কৃষ্ণনগরের হেরিটেজ ভবন ‘রানিকুঠি’ আজ বিলুপ্তির পথে। একটি ঐতিহাসিক ভবন হওয়া সত্ত্বেও প্রচারের আলো থেকে আজও সে দূরে রয়ে গিয়েছে। সরকার বাহাদুর, পৌর প্রশাসন, হেরিটেজ কমিশন, সাধারণ জনগণ— সকলেই নীরব। দীর্ঘকাল যাবত এই ভবন কোনো সংস্কার ছাড়াই কালের নিরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত এবং সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীদের বসতবাড়ি রানিকুঠির আয়ু তাই আর বেশিদিন নেই বলা যায়। অবস্থার পরিবর্তন না হলে কৃষ্ণনগরের রানিকুঠি খুব বেশি হলে আর দশ বছরও এভাবে দণ্ডায়মান থাকবে কিনা সন্দেহ!

২১শে মার্চ ২০১৮ ওয়েস্ট বেঙ্গল হেরিটেজ কমিশন যে ১৩টি সৌধকে হেরিটেজের মর্যাদা দিয়েছে, তার মধ্যে কৃষ্ণনগরস্থিত রানিকুঠি ভবনটি রয়েছে (তালিকায় ৮ নম্বর)। কিন্তু ‘monument of heritage importance’ হিসেবে ঘোষণা হবার পরেও এটির সংস্কার হয় নি। কৃষ্ণনগরের ডন বক্স রোডের পাশে মেরি ইমাকুলেট হাসপাতালের উত্তর দিকে একটি বড়ো মাঠের একপ্রান্তে অবহেলিত অবস্থায় দণ্ডায়মান রানিকুঠি। ১৭৮৭ সালে নদিয়া একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে গড়ে ওঠার পর থেকেই কৃষ্ণনগর হল জেলার সদর শহর। এই শহরে একাধিক হেরিটেজ ভবন রয়েছে। রানিকুঠি হল সেগুলির মধ্যে অন্যতম। ওয়েস্ট বেঙ্গল হেরিটেজ কমিশনের ঘোষণার পরেও, রানিকুঠির সংস্কার সম্পর্কে উদাসীনতার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

রানিকুঠির ছাদের একাংশ কয়েক বছর আগেই ভেঙে পড়েছে। অনেক আগে থেকেই বাড়িটি এভাবে পড়ে রয়েছে। বাড়িটির কোনো কিছুই আর অক্ষত নেই যদিও। রানিকুঠির দেওয়াল এবং দরজা-জানলাগুলি জীর্ণ দশা এখন প্রত্যক্ষ করা যাবে। সমগ্র ভবন এবং তার আশপাশ লতাপাতা, গুল্মে আচ্ছাদিত হয়েছে। দরজার মাথায়, ছাদে গজিয়েছে বটবৃক্ষ। এখন যদি সংস্কারের কথা ভাবাও হয়, সেটির জন্য অত্যন্ত যত্নশীল হতে হবে এবং কাজটি হবে যথেষ্ট কঠিন এবং পরিশ্রমসাধ্য। প্রাক-অতিমারি পর্যায়ের বছরগুলিতে কখনো কখনো সাধারণ জনগণের মধ্যে থেকে কিছু উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তাভাবনা করা হলেও সেগুলি খুব একটা ফলপ্রসু হয়নি। যত দিন যাচ্ছে রানিকুঠির স্বাস্থ্য ততোই ভেঙে পড়ছে। সরকার থেকে জনগণ —সকলেই যেন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালনে অবিচল।

একদা এটি ছিল কৃষ্ণনগরের হোয়াইট টাউন এলাকা। সেখানকার এক শ্বেতাঙ্গ সাহেবের বাড়ি ছিল এটি। অতঃপর দূর্গাদাস চৌধুরী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে কৃষ্ণনগরে আসেন এবং তার সন্তানদের পড়াশোনার সুবিধার জন্য এই বাড়িটি ক্রয় করেন। এই বাড়িরই সুসন্তান ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী, যিনি হলেন বাংলা সাহিত্যের ‘বীরবল’। বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষার ব্যবহারকে জনপ্রিয় করে তুলে যিনি এক প্রকার বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। দূর্গাদাস চৌধুরীর সন্তান ছিলেন যথাক্রমে আশুতোষ চৌধুরী, কুমুদনাথ চৌধুরী, প্রমথ চৌধুরী এবং প্রসন্নময়ী দেবী। তখন এটি ছিল চৌধুরী পরিবারের বাড়ি, রানিকুঠি নামকরণ তখনও হয়নি। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রামতনু লাহিড়ী, কালীচরণ লাহিড়ী, অতুলপ্রসাদ সেনের মতো বহু জ্ঞানীগুণী ব্যক্তির আগমন ঘটেছিল এই বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এখানে এসেছিলেন এবং কয়েক দিন ছিলেন বলেও শোনা যায়। একদা জাহাজ যাত্রাকালে চৌধুরী পরিবারের আশুতোষ চৌধুরীর সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সখ্যতা হয়েছিল। সেই সূত্র ধরেই ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে এপ্রিল ইস্টারের ছুটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ভাই হেমেন্দ্রনাথের কন্যা প্রতিভার সম্বন্ধ নিয়ে কৃষ্ণনগরের এই চৌধুরী বাড়িতে আসেন। বিংশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে এই বাড়িটির নাম হয় ‘রানিকুঠি’।

চৌধুরী পরিবারের অনেকেই পরবর্তিতে বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ সাধক হয়েছিলেন। দুর্গাদাস চৌধুরীর সন্তান-সন্ততি আশুতোষ চৌধুরী, কুমুদনাথ চৌধুরী, প্রমথ চৌধুরী, প্রসন্নময়ী দেবীর জীবনের অনেকটা পর্যায় কাটে কৃষ্ণনগরের এই বাড়িতে। প্রমথ চৌধুরীর অগ্রজ আশুতোষ চৌধুরী লেখক হিসেবে বেশ নাম করেছিলেন। কুমুদনাথ চৌধুরী শিকারি হিসেবে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিলেন। বাঘ শিকার করতে গিয়েই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। প্রসন্নময়ী দেবী ছিলেন প্রমথ চৌধুরীর বোন। তিনিও বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ সাধিকা ছিলেন। প্রমথ চৌধুরী তাঁর আত্মকথায় লিখেওছেন যে — “আমার বড়দাদা ইংরেজি ভাষা খুব ভালো জানতেন; আর আমার সেজ-দাদা কুমুদনাথ অল্পবয়েস থেকেই ছিলেন শিকারি। তিনি শিকারের বই পেলেই পড়তেন। শেষ বয়সে তিনি শিকার করতে গিয়ে বাঘের হাতে প্রাণ দিয়েছেন।”

প্রমথ চৌধুরীদের পরিবার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল। সেই সূত্রে ঠাকুর পরিবারের অনেকেই কৃষ্ণনগরের এই ভবনে এসেছিলেন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে এপ্রিল ইস্টারের ছুটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আশুতোষ চৌধুরীর জন্য তাঁর ভাই হেমেন্দ্রনাথের কন্যা প্রতিভার সম্বন্ধ নিয়ে কৃষ্ণনগরের চৌধুরীদের বাড়িতে এসেছিলেন। প্রতিভা দেবীর সাথে আশুতোষ চৌধুরীর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মেয়ে ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীও পরবর্তীতে চৌধুরী পরিবারের বৌমা হয়েছিলেন। প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে ১৮৯৯ সালে তাঁর বিবাহ হয়। ইন্দিরা ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর কন্যা। অল্প বয়সেই অনুবাদক হিসেবে তিনি বিশেষ নাম করেছিলেন। শুধু চৌধুরী পরিবারের পুত্ররাই নন, চৌধুরী পরিবারের কন্যা এবং পুত্রবধূরাও গুণী ছিলেন। এহেন সাংস্কৃতিক পরম্পরা বহনকারী কৃষ্ণনগরের চৌধুরী পরিবারের বাসভবন পরবর্তীতে বিংশ শতকের প্রথমার্ধে নদিয়া রাজবংশের মহারানি জ্যোতির্ময়ী দেবী ক্রয় করেন। অনেকের মতে, তারপর থেকেই এই ভবনটির নাম হয় ‘রানিকুঠি’। চৌধুরী পরিবারের বসতবাটি এই রানিকুঠি আজ বিলুপ্তির পথে। এর ভগ্নদশা চিৎকার করে বলছে যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আগামীদিনে আর রানিকুঠির অস্তিত্ব খুঁজে পাবে না। কিন্তু বিস্ময় হয় — সেই চিৎকার কেউ শুনতে পাচ্ছেন না!
লেখক : অধ্যাপক, চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়, নদিয়া।
খুব তথ্য সমৃদ্ধ ইতিহাসকণা উপহার দেওয়ার জন্য লেখককে অশেষ ধন্যবাদ জানাই।
এই মন্তব্য অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক। ধন্যবাদ স্যর।
লেখকের অসাধারন লিখনশৈলী ও রানিকুঠির তথ্যসমৃদ্ধ ইতিহাস মুগ্ধ করেছে আমায় ।
ধন্যবাদ বন্ধু
খুব সমৃদ্ধ পূর্ণ তথ্য।।. অনেক ধন্যবাদ লেখককে।।
ধন্যবাদ
Worth reading.
অনেক ধন্যবাদ।
জানা ছিল না। রবীন্দ্রনাথের পদধূলিধন্য এবং প্রমথ চৌধুরীর পারিবারিক বাড়ির বিবরণ পড়ে সমৃদ্ধ হলাম।
ধন্যবাদ আপনাকে।
হ্যাঁ, বাড়িটির ইতিহাস সম্পর্কে এখনও অনেকেই অবহিত নন।