অন্নদামঙ্গলে পড়ি পার্বতীর ক্ষোভের কথা — “পাইতে পতির অঙ্গ নারী সাদ করে।/ তার সাক্ষী মৃত পতি সঙ্গে পুড়ে মরে।।/ পুরুষেরা দেখে যদি নারী মরি যায়।/ অন্য নারী ঘরে আনে নাহি স্মরে তায়।।” সতীদাহ সহমরণের মত সংগঠিত হত্যায় বিশ্বাসী সমাজকে নারীরা কি চোখে দেখতেন তার একটা ছবি ফুটে ওঠে স্বয়ং দেবীর আক্ষেপে। ‘আপন ভাগ্য’ জয় করা দূরের কথা, নারী তখন শুধুই খেলার পুতুল। বাবা, দাদা, ভাই বা স্বামীর সংসারে হেলাফেলায় গড়িয়ে যেত তাদের ঘটনাহীন জীবন। সতীপ্রথা বিলোপ আইন এই ছবিটা বদলে দিয়েছিল। এ যেন এক ‘বৃহৎ উল্লম্ফন’ বা ‘বিগ লিপ’। ভারতের সামাজিক ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয় দত্ত, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, কাঙাল হরিনাথ, শিবনাথ শাস্ত্রী, শশীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়দের মত মানুষদের অক্লান্ত যুক্তিযুদ্ধের পরিণতিতে ১৮২৯ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর জারি হল সতীপ্রথা বিলোপ আইন।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “রাজা রামমোহন রায় ভারতের আধুনিক যুগের উদ্বোধন করেছিলেন।” সতীপ্রথা বিলোপ তার সূচনা। একটা অন্ধকার সময় পেরিয়ে এলে যতটা সহজে তার বর্ণনা লিখে ফেলা যায় সেই সময়টা পেরোনো কিন্তু ততটাই কঠিন। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে এই আইন চালু না করার জন্য বাংলার তৎকালীন গভর্নর উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের কাছে আবেদন করেছিলেন শতাধিক বিশিষ্ট নাগরিক। কুৎসা, কুযুক্তি, চরিত্রহনন তো ছিলই, সতীপ্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষদের ওপর শারীরিক আক্রমণও কম হয়নি। “মরে নারী, ওড়ে ছাই/ তয় নারীর কলঙ্ক নাই” আপ্তবাক্যে বিশ্বাসী সতীপ্রথার সমর্থকরা মনে করতেন, নারী পুরুষের সম্পত্তি, চিরকাল সে শুধু তাই থাকবে। পুরুষ যতই যথেচ্ছাচার করুক না কেন, নারীকে তার শারীরিক শুচিতা রক্ষা করে চলতেই হবে। সহমরণে যাওয়া বা ‘সতী’ হওয়া সবই আদতে এই শুচিতা রক্ষার নামে কুযুক্তির মোড়কে ঢাকা এক পরিকল্পিত হিংসা।
এই হিংসার ব্যাপকতার দিকে তাকালে চমকে উঠতে হয়। দূর গ্রামাঞ্চল নয়, কলকাতা ও তার আশেপাশের অঞ্চল হাওড়া, হুগলী ও ২৪ পরগণাতে নিয়মিত ঘটতো ‘সতী’ হওয়ার ঘটনা। ১৮০৪ সালে একটা সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে কলকাতার ৩০ মাইলের মধ্যে ১১৫টি সতীদাহ হয়েছিল। ১৮১৫ থেকে ১৮২০ এই ছ’বছরে ফোর্ট উইলিয়ামের সীমানার মধ্যে ঘটেছিল ৩৬১৩টি সতীদাহের ঘটনা। এর মধ্যে ৪৭জনের বয়স ছিল ১৬ বছর বা তারও কম। মাঝবয়সী মহিলাদের মধ্যে ‘সতী’ হওয়ার ঘটনা ছিল বেশি।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই আইন কুসংস্কারে বিশ্বাসী সমাজপতিদের ওপর একটা বড় ধাক্কা। মৃতের স্ত্রীদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে এটা চালু করেছিলেন ব্রাহ্মণরাই। ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের দাপটে সমাজের অন্যান্য অংশ থেকেও এর বিরুদ্ধে কোন আপত্তি আসেনি। ইংরেজ আমলে সারা ভারতের মধ্যে কলকাতা এবং বেনারস ডিভিশনে ‘সতী’ করার ঘটনা ঘটতো সবচেয়ে বেশি। ইতিহাস বলছে দ্বাদশ শতাব্দীতেও বাংলায় চালু ছিল সতীদাহ প্রথা।
পরিসংখ্যানের বাইরে বেরিয়ে সেই সময়কার সাধারণ বাঙালি পরিবারের মেয়েদের জীবনের দিকে তাকালে এই মানসিকতার উৎসে পৌঁছনো যায়। স্থিতাবস্থা ও গতানুগতিকতা মেনে নেওয়াই ছিল সমাজের বেশিরভাগ মহিলাদের জীবনের নিয়ম। পরিবারগুলির পুরুষেরা এটাই পছন্দ করতেন। একটা উদাহরণ নেওয়া যাক, ‘সেকেলে কথা’র লেখিকা নিস্তারিণী দেবীর বিয়ে হয়েছিল ৩০টি বিয়ে করা বছর পঁচিশের এক যুবকের সঙ্গে। স্বামী মারা যাওয়ার সময় নিস্তারিণীর বয়স মাত্র চোদ্দ বছর। ভাইদের সংসারে সীমাহীন কষ্ট সহ্য করার পর শেষজীবনে অন্ধ হয়ে কাশীতে তিনি মারা যান। স্বামীর সঙ্গে তাঁর দেখা হত কদাচিৎ। ‘আইবুড়ো’ নাম ঘোচানোর জন্য বিয়ে দেওয়া মেয়ের স্বামীকে তার বাপের বাড়ি থেকে ভাতা হিসেবে দেওয়া হত মাসে ৫ টাকা! তবুও নিস্তারিণী লিখেছেন, “আমাদের স্বামী ভগবান, সর্বস্ব।” বোঝাই যাচ্ছে নানা কুপ্রথার শিকার হওয়ার পরেও নিস্তারিণীকে তা স্পর্শ করেনি, তিনি তাকে মেনে নিয়েছেন।
মনে রাখা দরকার, এই ঘটনা ঘটছে সেকালের এক শিক্ষিত ও আলোকপ্রাপ্ত পরিবারে! ‘সেকেলে কথা’ তৎকালীন বঙ্গ জীবনের ঘটনাপ্রবাহের এক বিশ্বস্ত দলিল। কিন্তু সেখানে সতীপ্রথা কিংবা ‘সতী’ হওয়ার ঘটনা এবং বহুবিবাহ বিরোধী আন্দোলনের কোন উল্লেখ নেই। অন্ধকারের একটা শক্তি থাকে, তা যেন অন্যায়কে ন্যায় করে দেয়। সতীপ্রথা বন্ধ হওয়ার আইন সেই অন্ধকার সময়ে এক হঠাৎ আলোর ঝলকানি। সেই আলো ফেলেছিলেন রামমোহন, বিদ্যাসাগরেরা। যুক্তিযুদ্ধে আধুনিক বাঙালির জয়ী হওয়ার সূচনা হয়েছিল এই আইন রদ হওয়া থেকে।