‘শাঙনগগনে ঘোর ঘনঘটা’য় বৃন্দাবনে বর্ষা হাজির। বিবর্ণ, মলিন প্রকৃতির বুকে নতুন করে ঘটেছে প্রাণের সঞ্চার। শুষ্কপ্রায় নদীগুলির দুকূল ছাপিয়ে গেছে। মন্ডুকের দল মেঘের আওয়াজে কলেবর জুড়েছে। ময়ূর পেখম মেলে নৃত্য করছে। সমস্ত অরণ্যপত্রে পুষ্পে ফলে সুশোভিত হয়ে অপরূপ রূপ ধারণ করেছে।
শ্যামসুন্দর বড় ব্যাকুল হয়েছেন আজ। শ্রাবণের সজল কালো মেঘ, বৃষ্টি ভেজা স্বর্ণচাঁপার সুবাস তাঁকে ব্যাকুল করে তুলেছে। এ চাঁদনী রাতে চন্দ্রাবলীর সাথে মন যে পূর্ণলীলার স্বাদ পেতে চায়। কিন্তু কোথায় শ্যামসুন্দরের হ্লাদিনী? আর যে বিলম্ব সয় না! রসরাজ তার পেলেব ওষ্ঠাধরে নিজের বংশীখানি স্পর্শ করে অমোঘ মধুর ধ্বনি ছড়িয়ে দিলে ব্রজ-বৃন্দাবনের আকাশে বাতাসে। শ্যামসুন্দরের ব্যাকুলতার মধুর ধ্বনিতে বিবশ হলো ব্রহ্মাণ্ডের বৃক্ষ গুল্ম লতা তৃণ তথা প্রতিটি জীবই। অতিবড় পতিব্রতা রমণীদের প্রাণও পতিকোল ত্যাগ করে ধেয়ে যেতে চাইলো শ্রীকৃষ্ণের পানে। সেই বাঁশির ব্যাকুল ডাকে মিলন আশে আকুল হলেন রাধারানী। আকুল হলেন শ্যাম-সোহাগী গোপিনীরা।
কিন্তু যাবেন কি করে রাধারানী? একদিকে ঘরে শাশুড়ি-ননদীর প্রহরা, অন্যদিকে বাইরে প্রবল বর্ষাধারা। কোন ছলনায় তিনি যাবেন অভিসারে? তাঁর আকুলতা দেখে মায়াদেবীর মায়া হল, শাশুড়ি-ননদী পাহারার দায় ভুলে দোরের সুমুখ থেকে খানিকের তরে ঘরে গেল—যেন সেই ক্ষণের অপেক্ষাতেই রাধারানী প্রাণ রেখেছিলেন হাতে। অমনি দোর পেরিয়ে পা রাখলেন পথে। পিছল পথ বেয়ে ছুটে চললেন শ্যাম-অভিসারে। ভিতর-বাইরের বর্ষা এবার একাকার হল।
শ্রীরাধা মাদনাস্য মহাভাব প্রেম স্বরূপিনী। প্রেম মানেই নব যৌবন, নবজীবন, নব-নব আবেগ, নবোন্মাদনা। এই বর্ষা শুধু হৃদয় নয়, শরীরেও আলোড়ন তোলে। প্রেমিক-প্রেমিকা মন চায় একে অপরের স্বর্গীয় সুখ পেতে। রসময় রসিকশেখর শ্রীকৃষ্ণ তার প্রাণেশ্বরী প্রাণপ্রিয়া শ্রীরাধার সঙ্গে রতিবিলাসে রত হলেন। সখীরা কুঞ্জের বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলো।
এক সময় বাইরে বেরিয়ে এলেন যুগলে। শ্রীরাধার কাঁধে নিজের বাম হাত রেখে হাঁটতে থাকলেন শ্রীহরি। তার হাতের স্পর্শে রাধিকার সর্বাঙ্গে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল শিহরণের। হাস্য পরিহাস গল্পচ্ছলে ঘণ বনে সমাচ্ছন্ন পথে হাঁটছেন সকলে। ঠিক এমন সময় আকাশে মেঘের গর্জনের সাথে বিদ্যুতের চমক। শ্যামপ্রেয়সীর যাতে কষ্ট না হয় তার জন্য ছত্ররূপে বিরাজ করলো মেঘ। সেবা করার আনন্দে সেও যেন অশ্রু বিসর্জন করতে লাগলো বরিষণে। পাকা কদমের পরাগ ঝরে পড়তে লাগলো যুগলের শিরে। প্রকৃতি দেবী যেন তাদেরকে বরণ করে নিচ্ছেন।
কদম গাছের শাখায় স্বর্ণ দোলনা ঝোলানো হয়েছে। রক্তবর্ণের পট্টসূত্র দিয়ে। সেই কঠিন পাঠায় বসে যাতে ব্যথা না পান, তার জন্য তাতে বকুল মালতি কুন্দ ইত্যাদি ফুলের পাপড়ি বেশ মোটা করে বিছিয়ে সুক্ষ্ম বস্ত্র দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
দুজনে একই দোলনায় না বসে সামনাসামনি পৃথক দোলনায় বসলেন। পাশাপাশি বসলে যে প্রেয়সীর মুখ দর্শন করা যাবে না। ললিতা, বিশাখা, ইন্দুলেখা….সখিরা দোলায় দোল দিয়ে গান ধরলেন আর পুষ্পের আরতি করতে লাগলেন। পুষ্প বৃষ্টির মধ্যে দুই দোলা একসঙ্গে দুলতে লাগলো। “দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা/ দোলে কৃষ্ণ দোলে ঝুলনা/ দোলে রাই দোলে ঝুলনা/দোলে দোদুল নাই তুলনা”
শ্যামসুন্দর যখন নিচের দিকে তখন শ্রীরাধার হার শ্রীকৃষ্ণের বুক ছুঁয়ে নাচতে লাগলো আবার যখন শ্রীরাধা নিম্নের দিকে তখন শ্রীকৃষ্ণের মালা শ্রীরাধার বক্ষ স্পর্শ করে নৃত্য করছে। নায়ক নায়িকা তখন উভয়ের নয়নের দৃষ্টিতে, অধরের হাসিতে, না বলা কথাতে, প্রেমের আবেশে শিহরিত হচ্ছেন। আর সখিরা যুগলের সেই সুখানুভূতি অনুধাবন করে পরমানন্দ লাভ করছেন।
শ্রীরাধা এবার চাইলেন তাঁর প্রিয় সখিরাও যেন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গসান্নিধ্যে হিন্দোল লীলার আনন্দ আস্বাদন করেন। তিনি জোর করে সকলকে বসালেন শ্রীকৃষ্ণের পাশে। ললিতা, বিশাখা, চম্পকলতা, তুঙ্গবিদ্যা, ইন্দুলেখা, চিত্রা, সুদেবী, রঙ্গদেবী–এই অষ্টসখী বসলেন। সেখানে তো কেবল দুটি দোলনা সাজানো ছিল। পদ্মের মতো আকৃতিতে সেই দুই দোলার চতুর্দিকে অষ্টদলে আটটি দোলা আর তার বাইরে বৃত্তাকারে ষোল দলে ১৬টি দোলা সাজানো ছিল। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অচিন্ত্য শক্তি, অনন্ত বৈভব প্রয়োগ করে প্রতিটি দোলায় নিজেকে প্রকাশ করলেন।
পদ্মের মূল কেন্দ্রে রইলেন শ্রীরাধা-কৃষ্ণ, বাইরে অষ্ট দলের আটটি দোলায় অষ্টসখী সঙ্গে এক এক কৃষ্ণ, তার বাইরে ১৬ দলে ১৬ জন ব্রজবালার সঙ্গে আবার ১৬ কৃষ্ণ প্রকট হলেন। একসঙ্গে বৃত্তাকারে সে সকল দোলে চক্রাকারে দুলতে থাকলো। বাইরে থেকে মনে হল যেন একটি পদ্ম আবর্তিত হচ্ছে। এমন ৩২, ৬৪, ১২৮, ২৫৬… হাজার হাজার দোলনা বিশিষ্ট গোলাকৃতি হিন্দোলা সৃষ্টি হয়েছিল। শত শত গোপিনীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ হিন্দোলা লীলা করেছিলেন।
‘ঝুলন উৎসব’ এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কি দাঁড়ালো? শুধু কি দোলনায় দোল খাওয়া!

ঝুলন যাত্রার উৎপত্তি ভাগবত পুরাণ, হরিবংশ এবং গীতা গোবিন্দে পাওয়া যায়। বছরে তিনটি পূর্ণিমায় শ্রীকৃষ্ণের তিনটি যাত্রা বা লীলা হয়। প্রথমটি দোল পূর্ণিমায় দোলযাত্রা, দ্বিতীয়টি ঝুলন পূর্ণিমায় ঝুলন যাত্রা বা হিন্দোলা লীলা এবং তৃতীয়টি রাস পূর্ণিমায় লীলাশ্রেষ্ঠ রাসযাত্রা। প্রথমটি স্পন্দন, দ্বিতীয় হিন্দোল বা প্রবল আন্দোলন এবং তৃতীয়টিতে উল্লাস বা নৃত্য।
দোলনা হলো ভগবান কৃষ্ণ এবং রাধার আনন্দ ও প্রেমময় মুহূর্তগুলির প্রতীক। এটি বর্ষাকালে আনন্দ, ভালোবাসা এবং ভক্তি প্রকাশ করে।
হৃদয়ে যখন আনন্দ হয় তখন সেই আনন্দকে ইচ্ছা করে চারপাশে ছড়িয়ে দিতে। অপরকেও সেই আনন্দের ভাগীদার করতে, আশ্বাদন করাতে প্রাণ চায়। শ্রীভগবান সচ্চিদানন্দময় অর্থাৎ তিনি সদ (নিত্য), তিনিই চিদ (চেতন), এবং তিনি আনন্দস্বরূপ। শ্রুতিতে বলা হয়েছে ‘আনন্দং ব্রহ্ম’ — ব্রহ্মই আনন্দস্বরূপ। আনন্দময় শ্রীকৃষ্ণের আনন্দস্বরূপের প্রকাশ হচ্ছে এই আনন্দ-ক্রীড়া ‘হিন্দোলা লীলা’ বা ‘ঝুলনযাত্রা’।
দ্বাপর যুগে বর্ষাকালে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলাকে কেন্দ্র করে বৃন্দাবন ধামে এই উৎসবের সূচনা হয়। ঝুলন যাত্রার অপর নাম হিন্দোল যাত্রা। বৃন্দাবনে রাধাবাগের দক্ষিণ দিকে ঝুলনবন। বলা হয়, এখানেই রাধাকৃষ্ণের ঝুলন লীলা আজও হচ্ছে।
বৃন্দাবনের মন্দিরগুলোতে পাঁচ দিন ধরে চলে ‘ঝুলন উৎসব’। বাঁকে বিহারী মন্দির, ইসকন মন্দির, নন্দগাঁও, বারসানার মত জায়গায় রাধা-কৃষ্ণের ঝুলনের আয়োজন হয় ফুল, কাপড়ে। আলোকসজ্জায় সাজানো হয় চারদিক। প্রতিদিন বিশেষ ভজন, কীর্তন, মহাপ্রসাদ বিতরণের আয়োজন করা হয়। আয়োজিত হয় শোভাযাত্রাও। বর্তমানে বৃন্দাবন ছাড়াও মথুরা, নবদ্বীপ, মায়াপুর-সহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে এবং ভারত ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে (যেখানে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের অবস্থান রয়েছে) ঝুলন উৎসব আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয়।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবছর ঝুলনযাত্রা ৫ আগস্ট, ২০২৫ (মঙ্গলবার) থেকে শুরু হয়ে ৯ আগস্ট, ২০২৫ (শনিবার) পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। ভক্তদের বিশ্বাস, এই দিনগুলিতে রাধা-কৃষ্ণকে দোল খাওয়ালে জীবন প্রেমময় সুখকর হয় এবং বৈবাহিক জীবনে শান্তি আসে, বিশেষত বিবাহযোগ্য মেয়েদের জন্য তো বটেই। ঝুলন পূর্ণিমা শ্রাবণ মাসে হওয়ায় বর্ষার সঙ্গে এই উৎসবের এক বিশেষ সম্পর্ক আছে। বৃষ্টি যেন একধরনের শীতল আবহ তৈরি করে। এই উৎসবকে ঘিরে ভক্তদের মনে প্রেম এবং শ্রদ্ধার পরিবেশ তৈরি হয়।।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : পলাশ মহারাজ, রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক এবং অন্যান্য।