আমরা তো সেই আমরাই, যারা সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সামনে এগিয়ে যেতে চাই, সমস্ত চ্যালেঞ্জকে অ্যাকসেপ্ট করতে চাই। আমাদের মধ্যে এখনও বেঁচে আছে সহনশীলতা, ধৈর্য্য, চারিত্রিক দৃঢ়তা, সততা, সক্ষমতা, নৈতিকতাবোধ, বিবেকবোধ, সৌজন্যবোধ, মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর সুন্দর মানসিকতা। যে গুণ গুলি আগের শিক্ষকদের মধ্যেও ছিল, সেগুলো এখনও বেঁচে আছে। তাই বলা যায় এখনো শিক্ষকরা পড়ান, শুধু শুধু বেতন নেন না। এখনো শিক্ষকরা ছাত্রদের মন বোঝেন, বুঝতে চান। সমস্যায় পড়লে এগিয়ে আসেন। শিক্ষক ছাত্র এবং পাঠক্রমের মধ্যে একটা সেতুবন্ধনের কাজ করে। তাকে মোটিভেট করে। তার মনে আগ্রহ সঞ্চার করে। আগের শিক্ষকরাও করতেন এখনও করেন বা ভবিষ্যতেও করবেন। তাহলে বর্তমানের শিক্ষকদের ফল্টটা কোথায়? এঁরা কি পড়ান না? শিক্ষকতা করাটা আমি নিজের কাছে গর্ব মনে করি। নিজের কাছে নিজে সৎ থাকতে হবে। আমার যা কর্তব্য, তা সঠিক সময়ে পালন করব এই মনোভাব যদি থাকে, কেউ আপনাকে মর্যাদার আসন থেকে নামাতে পারবে না। আর নিন্দুকরাও আপনাকে ছোট করতে পারবে না। শিক্ষকদের যেমন মর্যাদার চোখে মানুষ দেখত, আজও দেখবে আর ভবিষ্যতেও দেখবে।
এবার আসি অন্য কথায়।
“ইস্কুল বলিতে আমরা যাহা বুঝি সে একটা শিক্ষা দেওয়ার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘন্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয়। মাস্টারের মুখ চলিতে থাকে। চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয়, মাস্টার কলও তখন মুখ বন্ধ করেন, ছাত্ররা দু-চার পাতা কলে ছাঁটা বিদ্যা লইয়া বাড়ি ফেরে।” — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার যান্ত্রিকতা নিয়ে যে কথাগুলো বলেছিলেন সেই কথাগুলি আজও যে কতটা প্রাসঙ্গিক তা আমরা প্রতি মুহূর্তে অনুভব করতে পারি। পাঠ্যবই, পরীক্ষা ব্যবস্থা, পরিকাঠামো, রাজনীতি ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় এই যান্ত্রিকতার জন্য দায়ী হলেও, এর অন্যতম প্রধান কারণ এই মাস্টারকল। শ্রেণিকক্ষে তাদের নিরস পাঠদান। শ্রেণীকক্ষের বাইরে শিক্ষক মহাশয়দের অনেককেই দেখা যায় যথেষ্ট যুক্তিশীল এবং তার্কিক। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের ওই ‘দশটা-চারটের আন্দামানের’ মধ্যে আবদ্ধ থাকা ওইসব কচিকাঁচাদের মন জয় করতে অনেকেই অসমর্থ হন। শিক্ষক-শিক্ষিকারা সমাজের মেরুদন্ড। তাই তাদের কর্তব্য ওইসব কচিকাঁচাদের যথার্থ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। তাই বিদ্যালয়গুলিকে শিক্ষক-শিক্ষিকারা যদি আনন্দ নিকেতন হিসাবে গড়ে তুলতে পারেন, যদি শ্রেণীকক্ষের পরিবেশগুলি মনোগ্রাহী ও সর্বোপরি Joyful করে তুলতে পারেন, তাহলে স্কুলটাকে আর ‘দশটা-চারটের আন্দামান’ বলে মনে হবে না শিশুর কাছে।কারণ —
“শিশুর কাছে বিদ্যালয়
নয়তো শুধু বিদ্যারই আলয়,
নাচবে, গাইবে, হাসবে সেথা
গড়বে তাকে মিত্রালয়।”
প্রথাগত ক্লাসে সারাক্ষণ বকবক করে পাঠ্যবিষয়টি উগরে দিয়ে শিক্ষকরা পাঠ্যক্রম শেষের পরিতৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরলেও দিনের শেষে যে “Mental Satisfaction” বা ” Job Satisfaction” পাওয়া উচিত সেটা পান না। কারণ তার পাঠদান শিক্ষার্থীদের কিছুটা হলেও কাজে দিল তো, তিনি কিছু ফিডব্যাক পেলেন তো বাচ্চাদের কাছ থেকে, এটাই বড় কথা। তাছাড়া তার নিরস পরিবেশন পড়ুয়াদের মধ্যে বিরক্তির সঞ্চার করলো কিনা এটাও খেয়াল রাখা দরকার। তাই শিক্ষক হিসেবে প্রত্যেকের দায়িত্ব একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে আগ্রহ সঞ্চয় করা। আমি যে পাত্রে জল ঢালছি, সেই পাত্রের পরিবেশ-পরিস্থিতি আমাকে আগে বিচার করতে হবে। তা জল ঢালার উপযুক্ত কিনা এটাও বিচার করতে হবে। তার মন এবং মান বুঝে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে হবে। মনে রাখতে হবে তারা হল নরম মাটির তাল।তাদের যেভাবে গড়ে তোলা যাবে, সেভাবেই সে গড়ে উঠবে।
এজন্য শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্কের প্রতিটা দিক সূক্ষ্মভাবে বিচার বিবেচনা করে ক্লাস রুম ট্রানজেকশন করতে হবে। এমন একটা “Joyful Situation” তৈরি করতে হবে, যাতে একজন শিক্ষার্থী আনন্দ পায় এবং তার মাধ্যমে শিশুর শিক্ষা সম্পন্ন হয়। দেখবেন আমরা যেটা করতে ভালোবাসি সেটা আমরা না করে থাকতে পারি না। যেমন আমি গান গাইতে ভালোবাসি। গান ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। আমাকে গাইতেই হবে। তেমনি ক্লাসরুমে পড়াশোনার যে রিদম্, পড়ার নেশা একবার যদি কোন বাচ্চা পেয়ে যায় তাকে আপনি কোন মতেই থামাতে পারবেন না। ক্লাসের প্রতি, বিষয়ের প্রতি, শিক্ষকের প্রতি, এমনকি বিদ্যালয়ের প্রতি শিশুর কোনরকম ফোবিয়া বা ভয় যাতে না জন্মায়, তার জন্য শিক্ষকদের সচেতন থাকতে হবে। স্কুলের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সেই ভালোলাগাটা তৈরি করে দিতে পারেন একমাত্র শিক্ষক। আবার একটা ক্লাস কে চিত্তাকর্ষক করে তোলার জন্য একজন শিক্ষকের তিনটি ‘স’-এর দরকার। যথা — সংযোগ, সঞ্চার এবং সংস্থাপন।
ছাত্র-ছাত্রীদের মনের সঙ্গে শিক্ষকদের মনের সেতুবন্ধন এর মাধ্যমে এই সংযোগ গড়ে ওঠে। শিক্ষক মহাশয় এই সেতু বেয়ে শিক্ষার্থীর মধ্যে আগ্রহ সঞ্চয় করে। আর শেষটি সংস্থাপন অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তে শিক্ষক যা বলে যাচ্ছেন শিক্ষার্থী সেগুলি যেন মনে গ্রথিত করতে পারে। মোটকথা একটি ক্লাস মনোগ্রাহী করার প্রথম শর্ত হলো পড়ুয়াদের মন দখল করা। জোর করে নয়, মন দিয়ে মন জয় করা।
ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কটা এমনই হওয়া উচিত। একজন শিক্ষার্থীর মনে কী চলছে, তার মনস্তত্ত্বকে বুঝে তাকে কাজে লাগানো, তাকে মোটিভেট করা বা ইন্সপায়ার করা এগুলোই মূল কথা। মহান শিক্ষক ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ বলতেন —”A good teacher tells, a mediocare teacher tells something more but an ideal teacher inspires or motivates his learners.” (ক্রমশঃ)