কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা বাঁকুড়ার মল্লরাজারা বিষ্ণুপুর শহরে একের পর এক মন্দির তৈরি করেছিলেন। আর সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য আজও বহন করে চলেছে সেখানকার রথযাত্রা। রথের প্রথম স্থাপত্য সম্ভবত উড়িষ্যার কোণার্ক মন্দির। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত কোণার্ক মন্দিরটি রথের একটি অনুকল্প। বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা সমৃদ্ধ মন্দিরগুলিতেও বহু রথের ভাস্কর্য আমরা দেখতে পাই।

এখানকার পাথরের রথটি আনুমানিক সপ্তদশ শতকে নির্মিত। আগাগোড়া মাকড়া পাথরের এই দ্বিতল রথটির নিচের অংশ বিখ্যাত রাসমঞ্চের অনুরূপ। উপরের দিকটি বিষ্ণুপুরের অন্যান্য মন্দিরের মতন। ইতিহাস বলে, বিষ্ণুপুরের রথ উৎসব প্রায় ৩৫০ বছরের বেশি প্রাচীন। ১৬৬৫ খ্রীষ্টাব্দে বিষ্ণুপুরের মল্লরাজা বীরহাম্বীর শহরের মাধবগঞ্জে রানি শিরোমণি দেবীর ইচ্ছা অনুযায়ী পাথরের পাঁচ চূড়া মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরে রাধামদন গোপাল জিউ-এর অধিষ্ঠান। এই মন্দিরের অনুকরণেই তৈরি হয় পিতলের রথ। সেই থেকেই শুরু। কালের নিয়মে মল্লরাজারা বিদায় নিয়েছেন। মল্লভূমির রথযাত্রা উৎসব আজ সর্বজনীন। এখানে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা রথে চাপেন না। রথে সওয়ার হন রাধা মদন গোপাল জিউ।
ঠিক যেমন কোচবিহারের রথে চড়েন ঠাকুর মদনমোহন।

প্রাচীন কালের রীতি মেনে সকালে মদন গোপাল জিউ এর মন্দিরে পুজো পাঠ করে মদন গোপাল জিউ এর শালগ্রাম শিলাকে কীর্তন ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহযোগে নিয়ে আসা হয় রথে । সেখানে ফের একপ্রস্থ পুজো পাঠ ও আরতি করে প্রথমে ছোট রথ ও পরে বড় রথ টানা হয়। রথযাত্রা উপলক্ষে সাতদিন ধরে চলে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গতবছর করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের জেরে গড়ায় নি বিষ্ণুপুরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বড় রথের চাকা। আড়ম্বর ছাড়াই মাঙ্গলিক ক্রিয়ার মাধ্যমে ছোট রথকে টানা হয়েছিল ব্যারিকেড করে। দূরদূরান্তে থেকে বহু মানুষ এসে উপস্থিত হয় এই রথের দড়িতে টান দেওয়ার ও পুণ্য অর্জনের জন্য। প্রাচীন নিয়ম মেনে আজও সমান ভাবে এই রথের উৎসব পালন করে চলেছেন বর্তমান প্রজন্ম আর উৎসব কমিটি।

রাজপরিবারের পক্ষে তন্ময় বাবু জানালেন মল্লরাজাদের প্রতিষ্টিত বিভিন্ন দেবতাদের রথে অধিষ্টানের মধ্য দিয়ে এই শুভ অনুষ্টানের সুচনা হয়। থাকেন শ্রী কুঞ্জবিহারী জিউ, শ্রী রাধা বিনোদ বিহারী জিউ, শ্রী কেশব রায় জিউ, শ্রীনিবাস আচার্য প্রতিষ্টিত শ্রী ষড়ভুজ জিউ। মূলতঃ দুটি ষোলোয়ানা কমিটি থেকে রথ যাত্রা উৎসব পালিত হয়, মল্ল রাজাদের আরাধ্য দেবতা, রাধা লাল জিউ, (কৃষ্ণগঞ্জ ১১ পাড়া ষোলোয়ানা কমিটি) আর মদন গোপাল জিউ (মাধব গঞ্জ ৮ পাড়া ষোলোয়ানা কমিটি), পরবর্তী কালে দুটি পারিবারিক রথ, এক, চোধুরী দের রথ, অপর টি, পার্থ সারথি সিংহ দেবের হাত ধরে সিংহ দেব পরিবারের রাজদরবার রথ যাত্রা শুরু হয়। মহা সমারোহে রথ শহরের বিভিন্ন পথ পরিক্রমার পর মন্দিরে ফিরে আসেন। রথের দিন থেকে উল্টো রথ পর্যন্ত চলে নানান অনুষ্ঠান। মন্দির চত্বরে কীর্তন ও নানাভক্তিমূলক অনুষ্ঠান চলে সাত দিন ধরে। এর পাশাপাশি থাকে নাচ গান নাটক এবং যাত্রা পালা। প্রতিদিন বিশেষ রাজভোগের প্রসাদ গ্রহণের জন্য ভক্তদের ভিড় উপচে পড়ে। আর একটি বিষয় যা না লিখলে এ প্রতিবেদন অসম্পুর্ন থেকে যাবে তা হল মন্দির নগরী বিষ্ণুপুরে সোজারথের থেকে উল্টোরথেরই জৌলুস বেশি।