ক্লাসরুমে অনেক শিক্ষককেই পিছিয়ে পড়া বাচ্চাদের বলতে শোনা যায় ‘তোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না, গাধা, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সমস্ত নেগেটিভ কথাবার্তা শিক্ষার্থীদের মনে নেগেটিভ ইম্প্যাক্ট ফেলে। তাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, হতাশায় ভোগে, নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে প্রত্যেক শিশুই অনন্য ‘এভরি চাইল্ড ইজ স্পেশাল’। প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু না কিছু করে দেখানোর উপাদান রয়েছে। আপনাদের মনে পড়ে ‘তারে জামিন পর’ সিনেমার সেই ছোট্ট ঈশানকে? তার মধ্যেও বিশিষ্টতা ছিল। তার হয়তো ডিসলেক্সিয়া (পঠন অক্ষমতা বা Learning Disability) ছিল, কিন্তু সে ভালো ছবি আঁকতো। তার মা-বাবা সেটাকে স্বীকৃতি দেয়নি। বারবার তাকে অপমানিত হতে হয়েছে ক্লাস টিচারের কাছে। শিক্ষকরা ভাবেন সে ইচ্ছা করেই পড়াশোনা করে না। দাঁতভাঙ্গা অংক ইংরেজিতে তার মন বসে না, পরিবর্তে সে দেখে প্রকৃতির সবুজকে, প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়কে, পাখির ছানাগুলিকে, মা পাখি কীভাবে খাইয়ে দিচ্ছে তার ছানাদের, এই সব টুকরো টুকরো ছবির মধ্যে সে হারিয়ে যায়। ফলে প্রতিনিয়ত শ্রেণী শিক্ষকদের কাছে অপমানিত হওয়া, তাদের কটুবাক্য, হাতের থাপ্পড় ইত্যাদি। কিন্তু তারপরেই তার জীবনে হাজির হল নতুন পার্টটাইম ড্রয়িং শিক্ষক নিকুম্ভ স্যার, যিনি নিজেও ঈশানের মতই এক দুঃসহ জীবন কাটিয়েছেন, তারও ছিল ডিসলেক্সিয়ার মত অসুখ। সে তার সমস্যাটা জানতে চেষ্টা করল, তার মন বুঝে তাকে মোটিভেট করার চেষ্টা করলো। ইতোপূর্বে আর কোন শিক্ষক তার মনকে বোঝার চেষ্টা করেনি। ধীরে ধীরে ঈশানের পরিবর্তন, শেষে তার পূর্ব অবস্থা থেকে উত্তোরণ এটিই হল ছবিটির বিষয়বস্তু। গল্পের শেষে ঈশানের সাফল্যে নিকুম্ভ স্যারের চোখেও জল এসেছে। তখনই তার মনে পড়ে গেছে কোন জায়গায় ছিল ঈশান। দেখানো হয়েছে তার বিবর্তন। তখনই একজন ছাত্র ও একজন প্রকৃত শিক্ষকের মধ্যে সম্পর্কের বন্ধনটি আমরা সহজেই চিনে নিতে পারি। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক বোধ হয় এমনটাই হওয়া উচিত।
আমরা শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-ছাত্রীদের সাধারণত উপদেশ দিই, কথা না শুনলে তাদের বকি, অনেক শিক্ষক আবার তাদের উপর মানসিক ভাবে অত্যাচারও করেন। কিন্তু তার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের চেষ্টা করি না। তবে ঈশানের মতো ছাত্র দের আর দোষ কোথায়? দোষ তো শিক্ষকদেরই। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে নিকুম্ভ স্যারের মতই একজন আদর্শ শিক্ষক দরকার আজকের দিনে। তবেই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক আরো নতুন করে উপলব্ধির জায়গায় নিয়ে আসবে। এমনটা মোটেও অসম্ভব নয়, এটা করা যেতেই পারে। পিছিয়ে পড়া বা স্লো লার্নার বলে কিছু হয়না। এটা আপেক্ষিক। যে শিশুরা Early Grade এ Belong করছে, তারা কখনোই পিছিয়ে পড়া হতে পারে না। এটা আমাদের মনের ভুল। প্রত্যেকেরই একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা Goal থাকে। যদিও ক্লাসের সমস্ত ছাত্র একই সঙ্গে সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, যারা পারছে না তাদের আমরা আপেক্ষিক অর্থে স্লো লার্নার বলি, কিন্তু তাদের এই পিছিয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধান করি না। তার কোনো সমাধান আমরা করি না। তবে দোষ আমাদেরই।
আসলে একটা ক্লাসে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক অনেকটা এক্সপেরিমেন্ট এর মত, বাংলাতে যাকে বলে গবেষণা। একজন শিক্ষককে প্রতিনিয়ত একজন ছাত্রকে নিয়ে গবেষণা করতে হবে। তার মন বুঝতে হবে। সে কি চায়, না চায়, তার চাওয়া-পাওয়া, তার চাহিদা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এগুলিকেও সূক্ষ্মভাবে বিচার করা একজন শিক্ষকের প্রকৃত কর্তব্য। অর্থাৎ শিক্ষককে হতে হবে একজন মনোবিদ। মনোবিজ্ঞানী যেমন করে একজন রোগীকে একান্তে কথা বলে জেনে নেয় তার সমস্ত সুবিধা-অসুবিধা, তেমনি শিক্ষককেও হতে হবে একজন প্রকৃত সাইকোলজিস্ট। তার পড়াশোনা করতে গিয়ে কী কী অসুবিধা হচ্ছে, তাকে সেই অসুবিধা গুলি থেকে কীভাবে উত্তরণের পথে নিয়ে যাওয়া যাবে, তাকে ভরসা দেওয়া, আত্মবিশ্বাস যোগানো, ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া, খারাপ কাজে একটু বকা দিয়ে সঠিক পথ চিনিয়ে দিতে সাহায্য করা শিক্ষকের কাজ। ক্লাসের সমস্ত শিক্ষার্থী একই স্তরে বিরাজ করে না অর্থাৎ তাদের লেভেল আলাদা। আমাদের লক্ষ্য মিনিমাম এক্সপেক্টেড লার্নিং আউটকাম অর্থাৎ ন্যূনতম কাম্য শিখন সামর্থ্য সকলকে পৌঁছে দেওয়া। দক্ষতার সঙ্গে ক্লাসরুম পরিচালনা করাও শিক্ষকের আরেকটি বড় কাজ। এই দক্ষতাই চিনিয়ে দেয় একজন প্রকৃত শিক্ষককে। আর তখনই পরিস্ফুট হয় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের প্রকৃত রূপটি। শিক্ষক মহাশয় যা পড়াতে যাচ্ছেন সেই বিষয়টি যাতে শিক্ষার্থীদের হৃদয়াঙ্গম হয় এজন্য দরকার হয় একটি সঠিক রূপরেখা তৈরি। সে যখন যা শিখছে তখনই সে যাতে বাস্তব জীবনে Apply করতে পারে তখনই তার শিক্ষা সম্পন্ন বিকাশ লাভ করে। আধুনিক শিক্ষা বোধ হয় এটাই বলতে চাইছে। এজন্য RTE তে Understanding এবং Application বিষয়টিকে জোর দেওয়া হয়েছে। এজন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন — “শিশু যখনই যাহা শিখিবে তখনই তাহা প্রয়োগ করিতে শিখিবে, তাহা হইলে শিক্ষা তাহার উপর চড়িয়া বসিবে না, সেইই শিক্ষার উপর চড়িয়া বসিবে।”
আমাদের মূল লক্ষ্য প্রত্যেকটা শিশুকে শ্রেণীগত শিখনে পৌঁছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এই পথে নানা বাধা আসবে, স্টাফ রুমে আপনাকে নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করবে। কিন্তু আপনি যদি ভয় পান, পিছিয়ে আসেন, তবে আপনি হেরে গেলেন। আপনি এগিয়ে এসে তার ঘাড় ধরুন, তাকে সাহায্য করুন, সে কিছু বলতে চায় আপনাকে। শুনুন তার কথা। তাহলে শেষ হাসিটা আপনি হাসবেন। আর এভাবেই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের এমন এক সেতু তৈরি হবে যা দিয়ে শিক্ষার্থীর মনের দরজায় আপনি খুব সহজেই পৌঁছাতে পারবেন।