| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

রতনতনু ঘাটীর ছোটোদের শ্রেষ্ঠ ছড়া-কবিতা — ইচ্ছেপুরের গল্প হয়ে ওঠে : অমৃতাভ দে

Reporter
অমৃতাভ দে / ১৫১৭ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১১ মার্চ, ২০২৪

শীত-কুয়াশায় ঢেকেছে চারপাশ। কথার ঘরের বাগান জুড়ে কত না সবুজ গাছ। আমাদের মাটির পুতুলের দেশে শীত আসে কবিতা হয়েই। পাতায় পাতায় শিশির ঝরে। রাতে মায়ের পাশে শুয়ে মেয়ে শোনায় — “তোমাদের সেই ছেলেবেলা যার গল্প করেছ কত/সেই ছেলেবেলা ফিরিয়ে দাও না/একটা দিনের মতো।” রতনতনু ঘাটী আমাদের বড়োদের দাঁড় করান কত না প্রশ্নের মুখোমুখি। ই-মেল খুলে আকাশ দেখে ওরা। বন্ধু খোঁজে ই-মেল খুলে। কেউ লেখে না চিঠি। সারাক্ষণই পরীক্ষা আর চারপাশে বই। বোনের সাথে খুনসুটিও বাদ, মাউস নিয়েই খেলা। আমিও এক পাসওয়ার্ডের বাড়িতে ঢুকে পড়ি। আঁতকে উঠি, ভয় পাই, ঘুম ভেঙে যায়। ভোরের আলো এসে পড়ে জানালায়, বাগানে পাখিদের কিচিরমিচির। মেয়েকে বলি দেখ সকালটা কী সুন্দর!চেনাই রতনতনুর ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’কে — ময়নামতী নদীর ওপারে অবাকপুরের যে ছেলেটি স্বপ্ন বেচতে শহরে এসেছে মা আর বোনকে ফেলে।সেই ছেলেই তো আমাকে শুনিয়েছে — “প্রথম হওয়ার দৌড়ে তোমরা সকলেই ফার্স্ট হবে/ স্বপ্ন তো নেই ব্যস্ততাভরা অদ্ভুত শৈশবে!” সে আমার হাতে তুলে দিয়েছে মালা গাঁথবার কল্পনামাখা সুতো। সেই কল্পনামাখা সূ্তোয় জড়িয়ে নিই নিজেকে।

আমি মেয়েকে শোনাই ‘ইচ্ছেপুরের গল্প’। সিঁদুরটিয়া প্রাইমারি স্কুলের সবাই তখন গোয়েন্দাদের সামনে। আজ গোয়েন্দাদের কাছে যার যা হারিয়ে গেছে তার কথা বলবে সবাই। হারিয়ে গেছে তাদের রংতুলি, রংবেরঙের কাগজ-কেটে বানানো নৌকো, পদ্য লেখার খাতা। আমিও মেয়েকে বলি ফেলুদাকে খোঁজো, রবার্ট ব্লেক কিংবা শ্রীপরাশর বর্মা অথবা কিরীটি রায়ের কাছে যাও।গিয়ে বলো —

“কম্পিউটার, তবলা,সাঁতার, আবৃত্তি আর গানে

ব্যস্ত আমি। হারিয়েছে আজ ছেলেবেলার মানে!

ও ফেলুদা, দিন না আমায় গোট্টা ছেলেবেলা!

তখন দূরে আকাশপারে একশো রঙের খেলা।”

মেয়ে আমাকে শোনায় ‘রূপকথা’, সেই ছেলেটির গল্প,যে রঙহীন তবু রঙে রঙে মাখা যার ছেলেবেলা।সে তালপাতার চশমা চোখে গোঁজে, নারকোলপাতা দিয়ে তার হাতঘড়ি হয়, পদ্মদিঘিতে সাঁতরে তোলে লাল-সাদা পদ্ম। কেয়াপাতা ছিঁড়ে নৌকা ভাসায়,তালগাছে উঠে পেড়ে আনে বাবুইপাখির বাসা, নাওয়া-খাওয়া ভুলে ফড়িং ধরে,চাঁদের আবির মেখে সে ঘুমিয়ে পড়ে — তার স্কুলে ভরতি হওয়া নেই, ক্লাসে প্রথম হওয়া নেই, রূপকথারা রোজই খেলতে আসে তার সঙ্গে। জোছনায় ভরা তার মনের কথা শুনতে শুনতে ভাবি মেয়ের হাতে আমি কীভাবে তুলে দেব সেই রূপকথা!

রতনতনু ঘাটী ছোটোদের জন্য তুলে দিয়েছেন ছন্দে ছন্দে সেই রূপকথা, আর বড়োদের ভাবতে শিখিয়েছেন। আসলে “তাঁর কৈশোরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মায়ের রাঙা সিঁথির মতো হলদি নদী আর উর্বশীর মতো এক-গ্রাম সুজলা প্রকৃতি।” তাঁর ‘ছোটোদের শ্রেষ্ঠ ছড়া-কবিতা’ পড়তে পড়তে মনে হয়েছে

“রতনতনু ঘাটী খুব সহজ ভাষায়, সুন্দর ছন্দে ছোটোদের মনের কথা বলতে পারেন।”

ঘুমোই যখন সবাই ভাবে ঘুমিয়েছে চোখ বুজে,

কেউ জানে না, স্বপ্নে খেলার সঙ্গী বেড়াই খুঁজে।

আমার মতো ছোট্ট যারাই বলছি তাদের শোনো

এই কথাটাই বড়োদেরকে বলবে না কক্ষনো!

#

গল্প-লেখার সময় বলতে স্বপ্নটুকুই হাতে

আমরা এবার বসবো স্কুলে ভরতি-পরীক্ষাতে।

“…ছোটোরা তাঁর ছড়া-কবিতার মুগ্ধ পাঠক। বড়োরাও তার এইসব ছড়া-কবিতা পড়তে পড়তে কুড়িয়ে পান তাঁদের বর্ণময় হারানো শৈশব। … তিনি এমনভাবে ছড়া-কবিতা লেখেন, ছোটোদের সামনে ভেসে ওঠে এক মায়াময় রূপকথার জগৎ, এক অপরূপ স্বপ্নের পৃথিবী। …. তিনি যেন ছোটোদের পাশে বসে আবৃত্তি করছেন।”

যে ছেলে দিগন্তকে নামিয়ে আনে ছবির খাতায়, তার জন্য কবি হলুদ পাতায় সবুজ রং রেখে দেন। ছবির পাতায় যে ছেলেটা মন্দাকিনী স্বর্গ থেকে নামিয়ে আনে, তার জন্য রেখে দেন ঢেউ, হলদি নদী, মোহনপুরের আকাশ। অঙ্ক বই আর জ্যামিতিতে যে ভ্যাবলা ছেলেটি আকাশ লেখে তাকেই জন্মদিনে তিনি উপহার দেন রামধনু। ‘প্রকৃতিপাঠ’ কবিতাটি মন ছুঁয়ে যায়। ঊনত্রিশটা অঙ্ক, এগারোখানা ম্যাপ কিংবা কেরিয়ারের মানে যে বোঝে না, সে তো পদ্মদিঘির তলে গুগলি কুড়োবেই, ঝুমকো জবায় সন্ধেবেলা যে জোনাকপোকা জ্বলে তারই দুটো ধরে এনে ঘরের কোনায় রেখে দেবেই, নারিকেলের পাতা দিয়ে বানিয়ে দেবে বাঁশি, মা-হারা বিড়ালছানার জন্য বিছানা করে রাখবে।সেইতো বোঝে চাঁদের সঙ্গে মেঘের লুটোপুটি। তাঁর কবিতা পড়লে বইয়ের পড়ার ফাঁকে প্রকৃতিকে যে জানতে ইচ্ছে করবেই।চেনা গ্রামের গল্পও বদলে যায়। মনসাপোতার খালে সরু বাশের সাঁকো ভেঙে যায়, কংক্রিটের ব্রিজ তৈরি হয়, জ্বলে বিজলিবাতির আলো। বাবুইপাখিরা জোনাকি ধরে না আর। মোরাম রাস্তায় ভ্যান-রিকশার ঠুংঠাং চলতে থাকে অবিরত। বাড়িতে এসে গেছে নতুন টেলিভিশন। টেলিফোন আর ইলেকট্রিকের তারে আকাশ ছোটো হয়ে যাচ্ছে। কবি লেখেন — “… এবার পুজোয় যদি/ গ্রামে আসো তবে, কিচ্ছু চাই না জেনো,/ শহরেই নাকি সবকিছু পাওয়া যায়/ আমার জন্যে গ্রামের গল্প এনো।”

মনে পড়ে যাচ্ছে ‘তিতলি’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর একটি সাক্ষাৎকারের কথা। সেখানে তিনি বলেছেন, “আমি প্রকৃতি পাঠ পড়ে শিশুসাহিত্যে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। সে পাঠ আমার মেদিনীপুরের গ্রামের আকাশের মেঘের গায়ে লেখা থাকত, গাছ-লতাপাতার সবুজের গায়ে মনসাপোতা খালের বান-ডাকা ঘোলা জলের তিরতিরে ঢেউয়ের মাথায়, ফুল থেকে ক্ষীর জন্মানো ধানের শিষে, বিকেলবেলার রামধনুর পিঠে, পূর্ণিমা রাতের দুধসাদা জ্যোৎস্নায় আর বাঁশবাগানের গায়ে মস্ত শিরিশ গাছের নীচের ভূতের ভয়পাওয়া জমাট-বাঁধা অন্ধকারে।”

পৃথিবীকে ভালবাসতে শেখান রতনতনু। শেখান মানবিক গুণ। পৃথিবী ধ্বংসের কথা ভাবতেই পারেন না তিনি। যুদ্ধ, লড়াই, হিংসা নয়, বিশ্বশান্তির কথা বলেন তিনি। তাঁর কবিতা আমাদের নিয়ে যায় বনের মধ্যে, যেখানে চাঁদকে দিয়ে মেঘ লেখাব আমি,আকাশকুসুম ফুটে ওঠার গন্ধ পাব। কদমকুঁড়ি গাঁয়ের শেষে চাপাদিঘির জলে দু’মুঠো ফুল ছড়িয়ে দিতে আমিও যাব তাড়াতাড়ি। তাঁর মতো শব্দ দিয়ে ছবি আঁকতে ইচ্ছে করে আমারও — “অস্তাচলে দিন চলেছে/ পিছনে দেবদারু/ সন্ধে এসে নদীর পারে/পথ গিয়েছে ভুলে।”মেঘেরা সব তাকিয়ে থাকে বনের দিকে মুখ করে, অভিমানী চাঁদ ভেসে যায় ইচ্ছামতীর জলে। ঝাপসা হয়ে আসে আমার দু’চোখ আঁধার নেমে এলে।

মেয়ে বলে, ‘চাঁদের মাটিতে হবে আমাদের বাড়ি’। চলে যাই চাঁদের বাড়ি। চাঁদের মাটি থেকে মেয়ে চিঠি লেখে ঠাকুমাকে। কিন্তু সেই চাঁদের বাড়িতে নেই কোনো রূপকথা, নেই ক্ষীরের পুতুল। বন্ধুদের জন্য মন খারাপ করে, বারবার মনে পড়ে ঠাকুমার কথা। পুজো এলে ঠাকুমাকে আসতেই হবে পুরোনো বাড়ির স্মৃতিটুকু ফেলে আর চাঁদের বাড়িটাকে আনন্দে ভরিয়ে তুলতে হবে।

ভূতের কত না রকমফের। তাঁর ভূতের ছড়ায় ভয় থাকে না, থাকে মজা। গল্পের রঙে লেখা সে সব ছড়ায় আমরা পেয়ে যাই ভ্রমণ-বিলাসী ভূতকে, পেয়ে যাই খেলোয়াড় ভূত, সঙ্গীতপ্রেমী ভূত, কেরানি ভূতকেও। মানুষের উৎপাতে তাঁর ভূতকে সুন্দরবনে বলে পালিয়ে যেতেও দেখি আমরা। শব্দচয়ন ও চিত্রকল্প নির্মাণে রতনতনু আমাদের চমকে দেন, ছোটোবেলাকে ছুঁতে পারি আমরা। ছন্দ নিয়ে কত না পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কল্পজগৎ তাঁর কবিতার অলঙ্কার। পাল্টে-যাওয়া পৃথিবীকে দেখি, ভাবি নেপচুনের বাড়ি কেনার কথা, মঙ্গলে বাগান বানানোর কথা, শুক্রগ্রহের পাশের গ্রহে পুকুর কাটার কথা কিন্তু কবির মতো আমারও মনে হয় বেশ আছি ছোটোনীলপুরে। তাঁর ছড়ায় গল্পের মেজাজ আমাদের আবেশে জড়িয়ে রাখে। মিথ্যে রাজার দেশ থেকে ছুটি নিতে হয় আকাশ-রোদ-নদী-রামধনুকে।রাজার হুকুমে ছুটির নোটিশ পায় তারা। যে আকাশ গাছে-পাতায় আলো মাখায়,যে নদী গরিব লোকের ঘরে বিনি পয়সায় কল্পনা দিয়ে আসে, যে রামধনুরা ছেলে-মেয়েদের রাঙিয়ে তোলে নানান রঙে — তাদের বিদায় নিতে হয় সেই রাজার রাজত্ব থেকে।

নতুন ভারতবর্ষের কথা শুনি কান পেতে।গ্রামের ফুলে শহর সেজে ওঠার কবিতা পড়তে পড়তে খুঁজে পাই চম্পারানি দুলে, অমূল্যধন জোলা, দিনু বাগদি,ভানু কাহারকে — এদের সাফল্য উজ্জ্বল করেছে আমাদেরও। বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন — “বাংলা আমার ভাষা/ আমি বাংলার/এই ভাষা আমাদের/ বেঁচে থাকবার!”

‘আবৃত্তির নতুন ছড়া-কবিতা’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, “ছড়া কবিতা হল একাকী পাঠকের নিভৃত পাঠ, আর আবৃত্তি হল লোকপ্রিয় বাকশিল্প,জনসমক্ষের। ভালো ছড়া-কবিতা হিরের মতো, নানা দিকে তার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে, আবৃত্তির মধ্যে দিয়ে তা প্রাণ পায়। আবৃত্তিযোগ্যতা কোনও কবিতার বিশেষণ নয়। আবৃত্তিশিল্পীর চেতনায় তা আবৃত্তিযোগ্যতা লাভ করে।” আমরা সবাই জানি তাঁর কবিতা আবৃত্তি করে পুরস্কার এবং আনন্দ দুটোই পায় ছোটোর।তিনি বলেন, “যখন ছোটোদের মুখ থেকে শুনি তার আবৃত্তির সমস্ত পুরস্কারই আমার কবিতা বলে,তখন আনন্দ হয় বইকী।”

তাঁর কবিতা পড়ে আমরাও আনন্দিত হই। তাঁর লেখায় ছড়িয়ে-থাকা ‘মানুষের লাবণ্য, মায়াময় নদী-পথঘাট-গাছপালা-ফুল পাখির মাধুর্য, অপরূপ জীবনের মায়াময় গন্ধ’ আমাদের বিভোর করে।

ধুধু নির্জনগাছিতে শীতের ছুটিতে আমিও চলে যাই, মেঘের গায়ে চাঁদ দেখে আসি। নিরিবিলিগড়ে পৌঁছে সেগুনপাতায় সাদা অক্ষরে লেখা ছড়াও পড়ে নিই, বসন্তে রকমারিপুর গিয়ে পলাশের বনে কান পেতে শুনে আসি গান ভোমরার সুরে, কাহিনীনগরের রূপকথাও শুনতে ভুলি না।

‘টাপুর টুপুর’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন —

“আমার ছেলেবেলা ছিল রূপকথায় মোড়া এক স্বপ্নের দেশ। অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার মহিষাদল থানার উর্বশীর মতো একটা গ্রাম রাজারামপুর। সেখানেই আমার পৃথিবীর মুখ দেখা। সে গ্রামে ভোরবেলার আম-কুড়নো সকাল ছিল। খর গ্রীষ্মে বাঁশ বাগানের ওপাশ থেকে ‘চোখ গেল’ পাখির ‘চোখ গেল’ ‘চোখ গেল’ ডাক যখন দুপুরের তাপমানকে ঠেলে সরিয়ে ভেসে-আসত, আমিও সে ডাক নকল করে গলা মেলাতাম। ঠাকুরমা বারণ করত, ‘‘ও ডাক নকল করতে নেই!’’ কেন যে নকল করতে নেই, কে জানে!  তা হলে তাই সই।

কিন্তু খানিক পরেই ভেসে আসত কোকিলের ডাক ‘কুউ’ ‘কুউ’। ফের গলা মেলাতাম। আমার ডাকে বেশ রাগ হয়ে যেত কোকিলের। তখন সে দ্রুতলয়ে ডাকতে শুরু করত। কোকিলটা ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে গেলে, তারপর বাঁশকাঠি দিয়ে বাবার নিজের হাতে তৈরি করে দেওয়া ঘুড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। তাতে বেঁধে দিতাম কাঁচি দিয়ে কাটা কাগজের ভোমরা। ঘুড়ি যখন আকাশের অনেক উঁচুতে, তার সুতোয় কান পেতে নিঝুম হয়ে বসে কাগুজে ভোমরার শব্দ শুনতাম তন্ময় হয়ে। বন্ধুরা ‘আয় তো মোদের গোলাপ ফুল’, ‘রুমালচোর’ বা ‘বউবসন্ত’ খেলতে ডাকলে যেতে আমার বয়েই গেছে! তারপর যখন সোনালি গোধূলির আলোর ওড়না মাথায় দিয়ে সন্ধে নামবে নামবে করত, আমি তখন ঘুড়ি গুটিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কালিপোতার মাঠের উঁচু ঢিবির উপর গ্যাঁট হয়ে। আমাদের গ্রামের পশ্চিম পাড়ার গাছগাছালির মাথায় তখন আকাশ জুড়ে শুরু হয়ে যেত মেঘের ঘরবাড়ি, গাছ-লতা-পাতা, নদী-নৌকো আর পথভোলা পথিকের পথচলার জলছবি। মনে মনে আমি আর আমার বন্ধুরা ওসব ছবি আঁকতাম মুখে মুখে। তারও পরে অন্ধকার নেমে এসে যখন সামনে দাঁড়াত, তখন নামতা আবৃত্তি করতে করতে বাড়ির পথে দৌড়তাম। কোনও কোনও দিন ঢ্যাঙা খিরিশ গাছের মগডাল থেকে যে পুতনা রাক্ষসীর ভূত নামত না তা নয়। গায়ে কাঁটা দিত! তারপর বাড়ি ফিরে গিয়ে বর্ণপরিচয় বা সহজপাঠের একটা লাইনও পড়তে পারতাম না। চোখ-জুড়ে নেমে আসত ঘুম! এরকম ছিল আমার ছেলেবেলা!”

আকাশ দত্ত সম্পাদিত ‘কলস্বর’ পত্রিকায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “রতনতনু ঘাটীর ছোটোদের শ্রেষ্ঠ ছড়া-কবিতা — ইচ্ছেপুরের গল্প হয়ে ওঠে : অমৃতাভ দে”

  1. দীপাঞ্জন দে says:

    খুব ভালো লাগল।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev