দক্ষিণ রাঢ়ের অন্যতম বৃহৎ জনপদ হুগলী — চুঁচুড়া। গঙ্গাপাড়ের এই জেলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস।
রথযাত্রা এই অঞ্চলের সেরা উৎসব। চুঁচুড়াতে রথযাত্রা সম্ভবত অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়। বাবুগঞ্জ, ঘুঁটে বাজার, রথতলা, চৌমাথা মোড় এলাকায় রথ যাত্রা বেশি দেখা যায়। এইসব যায়গায় সুবর্ণ-বণিক, তাম্বুলি, বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি থাকায় রথযাত্রা সারা সপ্তাহ জুড়ে চলতে থাকে।
ঘুঁটে বাজারের বড় জগন্নাথ বাড়ীর রথ সবচেয়ে প্রাচীন। সঠিক প্রমাণ না মিললেও, ধারণা করা হয় সপ্তগ্রাম অঞ্চলের পতনের পর সুবর্ণবণিক সমাজের সঙ্গে এরাও হুগলিতে চলে আসেন। সেই থেকেই জগন্নাথ দেবের সেবা করছেন। জগন্নাথ বাড়ির জগন্নাথ সব থেকে বড়। চওড়ায় ৩ ফুট, উচ্চতায়ও ৩ফুট।
ঠাকুর বাড়ির রাধাকৃষ্ণ একসঙ্গে রথে চড়ে। কৃষ্ণ কালো পাথরের এবং রাধা অষ্ট ধাতুর।

এখানে ‘রথযাত্রা’ কমিটি রয়েছে। তাদের তত্ত্বাবধানে রথতলা থেকে পরপর আটটি রথ জেলখানার কাছে যায়। পরে উল্টো রথে একইভাবে ফিরে আসে। আগে বড়ো বড়ো রথ ছিলো কিন্তু বর্তমানে সংরক্ষণ ও ব্যয় বৃদ্ধির জন্য রাধাকৃষ্ণর রথ, রাধাবল্লভ রথ, বাবাজী বাড়ীর রথ, ছাতাগলির রথ, সাইজে ছোট হয়ে গেছে। সৌন্দর্যতে সেরা জগন্নাথ ঘাটের রথ।
বাবুগঞ্জের ময়ূরপক্ষ্মী/ জগন্নাথ ঘাটে রয়েছে প্রায় তিনশ বছরের প্রাচীন জগন্নাথ দেবের মন্দির। সকাল থেকেই মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের সমাগম ঘটে। স্থানীয় চক্রবর্তী পরিবার বংশানুক্রমে পুজা-আর্চনা করছেন। এখানকার রথ নগর প্রদক্ষিণ করে জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম সমেত।

ঘুঁটিয়াবাজার রাধা বল্লভ জীও ঠাকুর বাড়ির ছবি
গৌড়ীয় মঠ থেকে এদিন রথ পথপরিক্রমা করে। ষণ্ডেশ্বরতলার মল্লিক বাড়ির রথও পরিক্রমায় বেরোয়। তামলীপাড়ার বিজয় দাসের বাড়ীর রথ ও বেশ প্রাচীণ। ক্রুকেড লেনের প্রাচীণ রথ নবকলেবরের রূপ পেয়ে ,স্থানীয় প্রতিবেশীদের উৎসাহে রথ নগর পরিক্রমায় বেরোয়। ফুলপুকুরেও রথ যাত্রা শুরু হয়েছে।
চুঁচুড়ার চৌমাথা এলাকার বেলতলায় আছে ছোট জগন্নাথদেব বাড়ি। অনেকে এটিকে মল্লিক বাড়ির জগন্নাথ মন্দিরও বলেন। স্বর্গীয় নৃসিংহ দাস দে মল্লিক ১৭২৫ খ্রিস্টাব্দে মহাপ্রভু জগন্নাথ দেবের স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুজো শুরু করেন।

শুধুমাত্র রথ যাত্রা উপলক্ষ্যে বাড়ির শ্রী জগন্নাথ জনসমক্ষে আসেন। সারাবছরই ঠাকুর ঘরে পুজো হয় এবং মল্লিকবাড়ির লোক ছাড়া বাইরের কেউ খুব একটা অনুমতি পান না দর্শনের জন্য। মন্দিরে রয়েছে সুসজ্জিত জগন্নাথ দেবের বিগ্রহ, ছোট পিতলের সিংহাসনে বিরাজমান গৌড় নিত্যানন্দ মূর্তি, গোপাল ঠাকুর, শ্রী রাধাকান্ত রাধারাণী ও পারিবারিক প্রতিষ্ঠিত নারায়ণ শীলা। সোজারথ থেকে উল্টোরথ পর্যন্ত তিনবেলা বিশেষ পুজোর নিয়ম রয়েছে।
শহরে কুমোর পাড়ায় ও বাড়ির দুর্গা কাঠামো পুজোও হয় এদিন। গলিতে গলিতে শিশুরা নানান ধরনের পুতুল সাজিয়ে আটবেশ গড়ে তোলে। রথযাত্রার সঙ্গে চুঁচুড়াবাসীর একটা আলাদা অনুভুতি জড়িয়ে রয়েছে। বিকেলে রথ যাত্রার সময়ে, রথতলায় মালপোয়া, বাতাসা, কাঁঠাল, সন্দেশ, আনারস, নানান ফলের প্রসাদ ভক্তদের বিতরণ করার একটি পুরোনো প্রথা আছে।
শিবতলায় রথের বড়ো মেলা বসে। তালপাতার ভেঁপু থেকে আরম্ভ করে নিত্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় জিনিষ বিক্রি হয় এখানকার মেলায়। শ-খানেক ছোট বড় দোকান বসে।

বিকেল হলেই রথের দড়ি ছোঁয়ার উত্তেজনা, পাঁপড়-জিলিপির অমোঘ জুটির অপেক্ষা ফিরিয়ে নিয়ে যায় ছেলেবেলার দিনগুলিতে। এখানে ঘরে ঘরে চলে জগন্নাথ দেবের সেবা আর নিরামিষ ভোজন। নিমন্ত্রিতদের পাত পেড়ে খিচুড়ি, আলুর দম, পাঁচরকম ভাজা, পাঁপড়, মিষ্টি, পায়েস খাওয়ানো হয়।
রথযাত্রা শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়, এর অন্তরালে রয়েছে এক সুগভীর দার্শনিক ও ধর্মীয় ভাবনা। উপনিষদে বলা হয় “চরৈবেতি” — এগিয়ে চলো। আবহমান কাল ধরে জীবনে প্রবাহ চলে আসছে, রথের রশি টানা হলো সেই চরম লক্ষের দিকে যাত্রার প্রতীক।
আষাঢ় মাসের শুক্লাপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে জগন্নাথদেব রথারূঢ়। তাঁর গমনপথ ভক্তদের স্তবগানে মুখর। সেই প্রভু জগন্নাথদেব আমার দৃষ্টিগোচর হন — “জগন্নাথ স্বামী নয়ন পথগামী ভবতু মে।।”
তথ্যঋণ : হুগলী চুঁচুড়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতি — সংগ্রাম মল্লিক এবং লোকাল নিউজ মাধ্যম।।
Joy joggnath….
Khub bhalo
পেজ ফোর*র আকর্ষণ মানেই রিঙ্কি সামন্তের সুন্দর প্রতিবেদন।”রথযাত্রা*র বিবরণ তেমনই
এক সুন্দর তথ্য বহুল রচনার সাক্ষী হয়ে থাকবে।
ধার্মিক পরম্পরা,ধার্মিক অনুষ্ঠানের ইতিবৃত্ত সুশ্রী
রিঙ্কি’র অতুলনীয় জ্ঞানের পরিচায়ক।
রথযাত্রা বিষয়ে চুঁচুড়ার অনেক তথ্য জানা গেল।
– জগন্নাথ কৈরী