| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

রণজিৎ গুহ : কীর্তিমানের মহাপ্রয়াণ : ড. মিল্টন বিশ্বাস

Reporter
ড. মিল্টন বিশ্বাস / ৮৩১ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৩

২৮ এপ্রিল ২০২৩ অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাতে নিজ বাসভবনে কীর্তিমান ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহের জীবনবসান ঘটল। অসুস্থ ছিলেন, দীর্ঘ রোগ ভোগের পর ভোর ৩টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চলতি বছর ২৩ মে তাঁর ১০০ বছরে পা দেওয়ার কথা ছিল। তাঁর আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন এই ইতিহাসবিদ, তাত্ত্বিক ও সাহিত্য সমালোচক।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে কলকাতার বইমেলায় কলাবতী মুদ্রা থেকে ‘শতবর্ষে রণজিৎ গুহ ও সাব-অল্টার্ন তত্ত্ব’ যখন প্রকাশিত হয়; তখন থেকে দেশ-বিদেশে এ পর্যন্ত আর কেউ এ ধরনের গ্রন্থ প্রকাশ করেননি। তবে কলকাতা-সহ ভারতের বিভিন্ন শহরে আলোচিত ও নমস্য ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানমালা শুরু হয়েছিল। নিজের হাতে গড়া এবং অধুনা বিলুপ্ত সাব-অল্টার্ন স্টাডিজের জীবিত লেখকবৃন্দ, তাঁর ছাত্র-ছাত্রীগণ, সুহৃদ ও সুশীলসমাজ চলতি বছর ২৩ মে তাঁর ১০০ বছর পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। শোকে মুহ্যমান হওয়ার কারণ হলো- জন্মশতবর্ষের নানা আয়োজন থেকে এক মাসের কম দূরত্বে থাকা কীর্তিমান রণজিৎ গুহ বিদেশের মাটিতে প্রয়াত হলেন। বাংলাদেশের এই সন্তান প্রকৃতপক্ষে গোটা বিশ্বকে তাঁর জ্ঞান সাধনার দিকে তাকাতে বাধ্য করেছিলেন। আমরা গৌরবান্বিত এজন্য যে তিনি বাঙালি হিসেবে নি¤œবর্গের ইতিহাস চর্চার যে ধারা সৃষ্টি করে গেছেন তা বিশ্বজুড়ে নতুন জ্ঞানকাণ্ডের অনন্য দৃষ্টান্ত। একথা ঠিক- যে কয়েক জন হাতে-গোনা বিদ্বান মানুষের জন্য আজও বিশ্বের সারস্বত জগতে বাঙালি বলে পরিচয় দিতে গর্ব বোধ হয়, রণজিৎ গুহ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ২০১৯ সালে দুই খণ্ডে প্রকাশিত ‘রণজিৎ গুহ, রচনা সংগ্রহ’ বাঙালি পাঠকদের জন্য অসাধারণ চিন্তার আধার।

রণজিৎ গুহ বাংলাদেশের ভূতপূর্ব বাখরগঞ্জ জেলার (বরিশাল) সিদ্ধকাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৩২৯ বঙ্গাব্দ, ২৩ মে ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দ। সিদ্ধকাটিতে তাঁদের পৈতৃক তালুকদারি ছিল গুহ-বকশী নামে। তবে পারিবারিক গুহ-বকশী পদবিটি রণজিতের পিতার আমল থেকে কেবল গুহ হিসেবে গৃহীত হয়। পরিবারটি সুশিক্ষিত ছিল। রণজিতের পিতামহ ছিলেন একজন রাজস্ব কর্মকর্তা, এবং তার বাবা, রাধিকা রঞ্জন গুহ, একজন আইনজীবী যিনি পরে ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতির পদে উন্নীত হন। তাঁর বড় ভাই দেব প্রসাদ গুহ পালি ভাষায় সুপন্ডিত ছিলেন যিনি বহু বছর ধরে বার্মার (মিয়ানমার) রেঙ্গুন (বর্তমানে ইয়াঙ্গুন) এবং ভারতের বেনারসে শিক্ষকতা করেন। রণজিৎ গ্রামের স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। তাঁর পিতামহ তাঁর শিক্ষার প্রতি বিশেষ যত্নশীল ছিলেন। তিনি নিজগৃহে তাঁকে বাংলা, সংস্কৃত এবং ইংরেজি শিখিয়েছিলেন। রণজিৎ সিদ্ধকাটির গ্রামের স্কুল ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন এবং ১৯৩৮ সালে মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে বৃত্তি-সহ ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর তিনি প্রেসিডেন্সি থেকে বৃত্তি-সহ ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়নকালে রণজিৎ একজন মার্কসবাদী হয়ে উঠেন এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। দলীয় কর্মকান্ড তাঁর লেখাপড়ায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে; তাঁর জীবন থেকে একটি বছর বাদ যায় কিন্তু পরবর্তীতে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে বি.এ পাস করে ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে প্রথম শ্রেণিতে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।

প্রেসিডেন্সি কলেজে রণজিৎ গুহকে ইতিহাস পড়াতেন ইতিহাসবিদ সুশোভন সরকার, যিনি সেই প্রতিষ্ঠানে অনেক তরুণ ইতিহাসবিদকে পথ দেখিয়েছিলেন। গুহ A Rule of Property for Bengal (1963) গ্রন্থটি সুশোভন সরকারকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন কারণ তাঁর মতে, Ostoked so many of my first doubts তিরিশ ও চল্লিশ দশকে রণজিৎ গুহ যখন শিক্ষার্থী সেসময় কলকাতা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ক্ষতবিক্ষত। বিরূপ বিশ্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি তখন বামপন্থী আন্দোলনে সক্রিয়, মানব মুক্তির পথ অন্বেষণে উদ্দীপিত। প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়নকালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের ঐতিহাসিক উৎস সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয়। সেসময় তিনি ইতিহাসবিদ সুশোভন সরকার দ্বারা প্রভাবান্বিত হন। পাঠকদের কাছে আন্তোনিও গ্রামসির সৃষ্টিকর্মকে পরিচিত করা প্রথম পণ্ডিতদের একজন হলেন সুশোভন সরকার। রণজিৎ গুহ তাঁর সাহচর্যে এসে বাংলায় জমিদারিত্বের বিভিন্ন উদ্দীপক বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন যার ফলস্বরূপ ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় A Rule of Property for Bengal।

অন্যদিকে ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর, তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। এম.এ পড়ার সময় রণজিৎ বাংলার ইতিহাসকে সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত অধ্যাপক নৃপেন্দ্র কৃষ্ণ সিনহার অধীনে কাজ করেন। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জনে ব্যর্থ হন।

১৯৪২ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত রণজিতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশেষত বামপন্থী আন্দোলনে গভীর সম্পৃক্ততা তাঁর জীবনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৪০-এর দশকের প্রথম দিকে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে Students’ Cultural Society সংগঠিত করেন। এম.এ শেষ করার পর, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সংবাদপত্র স্বাধীনতাতে যোগ দেন এবং পত্রিকার জন্য অসংখ্য কলাম ও ফিচার লেখেন। ১৯৪৭ সালে তিনি বোম্বে চলে যান, সেখানে People’s War জার্নালের জন্য কাজ করেন। একই বছর ডিসেম্বরে World Federation of Democratic Youth-এর প্রতিনিধি হিসেবে প্যারিসে গমন করেন। ১৯৫৩ সালে কলকাতায় ফিরে এসে রণজিৎ কেশোরাম কটন মিল এবং ডক শ্রমিকদের মধ্যে অল্প সময়ের জন্য কাজ করেন। ছয় বছর পর মাটিয়াবুরুজ ও খিদিরপুরের কমিউনিস্ট আন্দোলনে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে নিয়োজিত হন।

কমিউনিস্ট আন্দোলনের সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে অতিবাহিত করার সময় গুহ ১৯৫৩ সালে শিক্ষকতা ও গবেষণার জগতে ফিরে আসেন। তিনি কলকাতা এবং তার আশেপাশের বেশ কয়েকটি স্নাতক পর্যায়ের কলেজে কয়েক বছর শিক্ষকতা করেন। কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরও নিয়মিত মহাফেজখানায় তাঁর পদচারণা ছিল। কিন্তু ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন হাঙ্গেরি আক্রমণ করলে গুহ কমিউনিস্ট পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন।

১৯৫৮-৫৯ সালে রণজিৎ গুহ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস বিভাগে যোগ দেন। সেখানে বিভাগীয় প্রধান ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের ভূতপূর্ব অধ্যাপক ও মেন্টর সুশোভন সরকার। কিন্তু গুহ চাকরি ছেড়ে ১৯৫৯ সালে ইংল্যান্ড চলে যান এবং পরবর্তী একুশ বছর সেখানে কাটিয়েছেন। প্রথমে ইউনিভার্সিটি অফ ম্যানচেস্টারে, পরে সাসেক্স ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ আফ্রিকান অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজের লেকচারার হিসেবে। সাসেক্সে তিনি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মেকথিল্ডের দেখা পান। ১৯৭০-৭১ সালে রণজিৎ গান্ধীকে নিয়ে গবেষণা করেন বই লেখার উদ্দেশ্যে sabbatical leave নিয়ে ভারতে উপস্থিত হন। দিল্লির স্কুল অফ ইকোনমিক্সে। গবেষণা মূল লক্ষ্য থাকলেও তিনি গুজরাট ভ্রমণ করেন। রণজিৎ দিল্লিতে মাওবাদী ছাত্রদের সংস্পর্শে এসে গান্ধী সম্পর্কে তাঁর অনুমান করা অধ্যয়ন ছেড়ে কৃষক বিদ্রোহ নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

বিদ্রোহী হিসেবে কৃষকদের প্রতি এই আগ্রহের প্রথম গবেষণাকর্মটি ছিল বাংলায় ১৮৬০ সালের নীল বিদ্রোহের উপর একটি বহুল আলোচিত নিবন্ধ যা রণজিৎ ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে কলকাতার র‌্যাডিক্যাল জার্নাল ফ্রন্টিয়ারে প্রকাশ করেছিলেন (পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে জার্নাল অফ পিজেন্ট স্টাডিজে প্রকাশের জন্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল)। বিশ বছর আগে রণজিৎ একইভাবে বাংলা জার্নাল পরিচয়-এ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে তাঁর মৌলিক ভাবনা প্রকাশ করেছিলেন। সত্তর ও আশির দশকে ফ্রন্টিয়ারে প্রকাশিত গুহের কিছু সেরা কিন্তু ক্ষুদ্র পরিসরের কাজ যেমন নকশালদের উপর পুলিশি দমন-পীড়নের তীব্র সমালোচনামূলক লেখাগুলো ছিল তীক্ষ ও প্রতিস্পর্ধী। যা প্রচলিত ইতিহাস কাঠামোর বাইরের ইতিহাস হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশেষত ১৯৭১ সালের ২৩ জানুয়ারি ফ্রন্টিয়ারে প্রকাশিত On Torture and Culture  প্রবন্ধটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৯৭১ সালে সাসেক্স ইউনিভার্সিটিতে ফিরে আসার পর, রণজিৎ ঔপনিবেশিক ভারতে কৃষকদের রাজনীতির উপর তাঁর শ্রমনিষ্ঠ গবেষণা শুরু করেন এবং শ্রেণিকক্ষে নিম্নবর্গের বিদ্রোহ নিয়ে শিক্ষাদানের সময়সূচি প্রচলন করেন। দশ বছর পরে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, গবেষণা অনুদান বা sabbatical leave ছাড়াই Elementary Aspects of Peasant Insurgency in Colonial India (দিল্লি, ১৯৮৩) শেষ করেছিলেন। এটি ছিল রণজিৎ গুহের দ্বিতীয় বই। ঠিক বিশ বছরের ব্যবধানে এটি প্রকাশিত হয়।

১৯৭৯-৮০ সালের মধ্যে রণজিৎ গুহের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডে অবস্থানরত একদল তরুণ ইতিহাসবিদ ঔপনিবেশিক ভারতীয় ইতিহাসের উপর একের পর এক নিবিড় বৈঠক ও আলোচনা শুরু করেন। এটি ছিল সাব-অল্টার্ন স্টাডিজের ধারণার সূচনা যা রণজিৎ দ্বারা উদ্ভাবিত একটি অনুধ্যান। রণজিৎ গুহ সম্পাদিত এই সিরিজের প্রথম খণ্ডটি ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয়। তিনি এই সংকলনকে আখ্যা দিয়েছিলেন editorial collective of Subaltern Studies পরবর্তীকালে সাব-অল্টার্ন স্টাডিজের কলেবর বৃদ্ধি পেতে থাকে।

১৯৮০ সালের শেষ দিকে রণজিৎ ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রিসার্চ স্কুল অফ প্যাসিফিক স্টাডিজে সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে যোগদান করেন। তিনি সাসেক্স ইউনিভার্সিটির চাকরি থেকে ইস্তফা দেন এবং ক্যানবেরায় স্থায়ী হন, যেখানে তিনি দীর্ঘদিন নৃবিজ্ঞান বিভাগের একজন ইমেরিটাস ফেলো ছিলেন। সেসময় শিক্ষাদানের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে রণজিৎ সাব-অল্টার্ন স্টাডিজের প্রথম ছয়টি খণ্ড (দিল্লি, ১৯৮২-৮৯) সম্পাদনার ভার বহন করেন। সময়গুলো ছিল তাঁর সবচেয়ে উদ্ভাবনী এবং চ্যালেঞ্জিং কাজগুলির অন্যতম। ১৯৮৯ সালে গুহ সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ সম্পাদনার সামগ্রিক দায়িত্ব ত্যাগ করেন, কিন্তু তিনি সেই প্রকল্পের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র রেখেছিলেন অনেকদিন। কারণ তার সঙ্গে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ সিরিজের সপ্তম খণ্ডে তিনি গান্ধীবাদী জাতীয়তাবাদের শৃঙ্খলাগত দিকটির উপর একটি প্রবন্ধ রচনা করেছেন।

১৯৯৪ সালে শাহিদ আমিন ও গৌতম ভদ্র লিখেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তিনি তাঁর একাডেমিক কাজে নিয়ে এসেছেন ভিন্নতর প্রেক্ষণী। তাঁর জীবনে ধ্রুপদী সাহিত্য ও ভাষা এবং অলঙ্কারশাস্ত্র সম্পর্কে গভীর কৌতূহল লক্ষ করেছেন। পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি ম্যাকবেথের বাংলা অনুবাদ নিয়ে পরিচয় পত্রিকায় একটি বিতর্কে তাঁর প্রবল উদ্দীপনা ও লেখনি বিস্তার কলকাতায় তাঁর সমসাময়িকদের অনেকেই তাঁকে স্মরণ করেন।

প্রকৃতপক্ষে, কথোপকথনে এবং লেখায়, ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায়, কৌতুক বা ব্যঙ্গ, উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা বা বিশ্লেষণাত্মক নির্ভুলতায়, রণজিৎ গুহ একজন পরিপূর্ণ এবং সাহসীভাবে আত্ম-সচেতন স্টাইলিস্ট হিসেবে গণ্য হয়েছেন। শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন জ্ঞান চর্চায় সক্রিয় একজন নিবেদিতপ্রাণ ইতিহাসবিদ। উত্তর-আধুনিক ইতিহাসচর্চায় তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন হাজার বছর। তাঁর মহাপ্রয়াণ আমাদের মনে শোকের দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে।

লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম এবং অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-drmiltonbiswas1971@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “রণজিৎ গুহ : কীর্তিমানের মহাপ্রয়াণ : ড. মিল্টন বিশ্বাস”

  1. মাসুদুজ্জামান says:

    তাঁর বাংলা বইগুলির আলোচনা নেই কেন!

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev