| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ধর্ষিতা বড়োগল্প লিখেছেন সমরেশ বসু (শেষ পর্ব)

Reporter
সমরেশ বসু / ৬০৮ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৯ এপ্রিল, ২০২১

আবার দরজায় শব্দ হতেই, আমি বললাম, কারুর সামনে বাইরে যাবার মতো আবুও আমার নেই। হঠাৎ সব চুপ, তারপরেই দু-একটা অস্পষ্ট কথা শুনতে পেলাম। ঘরের ভিতরে কী ঘটছে বুঝতে পারছি না। স্কাইলাইটের দিকে তাকালাম। অতখানি উঁচুতে উঠবার কোনও উপায় নেই। মিনিটখানেক পরেই, বাইরে থেকে সুইচ টিপে গোসলখানার আলো জ্বেলে দিল। দরজায় ঠক ঠক আওয়াজের সঙ্গে। ইয়াকুবের গলা শোনা গেল, দরজা খুলুন, এই কাপড় নিন, তৈরি হয়ে বেরিয়ে আসুন।কী করব? স্থির করে ওঠবার মুহূর্তেই আবার মনে হল, ইয়াকুব চলে গেলে দরজা গুলি করে ভেঙে ফেলবে। আশা করা ছাড়া, আমার আর কী করার আছে? আমি সাহস করে দরজা খুলে একটুখানি ফাঁক করে, বাইরে হাত বাড়ালাম। একটা কিছু আমার হাতে এসে পড়ল। আমি হাত ভিতরে নিয়ে এসে, দরজা বন্ধ করে দিলাম। কেউ বাধা দিল না। দেখলাম আনকোরা একটা নতুন সিল্কের শাড়ি। এক মিনিটের মধ্যেই কেমন করে এইরকম একটা শাড়ি এদের হাতে এল?

সে সব কথা ভাববার সময় পরেও পাব। এখন বাঁচার আশা আমার মনে।

আমি তাড়াতাড়ি কাপড়টা গুছিয়ে নিয়ে পরলাম। অভ্যাসবশতই বোধহয় আয়নার দিকে তাকালাম। ঘেঁড়া জামা সায়া ঢেকে সেই উজ্জ্বল সিল্কের শাড়ি পরে একটু অপেক্ষা করলাম। তারপর খোদার নাম নিয়ে দরজা খুলে বাইরে এলাম। ইয়াকুব কয়েক হাত দূরেই দাঁড়িয়ে। সেই একই বেশ, কোমরে রিভলবার। চোখ রক্তবর্ণ। বাইরে যাবার দরজার কাছে, অটোমেটিক বন্দুক হাতে একজন সেনা দাঁড়িয়েছিল। ইয়াকুব সেদিকে ফিরে হুকুম করল, তুমি বাইরে যাও। বলে সে এগিয়ে গিয়ে ভিতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ফিরে এসে টেবিলের কাছে দাঁড়াল। আমি তার দিকে না তাকিয়েও, ঠিক তার দিকেই নজর রেখে ছিলাম। সে আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, আমি সারাদিন শহরের বাইরে ছিলাম। কিছুক্ষণ আগে এসেই শুনলাম, আপনাকে ওরা ধরে নিয়ে এসেছে। সবথেকে যেটা বড় গলতি হয়ে গেছে, মিঃ শামসেরকে মেরে ফেলা। এর জন্য আমি নিশ্চয়ই কৈফিয়ত তলব করব। আমি দুঃখিত। জিজ্ঞেস করলাম, আমি এখন কোথায়? ইয়াকুব বলল, আপনি রমনার একটা বাড়িতে আছেন? আমি এখন তার সঙ্গে ইংরেজিতেই কথা বলছিলাম, আমার স্বামী তা হলে সত্যি মারা গেছেন? ইয়াকুব ঘাড় নেড়ে জবাব দিল, দুঃখের কথা, হ্যাঁ। তাঁর মৃতদেহ এখন কোথায় আপনি জানেন? না, মনে হয় ওরা কোথাও নিয়ে গিয়ে গোর দিয়েছে। আমার বুকের কাছে কিছু ঠেলে এল। আমি কথা বলতে পারলাম না। আমার মন বলছে, মোরশেদকে আর কোনওদিন দেখতে পাব না। আর মুশতাক–আমার মুশতাক, সে-ই বা এখন কোথায়? তাকেও কি আর কখনও দেখতে পাব?

গেলাসে হুইস্কি ঢালার শব্দে আমি টেবিলের দিকে ফিরে তাকালাম। ইয়াকুব গেলাসে হুইস্কি ঢালছে, কিন্তু তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে। ওই চোখের নজর আমার প্রথম দিন থেকেই চেনা। ভয়? হ্যাঁ এখনও আছে। কিছুই হয়তো আর বাকি নেই, তবু বেঁচে আছি। বেঁচে থেকে পীড়ন সহ্য করা বড় যন্ত্রণা। ইয়াকুবকে কি আমি বিশ্বাস করব? হা বিশ্বাস! মোরশেদ বিশ্বাস করেই মরল। ইয়াকুব হুইস্কির গেলাসে পানি ঢেলে চুমুক দিল। জিজ্ঞাসা করলাম, আমাকে নিয়ে আপনারা এখন কী করতে চান? ইয়াকুব বলল, যা আপনার মর্জি। চান তো, আপনার ধানমণ্ডির মোকামে আপনাকে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। তবে এই রাত্রে সম্ভব হবে না। ভোর না হলে, আমাদের শহরে ঘোরা নিষেধ। আমি তা জানি। দিনের বেলা কারফিউ দিয়ে, এলাকা ঘিরে ঘিরে, গ্রেপ্তার লুঠ খুন আর ধর্ষণ। রাত্রি হলেই মুক্তিদের ভয়ে বন্দুক বাগিয়ে অন্ধকারে আত্মরক্ষা। জিজ্ঞাসা করলাম, আমার মোকাম কি আস্ত আছে? ইয়াকুব জবাব দিল, কোনও মোকাম উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে কিছু খবর নেই। তবে কিছু লুঠপাট হয়ে থাকতে পারে। বেশ সহজভাবেই ইয়াকুব কথাগুলি বলল। মনের মধ্যে কোনও অহংকার বা জেদ না থাকলে এরকম সাফ কথা ভাল। কিন্তু সত্যি কি আমি আমার ধানমণ্ডির মোকামে ফিরে যেতে পারব? পারলেও, আমি কি সেখানে আর থাকতে পারব? অসম্ভব। তা আমি বুঝে নিয়েছি। আবদুল ও কুলসমের কথা মনে পড়তেই, জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি আমার ঝি-চাকরের সংবাদ কিছু জানেন?ইয়াকুব হঠাৎ কোনও জবাব দিল না। আমারই, শরীরের নীচের দিকে তাকিয়ে, গেলাসে চুমুক দিল। মুখ নিচু করেই, একটু যেন শক্ত গলায় বলল, ঝি-চাকরের সংবাদ আমাকে কেউ জানায়নি। বলে সে আমার দিকে তাকাল। রক্তবর্ণ চোখ। ইয়াকুবের মুখটা যেন কেমন বড় আর মোটা মোটা দেখাচ্ছে। রোদলাগা আয়নায় যেমন চোখ রাখা যায় না, আমিও তেমনি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। নজর ফিরিয়ে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করতে গেলাম, তা হলে এ রাত্রিটা আমি কোথায় থাকব? কেননা, মনে মনে স্থির করেই নিচ্ছি, একবার এখান থেকে ছাড়া পেলে, কিছু একটা গতি হতে পারে। সামাদ সাহেবরা বা পাড়ায় কি অন্য কেউ নেই? আবদুল আর কুলসমকে পেলেও শহরের বাইরে পালিয়ে যাবার একটা ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু তার আগেই ইয়াকুব বলল, আপনার ছেলেই আপনাদের এই অবস্থার জন্য দায়ী। কথাটা শোনা মাত্র ঘৃণায় আর রাগে আমার ভিতরটা জ্বলে গেল। বোধহয় তার ছাপ আমার মুখেও ফুটে থাকবে। কিন্তু আমি এ কথার কোনও জবাব তাকে দিলাম না। কথাটা কি আপনি বিশ্বাস করেন না? ইয়াকুব সোজাসুজি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কথাটা জিজ্ঞাসা করল। দেখলাম তার মুখ কঠিন, রক্তচোখ যেন জ্বলছে। বললাম, এখন আর এ সব কথায় কিছু যায় আসে না। ইয়াকুব মুহূর্তেই পাঞ্জাবি লেঃ কর্নেল হয়ে উঠল। মেঝেতে বুট ঠুকে গর্জন করল, যায় আসে। তোমাকে মুখ খুলে বলতেই হবে। এই প্রথম সে আমাকে তুমি বলল। মুশতাকের মুখ আমার মনে পড়ল। ভয়? আর আমার কীসের আশা? ইয়াকুবকে আর চিনতে ভুল হওয়া উচিত না। সে সেই একই পাঞ্জাবি, নতুনত্ব কিছুই নেই। নরম করে কথা বা মিথ্যা কথা কেন বলব? সামাদ সাহেবের বারো বছরের ছেলেটাকে তারা নিয়ে গেছে। মুশতাক ঘরে থাকলে, ছেড়ে দিত? এখন মুশতাককে দায়ী করছে। বাঘ সেই জল ঘোলা করার ছলনা করছে। চোখ দেখে আমি চিনতে পারছি। ইয়াকুবের এইটুকুই বৈশিষ্ট্য।

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে সে আবার গর্জন করে উঠল, মুখ খোলো৷আমি ইয়াকুবের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বললাম, বিশ্বাস করি না। ছলাৎ করে আমার দুই ঘোলা চোখে হুইস্কি ছিটকে পড়ল। ইয়াকুব গেলাসটা ছোড়নি। আমি চোখে হাত চাপা দিলাম। চোখ জ্বলে যাচ্ছিল। আমি ইয়াকুবের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম, বাঙালি কুত্তাকুত্তিরা সবাই সমান। তারা সত্যি কথা বলতে শেখেনি। ইচ্ছা করল, চিৎকার করে বলি–পাঞ্জাবি কুত্তা, তোরা বুঝি শিখেছিস? চোখ থেকে হুইস্কি মুছে ফেলার আগেই, ইয়াকুবের গায়ের স্পর্শ আমার গায়ে লাগল। ঘাম আর হুইস্কির গন্ধ। ছিটকে সরে যাব? কোথায়? শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে, দম বন্ধ করে, পরের অ্যাকশনের অপেক্ষা করতে লাগলাম। বুঝতে পারছি সে আমাকে এখুনি ছোঁ মেরে তুলে নেবে।

কিন্তু আমার আশঙ্কা মিথ্যা হল। আমি কানের কাছে তার শান্ত মোটা গলা শুনতে পেলাম, মিঃ শামসের একজন খাঁটি লোক ছিল। তাকে মেরে ফেলাটা গলতি হয়েছে। কিন্তু তোমার ছেলে মুক্তি না হলে, এ সব দুর্ঘটনা কিছুই ঘটত না। এ কথা তুমি কী করে অস্বীকার করছ! এ সব কথার কোনও জবাব নেই। আমি চোখ মুছতে লাগলাম। ইয়াকুব আমার গায়ের কাছে আরও ঘন হয়ে এল। আমার কাঁধে তার হাত রাখল। আঃ খোদা, আমি তো হাতেমতাইয়ের জাদু জানি না। গুটিয়ে যেতে পারি না, অদৃশ্য হয়ে যেতে পারি না। কেবল দাঁতে দাঁত চেপে, শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি। ইয়াকুব আমাকে আর এক হাত দিয়ে ধরে, তার দিকে ফেরাল। আমার চোখ তখনও জ্বলছে, চোখ মুছছি। ইয়াকুবের হাত আমার শরীরে ঘুরছে, ঘুরতে ঘুরতে যেখানে এসে ঠেকল, আমি হাত দিয়ে বাধা না দিয়ে পারলাম না। ইয়াকুব জোর করল না, কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর ব্যাপার হল, আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না। সে মাতাল মিঠা গলায় ডাকল, বুলবুলি। চোখের জ্বালা ভুলে, আমি তার দিকে তাকালাম। নিজের নামটা আমি নিজেই মনে মনে একবার উচ্চারণ করলাম। তারপরে তার সেই কামার্ত লুব্ধ মুখের উপর থুথু ছিটিয়ে দিলাম। এক ঝটকায় কয়েক হাত সরে গেলাম। রাগে আর ঘৃণায় আমি কথা বলতে পারছিলাম না।

ইয়াকুব রিভলবারে হাত রেখে, অন্য হাতে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছল। মুছতে মুছতেই বলল, দেখো বুলবুলি, আমি অনেক বাঙালি অওরতকে দেখলাম, তোমার মতো কাউকে পাইনি। অন্য কোনও অওরত হলে তাকে আমি একটি গুলিতেই খতম করতাম। এফ আই ইউর ক্যাপটেনের ওপরেও আমার মেজাজ বিগড়ে গেছিল, কেন সে তোমার ওপর জুলুম করেছে। তুমি। আমাকে থু দিয়েছ? বলে সে আমার দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল। আমি কিছু বললাম না। সে আবার বলল, তোমাকে বুলবুলি বলে ডেকেছি বলে? আমি তোমাকে বুলবুলি বলেই ডাকব। দরকার। হলে, তোমাকে আমি পাঞ্জাবে পাঠিয়ে দেব।বলতে বলতে সে আমার দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে এল। আমি বললাম, আবার আমি থুথু দেব। সে আমার গায়ের কাছে দাঁড়িয়ে বলল, তবু আমি তোমাকে। খুন করব না।বসে এক পলক সময় না দিয়েই, সে আমার বুকের শাড়ি আর জামা একসঙ্গে চেপে ধরে হ্যাঁচকা টান মারল। আমি তার গায়ের ওপরে গিয়ে পড়লাম। বাধা দেবার আগেই, তার নিজের দেওয়া সিল্ক শাড়ির আঁচল টেনে নামিয়ে দিল। আমি বুকের কাছে হাত জড়ো করে ধরতেই, সে নিচু হয়ে, ভাল্লুকের মতো দুহাত দিয়ে আমার সায়াটা ছিঁড়ে দিল। আমি উপুড় হয়ে বসে পড়লাম। সে পিছন থেকে এক টানে জামা আর অন্তর্বাস টেনে ছিঁড়ে দিল। বুকে অসহ্য যন্ত্রণা লাগল। তবু আমি মুখ না তুলে, হাঁটুতে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে রইলাম। সে পিছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরে টেনে তুলল। আমি হাত-পা ছোঁড়া সত্ত্বেও সে আমাকে মারল না। গায়ের জোরে এক এক করে আমাকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে দিল। খাটের বিছানায় তুলে দিল। নিজেকেও সে আবৃত রাখল না। আমাকে শরীর দিয়ে চেপে ধরে নিজেকে সে অনাবৃত করল, আর আঃ খোদা, আমি অজ্ঞান হলাম না, জীবন্ত দোজখের যন্ত্রণা ভোগ করলাম, আর মনে হল, আমার মাথাটা একেবারে শূন্য।

কতক্ষণ পরে জানি না, দরজায় খটখট আওয়াজ শোনা গেল। ইয়াকুব চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করল, কে? দরজার বাইরের জবাব আমি ভাল শুনতে পেলাম না। ইয়াকুব চিৎকার করে বলল, যাচ্ছি।তারপরে লোকটার মায়ের উদ্দেশে একটা খারাপ গালি দিল। সে আমার ওপর থেকে উঠতেই, আমি বিছানার চাদরটা গায়ের ওপর টেনে নিলাম। দরজা খোলার শব্দ পেলাম। কথাবার্তা কিছুই স্পষ্ট শুনতে পেলাম না, পাবার মতো আমার অবস্থাও ছিল না। একটু পরেই আবার ভিতর থেকে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে পায়ের আওয়াজ দূরে চলে গেল। ইয়াকুবের হুকুম শোনা গেল, ওঠো, জামা কাপড় পরে নাও।তারপরেই চাদরে ঢাকা আমার গায়ের ওপরে ঝুপ করে কী সব পড়ল। বুঝতে পারলাম, আমারই ছেঁড়া জামা-কাপড়। গোসলখানার দরজাটা দড়াম করে বন্ধ হল। তৎক্ষণাৎ যেন আমার মাথায় বিজলি। হেনে গেল। আমি চাদর সরিয়ে উঠে পড়লাম। সায়া বা জামার দিকে হাত না বাড়িয়ে, কোনওরকমে শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নিলাম। ছুটে গিয়ে সাবধানে, আওয়াজ না করে ছিটকিনি খুললাম। অন্ধকার, কিন্তু। যা আশা করেছিলাম, তাই হল। দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে নেই। ডান দিকে রেলিংয়ের আভাস দেখে। সেখানে এগিয়ে গেলাম।

অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছে, রেলিং টপকালেই গাছপালা আর ঘাস। মনে হল বাগান। আমি একতলাতেই ছিলাম। আর একটুও না ভেবে, রেলিং টপকালাম। টপকে সামনে তাকিয়ে মনে হল। গাড়ি বারান্দা, সেখানে লোজন রয়েছে মনে হয়। আমি পিছন ফিরে দেয়ালের গা ঘেঁষে মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে এগোলাম। তখনই একটা চিৎকার আমার কানে এল, আর্দালি! সঙ্গে সঙ্গে বুটের দ্রুত ছুটে যাওয়া। কিন্তু ঠিক আমার উলটো দিকে। আমি কোমর ভাঙা গোসাপের মতো চলতে চলতে, হঠাৎ নর্দমার মধ্যে পড়ে গেলাম। খুব বড় না, ছোটও না। আর মনে হল, নর্দমায় ময়লার চেয়ে পানি বেশি। ওদিকে তখন হাঁক-ডাক চলছে। টর্চের আলো ঘুরছে। আমার মাথার ঠিক নেই। আমি নর্দমা বেয়েই চলতে লাগলাম। একটা গাড়ির ইঞ্জিন গর্জে উঠল, আর মনে হল, সেই গর্জনটা অনেকখানি জায়গা জুড়ে খ্যাপা বাঘের মতো পাক দিয়ে বেড়াচ্ছে, আর টর্চের আলো ঝলকে উঠছে। আমি থামছি না। নর্দমা কামড়ে চলছি আর মনে হচ্ছে নর্দমাটা যেন আরও বেশি পিছল হয়ে যাচ্ছে। তারপরে হঠাৎ আমার মাথাটা জোরে ঠুকে গেল, আর মনে হল, আমি যেন একটা অন্ধকার কুয়ার মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। মাথা ঠোকার যন্ত্রণা আমার নেই। কিন্তু কোথায় পড়ে যাচ্ছি, সেটা বোঝবার জন্য সামনে উঁচুতে হাত বাড়াতেই, দেয়াল পেলাম। হাত দিয়ে নিজেকে ঠেলে রাখলাম। নীচের দিকে তাকিয়ে মনে হল, আরও বড় গভীর নর্দমা সামনে। ঠিক এ সময়েই একটা আলোর ঝলক দেখলাম। মুখ তুলেই দেখলাম, টর্চের আলো পড়েছে রেলিংয়ের উপর। মনে হল, আমি যে বাড়িতে আছি, এই রেলিং তার সীমা। বাইরে বোধহয় রাস্তা। টর্চের আলো একবার বাঁয়ে আর একবার ডাইনে ঘোরাফেরা করল। নর্দমায় নেমে এল না, খোদার শুকুর। কিন্তু এ রেলিং বেশ উঁচু, মনে হয় আমার বুকের সমান। ছোট ফাঁক, শরীর ঢুকবে না। জায়গাটা যে কোথায়, কিছুই বুঝতে পারছি না। রমনাই কি সত্যি? ক্যান্টনমেন্ট না, তা বুঝতে পারছি। তার চেহারা আলাদা। এখানে কী ধরনের কাজ হয়, বুঝতে পারি না। কেবল কি মেয়েদের ধরে আনে এখানে?

হঠাৎ একসঙ্গে কয়েকটা গাড়ি যেন বেরিয়ে গেল। তারপরে সব চুপচাপ। কোনও সাড়াশব্দ নেই। টর্চের আলোও পড়ছে না। তবু উঠে দাঁড়াবার আগে, আর একবার ভাবলাম। তারপরে নর্দমার ধারে হাত রেখে মাথা তুললাম। চারদিকেই অন্ধকার। কিন্তু রেলিংয়ের বাইরে যে একটা রাস্তা, তাতে সন্দেহ নেই। এবার খোদা যা করেন। পিছল নর্দমার উপর থেকে সাবধানে উঠলাম। কাছেই একটা বড় গাছ দেখে হামাগুড়ি দিয়ে তার নীচে গেলাম। হঠাৎ টর্চের আলো ফেললেও লুকোনো যেতে পারে। রেলিংয়ে ওঠারও সুবিধা আছে। দেরি করলাম না, রেলিংয়ের লোহায় হাত দিয়ে আর এক পা গাছে। ঠেকিয়ে উঠতে গিয়েই ধপ করে পড়ে গেলাম। কিন্তু এখন আমার শরীরে যন্ত্রণা বোধ নেই। পায়ের তলা দূর্বায় ঘষে, আবার চেষ্টা করলাম। শেষ চেষ্টায় ওপারে গিয়ে পড়লাম, কিন্তু শাড়ি ছিঁড়ে গেল। বাঁ হাতের বগলের নীচে রেলিংয়ের খোঁচায় অনেকখানি আঁচড়ে গেল। সেদিকে দেখবার সময় আমার ছিল না। কোমরের কাছে কাপড় চেপে ধরে উলটো দিকে ছুটতে লাগলাম। আবার বাঘের ঘরেই যাচ্ছি কি না, না জেনেই ছুটতে লাগলাম। সবসময়েই কোনও না কোনও মোকামের দেওয়াল কিংবা রেলিং বা বাগান ঘেঁষে। অন্ধকারে আমি যেন তখন সবই দেখতে পাচ্ছিলাম। গোটা শহরটা যেন কবরখানার মতো নির্জন নিঝুম। খোদাকে বললাম তোমার জগৎকে এখন এমনি কবরখানা করেই রাখো।….

কতক্ষণ ছুটেছি জানি না। এক সময়ে আমার মনে হল, আমি ছোট রাস্তায় ঢুকেছি। আশেপাশে ঘিঞ্জি বাড়িঘর। সবই চুপচাপ, অন্ধকার। মনে হল কোনও বাড়ি-ঘরে লোকজন নেই। কিন্তু আমি আর পারছিলাম না। অথচ বুঝতে পারছিলাম না, কোন এলাকা? বিহারি এলাকা না তো? মনে হয় না। একটা বাড়ির পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পাঁচিলের মধ্যে দোতলা বাড়ি, গাছপালা আছে। পাঁচিলের পাশে পাশে এগিয়ে দেখলাম কাঠের গেট। হাত দিয়ে দেখলাম, আলগা খিল। তারপর খুলে ভিতরে ঢুকলাম। খোলা জায়গা পেরিয়ে বাড়ির বারান্দায় উঠলাম। তারপর? না, ভাববার সময় নেই, দরজায় আস্তে টুক টুক করে আওয়াজ করলাম। কোনও জবাব নেই। একটু থেমে আবার দরজা ঠুকলাম। থেমে থেমে ছ-সাতবার ঠুকবার পরেও যখন খুলল না, বুঝলাম খালি বাড়ি ফিরতে যাব, ক্যাঁচ করে একটি আওয়াজ হল। মনে হল, দরজা একটু ফাঁক হল। ভিতরে অন্ধকার। বোধ হয় আমাকে একলা দেখেই ভিতরের মানুষের একটু ভরসা হল। চাপা গলা শোনা গেল, কে? বাঙালি! আমি দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললাম, আমাকে একটু ঢুকতে দিন, বাঁচান, ভয় পাবেন না, আমি একটা মেয়ে! মনে হল, ভিতরে কয়েকজন লোক আছে। স্ত্রীলোকের চাপা গলাও যেন শুনতে পেলাম। মনে। হল তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। তারপরে শুনতে পেলাম, আসেন। নসিবে কী আছে জানি না, ভিতরে ঢুকে পড়লাম। দরজা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল। একমাত্র ভরসা, এখানা বাঙালির মোকাম মনে হচ্ছে।…

কিন্তু যাক, আর এ সব কথা লিখে কী হবে? আমি ঠিক আশ্রয়েই উঠেছিলাম। আমার আশ্রয়দাতারা জানে, আমি আক্রান্ত হয়েছিলাম, পালিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছি। আজ যারা নিপীড়িতা বলে পরিচিতা, তার কোনও পরিচয় আমার নেই। আমি একদিন আমাদের ধানমণ্ডির বাড়িতে টেলিফোনও করেছিলাম। কোনও জবাব পাইনি। বুঝতে পেরেছিলাম, বাড়িটা ফাঁকা পড়ে আছে। পরে ফিরে এসে দেখেছি, আলমারি ও সিন্দুক ছাড়া আর কিছুই ভাঙা হয়নি। টাকা গহনা ছাড়া, বিশেষ কিছু খোয়া যায়নি। পিয়ানোটার উপরে আঘাতের দাগ দেখেছি। টেলিভিশন সেট বিকল। রেডিয়োগ্রামটা ঠিকই ছিল।

তিন দিন আগে হাফেজ সাহেবের ছেলে আতাউর এসেছিল। ওর মুখেই শুনেছি, আমার মুশতাক নেই। বলতে গেলে আতার চোখের সামনেই নাকি মুশতাক মারা যায়। মুশতাক নাকি কেবল দুঃসাহসী ছিল না, সে কারুর কথা মানত না। অনেক সময় কিছু হিসাব-বিবেচনা না করেই সে খান মিলিটারিদের। উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, আর তা করতে গিয়েই মারা যায়। মুশতাককে খানেরা গুলিতে ঝাঁজরা করে দিয়েছিল। কিন্তু নুরও ফেরেনি, আতার ছোট ভাই, হাফেজ সাহেবের ছোট ছেলে। সে মারা গেছে। সামাদ সাহেবের বারো বছরের ছেলেটি ফিরে এসেছে। মাথার ঠিক নেই। আবোলতাবোল কথা বলে। সবসময়েই যেন ভয়ে কুঁকড়ে থাকে। ওর কাছ থেকে এফ আই ইউ-এর লোকেরা পাড়ার ছেলেদের। খবর জানতে চেয়েছিল, ভীষণ মারধোর করেছে। আর যা করেছে, তা লেখা যায় না।

মোরশেদ আমার চোখের সামনেই গেছে। যখনই আতাকে কাছে পাই, ডেকে ডেকে মুশতাকের কথা জিজ্ঞাসা করি। খান সেনারা আর এ দেশে নেই। কিন্তু আমার মুশতাক আর ফিরে এল না। আম্মার কাছে তার সেই শেষ কদমবুসি।…

লেখা এখানেই শেষ, এবং মনে হয়, যেন আকস্মিকভাবেই লেখিকা লেখা থামিয়ে দিয়েছে। পাতা উলটে দেখলাম, আর কিছুই লেখা নেই। কোনও রকমে কয়েকটা ভয়ংকর দিনের স্মৃতিচারণ মাত্র। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের অবস্থায়, কী ভেবেছে, কী প্রতিক্রিয়া তাঁর মনে ঘটেছে, সে বিষয়ে একটি কথাও নেই। জয়ের উল্লাস বা বিজয়ের গর্ব বা মুক্তির আনন্দ, অথবা ঘরে ফিরে আসতে পারার শান্তি, কোনও কথাই নেই। সেই ভৃত্য আবদুল বা বালিকা দাসী কুলসমেরও কোনও কথা নেই।

নোটবইটা বন্ধ করে, আমি যেন একটা বিস্মিত তীব্র কৌতূহলে নোটবইটাকে তাকিয়ে দেখলাম। চোখ বুজলাম। কেন যেন একটিমাত্র মুখই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। কিন্তু আমি মনে মনে বললাম, না।তবু সে মুখ চোখের সামনে জেগে রইল। নোটবইটা আবার রেখে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। সেই মুখই আমার চোখের সামনে ভাসছে।

পরের দিন স্নানের পরে, ব্রেকফাস্ট শেষ করতেই এক সাংবাদিক বন্ধু ঘরে এলেন। এলেন আসলে তাঁর বাড়িতে দাওয়াত জানাতে। এমন সময়েই টেলিফোন বাজল। গলার স্বর শুনেই চিনতে পারলাম, আনোয়ারা খান কথা বলছেন। বললেন, সালামওয়ালাইকুম। শুভ সকাল।

হেসে বললাম, শুভ সকাল।

ওপার থেকেও হাসির সঙ্গে প্রশ্ন এল, রাত্রে ভাল ঘুমিয়েছিলেন?

বললাম, তা ঠিক বলা যায় না। আমি আপনার দেওয়া সেই লাঞ্ছিতার ডায়রিটা রাত্রেই শেষ করেছি।

ওপার থেকে হঠাৎ কোনও কথা শোনা গেল না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হ্যালো।

জবাব এল, হ্যাঁ। তা হলে তো আপনার রাত্রিটা এক রকম দুঃস্বপ্নে কেটেছে।

বললাম, এক রকম তাই বলতে পারেন।

আনোয়ারা সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ব্যস্ত আছেন? বললাম, এই মুহূর্তে না।

তবে আসুন না একবার, একটু গল্প করি।

বেলা প্রায় দশটা। এখন যাওয়া কি ঠিক হবে? ওপার থেকে আবার প্রশ্ন এল, অসুবিধা আছে?

বললাম, ঠিক তা না, তবে বেলা তো হল।

আনোয়ারা বললেন, আসুন না ভাই। গাড়িটা পাঠিয়ে দিচ্ছি। একবার একটু ঘুরে যান। অসুবিধা না হলে আমার এখানেই দুপুরে খেয়ে যাবেন।

তাড়াতাড়ি বললাম, তার দরকার নেই। গাড়ি পাঠান, আমি যাচ্ছি।

কৃতজ্ঞ খুশির স্বর শোনা গেল, লক্ষ্মী ভাই আমার।

লাইন কেটে দিলেন। সাংবাদিক বন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, কার সঙ্গে কথা হচ্ছিল? আমি নাম বললাম। বন্ধুটির মুখ সশ্রদ্ধ গাম্ভীর্য ও ব্যথায় ভরে উঠল। বললেন, ভদ্রমহিলা কোনও রকমে বেঁচে গেছলেন। কিন্তু আর সবাইকে হারালেন।

বলে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে, উঠে বললেন, চলি, সন্ধ্যা সাতটায় আপনাকে নিতে আসব।

তিনি বিদায় নিলেন। মিনিট পনেরো পরেই রিসেপশন থেকে টেলিফোনে খবর দিল, গাড়ি এসেছে। নোটবইটা নিয়ে আমি দরজা বন্ধ করে নীচে নেমে গেলাম। ড্রাইভার আমার চেনা। সে আমাকে সেলাম দিল। প্রায় পনেরো মিনিটের মধ্যেই মিসেস আনোয়ারা খানের গৃহে পৌঁছলাম। তিনি বাইরের ঘরেই বসে ছিলেন। একলা, আর কেউ ছিল না। এগিয়ে এসে ডাকলেন, আসুন।

দুজনেই কপালে হাত ছোঁয়ালাম। বসবার আগে তাঁকে আমি নোটবইটি এগিয়ে দিলাম। তিমি হাত বাড়ালেন, তাঁর দৃষ্টি আমার চোখের প্রতি। তারপরে নোটবইটার দিকে তাকালাম, আবার আমার চোখের দিকে, তাঁর কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা, এবং একটু কি অনুসন্ধিৎসাও রয়েছে? নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, পড়লেন?

আমি তাঁর চোখের দিকে চেয়ে বললাম, নিশ্চয়।

তিনিও চোখ না সরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন? কী মনে হল?

এক কথায় বললাম, নৃশংস।

আনোয়ারা খানের মুখ বিমর্ষ হয়ে উঠল। কিন্তু তিনি আবার আমার চোখের দিকে তাকালেন। বোধহয় একটা দীর্ঘশ্বাসে তাঁর বুক ফুলে উঠছিল। তিনি সামলে নিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আর কিছু মনে হল না?

এবার আমি ওঁর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বললাম, মিসেস শামসেরের নিঃসঙ্গ জীবনের কথা ভাবতে আমি সাহস পাই না।

আনোয়ারা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন, একটু অস্ফুট স্বরে বললেন, আসছি।

মুখটা ফিরিয়ে চলে গেলেন। নীলা ইদ্রিসের গানের কথা আমার মনে পড়ে গেল। সুখে আমায় রাখবে কেন…।

ঘরের এক পাশে পিয়ানোটার দিকে ফিরে তাকালাম। নীল কাপড়ের কভার দিয়ে ঢাকা। আর এক পাশে রেডিয়োগ্রাম। বাঁ দিকে ডাইনিং হলের পার্টিশনের দেওয়ালের দিকে আমার চোখ গেল। পার্টিশনের ওপারে, ডাইনিং রুমের পিছনের দেওয়াল ঘেঁষে, ওপরে যাবার সিঁড়ির রেলিং দেখতে পাচ্ছি। ডায়রিতে লেখা মোরশেদ সাহেবের বাড়ির বর্ণনা মনে করবার চেষ্টা করলাম। বাড়িটা কী নিঝুম! নীলা ইদ্রিসের গান আবার আমার মনে পড়ল, আজি যে রজনী যায় ফিরাইব তায়…আর মনে পড়ল।

আনোয়ারা ফিরে এলেন। রক্তের ছটা মুখে। দুচোখেও। নিজেই বললেন, এখন একটু চা খান।

বললাম, দিন।

তিনি সেখান থেকেই গলা একটু তুলে বললেন, বশীর, একটু চায়ের জল বসাও।

ভিতর থেকে জবাব এল, জি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই ডায়রির লেখিকার সেই ঝি-চাকরদের আর কোনও সংবাদ পাওয়া যায়নি?

আনোয়ারা আমার চোখের দিকে তাঁর দুচোখের কালো তারা পূর্ণ করে মেলে ধরে বললেন, গেছে।

কী হয়েছে তাদের?

আবদুল বেঁচে আছে। কুলসম একটা নিপীড়িতা মেয়েদের ক্যাম্পে আছে। সে এখন গর্ভবতী।

আমি কোনও কথা বলতে পারলাম না। আনোয়ারার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। আনোয়ারা চোখ সরিয়ে, শুন্যে তাকিয়ে রইলেন। বাইরে মার্চের বাতাস, বাংলাদেশের বসন্ত আসন্ন, এই দুপুরের মুখে কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠছে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev