ভারতবর্ষের নবজাগরণের পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়ের জন্ম হুগলির খানাকুলের রাধানগর গ্রামে। ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দের ২২ মে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রয়াণ ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর।

হেরিটেজ ঘোষিত রঘুনাথপুরে রামমোহনের বসতবাড়ি
আমরা জানি, পৌত্তলিকতা এবং ধর্মের বিভিন্ন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শুধুমাত্র তথাকথিত ধর্মভীরু দেশবাসী নয় তার পরিবারেরও বিরাগভাজন হয়েছিলেন রামমোহন। এই অপরাধে তিনি পিতা-মাতা কর্তৃক বিতাড়িত হন এবং রঘুনাথপুরে পারিবারিক শ্মশানের পাশে গিয়ে বাড়ি তৈরি করেন। স্ত্রী-পুত্র নিয়ে এই বাড়িতে তিনি বেশ কিছুদিন বসবাসও করেছিলেন। রঘুনাথপুর এর বিশাল আম বাগানের মধ্যে সেই বাড়ির ভগ্ন শেষ এখনো দেখা যাবে। হুগলি জেলা পরিষদ এর তত্ত্বাবধানে এখানে একটি পর্যটন কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে সেটিও দর্শনীয়। এখানে রামমোহন রায়ের বৌদি অলকমঞ্জরি দেবী কে তাঁর মৃত স্বামীর চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে সতী করা হয়েছিল। তার স্মারক হিসেবে সতীর বেদী এখানে আছে। এখানকার ভেঙেচুরে যাওয়া বসতবাড়িটি হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়েছে।

রামমোহনের জন্মবেদি
রামমোহনের জন্মস্থান নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হয়েছিল ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে। রেভারেন্ড জেমস লং নামে এক রামমোহন অনুরাগী এই সময় এখানে এসে স্থানীয় বর্ষিয়ান মানুষজনের সহযোগিতায় রায় পরিবারের সূতিকাগারের অবস্থান নির্ণয় করে স্থানটি চিহ্নিত করেন। রামমোহনের দেড়শ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে স্মৃতি রক্ষা কমিটির উদ্যোগে জন্ম বেদীর উপর বর্তমান আচ্ছাদনটি নির্মাণ করা হয় ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে। জন্ম বেদি থেকে চোখ তুললেই আমরা দেখতে পাবো সুদৃশ্য রামমোহন মেমোরিয়াল হল। এই স্মৃতিসৌধটির নকশা তৈরি করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মন্দির মসজিদ এবং গির্জা এই তিন ধর্মক্ষেত্রেরই স্থাপত্য ধরা আছে এই স্মৃতি মন্দিরের মধ্যে। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন শ্রীমতি হেমলতা ঠাকুর। তিনি রামমোহনের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাধাপ্রসাদ এর কন্যা চন্দ্রজ্যোতির কন্যা এবং রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র দীপেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্নী। ১৯১৬ সালে ভিত্তি স্থাপন হলেও এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১৯১৭ সালে। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত কাজ হয় ।আসলে এত খরচ হয়ে গিয়েছিল যে শেষপর্যন্ত দেনা মেটানোর জন্য সরকারি নির্দেশে নিলামে বিক্রি করে দিতে হয় এই সৌধটি। যতীন্দ্রনাথ বসু তখন এটি কিনেছিলেন। পরবর্তীকালে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ১৯ এপ্রিল হুগলি জেলা বোর্ড বর্তমানে যাকে “জেলা পরিষদ” বলা হয় তাকে দলিল বলে এই সম্পত্তি হস্তান্তর করেন যতীন্দ্রনাথ।

রঘুনাথপুরের সতীর বেদী
ঐতিহাসিক এই ভবনটি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হেরিটেজ কমিটি, হেরিটেজ এর মর্যাদা দেওয়ায় খুশি রামমোহন অনুরাগীরা।
কভারের ছবি : হেরিটেজ ঘোষিত রামমোহন মেমোরিয়াল হল