুঁটিনাটি আলোচনার পর উচ্চ কক্ষে পাঠানো হয়। শেষ পর্যন্ত এই বছরের জুন মাসে এই রিফর্ম বিল পাশ হয়। তবে পার্লামেন্টে পাশ হওয়া যে সনদ আইন অনুসারে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতশাসন করত। সেই সময়কার নিয়ম অনুযায়ী প্রতি কুড়ি বছর অন্তর ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি বোর্ড তার মেয়াদ বাড়িয়ে দিত। সেটি চাটার্ড এ্যাক্ট নামে পরিচিত ছিল। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে নতুন চ্যাটার্ড এ্যাক্ট পাশ করা হবে। তার আগে এত বছর ধরে চলা কাজকর্মের নিরিখে কী কী পরিবর্তন বা সংশোধন প্রয়োজন তা নির্ধারণ করার জন্য ১৮৩১ এর জুন মাসে পার্লামেন্টের তরফে একটি সিলেক্ট কমিটি নিযুক্ত করা হয়। এই সিলেক্ট কমিটি ভারতবর্ষের শাসনপ্রণালী সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের কাজ করে। এর জন্য ভারতবর্ষের সঙ্গে যুক্ত কিছু ইউরোপীয় বণিক এবং রাজকর্মচারি সিলেক্ট কমিটির কাছে তাঁদের সাক্ষ্য দেন। একজন জ্ঞানী ভারতবাসী হিসাবে রামমোহন রায়কেও সাক্ষ্য দিতে অনুরোধ করেন সিলেক্ট কমিটি।

রামমোহন ভারতবর্ষের রাজস্ব ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, জনসাধারণের অবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে কমিটির সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লিখিতভাবে সিলেক্ট কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেন। এই উত্তরগুলি প্রথমে উপযুক্ত মর্যাদার সঙ্গে ব্লু বুক-এ ছাপানো হয়। এর পর লন্ডন থেকে ‘Exposition of the practical operation of the Judicial and Revenue system of India, and the General Character and Condition of its Native Inhabitants as submitted in Evidence to the Authorities in England’ নামে স্বতন্ত্র একটি গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়। এ নিশ্চয়ই উল্লেখযোগ্য গৌরবময় ঘটনা। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে জুন মাসে বিলটির খসড়া তৈরি করে তা হাউস অব কমন্সে পেশ করা হয়। তার পর ওই বছর ২০ আগস্ট বিলটি রাজকীয় অনুমোদন পায়। ইংল্যান্ডে রামমোহনের আসার মূল উদ্দেশ্যগুলি একে একে সফল হল এমনকি দিল্লির বাদশার ভাতা বৃদ্ধির বিষয়েও আশানুরূপ না হলেও সাফল্য পাওয়া গেল।

১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির তরফে বাংলার গভর্নর জেনারেলকে বাদশার জন্য বর্ষিক ৩ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত ভাতা বৃদ্ধি করার সরকারি নির্দেশ দেওয়া হল। এই সমস্ত কাজের মধ্যেই ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে রামমোহন ফ্রান্সে যান। সেখানকার সম্রাট লুই ফিলিপ তাঁর সম্মানে ভোজসভার আহ্বান করেন এবং তাঁর সঙ্গে একত্রে ভোজন করেন। সেখান থেকে জানুয়ারিতেই তিনি পুনরায় ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। এই সময় থেকেই চরম দুর্ভোগের শিকার হন তিনি। তাঁর আর্থিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। প্রথমত, দিল্লির বাদশাহের যে তিন লক্ষ টাকা ভাতা বৃদ্ধি হল তাতে বাদশাহ খুব একটা খুশি হলেন না। তাঁর দাবি ছিল আরও অনেক বেশি। এ ছাড়া বৃত্তি বাড়ানোর এই খবর গভর্নর জেনারেলের হাত দিয়ে সরাসরি বাদশার কাছে পৌঁছে যাওয়ায় তিনি রামমোহনের প্রয়োজনীয়তা আর অনুভব করলেন না। তাই প্রতিশ্রুতি মতো মাসিক দুই হাজার টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিলেন। এ ছাড়া, টাকাকড়ি সংক্রান্ত বিষয়ে কলকাতার যে এজেন্সি হাউসের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন, সেই ম্যাকিনটোস কোম্পানি ১৮৩৩-এর জানুয়ারিতে দেউলিয়া ঘোষণা হয়ে যায়। ফলে ইংল্যান্ডের ম্যাকিনটোস এর প্রতিনিধিরা তাঁর জমানো টাকা ফেরত দিতে অক্ষম হয়ে পড়ে।

নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়ের জীবনচরিত’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সংস্কৃত কলেজসংস্থাপক শ্রীযুক্ত উইলসন সাহেব বলেন যে, ইংলন্ডে তাঁহার অত্যন্ত অর্থাভাব হইয়াছিল। দিল্লির বাদশাহের নিকট হইতে অথবা তাঁহার বাটি হইতে কিছুমাত্র অর্থ প্রেরিত হইত না; সুতরাং তাঁহাকে ক্রমাগত ঋণ করিতে হইতেছিল। কেমন করিয়া ঋণ পরিশোধ করিবেন, তাহার কোনো উপায় দেখিতে পাইতেছিলেন না। একান্ত প্রয়োজনীয় ব্যয়, এমনকি, আহারাদি নির্বাহ হওয়াও কঠিন হইয়া উঠিয়াছিল। ‘দুঃখের বিষয়, এই অবস্থায় কেউ তাঁর প্রতি কোনো কর্তব্য পালন করেনি, না তাঁর সন্তানসন্ততি, না তাঁর স্বদেশের অগণিত বন্ধু অনুগামীর দল যারা তাঁর কাছ থেকে নানা ভাবে উপকৃত হয়েছেন। বিদেশ-বিভুঁইয়ে কপর্দকহীন নিরুপায় ‘রাজা’ রামমোহন এই পরিস্থিতিতে দেশে ফেরবার জন্য ব্যাকুল হয়ে অবশেষে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে হাত পাতলেন। মাত্র দুই হাজার পাউন্ড ধার চেয়ে তাদের কাছে আবেদন করলেন। কিন্তু কোম্পানি তাঁর সেই আবেদন নাকচ করে দেয়। আরও দুর্ভাগ্যের বিষয়, তাঁকে সহযোগিতা করা তো দূরের কথা, তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজের নিজেরই অস্তিত্ব তখন বিপন্ন হতে বসেছে।

রামমোহন কলকাতায় থাকাকালীন যে সব মান্যগণ্য মানুষ এই সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, তিনি চোখের আড়াল হতেই তাঁরা উৎসাহ হারিয়ে ফেললেন। তাদের সদস্যসংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। এই সময়ের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা থেকে জানা যায়, ‘ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত হইলে এক বৎসর পরে ১৭৫২ শকে রামমোহন রায় ইংলন্ড দ্বীপে গমন করিলে সমাজ দুর্দশাগ্রস্ত হইয়াছিল। যাঁহারা অর্থ দিয়া আনুকুল্য করিতেন, তাঁহারা ক্রমে ক্রমে সকলেই স্বীয় স্বীয় দাতব্য রহিত করিলেন; কেবল শ্রীযুক্ত বাবু দ্বারকানাথ ঠাকুর যাবৎ জীবিত ছিলেন, তাবৎ প্রতি মাসে মাসে প্রথমে ৬০ টাকা, পরে ৮০ টাকা করিয়া দিতেন, তাহাতেই সমাজের ব্যয় নির্বাহ হইত। অত্যল্প লোক প্রতি বুধবারে সমাজে উপস্থিত হইতেন; পরিশেষে এমন হইল যে কেবল ১০/১২ জন করিয়া উপস্থিত থাকিতেন। তথাপি তত্ত্ববোধিনী সভার আশ্রয়-প্রাপ্তিকাল পর্যন্ত সমাজ যে জীবিত ছিল, তাহা কেবল শ্রীযুক্ত রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ মহাশয়ের উৎসাহে ও যত্নে।’ (ব্রাহ্মসমাজের পুরাবৃত্ত, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, ফাল্গুন ১৭৮২ শক, ২১১ সংখ্যা, বিনয় ঘোষ সম্পাদিত, সাময়িক পত্রে বাংলার সমাজচিত্র, পঞ্চম খণ্ড, পৃঃ ১৪৭)।

এরপর ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে ভাড়ার হোটেল ছেড়ে তিনি বেডফোর্ড স্কোয়ারে ডেভিড হেয়ারের দুই ভাই জন ও যোসেফ হেয়ারের বাড়িতে কিছুদিন থাকেন। এর পর ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে সেই বাড়ি ছেড়ে ব্রিস্টল শহরের কাছে ‘স্টেপলটন গ্রোভ’ নামে একটি বাড়িতে মিস কিডেল ও মিস কাসেলের আমন্ত্রণে তাঁদের অতিথি হিসাবে থাকার সুযোগ পান। ভাঙা মন ও দুর্বল পরিশ্রান্ত শরীর নিয়ে এখানে উপস্থিত হয়ে ১৯ সেপ্টেম্বরেই তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। এই জ্বর আর উপশম হল না। ২৭ সেপ্টেম্বর এখানেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। পুবের সূর্য এভাবেই অস্তাচলে গেলেন পশ্চিমের দেশে। সেই সময় ইংল্যান্ডে শবদাহ প্রচলিত ছিল না। তাই তাঁর অন্তিম ইচ্ছা শেষ জীবনে পিছু ছাড়েনি, বিতর্ক অনুযায়ী তাঁর ইউরোপীয় বন্ধুরা তাঁর দেহ সমাধিস্থ করেন। ১৮ অক্টোবর স্টেপলটন গ্রোভ সংলগ্ন বাগানে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। এর প্রায় দশ বছর পর আবার তাঁর প্রোত সফরে পেলটন গ্রোভ থেকে স্থানন্তরিত করে আর্নোস ভেল-এ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর বন্ধু অনুগামী দ্বারকানাথ ঠাকুরের উদ্যোগে এবং সেখানে তিনি সুন্দর একটি  মন্দির নির্মাণ করে দেন। এই প্রসঙ্গে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘রামমোহন রায়’ গ্রন্থে (পৃঃ- ৬৮) লেখেন, ‘পাছে তাঁহার পুত্রদের বিষয়-সম্পত্তি পাওয়া সম্বন্ধে কোনো অসুবিধা ঘটে, সেজন্য রামমোহন পূর্ব হইতেই বন্ধুদিগকে অনুরোধ করিয়া রাখিয়াছিলেন যে, তাঁহাকে যেন খ্রিস্টান সমাধিস্থানে সমাহিত করা না হয়। তাঁহার নির্দেশ অনুসারে তাঁহার দেহ ব্রিস্টলে যে বাড়িতে তিনি থাকিতেন, তাঁহারই নিকট এক নির্জন স্থানে সমাধিস্থ করা হয়। দশ বৎসর পরে তাঁহার বন্ধু দ্বারকানাথ ঠাকুর বিলাতে গিয়া তাঁহার দেহ স্থানান্তরিত করিয়া ব্রিস্টলের আরনোস ভেল নামে একটি জায়গায় সমাধিস্থ করেন ও তাহার উপর একটি সুন্দর মন্দির তৈয়ার করাইয়া দেন।’ অবশ্য দ্বারকানাথ ঠাকুরের উপস্থিতি সম্পর্কে কিছু ভিন্ন মত পাওয়া যায়। সেই নিয়ে বিতর্ক আছে পণ্ডিত মহলে।

সুরেশপ্রসাদ নিয়োগীর লেখা ‘রাজা রামমোহন রায়ের আবির্ভাবকাল’ (কালি ও কলম) গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যেহেতু ১৮৪৩ ও ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকানাথ ভারতবর্ষেই ছিলেন সেহেতু এই স্মৃতিসৌধ নির্মাণে তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ভূমিকাই ছিল না।’ এই গ্রন্থে ‘বেঙ্গল স্পেক্টেটর’ পত্রিকাকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়, ‘বিষ্টলের নিকট স্টেপলটন গ্রো নামক স্থানের এম এইচ ক্যাস্টল সাহেবের বাটিতে রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যু হয় এবং সেই বাটির সমীপে তাহার মৃত শরীরের কবর হইয়াছিল আর্নোবেল নামে ডিসেন্টারদিগের গোরস্থানে। তাঁহার ঐ গোর উঠাইয়া লইয়া গিয়াছে এবং তাহার উপরে স্তম্ভ নির্মাণের নিমিত্ত ভারতবর্ষ হইতে কিঞ্চিৎ টাকা প্রেরিত হইয়াছে ঐ স্তম্ভ উচ্চে ৩০ ফিট এবং হিন্দুদিগের রীত্যানুসারে হইবেক।’ সুরেশপ্রসাদ তাঁর বইতে লেখেন, ‘১৮৪২ এর ৯ মার্চ দ্বারকানাথ প্রথমবার ইংল্যান্ডে যান ঐ বছরের শেষ দিকেই ফিরে আসেন। ১৮৪৫ সালের মার্চ দ্বারকানাথ দ্বিতীয়বার ইংল্যান্ড অভিমুখে রওনা দেন এবং ১৮৪৬-এর আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়। প্রকৃত পক্ষে ১৯৩৩ সালে রামমোহনের শতবার্ষিকীর কিছু আগে এই স্মৃতিফলকটি বসানো হয়।’ রামমোহনের প্রয়াণের ঠিক পর পরেই আর একটি বিতর্ক তুলে দেন তাঁর ইংল্যান্ডের সেক্রেটারি স্যান্ডফোর্ড আর্নট। তিনি প্রথমের দিকে ‘ক্যালকাটা জার্নাল’পত্রিকার সম্পাদক বাকিংহ্যামের সহকারী ছিলেন।

১৮২৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মার্চ সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন চালু হওয়ার পর বাকিংহামের সঙ্গে আর্নটকেও ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে হয়। আর্নট এক সময় রামমোহনের ‘অ্যাংলো হিন্দু’ স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তখন থেকেই রামমোহনের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। রামমোহনের আর্থিক অবস্থার অবনতির কারণে তাঁর মাইনেপত্র বাকি থেকে যাওয়ায় তিনি রুষ্ঠ হন। তিনি রামমোহনের জীবদ্দশাতেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, ইংল্যান্ডে প্রকাশিত রামমোহনের যাবতীয় লেখা আসলে তাঁর অর্থাৎ আর্নটের। রামমোহন যদি তাঁর টাকা পুরোপুরি মিটিয়ে না দেন তাহলে তিনি সে কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করবেন। রামমোহনের মৃত্যুর পরেই ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২৩ নভেম্বর ‘দ্য টাইম্‌স্’ পত্রিকায় তিনি চিঠি লেখেন, ‘দিল্লির সম্রাটের দূত হিসাবে ইউরোপে আসার সময় থেকে যে সময়ে আমি তাঁর সচিব হিসাবে কাজ করেছি এ দেশে দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছোটো-বড়ো কাগজপত্র, চিঠি এবং নোট ইত্যাদি যা যা লিখেছেন, তার প্রায় প্রত্যেকটিই আমার লেখা।’ (Supplementary Notes, SD Collet, The Life and Letters of Raja Rammohun Roy, P-402)। অবশ্য, আর্নোটের ভিত্তিহীন এই অভিযোগের তীব্র বিরোধিতা করে ১১ ডিসেম্বর ওই পত্রিকাতেই চিঠি লিখলেন ডেভিড হেয়ারের ভাই জন হেয়ার। শুধু তাই নয়, এর পর লান্ট কার্পেন্টার তাঁর ‘A Review of the Labours, Opinions and Charac- ter of Rammohun Roy-1833’ গ্রন্থে রামমোহনের পক্ষ নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ করে আর্নোটের অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করে দেন। এই বইয়ে কার্পেন্টার লন্ডনের একটি পত্রিকায় আর্নোটেরই একটি লেখা উদ্ধৃত করেন, যেখানে আর্নোট রামমোহনের ইংরেজি ভাষার দক্ষতার কথা উল্লেখ করে লিখছেন, ‘রাজা কমবেশি দশটি ভাষায় ব্যুৎপন্ন ছিলেন সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, হিন্দুস্থানি, বাংলা, ইংরেজি, হিব্রু, গ্রিক, লাতিন এবং ফরাসি। প্রথম দুটিতে তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য ছিল, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠটি তিনি সাবলীলভাবে বলতে ও লিখতে পারতেন।’ আরও কিছু বিষয় উদ্ধৃত করে কার্পেন্টার আর্নোটের দাবিকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেন। এর পর অবশ্য আর্নোটও আর উচ্চবাচ্চ করেননি। জীবনের শেষপর্যন্ত একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তবুও তাঁর ভাবনা ও কাজ আজও মানুষের মনে দাগ কেটে আছে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev