ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত — এ নিয়ে দেশের তাবড় তাবড় শিক্ষাবিদ থেকে শুরু করে মনীষীগণ সকলেই বলে গেছেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।আমিও এই প্রবন্ধে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের বেশ কিছু দিক তুলে ধরলাম। আশা করি সুধী পাঠকবর্গ প্রবন্ধটি পড়ে আপনাদের মনে কিছুটা হলেও প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিতে পারব।
আমরা জানি শিক্ষক ছাত্রের “Friend, Philosopher and Guide” অর্থাৎ বন্ধু, দার্শনিক এবং পথপ্রদর্শক।
তবে আমরা সাধারণত বলে থাকি পিতা-মাতার পরেই শিক্ষকের স্থান। কারণ চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে একজন ছাত্রের সবচেয়ে বেশি সময় কাটে বাড়িতে বাবা-মা বা অন্যান্য অভিভাবকের কাছে। তার পরেই সবচেয়ে বেশি সময় সে কাটায় স্কুলে শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে। সুতরাং শিক্ষক-শিক্ষিকা একজন ছাত্র বা ছাত্রীর দ্বিতীয় অভিভাবক হিসেবে কাজ করে। একজন বাবা বা মা তার সন্তানকে যে পরম স্নেহে বা যত্নে মানুষ করেন বা তার বাহ্যিক চাহিদাগুলো পূরণ করেন, তেমনি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকার কাছে এসে সে অভ্যন্তরীণ চাহিদাগুলির খোরাক পায়। সর্বোপরি একজন শিক্ষক হলেন ছাত্রের বন্ধু স্বরূপ। বন্ধু যেমন বন্ধুর কাছে এসে তার মনের কথা জেনে নেয়, তেমনি শিক্ষকের কর্তব্য একজন ছাত্রের ব্যক্তিগত অসুবিধা ও পড়াশোনার ব্যক্তিগত সুবিধা অসুবিধাগুলো যথাসম্ভব সমাধান করার চেষ্টা করা। তার মন ও মান বুঝে তাকে Motivate করা। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন — “কী শিখাইব তাহা ভাবিবার বটে কিন্তু যাহাকে শিখাইব তাহার মনটাও পাইব কী উপায়ে সেটাও কম কথা নয়।”
অর্থাৎ শিক্ষার্থীর মন পাওয়া এটাও বড়ো দিক।
সুতরাং শিক্ষার্থীর মন পেতে গেলে তার মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে, তার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে হবে। তার মানে এই নয় যে, দুজন বন্ধুর মধ্যে যে যে কথাবার্তা হয়, তারা যে আচার আচরণ করে সেটাই তাকে করতে হবে। এই বন্ধুত্বের একটা সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত। সেটা একজন শিক্ষককে নির্বাচন করে নিতে হবে।
শিক্ষক একজন ছাত্র বা ছাত্রীর কাছে একজন Philosopher বা দার্শনিক হিসেবে বিবেচিত হবেন। একজন দার্শনিক যেমন যুক্তি-তর্কের মধ্যে দিয়ে সত্যকে উদঘাটন করেন, তেমনি ছাত্রের মনের গোপনের নিগূঢ় সত্যকে সকলের সামনে উন্মোচিত হতে সহায়তা করবেন। তার Psychology বুঝে তাকে সঠিক পথে অগ্রসর হতে শেখানোই শিক্ষকের কাজ।
তেমনি শিক্ষক-ছাত্রের Guide বা পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেন। তাই ক্লাসরুমে শিক্ষক কে এখন শিক্ষক না বলে Facilitator বা সহায়তাকারী বললে ভালো। কারণ একসময় “শিক্ষক কেন্দ্রিক শিক্ষা” (Teacher Centric Education) চালু ছিল। কিন্তু বর্তমানে “শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা” (Learner Centric Education) প্রচলিত। ক্লাসের সময় যদি চল্লিশ মিনিটের হয় তাহলে ১০ থেকে ১৫ মিনিট কথা বলবেন শিক্ষক।আর শিক্ষার্থীরা কথা বলবে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট। তাহলে বুঝতে হবে Learner Centric Education এর গুরুত্ব। শিক্ষক মহাশয় শুধুমাত্র বক্তৃতা পদ্ধতিতে শিক্ষা দান করবেন না, শিশুরা কথা বলবে বেশি করে। এখানে শিক্ষক শুধুমাত্র Facilitate করবেন বা Scafolding এর কাজ করবেন। উঁচু জায়গায় উঠতে যেমন আমাদের একটা মই সাহায্য করে, ঠিক তেমনি শিক্ষকরা সেই মই এর কাজটা করবেন। একটা শিক্ষাবর্ষ শেষে একজন ছাত্র যাতে বিকাশের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারে, সেটাই শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত।
যাইহোক ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক নিয়ে যেসব কথা বললাম এগুলি বড় বড় মানুষদের মোটা মোটা কেতাবে লেখা বুলি। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক যে কি তা একজন শিক্ষকই ভালো করে বুঝবেন। আমরা বলি মাঠে না নামলে যেমন আমরা খেলা শিখতে পারি না; জলে না নামলে যেমন আমরা সাঁতার শিখতে পারি না, তেমনি ক্লাসরুম ট্রানজেকশন করার সময় একজন শিক্ষকই বুঝবেন রিলেশনটা আসলে কী?কেন জরুরী এই রিলেশনটা? কেমন হওয়া উচিত একজন ছাত্র শিক্ষকের মধ্যে Relation?
প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত কালে কালে বিবর্তনের হাত ধরে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের বিবর্তন ঘটেছে। পাল্টেছে সম্পর্কের মানে। পূর্বে শিক্ষক ছিলেন একজন ছাত্র ছাত্রীর বা শিক্ষার্থীর প্রকৃত গুরু।গুরুগৃহে থেকে শিষ্যরা স্মৃতিশাস্ত্র, ন্যায়, দর্শন, বেদ, ব্যাকরণ, পুরাণবিদ্যা ইত্যাদি পড়ত। পড়া শেষ হলে গার্হস্থ্য জীবন পালন করতো। শিক্ষক তখন প্রকৃত অর্থেই ‘গুরু’।
‘গু’ অর্থাৎ ‘অন্ধকার’ এবং ‘রু’ অর্থাৎ ‘আলো’। যিনি অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসেন তিনিই গুরু। এই অন্ধকার অজ্ঞানতার অন্ধকার। সেই অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোর পথ দেখায় গুরু। বাঙালি শিক্ষক রামনাথ তর্ক সিদ্ধান্তের কথা আমরা সকলেই জানি, যিনি বুনো রামনাথ নামে পরিচিত। আমরা এও জানি তেঁতুল পাতার ঝোল খেয়ে বিনা পারিশ্রমিকে তিনি ছাত্রদের পড়াতেন। কারণ তিনি মনে করতেন অর্থই অনর্থের মূল। একঘেঁয়ে অভাবটাকে সহ্য করেও কখনো তিনি রাজার অনুগ্রহ নেননি। নদিয়ার কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ছেলে শিবচন্দ্র নবদ্বীপে এসে তার দারিদ্র্যের অবস্থা দেখে তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তার কোন সাংসারিক অভাব আছে কি না। তার উত্তরে তিনি বলেন —
“না, আমার কিছুই অনটন নাই; আমার কয়েক বিঘা ভূমি আছে, তাহাতে যথেষ্ট ধান্য উৎপন্ন হয়, আর সম্মুখে এই তিস্তিড়ি বৃক্ষ দেখিতেছেন, ইহার পত্র আমার গৃহিণী দিব্য পাক করেন, অতি সুন্দর লাগে, আমি স্বচ্ছন্দে তাহা দিয়া অন্ন আহার করি।”।
এমন কৃচ্ছসাধন করা আর কজন শিক্ষকের পক্ষে সম্ভবপর? একজন শিক্ষার্থীকে সাফল্যের চূড়ান্ত শীর্ষে নিয়ে যেতে হলে গুরুকেও কৃচ্ছসাধন করতে হয়। গুরুকে শ্রদ্ধেয় হতে হয় শিক্ষার্থীর কাছে। আমরা বিখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক মতি নন্দীর ‘কোনি’ উপন্যাসের কথা জানি। এটি একটি নিম্নমধ্যবিত্ত মেয়ের কাহিনী। কীভাবে একগুঁয়ে অভাবটাকে সহ্য করেও শুধুমাত্র আত্মবিশ্বাস, প্রচন্ড দৈহিক মনোবল, অদম্য জেদ, অধ্যবসায় আর কঠোর ট্রেনিং মেয়েটিকে সফলতার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে দিলে, এ উপন্যাস তারই কাহিনী। তবে কোনির সফলতার পেছনে যার অবদান কোন অংশে কম নয় তিনি হলেন তারই সাঁতার প্রশিক্ষণ ক্ষিতীশ সিংহ ওরফে ক্ষিদ্দা।সেইই তার প্রকৃত গুরু। তার মন ও মান বুঝে তাকে মোটিভেট করেছিল, জুগিয়েছিল আত্মবিশ্বাস, বুকে দিয়েছিল সাহস, যাকে পাথেয় করেই কোনি জীবন যুদ্ধে জিতেছিল। সুতরাং মনে রাখতে হবে যে কোন ক্ষেত্রে কারোর সাফল্যের পিছনে একজন ব্যক্তি থাকেন, যিনি সবার অলক্ষ্যে কাজ করে যান তাকে সেই জায়গাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।তাই কোনি উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছেদে মাদ্রাজের সাঁতার প্রতিযোগিতায় “বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ানশিপের” মেডেল নেওয়ার পর ক্ষিতিশকে দেখে কোনির প্রশ্ন—
—” কোথায় লুকিয়ে ছিলে তুমি? ”
—”কোথায় ছিলুম জানিস, ওইখানে।”
কুঁজো হয়ে ক্ষিতীশ ডান হাতের তর্জনীটা তুলে পুলের জলের দিকে তাকাল।
—”ওই জলের নিচে লুকিয়েছিলুম আর বলছিলুম —সব পারে, মানুষ সব পারে, …. ফাইট, কোনি, ফাইট। ”
—”মিথ্যুক, মিথ্যুক।”
কোনি ছুটে এসে ক্ষিতীশের বুকে দুমদুম ঘুষি মারতে শুরু করল।
—”কিচ্ছু দেখিনি, কিচ্ছু শুনিনি। যন্ত্রণায় তখন আমি মরে যাচ্ছিলুম।”
—”ওইটেই তো আমি রে। যন্ত্রনাটাই তো আমি।”
বলতে বলতে কোনি ক্ষিতীশের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে ফোঁপাতে লাগল আর ক্ষিতীশ এর চোখ থেকে জল ঝরে পড়ল কোনির মাথায়। গুরু-শিষ্যের এমন মিষ্টি-মধুর সম্পর্কটাই চিনিয়ে দেয় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের আসল স্বরূপ। (ক্রমশঃ)