রম্যরচনা শব্দটির বয়স মাত্র কয়েক দশক, যার সৃষ্টি এই যুগের মনোবিলাস থেকেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ গ্রন্থ অসাধারণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। গ্রন্থটি কেবল পরম রমণীয় ছিল না, কার্যত বহু লেখককে পরবর্তী সময়ে এই জাতীয় রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে। যাযাবর যে ধারার সূচনা করলেন, তাকে নূতন মশলাসংযোগে অতিশয় হৃদ্য করে তুললেন সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনী ‘দেশবিদেশে’র মধ্যে। ফলে যে রচনাধারার সূত্রপাত হলো, তার আধুনিক নামকরণ হয়েছে রম্যরচনা। যাঁরা এই নামটি গ্রহণ করেছেন, তাঁরা সকলেই পাশ্চাত্য ‘Bells Letters’ আদর্শকে গ্রহণ করেছেন, তা স্বীকার করেন।

ইতিহাস ওল্টালে দেখা যাবে রম্য-লেখনী বাংলায় ছিল না তা নয়। যতই অম্লশূল অগ্নিমান্দ্যে ভুগুক না কেন, বাঙালির ভিতর চিরকালীন রসের ফল্গুধারা। রবীন্দ্রনাথের কথায় রম্যরচনার “যদি কোনও মূল্য থাকে, তাহা বিষয়বস্তুর গৌরবে নয়, রচনার রসসম্ভোগে।” প্রবন্ধসাহিত্য ও রসসাহিত্যের তুলনামূলক আলোচনা প্রসঙ্গে আরো বিশদে বললে, “এ কতকটা শরৎকালের হালকা হওয়ায় ভেসে চলা মেঘ; ক্ষণে ক্ষণে তার রূপ বদলায়, ক্ষণে ক্ষণে তাতে রং ধরে। প্রবন্ধ সাহিত্য বর্ষার জলভারাক্রান্ত মেঘমেদুর আকাশ, আর রসসাহিত্য শরৎ আকাশের লঘুপক্ষপাতি মেঘমালা। প্রবন্ধসাহিত্য প্রকাশ, রসসাহিত্য বিকাশ।” যুক্তিনির্ভর, তথ্যবহুল, বিষয়সমৃদ্ধ রচনাকে যেখানে প্রবন্ধ বলা হয়, সেখানে রম্যরচনাকে ব্যক্তিগত প্রবন্ধ, রচনা, লঘু নিবন্ধ, আমেজি সাহিত্য, বৈঠকী রচনা, স্বগত প্রবন্ধ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। রস সাহিত্যের এই বিশেষ ক্ষেত্রে বাঙালি কোনোদিন পিছিয়ে থাকেনি বলেই সাহিত্য সমালোচকরা স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি যে “রম্যরচনা” নামটি তার যাথার্থ্য প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছে। ব্যঙ্গদীপ্ত রসনিপুণ রচনায় বাঙালি লেখকের জুড়ি মেলা ভার। জমিয়ে গল্প বলার বিশেষ কায়দা তার শোণিতে প্রবহমান। তাই জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে যাই হোক না কেন, সাহিত্যক্ষেত্রে বাঙালি আজও রসেবশে বিরাজমান। যেমন বিদ্যাসাগরের বেনামী রচনায়, বঙ্কিমচন্দ্রের লোকরহস্য এবং কমলাকান্তের দপ্তরে, কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোমপাঁচ্যার নকশায়, বিবেকানন্দের প্রাচ্য পাশ্চাত্য এবং পরিব্রাজক গ্রন্থে, রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিকের পত্রাবলিতে ও বিচিত্র প্রবন্ধে। ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখের রচনায় গভীরতা সত্ত্বেও লঘু ও সরস, যার মধ্যে রসবোধের ঝলকানি প্রভূত পরিমাণে দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে প্রমথ চৌধুরী, পরিমল রায়, প্রমথনাথ বিশী, রূপদর্শী নানা ধরনের লঘু বৈঠকী গল্পকাহিনী লিখে নাম করেছেন। আরো পরে জরাসন্ধ, ধীরাজ ভট্টাচার্য, অন্নদাকিশোর মুনশী, দুলেন্দ্র ভৌমিক, আনন্দ বাগচী প্রমুখ নিজ উপজীবিকার ঘটনাকে ব্যক্তিচিত্তের রসে ডুবিয়ে অপরূপ করে তুলেছেন।
সবশেষে বলা যায়, রম্যরচনা যখন বাংলায় জনপ্রিয় হয়েছে এবং পাঠকের মনই যখন সাহিত্যের আশ্রয়, তখন রম্যরচনা অকালমৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে আসে নি। এ যুগ ছোট গল্পের এবং রম্যরচনার। আমরা আশা করবো, ছোটত্ব যেমন ছোটগল্পের একমাত্র গুণ নয়, তেমনি সৃষ্টি-প্রতিশ্রুতিহীন রম্যতা যেন রম্যরচনার লক্ষণ না-হয়ে ওঠে।
ছবিতে যাঁদের দেখা যাচ্ছে তাঁরা হলেন বাঁদিক থেকে গজেন্দ্রকুমার মিত্র, সাগরময় ঘোষ, কনা বসু মিশ্র, মনি শংকর মুখোপাধ্যায় ও শঙ্করি প্রসাদ বসু।
উপরোক্ত নিবন্ধটি “রসিক বাঙালি” গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত। এই গ্রন্থ খ্যাতনামা বাঙালির রসাকাহিনির ইতিকথা। প্রকাশক – দেজ পাবলিশিং হাউস, কলকাতা।