ঐতিহ্য আর মিশ্র সংস্কৃতির মিশেল, এই নিয়েই শিল্পাঞ্চলের রথযাত্রা উৎসব। এইরকমই এক রথযাত্রার উৎসব হয় পশ্চিম বর্ধমানের অণ্ডালে। উখড়ার জমিদার পরিবার হন্ডাদের শতাব্দী প্রাচীন রথ। এই রথে অধিষ্ঠান করেন কুলদেবতা গোপীনাথজী। পরিবারের সদস্যরা জানান রথ শুরু হয়েছিল ১২৫৭ বঙ্গাব্দে। হান্ডা পরিবার কিন্তু বঙ্গ সন্তান নন, এই পরিবারের পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন লাহোরের মচ্ছিহাটা থেকে, ব্যবসা সূত্রে, পরবরতী সময়ে বংশপরম্পরায় বাঙালি সংস্কৃতিকে মনের মাধুরী মিশিয়ে দোল, দুর্গোৎসব, রাস, ঝুলন আর রথযাত্রার হাত ধরে কখন যেন মনেপ্রাণে বাঙালি হয়ে উঠেছেন এই পরিবার।

আগে ঠাকুরবাড়ি থেকে গোপীনাথজিকে কাঁধে করে আনা হত চাঁদনি বাড়িতে যেখানে জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো হত। সেখান থেকে রথে করে নিয়ে যাওয়া হত সার্কাস ময়দানের গোষ্ঠবেড়া মন্দিরে। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ময়দানে সেনা ছাউনি হওয়ায় সেখানে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪২ সাল থেকে গোপীনাথজিকে ঠাকুরবাড়ি থেকে বাজপেয়ী মোড় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পর চাঁদনি বাড়িতে সাত দিন রাখা হত। স্বাভাবিক কারনেই রথের দড়ি টানার জন্য প্রচুর ভক্ত সমাগম হত। দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছিল। তাই বেশ কিছু বছর ধরে ট্রাক্টর দিয়েই রথ টানা হয়। একসময়ে ধুমধাম করে সাত দিন ধরে চলত মেলা। এখন শুধুই রথ ও উল্টোরথের দিন মেলা বসে।

উখড়ার এই রথ বাংলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধাতুশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। কারুকার্য মণ্ডিত নয়চূড়ার পিতলের রথটির প্রধান কারিগর ছিলেন বিখ্যাত রাধাবল্লভ মেহতরী। সহযোগী ছিলেন বেশ কিছু স্থানীয় শিল্পী। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবেনা। কি অসাধারণ শিল্প দক্ষতায় এই রথ তৈরী হয়েছিল। দেখলেই বোঝা যায় শিল্পের প্রাচীন ও আধুনিক উভয় ধারার সাথে শিল্পীদের কি সাবলীল ধারণা ছিল। কাঠের রথ নষ্ট হয়ে যাবার পর এই পিতলের রথ তৈরী হয় জানালেন জমিদার বাড়ির উত্তর পুরুষ শ্রী অনুরণ লাল সিং হাণ্ডা। একসময় একটি নয় দুটি রথ বের হতো এই উখড়ার জমিদার বাড়ি থেকে। ছোট রথটি টেনে নিয়ে যেতেন বাড়ির মহিলা সদস্যেরা। পরে সামাজিক পরিস্থিতিতে এই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। একসময় মুর্শিদাবাদের স্থায়ী বাস ছেড়ে হান্ডা পরিবার চলে আসেন আজকের অণ্ডালে। পরবর্তী সময়ে বর্ধমানের রাজাপরিবারের সাথে ওনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

এরমধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে কয়লা, শুরু হলো রেল যোগাযোগ সেইসঙ্গে হাণ্ডা পরিবারের আর্থিক অভুথ্যান। গড়ে উঠলো উখড়ার প্রাচীনতম মন্দির শ্যামরায়ের মন্দির। তৈরী হলো প্রস্তর নির্মিত দ্বারবাসিনী দেবীর মন্দির-সহ অনেক সৌধ। শুরু হয় দোল উৎসব, দুর্গোৎসব আর রথযাত্রা। বিশাল পিতলের রথটির গায়ে রয়েছে অবিশ্বাস্য সূক্ষ্ম অলঙ্করণ। পারিবারিক সুত্রে জানা যায় বারোটি চাকা বিশিষ্ট এই নবরত্ন রথটির সর্বনিম্ন পাটাতন থেকে সর্বোচ্চ চূড়া পর্যন্ত উচ্চতা কুড়ি ফুটের কিছু বেশী। রথের দৈর্ঘ্যও ও প্রস্থ মোটামুটি দশ ফুট। ত্রিতল বিশিষ্ট রথটির প্রথম বেদীর উচ্চতা তিন ফুট এক ইঞ্চি, দ্বিতীয় বেদীর উচ্চতা সাত ফুট পাঁচ ইঞ্চি এবং তৃতীয় বেদীর উচ্চতা চার ফুট দু ইঞ্চি। ছোট রত্নগুলির উচ্চতা দু ফুট দু ইঞ্চি, মাঝারি রত্নগুলির উচ্চতা চার ফুট এবং সর্ববৃহৎ চূড়াটির উচ্চতা পাচ ফুট দশ ইঞ্চি। বাংলার নবরত্ন মন্দিরের আদলে তৈরি এই রথের ভাস্কর্যের মধ্যে আছে মহাভারতের যুদ্ধের বিভিন্ন দৃশ্য; সিদ্ধার্থ, হাঁস ও দেবদত্ত; প্রলয়নাচনরত নটরাজ; শ্রীকৃষ্ণের পাশাখেলা; ঝুলন; নৃসিংহ অবতার; শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম-ধারী বিষ্ণু; পরশুরাম; সিংহের পিঠে বসে মা দুর্গা, কোলে ছোট্ট গণেশ ও গীতগোবিন্দের পদের অনুসরণে রাধার পা ধরে কৃষ্ণের ক্ষমা চাওয়ার চিত্রায়ন ইত্যাদি। রয়েছে অনন্তনাগের উপর শ্রীবিষ্ণু; গরুড়ের উপরে শ্রীবিষ্ণু। রাম, সীতা ও লক্ষ্মণের সামনে প্রণত হনুমান; ওঁ-এর ভেতর রাধাকৃষ্ণ; বংশীবাদক শ্রীকৃষ্ণ; নৌকাবিলাস; কালীয়দমন; শ্রীকৃষ্ণ ও গোপিনীদের দোল উৎসব; কৃষ্ণ ও বলরামের গোষ্ঠলীলা প্রভৃতি। নকসাগুলি আবার দু-ধরনের। এক ধরনের নকশা যেগুলি স্বল্প গভীর দাগ কেটে তৈরী আর এক ধরনের নকশা যা পিছন থেকে ছাঁচ দিয়ে পিটিয়ে উঁচু করে বানানো হয়েছে। ন’টি রত্নের বড় রত্নটি ছাড়া আটটি চূড়াতেই তিনটি করে কলস, চক্র ও নিশান আছে। জমিদার পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের কাছে জানা গেল প্রতি বছর শুধুই তেঁতুল দিয়ে রথটি পরিষ্কার করা হয়। রথযাত্রা শুরু হওয়ার আগে গোপীনাথ জীউয়ের মন্দির থেকে শ্রীশ্রী গোপীনাথ জীউ, রাধা এবং অন্যান্য দেবদেবীর বিগ্রহকে চৌদোলায় বসিয়ে কীর্তন গাইতে গাইতে রথের কাছে এনে প্রদক্ষিণের পরে সর্বোচ্চ কক্ষে স্থাপন করা হয়। প্রথা মেনে পুজার পর শুরু হয় রথের রশিতে টান।
চমৎকার লাগল লেখাটি! এই রথ সম্পর্কে আগে কখনও শুনিনি । লেখক মহাশয়কে ধন্যবাদ ।
খুব ভালো লাগল কমলবাবু। অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ লেখা- বাংলাতে যে প্রাদেশিকতা কোনদিন স্থান পায় নি এ উৎসব তার জাজ্বল্যমান সাক্ষী।