ঝমঝমিয়ে হঠাৎ ভাদুরে বৃষ্টির শব্দ তালেবেতালে। সঙ্গে রান্নাঘরের ক্যাকোফোনি। তবে শব্দ ছাপিয়ে এই মুহুর্তে ঘ্রাণ জয়ী। বাড়িময় ভেসে বেড়াচ্ছে চালতা চাটনির ভাজা মশলার ঝাঁঝ। নারকেল কুমড়ির আটপৌরে নরম সুগন্ধ। ইলিশের অভিজাত সুবাস।
অরন্ধনের আগের সন্ধ্যেয় রান্নাঘরে ব্যস্ত মা। রান্নার আঁচে মায়ের মুখে ঘামতেল। আমাদের নাকি ইচ্ছে আরান্ধ অর্থাৎ ভাদ্রমাসের যে কোনো শনি, মঙ্গল বারে সুবিধেমত পালন করলেই হল। বুড়ো আরান্ধর জন্যে ভাদ্রের সংক্রান্তি নির্দিষ্ট দিন।
ওবাড়িতে সেজ, ন’, নতুনঠাকুমারাও রাঁধছে মিষ্টি মিষ্টি ছাঁচিকুমড়োর ঘন্ট, নারকেল কোরা দিয়ে হালুয়ার মত ঘন মুসুরডাল (যেটা পরের দিন আরো ঘন হয়ে কেকের মত কেটে খেতে হবে) পাঁচভাজা, ইলিশের ঝাল আর চালতার চাটনি। সবার ঘরেই আজ আত্মীয়পরিজনের পাত পেড়ে একসঙ্গে খাবার আনন্দ।

পরের দিন অরন্ধন। তাই রান্নাবান্না থেকে ছুটি। নেহাত পান্তা খেতে সবার অরুচি, তাই গরম ভাতটুকু করতে হবে।
পাতের কোণে নিয়মরক্ষার একটু পান্তা।
মনসা দেবী জুড়ে আছেন ভাদ্রের এই অরন্ধনে বা রান্নাপুজোয়। সঙ্গে পুজো করা হবে উনুনকেও। সংসার যজ্ঞে সেটিই যে অগ্নিহোত্র!
এবাড়ি ওবাড়ি মিলিয়ে আছে সবেধন নীলমণি মাটির একটি উনুন। তাতে সকালবেলায় সদ্য সদ্য তিনচারটি পিটুলিগোলায় আঁকা সাপ লতিয়ে আছে। নাগ দেবতার মাথার ফণিতে মণির বদলে গোল করে কাটা কলার টুকরো। সিঁদুর আর হলুদ আর চন্দনের ফোঁটা। দু-চারটি ফুল আর দুধ দিয়ে, ঘন্টা নেড়ে পুরোহিত পুজো করবে কশ্যপ আর কদ্রুর কন্যা দেবী মনসাকে।

সে নাগেশ্বরীর বন্দনায় কত কাব্য, পালাগান, পাঁচালি, পটচিত্রকথা! জলজঙ্গলে ভরা বাংলার গ্রামের মানুষের সাপের সঙ্গে নিত্য বসবাস। বাস্তুসাপ বাড়ির সদস্য হয়ে নির্ভয়ে বংশবৃদ্ধি করে বাড়ির আনাচে কানাচে। ভয়ে, ভক্তিতে রাঢ়বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে মনসার থানে ফণি মনসার গাছ, পোড়ামাটির মনসার চালি, হাতি ঘোড়া সবাই স্থান পায়। পথে যেতে আসতে সেখানে নিত্য গড় করে হিন্দু-মুসলমান।
মধ্যযুগের অন্ধকারে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস কে আলো দেখিয়েছে মঙ্গলকাব্য। তার মধ্যে পদ্মপুরাণ বা মনসামঙ্গল অন্যতম। মনসামঙ্গলের কবিরা দেবিকে সাজিয়েছেন সর্পসজ্জায়। যেমন সুন্দর সাপেদের নাম, তেমন পদ্মাবতীর রূপসজ্জা।
“কনকচিতি নাগে দেবীর নাসিকা উজ্জ্বল
কুন্ডলিয়া নাগে হইল শ্রবণে কুন্ডল
বিঘতিয়া বোড়া হইল অঙ্গুলে অঙ্গুরি
গন্ধচিতি নাগ দেবীর কুমকুম কস্তুরি।”
কালচিতি নাগ দেবির হাতের বালা, কালনাগিনী চোখের কাজল। পদ্মনাগ শোভা পায় দেবির সুন্দর কিঙ্কিনী হয়ে, বেতনাগ তার বুকের কাঁচুলি।

মনসামঙ্গলের কবি দ্বিজ বিপ্রদাস শুধু দেবিকে বন্দনা করে, বসনেভূষণে সাজিয়েই ক্ষান্ত হ’ন নি। মনসা পুজোয় তিনি হিন্দুমুসলমানকে একতায় বেঁধেছেন। মনসার পুজোয় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার আমন্ত্রণ।
“নিবসে যবন যত তাহা বা বলি কত,
মোঙ্গল পাঠান মোকাদীম।
সৈয়দ মোল্লা কাজি কেতাব কোরাণ রাজি
দুই ওক্ত করে তছলিম।।
মসিদ মোকাম ঘরে সেলাম বাজায় করে
ফয়তা (উপাসনা) করয়ে নিত্য লোকে।
বন্দিয়া মনসা দেবী দ্বিজ বিপ্রদাস কবি
উদ্ধরিয়া ভক্ত সেবকে।।”
তিনি পৌরাণিক হয়েও বড় লৌকিক। আজন্ম দুঃখ পাওয়া মনসার দেবী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার সংগ্রামের গল্পে প্রান্তজনের মানুষ তাঁকে খুঁজে নিয়েছেন নিজেদের মধ্যে। দেবী যেন তাদেরই একজন। তাঁর লড়াই, সংগ্রাম যেন নিজেদেরই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা। নিজের লোক বলেই তাঁকে ভোগ দেওয়া যায় কচুর শাক, পান্তাভাত, চালতের অম্বল!

বর্ষা পড়তেই মনসার বাহনরা বংশবৃদ্ধিতে বড় সক্রিয়। আষাঢ় থেকে ভাদ্র গোটা বর্ষাকাল জুড়ে তাদের তুষ্ট করতে নানা উপাচারে, নানা পুজো। বেতের ঝাঁপিতে কালকেউটে নিয়ে শুকনো মুখ সাপুড়ের গ্রামেগঞ্জে দুটো পয়সা রোজগার।
ছত্তীশগঢ়ে থাকতে দেখেছি ঘোরলাগা সৌন্দর্যের কত বিচিত্র সাপ। পথেঘাটে কতবার শঙ্খলাগা সাপের অদ্ভুত মিলন দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়িয়েছি। সাপ জড়িয়ে থাকত আমাদের বাগানে লোহার গেটে। সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে শুয়ে থাকা সাপকে পাশ কাটিয়ে আমরা দোতলায় উঠে যেতাম। বিশাখাপত্তনমে অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি সিল্কের শাড়ি-গয়না পরে, দামি গাড়ি থেকে নেমে মহিলারা ঝোপঝাড়ে ঢুকছেন। গাড়ির চালককে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম উইয়ের ঢিপিতে তাঁরা নাগপঞ্চমীর পুজো করছেন। সাপ উই খেতে এসে তাদের ঢিপিতেই নিজের সংসার পাতে!
এ বিচিত্র দেশের বিচিত্র কাজে মা মনসা তাঁর সন্তানদের নিয়ে প্রবলভাবে রয়েছেন। গাঙুড়ের জলে কত বেহুলা লখিন্দরের জন্যে এখনো চোখের জলের ভেলা ভাসায়। মাতলানদীর নেতা ধোপানীর ঘাটে পর্যটক ভিড় করে। নাগেশ্বরীর কৃপায় এখনো ঝাড়ফুঁক, ওঝাগিরির রমরমা। স্বপ্নে নাকি তাঁর বাহনরা দেখা দিলে বংশবৃদ্ধি হয়! সাপুড়ের বীণের সুরে “মন ডোলে মেরা তন ডোলে” গান বাঁধা হয়। নাগিন সিনেমার রি-রিমেকের জয় জয়কার অনিবার্য। ল্যাবরেটরিতে সাপের বিষ, তার প্রতিষেধক নিয়ে নিরন্তর গবেষণা করেন বিজ্ঞানীরা।

চাঁদ সদাগরের পুজো নিয়েই নাগমাতা ক্ষান্ত হন না। ভাদ্রের শেষে বাজার দর নিয়ন্ত্রণ করেন তিনিই। আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির নিচে আলু-বেগুন-পটল নিয়ে বসা মাসির সঙ্গে এখন কেউ দরাদরি করতে পারেনা। দু-পাঁচ টাকা কমানোর কথা হলে সে প্রবল বেগে হাত আর মাথা নাড়িয়ে বলে, “আমি কিচ্ছুটি এখন সস্তায় দিতে পারবো নিকো। সংক্রান্তির রান্নাপুজো অবধি তরকারিপাতি এমনি আক্রা থাকবে বলে দিলুম!!