সদ্য হয়ে যাওয়া দিল্লি বিধানসভা ভোটের ফল প্রমাণ করছে মানুষের জন্য কাজ করলে মানুষ ভোট দেয়। এই একই কারণে ২০২১ সালেও বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দেবে। সাধারণ মানুষ ভোট দেওয়ার পর এটুকুই আশা করেন যে, সরকার তাদের স্বার্থে কাজ করবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার তেমন কাজই বিগত ১০৫ মাস ধরে করে আসছেন। প্রসূতি মা, সদ্যোজাত শিশু থেকে শ্মশানে বা কবরস্থানে যাওয়া শোকার্ত পরিবারের উপকারে মা-মাটি-মানুষ সরকার কত যে প্রকল্প করেছে, তা আগামী দিনেও পরপর জানাবো। সরকার চালাতে গেলে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকেই। কিন্তু প্রশ্ন হল সরকারের প্রধান সেই ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো ধরে শুধরে এগিয়ে যাচ্ছেন কিনা। ১৯৯৫ সালে বর্ধমানের এক সভায় তদানীন্তন মন্ত্রী বিনয় চৌধুরী বলেছিলেন, ‘আমাদের সরকার ঠিকাদারদের হয়ে, ঠিকাদারদের দ্বারা এবং ঠিকাদারদের জন্য কাজ করছে।’ একথা বলার জন্য জ্যোতি বসু উষ্মা প্রকাশ করে বলেছিলেন, তাহলে, উনি এই সরকারে আছেন কেন? বিপরীতে দেখুন, বাঁকুড়ার সারেঙ্গায় একটি জলাধার ভেঙে পড়ায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কত কড়া পদক্ষেপ নিলেন। বুধবার ২৮ মাঘ ১৪২৬ (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০) প্রকাশ্যে বললেন, সারেঙ্গার ভাঙা ট্যাঙ্ক ওই ঠিকাদারকেই বিনা পয়সায় করে দিতে হবে। প্রয়োজনে সরকার ওই ঠিকাদারের সম্পত্তি ক্রোক করবে। এজন্য আইন করার দরকার হলেও করব। টিভি চ্যানেলে ওই জলাধার ভেঙে পড়ার দৃশ্য দেখে সকলের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। সেই ক্ষোভের বহিপ্রকাশ ঘটল বাঁকুড়ার প্রশাসনিক বৈঠকে। মুখ্য সচিব রাজীব সিনহা জানান, ওই ঠিকাদারই নতুন ট্যাঙ্ক তৈরি করবেন। তবে তাঁকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ওই ঠিকাদারের হাতে আরও কয়েকটি কাজ রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জেলার পুলিশ সুপারকে বলেন, আপনি ওই ঠিকাদারের কাজে নজর রাখবেন। শুধু এটুকুই নয়, ওই বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মুখ্য সচিবকে বলেন, ভূমি দফতর আর পিএইচই-তে ঘুঘুর বাসা আছে। অনেক ক্ষেত্রে খরচা করে দশ শতাংশ আর নব্বই শতাংশ বেশি বিল করে দেয়। তিনি আরও বলেন, আমি লোকের পেটে ভাত দিতে চাই, সেই টাকা খরচ করব। যেটা দিলে লোকের পেটে দুটো ভাত পড়বে। এমন খরচ করব না, যাতে কেউ কারো ভাত কেড়ে নিজের পেট ভরতে পারে। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের জন্য আমাকে কথা শুনতে হচ্ছে।
পরদিন বৃহস্পতিবার দুর্গাপুরেও প্রশাসনিক বৈঠক ছিল। এই বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ পান, দু-একটি বেসরকারি হাসপাতাল স্বাস্থ্যসাথীর কার্ডধারীদের চিকিৎসা না করে ফিরিয়ে দিচ্ছে। কোনও বৈঠকে এই অভিযোগ শুনলে প্রথমে কি করা উচিত? অভিযোগ ঠিক কিনা সেটা বোঝা। মুখ্যমন্ত্রী যখন বুঝলেন, অভিযোগ ঠিক, তখন পরিষ্কার বলে দিলেন, স্বাস্থ্যসাথীর কার্ডধারীদের ফেরানো চলবে না। ফেরালে রাজ্য সরকার ওই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে দেবে। আবার দেখুন, হুগলির বেঙ্গাই কলেজে পূর্ণ সময়ের অধ্যাপক হিসেবে কাজে যোগ দেওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় ২০১৯-এর ৬ সেপ্টেম্বর কলেজের মধ্যেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান উদয়ভানু কুণ্ডু। তাঁর স্ত্রী মুখ্যমন্ত্রীকে নিজের দুঃখের কথা একটা চিঠিতে লিখে জানিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার বাঁকুড়ার জেলাশাসক উমাশংকর বেলিয়াতোড়ের সেই গৃহবধূ টুম্পা কুণ্ডুর বাড়িতে গিয়ে একটি সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র দিয়ে আসেন। মুখ্যমন্ত্রীকে সমস্যা জানিয়ে চিঠি লিখলাম, আর তিনি লিখে দিলেন, দ্য ম্যাটার ইজ বিইং লুকড ইনটু। এমন ধরতাই কাজ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেন না। তাঁর এমন সংবেদনশীলতার পরিচয় বারবার পাওয়া গেছে। বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আবার একই সঙ্গে দুষ্টের পালনে কঠোর হতেও তিনি দ্বিধা করেন না। এজন্যই এখনও গ্রামবাংলার প্রতিটি ব্লকে এবং শহরাঞ্চলের প্রতিটি ওয়ার্ডে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চাক্ষুষ দেখার জন্য রাস্তার দু-ধারে লোক দাঁড়িয়ে থাকেন। এই ক্যারিশমা তৈরি হয়েছে ২৬-২৭ বছর ধরে বামফ্রন্ট সরকার-বিরোধী একটানা আন্দোলন চালিয়ে একইসঙ্গে বিগত ১০৫ মাসে জনমুখী সরকারের উদাহরণ দেখিয়ে।