শোক, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা দুনিয়াদারি আগে কম দেখেনি। অতিমারি এসব কিছুকে চূড়ান্ত চেহারা দিয়েছে। জীবনকে লন্ডভন্ড করে দেওয়ার এমন ঘটনা গত ১০০ বছরে ঘটেনি। আশার কথা, এর মধ্যেই মানুষ আবার জীবনকে ঢেলে সাজাতে চাইছে। শুধু রাতের শব্দ নয়, আমরা শুনছি মানুষের চলার আওয়াজ, বেঁচে থাকার গান।
দুর্মুখ বলে বিজ্ঞাপিত পাড়ার পাইস হোটেলের মালিকটি বেশ কয়েক মাস ধরে জনা দশেক মানুষকে কুণ্ঠিতভাবে ডাল, ভাত, তরকারি খাইয়ে চলেছেন। কোন সাড়াশব্দ নেই দুপুরবেলা গঙ্গার ধারে ঝুপড়িগুলির কাছে চুপচাপ চলে যাচ্ছে খাবার। মনে পড়ছে সেই ডাক্তার বন্ধুটির কথা, কোভিডের সূচনায় যিনি আক্রান্তদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, সম্প্রতি তিনি মারা গেছেন। আমরা দেখছি, ঘরকুনো স্কুল বালকটি তার নতুন কোন গ্যাজেট কেনার টাকা ভেঙে খাওয়াচ্ছে পাড়ার ভবঘুরে মানুষটিকে। শহরের মানুষরা ছুটে যাচ্ছেন অতিমারিতে জীবিকা হারানো গ্রামের লোকশিল্পীদের কাছে। প্রচারবিহীন এসব কাজ আমাদের জীবনে ভরে দিচ্ছে অনেকদিন হল প্রায় হারিয়ে যাওয়া আলোবাতাস।

চিকিৎসাবিজ্ঞান তো আছেই, সাড়াশব্দহীন এসব কাজকর্মও অতিমারিকে কিঞ্চিৎ পিছু হঠতে বাধ্য করেছে। অনেকে বলবেন, আবার তো সে ফেরার হুমকি দিচ্ছে। দিক, মানুষই তাকে অতীত করে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। এই গাঙ্গেয় ডেল্টায় ডেল্টা স্ট্রেনের খেলাও মোটেই একতরফা হবেনা। জেগে ওঠা মানুষের নিঃশব্দ আন্তরিকতা তার দাপট অনেকটাই রুখে দেবে – তাকে পিছু হঠতে হবেই। প্যানডেমিক থেকে এনডেমিক হয়ে গিয়ে সে টিঁকে থাকবে শুধু উইকিপিডিয়ায়।
ওপর থেকে কিছু বোঝা যায়না – কিন্তু কোন গভীর সঙ্কটের সময় হারবো না এই জেদ থেকে জীবনের ভিতর থেকে জেগে ওঠে জীবন। প্রাত্যহিক চাপ ও ক্ষুদ্রতার আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া মানুষটির ভেতর থেকে বেরিয়ে পরে আসল মানুষ। অনেকদিন পর আবার মানুষের গলায় শোনা যায় মানুষের আওয়াজ। পৃথিবী তখন মানুষের গলায় কথা বলে। এমন জাগরণে কোন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেই। রাংতা মোড়া রাজনীতির ক্লীবতা ও দৈন্য এখানে অনুপস্থিত। বিক্রি হতে হতে আমাদের যে মনুষ্যত্বটুকু টিঁকে আছে, নিজেরটুকু ভাবতে ভাবতে অলৌকিকভাবে জেগে আছে যে পরার্থপরতা তা যেন এই দুঃসময়ে নতুন করে আবিষ্কার করেছে মানুষ। কোভিড সময়ে এটাই তার এগিয়ে যাওয়ার সম্বল।

এ এক আশ্চর্য লড়াই। প্লেগ, কলেরা, স্মল পক্স, সোয়াইন ফ্লু’র মত অতিমারিকে অতীত করে দিয়েছিল মানুষের লড়াই, এগিয়ে ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞান। কোভিডও হয়ে থাকবে শুধুই এক অতীতের স্মৃতি। এই অস্থির সময়ে মানুষের প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার আশ্চর্য উপাখ্যানগুলি শুনুন বা পড়ুন, সেটাই বেঁচে থাকার আনন্দপাঠ। কোভিড ত্রাস যতই চোখ রাঙাক না কেন, এসব সত্যি কাহিনী আমাদের বেঁচে থাকার পালে বাতাস লাগাচ্ছে।