বাবার পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করতে হবে বলেই প্রবল আপত্তি তোলেন। মধুসূদনের মতে কোর্টশিপ ছাড়া এক অচেনা মেয়েকে নিজের জীবনসঙ্গিনী ভাবা যায় না। উনবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে এ হেন চিন্তা সেকালের বাংলায় কারোর মাথাতে আসতে পারে না। কিন্তু মধুকবির সঙ্গে আর পাঁচজনকে গুলিয়ে ফেলা যায় না। তিনি সবসময় সবক্ষেত্রে আলাদা একজন ব্যক্তিত্ব। শুধুমাত্র বিয়ের হাত থেকে বাঁচতে তিনি ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হলেন, তাও মাত্র উনিশ বছর বয়সে, ইতিহাস খানিক এরকমই দাবী করে। তবে আর একটি দাবীও আছে, যেটি অনেক গল্পের জন্ম দেয়। মধুসূদনের জীবনীকারদের অনেকেই মনে করেন রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যা দেবকীর প্রতি মধুকবির অসীম মুগ্ধতা ছিল। মধুসূদনের প্রতি রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহনের যথেষ্ট স্নেহ থাকলেও বোধহয় তাঁর কন্যার প্রতি মধুকবির মুগ্ধতা তিনি মেনে নিতে পারেন নি। তাই দেবকীকে লাভ করার বাসনায় মধুসূদনের নিজধর্ম ত্যাগ করে পরধর্ম গ্রহণ পরবর্তীকালে মোটেই সুখদায়ক হয়নি।
১৮২৪ এর ২৫শে জানুয়ারি উনিশ শতকের একজন শ্রেষ্ঠ কবি ও নাট্যকার জন্ম নিলেন ব্রিটিশ ভারতের যশোর জেলার সাগরদাঁড়িতে। যিনি ছদ্মনাম নিয়েছিলেন ‘টিমোথি পেনপোয়েম’। এই ছদ্মনামও কেউ মনে রাখেননি। মনে থেকে যাবে মধুনাম।
সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত কলকাতার সদর দেওয়ানি আদালতের খ্যাতনামা আইনজীবী। খিদিরপুর অঞ্চলে সার্কুলার গার্ডেনরিচ রোডে (বর্তমানে কার্ল মার্কস সরণি) এক বিশাল অট্টালিকায় তিনি বাস করতেন। মা জাহ্নবীদেবী ছিলেন যথার্থ হিন্দু ধার্মিক রমণী। মায়ের কাছেই মধু কবির প্রারম্ভিক শিক্ষা শুরু হয়। মা তাঁকে রামায়ণ, মহাভারত ও হিন্দু পৌরাণিক সমস্ত কাহিনীর সঙ্গে পরিচিতি ঘটান। যে পরিচয় পরবর্তীতে মধুকবির অনন্য লেখায় প্রকাশ পেয়েছে। মায়ের স্নেহ, গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কপোতাক্ষ নদের কাকচক্ষু জলের স্নেহপরশে বড় হচ্ছেন এক বেপরোয়া বালক। একদিকে যাঁর অনন্ত জিজ্ঞাসা আবার অন্যদিকে অস্থির চিত্ত। অসম্ভব এক বৈপরীত্য মধুকবির সারা জীবনের সঙ্গী।
জীবনে যা কিছু ‘অ্যাচিভ’ করতে চেয়ে অগ্রসর হয়েছেন, হয় বাধা এসেছে, নয় হতাশা। বিশাল মাপের স্রষ্টা হয়েও সামাজিক স্বীকৃতি জোটেনি জীবনের অন্তিম ক্ষণেও। তবু চিরকাল তিনি বেপরোয়া হয়েই কাটিয়ে গেছেন জীবনের প্রতিটি ক্ষণ। হেরে গিয়েও হার মানেন নি। যে জাহ্নবী আর কপোতাক্ষ তাঁর জীবন জুড়ে ছিল, সেসব ত্যাগ করতে হল ধর্মত্যাগের কারণে। কী লাভ করার জন্য তিনি ধর্মকে ছেড়ে পরধর্ম গ্রহণ করেছিলেন জানা নেই, তবে এই কারণে হারিয়েছিলেন তাঁর বাবা, মা, আত্মীয়, বন্ধু, কপোতাক্ষকেও। পিতা রাজনারায়ণ কবিকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। বাবার সম্মুখে মধুসূদনের ধূমপান, মদ্যপান করতে কোনো দ্বিধা ছিল না। কিন্তু পরধর্ম গ্রহণ মানতে পারেন নি রাজনারায়ণ দত্ত।
ছেলেবেলায় সাগরদাঁড়ির পাশে শেখপুরা মসজিদের বিদ্বান ইমাম মুফতি লুৎফুল হকের কাছে ফারসি ও আরবি ভাষা শিক্ষা করেন। তারপর তেরো বছর বয়সে কলকাতায় এসে একটি স্কুলে ভর্তি হন। কিছুদিন পর হিন্দু স্কুলে ভর্তি হন। মেধাবী ছাত্র হওয়ার কারণে তিনি কলেজের অধ্যক্ষ ডি এল রিচার্ডসনের প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন। এই রিচার্ডসনই মধুসূদনের মধ্যে কাব্যপ্রীতি সঞ্চারিত করেন। হিন্দু কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর মতাদর্শ তাঁকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করত। ভূদেব মুখোপাধ্যায়, গৌরদাস বসাক, রাজনারায়ণ বসু, প্যারিচরণ সরকার – উনিশ শতকের এইসব বিশিষ্টজনেরা ছিলেন মধুকবির বন্ধু। ফলে মাত্র আঠারো বছর বয়সেই তিনি যে মহাকবি এবং বিলেত যেতেই হবে এই ধারণা তাঁর বদ্ধমূল হয়ে যায়।
১৮৪৩ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯ বছর বয়সে ওল্ড মিশন চার্চে মধুসূদন খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হলেন। পাদরি ডিলট্রি তাঁকে দীক্ষিত করেন। তিনিই তাঁর নাম “মাইকেল” রাখেন। এরপর থেকে মধুসূদনের পুরো নাম হল মাইকেল মধুসূদন দত্ত। কিন্তু এই ঘটনায় হিন্দুসমাজে আলোড়ন ওঠে সাংঘাতিক। তিনি হিন্দু কলেজ থেকে বিতাড়িত হলেন। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করেন। এরপর মাইকেল শিবপুরের বিশপ কলেজ থেকে পড়াশোনা চালাতে থাকেন। তাঁর পিতা ত্যাজ্য করলেও কলেজে পাঠের সময়কালে নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। কিন্তু চার বছর পর টাকা পাঠানো বন্ধ করেন। মাইকেল কলকাতায় চাকরির চেষ্টা করেও বিফল হয়ে কয়েকজন মাদ্রাজি বন্ধুর সঙ্গে মাদ্রাজে চলে যান। এই যাতায়াতের খরচ নাকি তিনি নিজের সমস্ত পাঠ্যপুস্তক বিক্রি করে জোগাড় করেছিলেন।
কিন্তু ভাগ্য যার সাথে নেই তার কোনোখানেই সাফল্য ধরা দেয় না। মাদ্রাজে একটি ইংরেজি স্কুলে তিনি শিক্ষকের চাকরি পান। যা বেতন পেতেন তাতে তাঁর ব্যয়সংকুলান হত না। মাদ্রাজ ক্রনিকল পত্রিকায় তিনি লিখতে শুরু করলেন। হিন্দু ক্রনিকল নামে একটি পত্রিকা তিনি সম্পাদনাও করেছিলেন। কিন্তু অর্থাভাবে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। পঁচিশ বছর বয়সে ‘ক্যাপটিভ লেডি’ নামক তাঁর প্রথম কাব্যটি প্রকাশিত হয়। ভেবেছিলেন এই কাব্য তাঁকে খ্যাতি এনে দেবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বইটির মাত্র আঠারো কপি বিক্রি হয়।
মাদ্রাজে ১৮৪৮ সাল থেকে ১৮৫৬ অবধি কাটিয়েছিলেন। ১৮৪৮-এর জুলাই মাসে তিনি রেবেকা ম্যাকটিভিসের সঙ্গে প্রেম পরিণয়ে আবদ্ধ হন। তাঁর থেকে বছর ছয়েকের ছোট রেবেকা মাইকেলের স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। বিয়ের তিন মাসের মধ্যে রেবেকা গর্ভবতী হলেন। সংসারে তখন নিদারুণ অর্থকষ্ট। রেবেকার স্বাস্থ্য উদ্ধারের উদ্দেশ্য নিয়ে মাইকেল উত্তরে ভ্রমণে যান। ঠিক একই সময়ে মাইকেলের সহকর্মী জর্জ জাইলস হোয়াইটের স্ত্রী মারা গেছেন। জর্জের তিন সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠা কন্যা ছিলেন হেনরিয়েটা। স্ত্রী বিয়োগের তিন বছরের মধ্যেই জর্জ বিবাহ করলেন ষোলো বছরের এমিলি জেইন শর্টকে। ওদিকে হেনরিয়েটা তখন সতেরো। কাজেই ১৭ বছরের হেনরিয়েটা নিজের থেকে এক বছরের ছোট নতুন মা’কে মানতে পারল না। সংসারে মেয়ে আর নতুন মায়ের প্রচন্ড ঝগড়া অশান্তি শুরু হল।
এই সময় মাইকেল আর হেনরিয়েটা নতুন একটা সম্পর্কে বাঁধা পড়তে শুরু করেন। অল্পশিক্ষিতা রেবেকার পাশে হেনরিয়েটাকে মাইকেল সঙ্গিনী বলে ভাবতে শুরু করেন। বস্তুত ধীরে ধীরে হেনরিয়েটা হয়ে ওঠেন মাইকেলের যথার্থ সঙ্গিনী। বিবাহ না হলেও ওদের সম্পর্ক খুবই গভীর হয়ে ওঠে। সন্তান হয়। কিন্তু পিতা রাজনারায়ণ দত্তের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মাইকেল সবকিছু ফেলে কলকাতায় চলে আসেন। বেশ কিছুদিন পরে হেনরিয়েটাও কলকাতা আসেন। মাইকেলের জীবনে দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়। তবে রেবেকার সঙ্গে আইনি বিচ্ছেদ না হওয়ার কারণে হেনরিয়েটা কখনও স্ত্রীর মর্যাদা পান নি। দ্বিতীয় সংসারও চরম অর্থকষ্ট আর অসুখের কেটেছে মধুকবির। মাইকেল ও হেনরিয়েটার চার সন্তানের মধ্যে একটি আঁতুড়ঘরেই মারা যায়। বাকি তিন সন্তান — শর্মিষ্ঠা, মিল্টন ও নেপোলিয়ন।
কলকাতায় আসার পর মাইকেল কখনো কেরানি কখনো দোভাষীর কাজ করেছেন। এদিকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে ততদিনে কাজ শুরু করেছেন। লিখছেন ‘শর্মিষ্ঠা’, ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’, ‘পদ্মাবতী’, ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’-র মতো সাহিত্য। সংসারের অনটনের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে পাড়ি দিলেন ইংল্যান্ড। কিন্তু বর্ণবিদ্বেষের কারণে ১৮৬০ সালে সেখান থেকে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে চলে যান। সেই সময় থেকে তাঁকে সর্বতোভাবে সাহায্য করেছিলেন ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর।
হিন্দু ধর্মের কাছে মাইকেল ছিলেন বিধর্মী আবার খ্রিস্টান ধর্মের কাছে ছিলেন পরিত্যক্ত। কারণ তিনি কোনোদিন গির্জায় যেতেন না। এক সময়ের পরমাত্মীয়রা কেউ পাশে ছিলেন না। ১৮৭২ সালে গুরুতর অসুস্থ হন মধুকবি। ১৮৭৩ সালে হেনরিয়েটা। বেনিয়াপুকুরে দারিদ্র্য ও রোগেভোগে জরাজীর্ণ জীবন। চিকিৎসা তো দূরের কথা, ঠিকমত খেতে পেতেন না কবির পরিবার। মাইকেলের বাল্যবন্ধু সেসময়ের হুগলির জেলাশাসক গৌরদাস বসাক তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন, “আমি কোনোদিন সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্যের কথা ভুলব না। দেখলাম, বিছানায় শায়িত মধু রক্ত বমি করছেন আর মেঝেতে শুয়ে হেনরিয়েটা রোগ যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। তাঁর সন্তান দুটি খিদের জ্বালায় পচা পান্তা খেয়ে ঘরের এক কোণে শুয়ে আছে।…”
এরপর গৌরদাস বসাক মধুসূদনকে আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে দেন। হেনরিয়েটা শেষ সময়েও অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলে গেছিলেন, “আমাকে নয়, ওঁকে দেখুন।” হেনরিয়েটার অসহ্য যন্ত্রণার পরিসমাপ্তি ঘটে তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে ১৮৭৩ সালে ২৬শে জুন বেনিয়াপুকুরের বাড়িতেই। হাসপাতালে যখন খবর পৌঁছল মধুকবি তখন লেডি ম্যাকবেথের মৃত্যুতে ম্যাকবেথ যা বলেছিলেন সেটাই আবৃত্তি করছেন,
“Tomorrow and tomorrow and
tomorrow,
Creeps in this petty pace from day to
day,
To the last syllable of recorded time,
And all our yesterdays, have lighted
fools
The way to duty death…”
এরপর মধুকবিকেও বেশিদিন কষ্ট পেতে হয় নি। মৃত্যু এসে সব বঞ্চনা, সব যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়েছিল ১৮৭৩ সালের ২৯ শে জুন। হেনরিয়েটার চলে যাবার ঠিক তিনদিন পরে। মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে নার্স আর ওয়ার্ড বয় ছাড়া আর কেউ ছিল না। বন্ধু মনমোহনের হাত ধরে মধুকবি তাঁর দুই সন্তানের দেখভাল করার জন্য প্রার্থনা মৃত্যুর আগে সেরে রেখেছিলেন। মৃত্যুর আগে তাঁর এক সময়ের মুনশি মনিরুদ্দিন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে মাইকেল জানতে চান মনিরুদ্দিনের কাছে টাকা আছে কিনা। মনিরুদ্দিনের কাছ থেকে দেড় টাকা নিয়ে বখশিশ দিয়েছিলেন কর্তব্যরত নার্সকে।
মৃত্যুর পরেও হতভাগ্য কবির কপালে আরও অনেক কিছু পাওনা বাকি থেকে গেছিল। মৃত্যুর একদিন পরেও মৃতদেহ সমাধিস্থ করার জন্য বিশপের অনুমতিপত্র মেলেনি। জুন মাসের গরমে মৃতদেহে পচন শুরু হয়েছে। অনেক কান্ডের পর অবশেষে লোয়ার সার্কুলার রোডের সিমেটারিতে মধুকবির স্থান মিলল হেনরিয়েটার পাশেই। স্মৃতিসৌধ দূরে থাক, কোনো পাকা গাঁথনিও তখন ছিল না। অমিত্রাক্ষর ছন্দের স্রষ্টা তবু রয়েছেন আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। কারণ জন্ম যদি হয় বঙ্গে — তবে এই বিদ্রোহী, বেপরোয়া, বেলাগাম কবির জন্য তাঁর সমাধির পাশে কিছুক্ষণ না দাঁড়িয়ে কোনও বাঙালির পক্ষেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।