প্রবল মূল্যবৃদ্ধির চাপ সত্ত্বেও বাড়ানো হলো না রেপো ও রিভার্স রেপো রেট। ব্যাঙ্ক সুদের হার তলানিতে পৌঁছলেও বাড়ানো গেল না বৃদ্ধির হারও। হতাশ সুদনির্ভর জনতার উদ্বেগ বাড়িয়ে বুধবার সকালে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর শক্তিকান্ত দাস জানালেন, গত বছরে আর্থিক সংকোচনের নিচু ভিতের উপর দাঁড়িয়েও ভারত পাচ্ছে না দুই অঙ্কের জিডিপি বৃদ্ধি। তবে রেট না বাড়ায় গুনতে হবে না ব্যাঙ্ক ঋণে বাড়তি সুদ, এই খবরে চড়চড়িয়ে বাড়ল শেয়ার বাজার। আকর্ষণীয় খবর হলো, জাতীয় অর্থনীতির আগামী দিনের চেহারা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গুরুত্বপূর্ণ মনিটরি পলিসি কমিটিতে। শেষ পর্যন্ত ৫ – ১ গরিষ্ঠতায় ছিক হলো, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বজায় রাখবে অ্যাকমোডেটিভ স্ট্যান্স।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মনিটরি পলিসি কমিটির তিন দিনব্যাপী সভা শেষ হলো বুধবার। কমিটির সদস্যদের মধ্যে আছেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর শক্তিকান্ত দাস, যিনি পদাধিকারবলে মনিটরি পলিসি কমিটির চেয়ারম্যান। রয়েছেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডেপুটি গভর্নর মাইকেল দেবব্রত পাত্র ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মৃদুল কে সাগর। এছাড়া তিন জন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বাইরের সদস্য মনিটারি পলিসি কমিটিতে আছেন, শশাঙ্ক ভিদে (ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ অ্যাপ্লায়েড ইকনমিক রিসার্চ-এর সিনিয়র অ্যাডভাইসর), অসীমা গয়াল ও জয়ন্ত আর বর্মা। সভা শেষে বুধবার সকালে সিদ্ধান্ত জানালেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর শক্তিকান্ত দাস। তবে তাঁর সিদ্ধান্তে পাওয়া গেল না সুদিনের আশ্বাস। চলতি বছরের শেষ অর্ধে বৃদ্ধির পূর্বাভাস কমালেন, বাড়ালেন চলতি ত্রৈমাসিকে মূল্যবৃদ্ধির অঙ্ক।
শক্তিকান্ত উবাচ
রেপো ও রিভার্স রেপো বিষয়ে —
গত বছরের ২২ মে রেপো রেট নামিয়ে আনা হয়েছিল ৪ শতাংশে। সেটাই বজায় থাকল এ দিনও। পরিবর্তন হলো না রিভার্স রেপো রেটেরও, তা রইল ৩.৫ শতাংশেই। প্রসঙ্গত, বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক ঋণ নিলে যে হারে রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে সুদ দিতে হয়, সেটাই রেপো রেট। আবার রিজার্ভ ব্যাঙ্কে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলো টাকা রাখলে যে হারে সুদ পায়, সেটা রিভার্স রেপো রেট।
আর্থিক বৃদ্ধি বিষয়ক —
অক্টোবর-ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে বৃদ্ধির পূর্বাভাস আগে ছিল ৬.৮ শতাংশ, তা কমিয়ে করা হলো ৬.৬ শতাংশ।
এর আগে ভাবা হয়েছিল, ২০২২-এর জানুয়ারি-মার্চ তিন মাসে জিডিপি বাড়বে ৬.১% হারে, এবার তা কমিয়ে করা হলো ৬ শতাংশ। সারা বছরে জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস রাখা হলো ৯.৫ শতাংশেই, অর্থাৎ দুই অঙ্কের বৃদ্ধি অধরাই রইল।

মূল্যবৃদ্ধির দুশ্চিন্তা —
চলতি অর্থবর্ষ অর্থাৎ, ২০২১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়পর্বে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি হবে ৫.৩% হারে, পূর্বাভাস রিজার্ভ ব্যাঙ্কের। এর আগে আরবিআই বলেছিল, চলতি বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি হবে, ৪.৫ শতাংশ হারে, এবার তা বদলে করা হয়েছে ৫.১ শতাংশ। এর অর্থ, জিনিসের দাম বর্ধিত গতিতে বাড়ছে, মানল কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চে খুচরো মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৫.৮ শতাংশ থেকে সামান্য কমিয়ে করা হলো ৫.৭ শতাংশ। আমাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা, লাগামছাড়া হয়েছে মূল্যবৃদ্ধি। বর্তমানে পাইকারি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির হার আকাশ ছোঁয়া, চলতি বছরের অক্টোবরে তা ছিল ১২.৫৪ শতাংশ। খুচরো বাজারেও দ্রুত গতিতে দাম বাড়ছে, অক্টোবরে ৪.৪৮ শতাংশ। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে ৫.১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির অর্থ, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ৬ শতাংশের কাছাকাছি হারে দাম বাড়ছে, মানছেন খোদ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরই। খুচরো মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সহ্যসীমা হলো ৪ শতাংশ, এর ২ শতাংশ কম-বেশি পর্যন্ত মেনে নেওয়া যায়। সেই হিসেবে খুচরো দাম বাড়ার ব্যাপারটা চিন্তাজনক। এই মুহূর্তে জিনিসপত্রের দাম যে ভাবে বাড়ছে, ব্যাঙ্কে সুদ মিলছে তার কম। ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিটে সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচ শতাংশ হারে সুদ পাওয়া যায়, অথচ আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, মূল্যবৃদ্ধি তার থেকে বেশি। অর্থাৎ, ব্যাঙ্কে জমা রাখলে টাকা না বেড়ে কমছে। সুদ-নির্ভর মধ্যবিত্ত সমাজ, বিশেষ করে মধ্যবিত্তরা আশা করেছিলেন, সুদ কিছুটা হলেও বাড়বে। তাদের হতাশ করেছেন শক্তিকান্ত দাস।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কে মতবিরোধ
অদূর ভবিষ্যতে অর্থনীতির চেহারা কেমন হবে, তা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ৬ সদস্যের মনিটারি পলিসি কমিটিতে। ৫ – ১ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সিদ্ধান্ত হয়, বজায় থাকবে অ্যাকমোডেটিভ স্ট্যান্স। অ্যাকমোডেটিভ স্ট্যান্স-এর অর্থ, রেপো রেট বা রিভার্স রেপো রেট কমানো বা একই রাখা হবে, বাড়াবার কথা ভাবা হচ্ছে না। বোঝাই যাচ্ছে, মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে রেট বাড়াবার কথা জোরালো ভাবেই উঠেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এই গুরুত্বপূর্ণ সভায়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে বাড়ানো হলো না রেটগুলি। রেপো ও রিভার্স রেপো না বাড়ায় অবশ্য স্বস্তি মিলেছে শিল্প মহলে। ব্যাঙ্ক ঋণে বাড়তি সুদের বোঝা চাপবে না, এই খবরে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে শেয়ার বাজার।
আবার উত্থান শেয়ার বাজারে
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হার বা রেট না বাড়ানোর সিদ্ধান্তে বুধবার শেয়ার বাজারে উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ে। ওমিক্রন সংক্রমণের তীব্রতা ততটা হচ্ছে না, এড়ানো যাবে লকডাউন, এই আশাও উত্থানের অন্যতম কারণ। গত শুক্রবার এবং সোমবার মিলিয়ে প্রায় পৌনে তিন শতাংশ পতন দেখেছিল শেয়ার বাজার। মঙ্গল ও বুধবারে প্রায় সওয়া তিন শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিল দালাল স্ট্রিট। বুধবার সেনসেক্স ১০১৬ পয়েন্ট বা ১.৭৬ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৫৮,৬৫০ পয়েন্ট। এ দিন নিফটি-র উত্থান ২৯৩ পয়েন্ট বা ১.৭১ শতাংশ, নিফটি দাঁড়িয়েছে ১৭,৪৭০ পয়েন্টে। রাষ্টায়ত্ত ব্যাঙ্ক, মিডিয়া, তথ্যপ্রযুক্তি ও ধাতু ক্ষেত্রগুলি বুধবারের উত্থানে সামনের সারিতে। পরপর দু’দিন এমন উত্থানে বাজারে প্রাধান্য পাচ্ছে আশাবাদী চিন্তা।

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কথিত মূল্যবৃদ্ধির হারের সঙ্গে কিন্তু মিলছে না প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। চাল-ডাল-সবজি সহ সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশ ছোঁয়া। সারা দেশ জুড়ে সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত হচ্ছেন ম্যাহেঙ্গাই-এর ধাক্কায়। ক্রমাগত পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধির পালে হাওয়া জোগাচ্ছে খোদ কেন্দ্র। এই অবস্থায় রেপো বা রিভার্স রেপো রেট না বাড়ায় হতাশ সুদ-নির্ভর জনতাকে প্রায় বাধ্য করা হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার বাজারে পা রাখতে।