চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে হিন্দুরা রামের জন্মকে সম্মান জানাতে রাম নবমী উদযাপন করে। শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে শুরু হয় নবরাত্রি আর নবমীর দিন পালিত হয় রাম নবমীর উৎসব। গত কয়েকটি বছর ধরে এই দিনটিতে দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্যে শুরু হয়েছে রামনবমীর মিছিল। যে মিছিল থেকে বিরাট অশান্তি, আক্রমণ, লুঠপাট, অগ্নি সংযোগ, ধর্মস্থান ভাঙা, খুন, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক হানাহানির ঘটনা ঘটেছে। এ বছরও গুজরাট, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, উত্তরপ্রদেশের একাধিক জায়গায় প্রাণহানি, রক্তপাত, হাঙ্গামা, বাড়িঘর-দোকানে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। বাদ যায়নি বাংলা।
হাঙ্গামা যে আকারেই হোক ধরণটা সব জায়গাতেই প্রায় এক। প্রথমে রামনবমী বা হনুমান জয়ন্তীকে কেন্দ্র করে বিপুল হুঙ্কারে আক্রমণোদ্যত হনুমানের ছবিওয়ালা পতাকা উড়িয়ে সশস্ত্র মিছিল। সেই মিছিল পরিকল্পিতভাবেই প্ররোচনামূলক স্লোগান এবং ডিজে বাজিয়ে এগিয়ে চলে মুসলিম মহল্লার দিকে, এলাকার মসজিদ আক্রমণের চেষ্টাও হয়, যদি স্থানীয় মুসলমানরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয় তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে হিংসা ছড়ানোর অভিযোগ ওঠে, এরপরেই সশস্ত্র হিন্দুত্ববাদী মিছিল ঢুকে পড়ে মুসলিম মহল্লায়, উত্তেজনা ছড়াতে ডিজের আওয়াজ আরও বেড়ে যায়, তার সঙ্গে প্ররোচনামূলক স্লোগান, রাজস্থানে একটি রামনবমীর মিছিল মুসলমান অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার সময় আওয়াজ তোলে, ‘যব ভাগওয়া লেহেরায়েগা, তব মিয়াঁ কাটে যায়েগা’ — অর্থাৎ, গেরুয়া পতাকা নিয়ে মোল্লাদের কাটতে হবে। এরপরেই ডিজে বক্সের ইলেক্ট্রিকের তারে শক খেয়ে তিনজন গেরুয়াধারী যুবক মারা যায়।
এই যে কানফাটানো ডিজের হুঙ্কার, হনুমানের ছবিওয়ালা পতাকা উড়িয়ে, অস্ত্রের ঝনঝনানিতে রামনবমীর মিছিলের হিড়িক তা কি স্রেফ রামের পুজো? কার্যত বিকট ডিজে হুঙ্কার-প্ররোচনামূলক স্লোগান-আক্রমণোদ্যত হনুমানের ছবিওয়ালা পতাকা-অস্ত্রের উলঙ্গ আস্ফালনের সঙ্গে ধর্ম বা ধর্মাচরণের কোনও যোগসূত্র নেই। ভক্তিপ্রদর্শনই যদি মিছিলের উদ্দশ্য হয়, তাহলে মানুষ সেই মিছিলের আকৃতি প্রকৃতি দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে কেন, নিছক আবেশের বশেই যদি মিছিল তবে প্রাণহানি, রক্তপাত, অগ্নি সংযোগ ঘটে কেন, কেন সেই মিছিল বারবার অন্য ধর্মের মানুষের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে ওঠে? আসলে এই মিছিলের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ভক্তিভাব বা ধর্মাচরণের কিছুমাত্র যোগাযোগ নেই। এই মিছিল পূর্বপরিকল্পিত কিংবা সংগঠিত না হলে মিছিল থেকে একই সঙ্গে একাধিক জায়গায় এমন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে না। এই মিছিলের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষমতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্য যতখানি ততটাই যোগসাজশ তাদের কুৎসিত ধুরন্ধর ভোট রাজনীতির। সে কারণেই রামনবমীর মিছিল হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক কর্মসূচির অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। সংকীর্ণ স্বার্থে জনগণের মধ্যে চরম সাম্প্রদায়িক বিভাজন বাড়াতেই তারা সর্বদা সচেষ্ট।
লক্ষ্যনীয় রাম নবমীর উৎসবে কেউই ব্যক্তিগতভাবে রামের পুজো করছে না, মিছিলও সংগঠিত করছে না। রামের পুজোর আয়োজন সংগঠিত ভাবেই হচ্ছে এবং তা করছে হিন্দুত্ববাদী দলটি। তাদের উদ্দেশ্য রামের নাম করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলে ঝামেলা ও সন্ত্রাস সৃষ্টি। বিশেষ করে এই সময়ে এই ধরণের পরিস্থিতি তৈরি করে হিন্দুত্ববাদী দলটির লাভ তো অবশ্যই রয়েছে। মে মাসের ১০ তারিখ কর্নাটক বিধানসভা নির্বাচন। সে রাজ্যে বিজেপি যথেষ্ট অসুবিধার মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক ভোটার সমীক্ষায় বিজেপির পরাজয় যে সে রাজ্যে সুনিশ্চিত এমনটাই উঠে এসেছে। এরপর রাহুল গান্ধীকে কেন্দ্রের শাসকেরা অপদস্ত করার বুমেরাং হয়ে উঠেছে। রাহুল গান্ধী এখন দেশের সমস্ত সংবাদমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। রাহুল পর্বে বিজেপি স্পষ্টতই অস্বস্তিতে পড়েছে। মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য। তাই তারা এ ধরণের উৎসব, মিছিল করতে টাকা খরচ করেছে সচেতনভাবে, যাতে রামনবমীর মিছিলকে কেন্দ্র করে অশান্তি সৃষ্টি করা যায়।
বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক রামনবমী উৎসবকে মেরুকরণের রাজনীতির ছকও বলছেন। এই ছকে দাঙ্গা বাঁধাতে পারলে বিজেপির ‘হিন্দু ভোট’ আরও জোটবদ্ধ হবে বলে জানাচ্ছেন। এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করাটা বিজেপির পুরনো ছক, যা দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন তৈরি করে রাহুল গান্ধীকে নিয়ে চর্চা করাটা বন্ধ করা যায়। কারন রাহুল গান্ধীকে সামনে রেখে বা পাশে নিয়ে যে মুহুর্তে সমস্ত বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ, তখন এই ধরনের সাম্প্রদায়িক ছক তৈরি করা ছাড়া বিজেপির আর কোনও রাস্তা নেই।
কয়েক বছর আগে পর্যন্ত বাংলায় রামনবমীর বিশাল উৎসবের কোনও খবর পাওয়া যায়নি। বাংলায় রাম রামায়নেই সীমাবদ্ধ ছিল। রামনবমীর সঙ্গে বাংলার ঐতিহ্য-রীতি-সংস্কৃতিরও যে খুব যোগ আছে তেমনটাও বলা যায় না। বরং এই সময় বাসন্তী পুজোর কথাই শোনা যেত। কিন্তু সেই পুজোতে মিছিল-হুঙ্কার-অন্য ধর্মে বিশ্বাসীদের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষও নেই। সেই পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি রামনবমীকে দলীয় কর্মসূচিতে পরিণত করে ফেলেছে। উদ্দেশ্য অশান্তি, রামনবমীর মিছিলের নামে দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা।