মানুষকে রাজনীতির কথা বলতে হলে আগে তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। পাশে থাকতে হবে তাদের। ৬০-৭০-৮০র দশক অবধি বাম রাজনীতির বিশেষ করে ছাত্র-যুবদের রাজনীতিতে আসার এই ছিল মূল সুর। জনসেবার মধ্যে দিয়ে মানুষের সঙ্গে একাত্ম না হলে রাজনীতি হয়না, এটা ছিল রাজনীতির দর্শন। জনসেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৩৮ এর পর থেকে প্রায় দীর্ঘ এক দশক ব্যাপী চিন-জাপান যুদ্ধের সময় মানব সেবায় চিনে গিয়ে আর্ত ত্রানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আমাদের দেশের দ্বারকানাথ কোটনিশ, বিজয় বসু, দেবেশ মুখোপাধ্যায়ের মত চিকিৎসকেরা। এদের অবদানের কথা বলেছিলেন স্বয়ং মাও সে তুং।
স্বাধীনতা সংগ্রামের আগে ও পরে ডাক্তার হওয়া এবং ডাক্তারি পড়া বহু ছেলেমেয়ে এবং বাম রাজনীতি করা যুবছাত্ররা নানা বিপর্যয়ের সময় নিজেদের জীবনকে বাজি রেখে মানুষকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়েছেন। কেউ বিলি করেছেন ত্রাণ, কেউ চালিয়েছেন লঙ্গরখানা, কেউ করেছেন চিকিৎসা। কেউবা নিজের বিপদের সম্ভাবনা ভুলে কলেরা বা গুটিবসন্ত আক্রান্ত মানুষদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়েছেন। এদের কাজ ও নিষ্ঠা জনসেবার এক নজির সৃষ্টি করেছিল, রাজনীতিকে দিয়েছিল নতুন উচ্চতা। কট্টর বিরোধীরাও এদের কাজ নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলেননি। মানবসেবার এই ভাবনাকে মাথায় রেখে চলছে ফুলেশ্বরের সঞ্জীবন হাসপাতাল কিংবা শ্রীরামপুরের শ্রমজীবী হাসপাতাল। আজকের রেড ভলান্টিয়ার্সরা বহন করে চলেছেন মানবিক স্বাস্থ্য পরিষেবার সেই উজ্জ্বল উত্তরাধিকার।

অতিমারির দুঃসময়েও মানবধর্ম পালনের ছবিটা ফিরিয়ে এনেছেন তারা। আজকের রাজনীতি বহু ক্ষেত্রেই করেকম্মে খাওয়ার ব্যাপার হয়ে গেছে। রেড ভলান্টিয়ার্সরা দেখিয়ে দিচ্ছেন রাজনীতি থেকে মানবসেবা ব্যাপারটা এখনও উবে যায়নি। বামেদের অতীতের আদর্শবাদের চেহারাটা তাদের কাজকর্মে আবার ফুটে উঠেছে। কোভিড সময়ে রেড ভলান্টিয়ার্সরা হয়ে উঠেছেন মানুষের একটা ভরসার জায়গা। বিরাট অর্থ, জনবল, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কিছুই তাদের নেই। কিন্তু উদ্যম, আন্তরিকতা, লোকের কথা শোনা, খবর পেলেই তাদের কাছে পৌঁছে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে সব ঘাটতি ঢেকে দিয়েছেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাওয়া যুবছাত্র, তরুণ চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং পরিষেবা প্রদানকারীদের দল। নিজেদের ইচ্ছা আর উষ্ণতার সুবাদে রেড ভলান্টিয়ার্স হয়ে উঠেছে এক পরম ভরসার জায়গা। মুখে মুখে ছড়াচ্ছে তাদের নাম। এই হয়ে ওঠার জন্য কোন সরকারি অনুদানের দরকার হয়নি।
পাভেল, বিয়াস, প্রীতম, অরিত্রি, রনবীর কিংবা শঙ্খর মত ছেলেমেয়েদের বিরাট কোন রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। কিন্তু এদের মত বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী ছেলেমেয়েরাই কোভিড সময়ে কলকাতা ও তার লাগোয়া এলাকায় গড়ে তুলেছেন এলাকাভিত্তিক স্বাস্থ্য পরিষেবার এক সংহত নেটওয়ার্ক। ফোন পাওয়ার পরই কোভিড আক্রান্ত বা তার বাড়ির লোকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা। সমস্যাটি জানার পর আক্রান্তদের চিকিৎসকের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করছেন, নিয়ে যাচ্ছেন সেফ হোমে কিংবা কোভিড হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করছেন। ধরুন আপনি বেহালার বাসিন্দা কিন্তু আপনার পরিচিত কোভিড আক্রান্ত মানুষটি থাকেন বালিগঞ্জে। আপনি সেখানকার রেড ভলান্টিয়ার্সদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে স্থানীয় শাখার সাহায্যে তা সহজেই করতে পারবেন। গোটা ব্যাপারটাই হচ্ছে কোন হৈচৈ না করে নীরবে। আন্তরিকতা রেড ভলান্টিয়ার্সদের সবচেয়ে বড় জোরের জায়গা। কোনরকম রাজনীতি বা ক্ষমতার দাসত্ব এখানে নেই, মানুষকে নিজেদের সাধ্যমত পরিষেবা দেওয়ার ইচ্ছা ও সঙ্কল্পই এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটির একমাত্র পুঁজি।
লিখতে লিখতেই হঠাৎ মনে পড়ে গেল, বাংলা ভাষার প্রধান গদ্যশিল্পী সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের একটা কথা – বড় প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার সঙ্গে লিটল ম্যাগাজিনের তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘চেন বাঁধা হাতির গায়ে স্বাধীন পিঁপড়ে’। বৃহৎ অথচ নানা সমস্যায় শৃঙ্খলিত দেশের জটিল স্বাস্থ্যব্যবস্থার পাশে সক্রিয় রেড ভলান্টিয়ার্সদের দৃপ্ত পদচারণাকে এছাড়া আর কীভাবেই বা ব্যাখ্যা করা যায়!
এই লিঙ্কে সকলের ফোন নং পাওয়া যাবে। যার যা এলাকা সেই মতো যোগাযোগ করতে পারেন। https://redvolunteers.carrd.co/
It’s really awesome.carry on comrades.