মণিপুরে নারী নির্যাতনের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কেরলে ৫ বছরের নাবালিকাকে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় শিউরে উঠেছেন সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, দেশে প্রতিদিন ৯১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। তার মানে প্রতি ১৫ মিনিটে একজন মহিলা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে ‘ক্রাই’ বা ‘চাইল্ড রাইটস অ্যান্ড ইউ’-এর একটি রিপোর্ট জানাচ্ছে, দেশে প্রতি ১৫ মিনিটে একজন নাবালিকা যৌন নিগ্রহের শিকার হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে দিল্লির নির্ভয়া কান্ডের জেরে উত্তাল হয়েছিল গোটা দেশ। অনেক টালবাহনার শেষে ৮ বছর পর ওই মামলায় ৫ জনের ফাঁসির সাজা ঘোষণা হয়। কিন্তু তাতে কি? দেশে যে ধর্ষণের ঘটনা কমেনি, তা প্রায় প্রতিদিন একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, তারপর আছে বিভিন্ন রিপোর্ট। যেমন ২০১৮ সালের একটি রিপোর্ট জানাচ্ছে, দেশজুড়ে কেবলমাত্র থানাতেই প্রায় ৩৪ হাজার ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। সাধারণ ভাবে গ্রামাঞ্চলে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের হয়না, তবে ৩৪ হাজার অভিযোগ মধ্যে মাত্র ২৭ শতাংশ দোষী সাব্যস্ত হয়। পাশাপাশি পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ, অনেক সময়েই এই অপরাধমূলক ঘটনাগুলি সঠিক ভাবে তদন্ত করা হয় না।
অন্যদিকে রিপোর্ট থেকেই জানা যাচ্ছে, শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধ গত ১০ বছরে বেড়েছে প্রায় ৫০০ গুণ। এই অপরাধগুলির মধ্যে প্রায় অর্ধেক ঘটছে ভারতের উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গে। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ উত্তর প্রদেশে, ১৪ শতাংশ মহারাষ্ট্র ও ১৩ শতাংশ মধ্যপ্রদেশে। দেশের ৩৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে ২৫টি রাজ্যেই শিশুরা নির্যাতনের শিকার হছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, গত কয়েক বছরে শিশুদের নির্যাতনের হার প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। যে হিসাবে থেকে বলা হচ্ছে, দেশে প্রতি ১৫ মিনিটে একটি শিশু যৌন নিগ্রহের শিকার হয়।দেশে এখনও এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে হাজার হাজার ঘটনা সরকারি খাতায় বা প্রশাসনের নজরে আসে না। নির্যাতিতা অনেক সময়েই লোকলজ্জার ভয়ে, পারিবারিক কারণে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন না। এর ফলে ধর্ষণকারী যেমন প্রশ্রয় পায়। তেমনই সমাজেরও ক্ষতি হয়।
লক্ষ্যনীয়, দেশে ইতিমধ্যে ধর্ষণের বিচার শুরু হয় ফার্স্ট ট্রাক কোর্টে।কিন্তু সেক্ষেত্রেও নির্ধারিত সময়ে যে বিচার সম্পন্ন হয়েছে তা বলা যাবে না। কারণ, অনেক সময়েই অনেক বেশি সময় লাগছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে দেশে দুর্বলদের ওপর সবলদের কর্তৃত্ব দেখাতে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। এমনিতেই মেয়ে ভ্রুণ হত্যার কারণে দেশে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা কম। যে কারণে, স্বাভাবিকের চেয়ে নারীর সংখ্যা ভারতে প্রায় ছ’কোটি ৩০ লাখ কম। অনেক সমাজ তত্ত্ববিদ মনেকরেন, পুরুষের সংখ্যা স্বাভাবিকের থেকে এত বেশি হওয়ায় নারীর ওপর যৌন নির্যাতন বাড়ছে।
এসবের পাশাপাশি আরও একটি অবস্থা সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হয়ে উঠেছে — এখন অনেক বেশি সংখ্যায় শিশুরা টার্গেট হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যানেই দেখা গিয়েছে, গর কয়েক বছরে শিশু ধর্ষণের ঘটনা দ্বিগুণ আকার নিয়েছে। দেশে ধর্ষণের শিকার নারীদের ৪০ শতাংশই শিশু। আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থায় নারী-পুরুষের অস্বাভাবিক অনুপাতের পাশাপাশি রয়েছে মানুষের উদাসীনতা। আমাদের দেশের কোনো ভোটেই নারীর অধিকার বা নিরাপত্তা কখনই ইস্যু হয় না। আরও হতাশার ব্যাপার হচ্ছে যে, দেশের বিচার ব্যবস্থাও প্রায়শেই রাজনৈতিক চাপের শিকার হছে। তার ফলে অনেক সময়েই ধর্ষকরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। সেই অনুসারে হিসাবটি দাঁড়ায় এইরকম — পাঁচটি ধর্ষণের মামলার মাত্র একটিতে অভিযুক্তরা দোষী সাব্যস্ত হয়।
অন্যদিকে শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন যে বেড়েই চলেছে তা জানিয়ে দিচ্ছে সরকারি হিসাব — গত পাঁচ বছরে দেশে ৫০ হাজারেরও বেশি নাবালিকা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। পরিস্থিতি যে কতটা ভীতিপ্রদ তা বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখে না। ভারতের জাতীয় মহিলা কমিশনের তথ্য জানাচ্ছে, ২০২১ সালে নারীদের প্রতি অপরাধের অভিযোগ ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশে নারীদের ওপর অপরাধের অভিযোগ ১৫ হাজার ৮২৮টি। এই সংখ্যাটি সর্বোচ্চ।এরপর রয়েছে দিল্লি- ৩ হাজার ৩৩৬, মহারাষ্ট্রে ১ হাজার ৫০৪, হরিয়ানায় ১ হাজার ৪৬০ এবং বিহারে ১ হাজার ৪৫৬টি৷
ধর্ষণের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ প্রতিবাদ মিছিল হয়, আন্দোলন হয়, কিন্তু ধর্ষণ থামেনি, বরং বেড়েছে। কেউ বলেন, নারীধর্ষণ বৃদ্ধির কারণ, বিচারব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা। কেউ বলেন, আমাদের দেশে ধর্ষণকারিরা তো বনেজঙ্গলে বা রাস্তাঘাটে জন্মায় না বা বেড়েও ওঠে না। সমাজেই বেড়ে ওঠে, এবং কোনো একটি চেতনাকে ধারণ করে। সেই চেতনার মূল কথা কি জীবনে ভোগের আনন্দ বাড়ানো? তাহলে তো তারা ভোগের আনন্দ বাড়াতে খুল্লাম খুল্লা নাচ দেখবে, পর্ণ ফিল্ম দেখবে, সম্ভোগ বাড়াতেই তারা নারীদেহে হাত দেবে, তাদের ধর্ষণ করবে…। দেখতে হবে ধর্ষণ নিজেই কোনও রোগ নাকি ভয়ানক এক রোগের লক্ষণ?