দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা গভীর দুশ্চিন্তার। চলতি অর্থবর্ষে জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি বৃদ্ধির হার আগের পূর্বাভাস থেকে অনেকটাই কম হবে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রসংঘের আর্থিক বিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস কন্ফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেবেলপমেন্ট ভারতের চলতি বছরের (২০২১-২২ বা ২০২১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ ২০২২ পর্যন্ত) জিডিপি বৃদ্ধি পূর্বাভাস ৬.৭ শতাংশ থেকে নির্মম ভাবে ছেঁটে ৪.৬ শতাংশে নামিয়েছে। পূর্বাভাস কমিয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থা এনএসও বা আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন সংস্থা মুডিজ-ও। মনে রাখা দরকার, করোনা হানা এবং আগে থেকেই চলে আসা আর্থিক দুর্বলতার কারণে ২০২০-২১ সালে ভারতীয় অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছিল। প্রথমে এই সংকোচনের হার ৭.৩ শতাংশ বলা হলেও পরে তা সামান্য কমিয়ে ৬.৬ শতাংশ বলা হচ্ছে। এর অর্থ হলো, ২০২০-২১ অর্থবর্ষে তার আগের বছরের তুলনায় জাতীয় উৎপাদন অন্তত ৬.৬ শতাংশ কমে গিয়েছিল। এই কমে যাওয়া ভিতের উপর এবার যদি বড় বৃদ্ধি না হয়, তবে জাতীয় উৎপাদন সেই ২০১৯ সালের স্তরেই আটকে থাকবে। দেশে কর্মহীনতার হার যে ভাবে বেড়ে রয়েছে, তাতে এই আশঙ্কাটাই হয়তো সত্যি হতে চলেছে। যাদের কাজ আছে, বা আগে কর্মরত ছিল বলে এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ডে বা ইপিএফ-এ কিছু টাকা জমা রয়েছে, আঘাত আসছে তাদের উপরও। সম্প্রতি কমানো হয়েছে ইপিএফ-এ জমা টাকার সুদের হার। এক কথায় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে।

মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো আরও আশঙ্কা দানা বাঁধছে। ইপিএফ-এর সুদ কমার পর এবার কমবে কি স্বল্প সঞ্চয়ের সুদের হার? পয়লা এপ্রিল নয়া অর্থবর্ষ শুরুর প্রাক্কালে এহেন সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। এপ্রিল খেকে জুন, এই তিন মাসের জন্য স্বল্প সঞ্চয়ের সুদের হার ৩১ মার্চ বিকেলে ঘোষণা করবে কেন্দ্র।
তলানিতে স্বল্প সঞ্চয়ে সুদের হার
স্বল্প সঞ্চয়ের সুদের হার তলানিতে এসে ঠেকেছে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির ফলে। কেভিপি, মাসিক আয় প্রকল্প বা টাইম ডিপোজিট, জনপ্রিয় সব সঞ্চয় প্রকল্পেরই সুদের হার বিগত বছরগুলিতে কমানো হয়েছে নির্মম ভাবে।
২০১৪ সালের এপ্রিলে কিষান বিকাশ পত্র বা কেভিপি-র সুদ ছিল ৮.৭ শতাংশ। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চে কেভিপি-র সুদের হার হয়েছে মাত্র ৬.৯ শতাংশ বা ১২৪ মাসে ম্যাচিওরিটি।

মোদি জমানার ঠিক আগে পাঁচ বছরের মাসিক আয় প্রকল্পে সুদ মিলত ৮.৪ শতাংশ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৬.৬ শতাংশে।
সুদ কমানো হয়েছে ১, ২, ৩ ও ৫ বছরের টাইম ডিপোজিট বা স্থায়ী আমানতে, রেকারিং ডিপোজিট, ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট বা এনএসসি, সিনিয়র সিটিজেনস্ সেভিংস স্কিম, পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড ও সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনাতে। বিপুল হারে সুদ কমানো হয়েছিল ২০২০-র এপ্রিলে, যখন করোনা লকডাউনে মানুষের দুর্দশা চরমে। পরবর্তীতে জিনিসপত্রের চড়া দাম সত্ত্বেও সুদ বাড়ানো হয়নি। বর্তমান ছবিটা একবার দেখে নেওয়া যেতে পারে।
অনেকটা কমে পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুদের হার দাঁড়িয়েছে ৭.১ শতাংশ।
১, ২ ও ৩ বছরের টাইম ডিপোজিটে সুদ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫.৫ শতাংশ। ৫ বছরের টাইম ডিপোজিটে সুদ মিলছে ৬.৭ শতাংশ।
পাঁচ বছরের রেকারিং ডিপোজিটে ৫.৮ ও পাঁচ বর্ষীয় এনএসসি-তে ৬.৮ শতাংশ সুদ মেলে। বয়স্কদের সঞ্চয় প্রকল্পে ৭.৪ ও সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনায় সুদ মেলে ৭.৬ শতাংশ।

ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে কমানো হয়েছে এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুদ। সাড়ে ৮ শতাংশ থেকে অনেকটা ছেঁটে তা করা হয়েছে ৮.১ শতাংশ। এর ফলে স্বল্প সঞ্চয়েও সুদ কমতে পারে, আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এমনই। অথচ মাথা চাড়া দিয়েছে দারুণ মূল্যবৃদ্ধি।
মূল্যবৃদ্ধি লাগাম-ছাড়া
চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১২.৯৬ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে হয়েছে ১৩.১১ শতাংশ। ২০২১ সালের জুলাইতে খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৫.৫৯ শতাংশ। ২০২২-র ফেব্রুয়ারিতে এই হার ৬.০৭ শতাংশ। সরকারি সংখ্যতত্ত্বে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি ৬.০৭ শতাংশ দেখালেও নিত্যদিন বাজারের চেহারা কিন্তু বলছে, প্রকৃত মূল্যবৃদ্ধি আরও অনেক বেশি। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নীতি অনুযায়ী ৪ শতাংশ খুচরো মূল্যবৃদ্ধি সহনীয় বলে ধরা হয়। এর থেকে ২ শতাংশ কম-বেশি হলে সহনসীমার মধ্যে রয়েছে বলে মনে করা হয়। চলতি বছরের বেশির ভাগ সময় জুড়েই খুচরো মূল্যবৃদ্ধি ৪ শতাংশের অনেকটা ওপরে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিসে টাকা জমা রাখলে তা আসলে কমে যাচ্ছে। কারণ, যে হারে সুদ পাওয়া যাচ্ছে, দাম বাড়ছে তার থেকে বেশি গতিতে।

কেন্দ্রের উপর চাপ বাড়ছে সুদের হার বাড়ানোর। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাসে স্বল্প সঞ্চয়ের সুদের হার ঘোষণা হবার কথা ৩১ মার্চ বিকেলের দিকে। এমন সময়েই এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুদ কমায় দানা বাঁধছে আশঙ্কা। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষ ভাবছেন, খানিকটা বাড়াবার বদলে কমিয়ে দেওয়া হবে কি স্বল্প সঞ্চয়ের সূদ? আর মাত্র একটি সপ্তাহ, কেন্দ্র কি করে, তা দেখতে দুরুদুরু বক্ষে অপেক্ষা চলছে সুদ-নির্ভর জনতার।