কি নেই? রামনগর-২ ব্লকের প্রত্যন্ত এলাকার এই প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালায়? রাজ্যের ও দেশের বহু নামকরা সরকারি বেসরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালাকে টেক্কা দেওয়ার মত সংগ্রহশালার সংগ্রহের তালিকায় রয়েছে দু-হাজার বছরের প্রাচীন রোমান অ্যামফোরা, অধুনালুপ্ত প্লিস্টোসিন যুগের অতিকায় বন্য বাইসনের মাথার জীবাশ্ম, প্রাচীন যক্ষিণী মূর্তি, দশম শতকের মহাবীর মূর্তি, ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিষ্ণু মূর্তি। এছাড়াও এই সংগ্রহশালায় রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম, নানা ধরণের শিলা, উল্কাপিন্ড, অতি প্রাচীন দলিল দস্তাবেজ, কুষাণ যুগ ও মধ্য যুগের বিভিন্ন আমলের কয়েকশো মুদ্রা থেকে শুরু করে লোকশিল্পের নানা মূল্যবান সম্ভার। এমন মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহের অধিকারী হয়েও চরম অর্থাভাবে অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগছে প্রত্যন্ত এলাকার এই প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালাটি।
একসময় সরকারি অনুদান বা আর্থিক সাহায্য বছরে একআধ বার ছিঁটেফোঁটা মিলতো। বহু বছর ধরে বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেই সরকারি আর্থিক সাহায্য। ফলে চরম অর্থাভাবে অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি মহকুমার একমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা ‘রজনীকান্ত জ্ঞান মন্দির সংগ্রহশালা ও গবেষণা কেন্দ্র।’ অর্থের অভাবে প্লাস্টার বিহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে সংগ্রহশালার নতুন ভবন। ফলে সরকারি অবহেলা আর উদাসীনতা আর অনাদরে পড়ে নষ্ট হচ্ছে কাঁথি মহকুমার রামনগর-২ ব্লকের কাদুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের ধাড়াস গ্রামে অবস্থিত রজনীকান্ত জ্ঞান মন্দির ও সংগ্রহশালার মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস,ভূতত্ব ও প্রত্নতত্ত্বের বহু মূল্যবান নিদর্শন ও সংগ্রহ। রামনগরের তৃণমূল বিধায়ক অখিল গিরি বলেন, “রজনীকান্ত জ্ঞান মন্দির গোটা মেদিনীপুর জেলার গর্ব। ওই সংগ্রহশালার সরকারি বার্ষিক অনুদান কি কারনে বন্ধ হল, সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখব। সংগ্রহশালার উন্নতি কল্পে বিধায়ক এলাকা উন্নয়ন তহবিল থেকে ভবিষ্যতে অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করব।”

অরবিন্দ মাইতি
রজনীকান্ত জ্ঞান মন্দির সংগ্রহশালা ও গবেষণা কেন্দ্রর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও কিউরেটার অরবিন্দ মাইতির কথায়, “সংগ্রহশালার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ ৬০ ইঞ্চি লম্বা ও ৫৮ ইঞ্চি চওড়া ২টি রোমান অ্যামফোরা (হাতল দেওয়া ফুলদানি)। যা প্রায় দু-হাজার বছরের পুরনো। দুটি অ্যামফোরার একটি রামনগরের মন্দারমণি এলাকা থেকে সংগৃহীত আর অন্যটি এক শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া।” অরবিন্দ বাবুর আক্ষেপ, “অর্থাভাবে সংগ্রহশালায় সংরক্ষণের কাজ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।”

স্বাধীনতা সংগ্রামী ও স্থানীয় মানিকাবসান হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রয়াত রজনীকান্ত মাইতির ইচ্ছা ছিল কাঁথি মহকুমা সহ জেলার বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া প্রাচীন নিদর্শনগুলি সযত্নে সংরক্ষণ করার। তাঁর সেই স্বপ্নপূরণ হওয়ার আগেই ১৯৭৫ সালে রজনীকান্ত বাবুর মৃত্যু হয়। রজনীকান্ত বাবুর মৃত্যুর পর ১৯৭৫ সালেই তাঁর কয়েকজন ছাত্র ও শুভানুধ্যায়ীর প্রচেষ্টায় ধাড়াস গ্রামে রজনীকান্ত বাবুর বাড়িতেই গড়ে উঠে এই সংগ্রহশালা। সংগ্রহশালার সূচনালগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন রজনীকান্ত বাবুর পুত্র অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক অরবিন্দ মাইতি। সংগ্রহশালাটি পরিচালনার জন্য ১১জন সদস্যের একটি পরিচালন সমিতি রয়েছে। পরিচালন সমিতির সভাপতি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ মিউজিয়াম অফ ইন্ডিয়ান আর্টের অধ্যক্ষ ড.দীপক কুমার বড়পন্ডা বলেন, “১৯৭৫ সালে পঞ্চাশের কম সংগ্রহ প্রদর্শন বস্তু নিয়ে অতি সাধারণভাবে যে রজনীকান্ত জ্ঞান মন্দির সংগ্রহশালা ও গবেষণা কেন্দ্রের যাত্রাপথ শুরু হয়েছিল আজ পঞ্চাশ বছরে সেই সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি।

এলাকার সাধারণ মানুষ থেকে শিক্ষাবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ, লোকসংস্কৃতিবিদ মানুষের অবদান ছাড়াও সামগ্রিক ভাবে সংগ্রহশালাটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়াত রজনীকান্ত মাইতির পুত্র অরবিন্দ মাইতি,প্রাক্তন শিক্ষক কানাইলাল আদকের অনবদ্য ভূমিকা ও বিশেষভাবে অরবিন্দবাবু সংগ্রহশালার অধিকাংশ উপাদান বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে জন্য ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন তা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করতেই হয়।” দীপক বাবু আরও জানান, “এই সংগ্রহশালায় মূলত তিনটি বিভাগ (১) ভূগোল ও ভূতত্ব (২) নৃতত্ব, প্রত্নতত্ত্ব বিদ্যা (৩) প্রাত্যহিক জীবনে শিল্প সাধনা নমুনা সংগ্রহ রাখা রয়েছে। এছাড়াও অনেকদিন ধরেই সংগ্রহশালার কোন ক্যাটালগ বা গাইড বুক ছিল না। সেই অভাব পূরণ সম্ভব হয়েছে মৈতনা গ্রাম-পঞ্চায়েতের প্রাক্তন উপাচার্য প্রধান ও বর্তমান পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের খাদ্য কর্মাধ্যক্ষ তমালতরু দাস মহাপাত্রের আর্থিক বদন্যতায়।”

সংগ্রহশালার পরিচালন সমিতির যুগ্ম সম্পাদক ডা. অরুনাভ পন্ডা জানান, সংগ্রহশালার জন্য প্রয়াত রজনীকান্ত মাইতির পুত্র সংগ্রহশালার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক অরবিন্দ মাইতি ব্যক্তিগত ভাবে ধাড়াস গ্রামে ১০ ডেসিমেল জমি দান করলে সেই জায়গাতেই রামনগরের প্রাক্তন বিধায়ক স্বদেশ নায়ক ও গ্রামবাসীদের অর্থ সাহায্যে কয়েক বছর আগে রজনীকান্ত জ্ঞান মন্দির সংগ্রহশালা ও গবেষণা কেন্দ্রের নতুন ভবন তৈরি হয়।”

অরুনাভ বাবু আরও জানান, “সম্প্রতি ন্যাশনাল মেরিটাইম মিউজিয়াম হেরিটেজ কমিশনের একদল প্রতিনিধি রজনীকান্ত জ্ঞান মন্দির পরিদর্শনে এসে সংগ্রহশালার রোমান অ্যামফোরা দেখে বিস্মিত হন ও অ্যামফোরা টি গুজরাতের লোথানে দেশের হতে যাওয়া সর্ববৃহৎ লোথান মেরিন মিউজিয়ামের প্রদর্শন গ্যালারিতে রাখার জন্য রোমান অ্যামফোরাটি নিয়ে যেতে রজনীকান্ত জ্ঞান মন্দিরের কাছে অনুরোধ জানান। রজনীকান্ত জ্ঞান মন্দিরের পক্ষ থেকে সেই অনুরোধ সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে আসল রোমান অ্যামফোরা’র একটি প্রতিরূপ (রেপ্লিকা) পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ন্যাশনাল মেরিটাইম মিউজিয়াম হেরিটেজ কমিশনের পক্ষ থেকে ওই রেপ্লিকা লোথান মেরিন মিউজিয়ামের গ্যালারিতে প্রদর্শনের জন্য রাখা হবে বলে এক চিঠিতে জানানো হয়েছে।

চলতি বছরেই রজনীকান্ত জ্ঞান মন্দির সংগ্রহশালা ও গবেষণা কেন্দ্রর সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব উদযাপন করা হয়েছে। সংগ্রহশালার অর্থ সংগ্রহের জন্য ইতিমধ্যেই কাঁথি মহকুমার বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সংগ্রহশালার দুষ্প্রাপ্য প্রত্নতত্ত্ব চাক্ষুষ দর্শনের জন্য বিভিন্ন স্কুল কলেজ ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে সংগ্রহশালা আসছেন। ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে মাথাপিছু দশ টাকা করে দর্শনী নেওয়া হয় বলে সংগ্রহশালার সহ সম্পাদক পুষ্পেন্দু রঞ্জন পন্ডা জানিয়ে আরও জানান, “সাধারণ মানুষের জন্য সংগ্রহশালা রবিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।”
ছবি : সুব্রত গাঙ্গুলী, সুব্রত গুহ