বাঙালির আর যাই হোক ছুটি পেলেই পৌরাণিক স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে, ইতিহাসের ফিসফিসানি শুনতে ভ্রমন পিপাসু, ভক্ত মানুষজন ছুটে আসেন অলীক কল্পনা আর বাস্তব ঘটনার এক আজব মিশেলে ঘেরা কর্ণগড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
এখানেই ঐতিহাসিক চুয়ারবিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলো মেদিনীপুরের কর্ণগড়ের রানী শিরোমণির নেতৃত্বে। কর্ণগড়ের মহামায়া মন্দিরের প্রাঙ্গণই ছিলো মঙ্গলকাব্য শিবায়ন কাব্যের রচয়িতা রামেশ্বর চক্রবর্তীর তন্ত্রসাধনা ও কাব্য রচনার মহাক্ষেত্র।

দেবী মহামায়া তথা বগলা দেবী ভক্তদের কাছে খুবই জাগ্রত। তার প্রসাদের পদে রাখতে হয় নানান ব্যঞ্জন এমনকি ভক্তরা চাইলে দিতে পারেন আমিষ ভোগও। কর্ণগড়-সহ এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে আছে অসংখ্য কিংবদন্তি। আর তারই উপর ভরসা করে অগণিত ভক্তদের আসা যাওয়া। মেদনীপুর সদর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরত্বে উৎকলাধিপতি কর্ণকেশোরীর এই গড় যা কর্ণগড় নামে বিখ্যাত।

পুরাণ বলে, সতীর দেহত্যাগের পর ক্রোধান্বিত মহাদেবের প্রলয় নিত্যকালে বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের আঘাতে সতীর কর্ণমূল পতিত হয় এই স্থানে যা থেকে কর্ণগড়ের নামের উৎপত্তি। আবার মহাভারতে বর্ণিত কর্ণ নাকি এই গড়ের প্রতিষ্ঠা করে রাজ্য শাসন করেছিলেন। তার নাম অনুসরণে এই রাজ্যের নাম কর্ণগড়। আবার অনেকে বলেন এটি ছিল ভোজ রাজ্যের রাজধানী। আরও একটি কাহিনী বলে, গৌড়াধিপতি নবপাল দেবের আমলে তার বীরসেনাপতি জ্ঞাতবর্মার সাহায্যে চেদিরাজ কর্ণদেব গৌড় আক্রমণ করে প্রভূত ক্ষতি সাধন করেছিলেন। অবশেষে বৌদ্ধ পন্ডিত, ধর্মগুরু ও দার্শনিক অতীশ দীপঙ্করের চেষ্টায় দুই রাজ্যের মধ্যে সন্ধি হয়। সন্ধির শর্তানুসারে অরণ্য সংকুল এই অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে চেদিরাজ কর্ণদেব অগ্রসর হয়েছিলেন বলে এই স্থানের নাম রাখেন কর্ণগড়। কিন্তু এই সকল তথ্যের সেরকম কোনো উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সন্ধ্যাকর নন্দী বিরচিত রামচরিত মানস গ্রন্থে কর্ণগড়ের কথা প্রথম জানতে পারা যায়। মুঘল আমলে লিপিবদ্ধ বিভিন্ন সরকারি নথিপত্র ও আবুল ফজলের লেখা ‘আইনি-ই-আকবরী’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় আকবরের রাজস্বমন্ত্রী টোডারমলের হাত ধরে মেদিনীপুরের মহাল ও মেদিনীপুরে জমিদারি ভরকেন্দ্র হিসেবে কর্ণগড়ের নাম পাওয়া যায়।

একক্রোশ ব্যাপী পরিখা বেষ্টিত কর্ণগড়ের অঞ্চলটি দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। কুলদেবতা ও রাজ পরিবারের সদস্যের জন্য অন্দরমহাল বা ভিতরগড় এবং রাজকর্মচারী ও সৈন্যদের ব্যবহারের জন্য ছিল সদরমহাল বা বাহিরগড়। মূল রাজপ্রাসাদ ছিল ভিতরগড়ে। প্রাচীরের চার কোনে চারটি তোরণ যেখান থেকে সমগ্র অঞ্চলে গতিবিধির ওপর নজরদারি করা হতো। কর্ণগড়ের তিন দিকে তিনটি প্রবেশদ্বার। গড়ের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পারাং নদী প্রাকৃতিকভাবেই পরিখার কাজ করেছে। আজ স্রোতস্বিনী পারাং নদী কৃশকায় এক জলধারায় পরিণত হয়েছে। পড়ে আছে বন জঙ্গলে ঘেরা কর্ণগড়ের ধ্বংসাবশেষ।

মধ্যযুগে স্থানীয়রাজা ইন্দ্রকেতু গোড়াপত্তন করেন এই নগরীর। পরবর্তীকালে ইন্দ্রকেতুর পুত্র নরেন্দ্রকেতু কর্ণগড়ের দায়ভার রণবীর সিংহ নামে এক স্থানীয় লোধা সরদারের হাতে সমর্পণ করে চলে যান। এই লোধা সর্দারই তাঁর আরাধ্যা দেবী মহামায়ার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন কর্নগড়ে। লোধা, পাইক সম্প্রদায় অধ্যুষিত এই আদিবাসী রাজ্যে মহামায়া হলেন লৌকিক শক্তির দেবী। জনশ্রুতি বলে মহামায়ার পূজারী রণবীর অপরাধীদের নরবলি দিতেন এই মাতৃমন্দিরে। কর্নগড় তখন ছিল বৃহত্তর উড়িষ্যা রাজ্যের অধীন।

ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে উড়িষ্যা রাজ্যের অন্তর্গত স্থানীয় খয়রা রাজার পুত্র লক্ষণ সিংহ কর্ণগড়ে প্রতিষ্ঠা করেন তার পরাক্রান্ত রাজবংশ। তার আমলে কর্ণগড় রাজ্যের অনেক উন্নতি হয়। ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে যশবন্ত সিংহ কর্ণগড়ের রাজ্যভার গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও দেবী মহামায়া ও দন্ডেশ্বরের উপাসক। তার সময় শাক্তপীঠ হিসাবে পরিচিতি পায় কর্ণগড়। যশবন্ত সিংহ ও কবি রামেশ্বর পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে সাধনা করতেন। দেবী যোগমায়া মন্দির দন্ডেশ্বরে মহামায়া মন্দিরের চারিদিকে উচ্চ প্রাচীর বিশিষ্ট। ঐতিহাসিকদের মতে, মহামায়া মন্দিরের প্রবেশ দ্বারে ৭৫ ফুট উঁচু পাথরের তোরণ ছিলো।
আজও দেখা যায় এখানে ভগ্নপ্রায় নহবতখানা। নহবতখানার বাইরে পুকুরপাড়ে রয়েছে মাকড়া পাথরের যশবন্ত সিংহ ও কবি রামেশ্বরের জীর্ণ সমাধি মন্দির। এখানকার নগর ও মন্দির সমূহ নির্মিত হয়েছিল ওড়িশা স্থাপত্যশৈলের আঙ্গিকে।

যশবন্ত সিংহের মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র অজিত সিং এ রাজ্যের অধীশ্বর হন। তার আমলে কর্ণগড় ছাড়াও জঙ্গলমহলের ২১টি জমিদারির ওপর রাজত্বের সীমানা প্রসারিত হয়। রাজা অজিত সিংহ ছিলেন এই বংশের শেষ শাসক। অপুত্রক অবস্থায় তার মৃত্যু হলে তার দুই রানী ভবানী ও শিরোমণির দ্বৈত্য শাসন প্রবর্তিত হয় কর্নগড়ে। রানী ভবাণীর মৃত্যুর পর রানী শিরোমনি হয়ে ওঠেন কর্নগড়ের অদ্বিতীয় অধীশ্বরী। রানী শিরোমণি নাড়াজোলের রাজা মোহনলাল খাঁর সহযোগিতায় এই গড়ের উন্নয়ন করেছিলেন। কর্ণগড় ছাড়াও আবাসগড় ও জামদারগড় ছিলো এই রাজবংশের। সেখানেও ইতিহাসের বেশ কিছু নিদর্শন মেলে যদিও সময়ের চোরাস্রোতে হারাতে বসেছে সেই সব স্মৃতি।

পলাশীর যুদ্ধের শেষে বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার রাজ্যভার যায় ইংরেজদের হাতে। ক্ষমতায় এসে ইংরেজরা পাইক ও নায়েকদের চাকরি কেড়ে নিলেন, বসালেন উচ্চ হারে কর জমির উপর। এই সময় চুয়াড় বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। বাংলায় চুয়ার বলতে অসভ্য, গোয়াদের বোঝায়। বাংলার মেদিনীপুর জেলার জঙ্গলমহলের ভূমিজ, কূর্মি, বাগদী, সাঁওতাল, কোড়া, মুন্নারি ইত্যাদি উপজাতিভুক্ত অধিবাসীদের চুয়াড় বা চোয়াড় বলা হতো। ১৭৯৮ সালে চুয়াড়-বিদ্রোহের সময় মেদিনীপুরের লক্ষীবাঈ রানী শিরোমনির নেতৃত্বে এই অঞ্চলের কৃষক সমাজ গর্জে ওঠে উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির অভাবে অচিরেই ব্রিটিশ শক্তির সামনে পরাজিত হয় বিদ্রোহের আগুন। রাণী শিরোমণী ইংরেজদের হাতে বন্দী হলেন৷ বাকী বিদ্রোহী চুয়াড়দের বন্দী করে কর্ণগড় দূর্গের চারপাশের গাছে গাছে ফাঁসি তে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো৷ বলা হয়, রানী শিরোমনি প্রথম ভারতবর্ষের রাজনৈতিক বন্দিনী। রাজ কোষের কোপে বিধ্বস্ত হয় কর্ণগড় দুর্গ ও প্রাসাদ। তবে তার প্রতিবাদ ব্যর্থ হয়নি বরং এই পরাজয়ের মধ্যেই রচিত হয়েছিল আগামী স্বাধীন ভারতের বীজমন্ত্র। তাই রানী শিরোমণিকে সম্মান জানাতে ভারতীয় রেল আদ্রা-হাওড়া প্যাসেঞ্জার ট্রেন চালু করেছে।

বর্তমানে শালবনি পঞ্চায়েত সমিতি ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক স্থানকে সাজিয়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। জল, বিদ্যুৎ, রাস্তার উন্নতি হয়েছে, পারংখালের ওপর ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। বানানো হয়েছে ক্যাফেটেরিয়া, কটেজ। ইতিহাসের গন্ধ আর সাথে প্রকৃতির সান্নিধ্য যদি একসাথে পেতে চান, তাহলে ঘুরে আসুন ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায় কর্ণগড়ে।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: যোগেশচন্দ্র বসুর লেখা মেদিনীপুরের ইতিহাস এবং অন্যান্য।
পেজ ফোরের আবশ্যকতা আপনার প্রতিবেদনে হামেশা পরিস্ফুট হয়ে পত্রিকার
মান বৃদ্ধি করে।শিক্ষামূলক প্রতিবেদন পাঠকের চেতনা সম্পৃক্ত করে জ্ঞান বুদ্ধির
বিকাশে সহায়ক হয়ে “ইতিহাসের খোঁজে—-” এক উৎকৃষ্ট ভ্রমন কাহিনী হিসাবে
আলোচনার বিষয়বস্তু হতে পারে।অনেক না জানা তথ্য চলচ্চিত্রের মতো ধরে রাখে পাঠকের দৃষ্টি।সুন্দর রিপোটার্জের জন্য ধন্যবাদ জানাই।
ভীষণ খুশি হলাম আপনার মূল্যবান মতামত পেয়ে। আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে শ্রদ্ধেয় ❤️????
অসাধারণ একটি লেখা। এমন ইতিহাসের খোঁজ আরো আসা উচিত।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ❤️????