তিন
কিন্তু যদিও আমি চিন্তার দিকে থেকে সম্পূর্ণভাবেই নাস্তিক, তা হলেও ধর্মকে স্রেফ এক ধরনের মানসিক আফিম বলে খারিজ করা আমার কাছে যুক্তিসংগত ঠেকে না। কেন ঠেকে না সেকথা বলার ভিতর দিয়ে ধর্ম সম্বন্ধে আমার কয়েকটি জিজ্ঞাসা স্পষ্টতর হয়ে উঠবে আশা রাখি।
ধর্মীয় প্রত্যায়াবলীর সমর্থনে যে সব যুক্ত্যাভাস খাড়া করা হয়ে থাকে তারা যদি নিতান্তই নড়বড়ে এবং ধর্মপ্রচারের ইতিহাসে জিজ্ঞাসার উপস্থচ্ছেদ এবং মর্ষকাম ও ধর্ষকামের প্রাবল্য যদিও সবিশেষ প্রত্যক্ষ, তবু অন্তত তিনটি কারণে ধর্মকে আমি ব্যামমাহমাত্র মনে করি না। প্রথমত এমন কয়েকজন ব্যক্তিকে আমি দেখেছি এবং জানি যারা ঘঘাষিতভাবে ধর্মবিশ্বাসী, কিন্তু যাঁদেৱ চরিত্রে এবং আচরণে এমন সব গুণ উপস্থিত (যেমন করুণা, সততা, প্রসন্নতা, সৃষ্টিশীলতা, সেবাবৃত্তি, সাহস, সমভাব, ইত্যাদি, যা আমার বিচারে অন্তিমূল্যবান। তার অর্থ নয় যে এইসব গুণ ধর্মবিশ্বাস থেকে উদ্ভূত। কিন্তু অন্তত এই বিশেষ স্ত্রীপুরুষদের ক্ষেত্রে এইসব গুণকে তাদের ধর্মবিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্ন করা বোধ হয় যায় না। ফলে মনে প্রশ্ন ওঠে, ধর্মের সঙ্গে এইসব গুণের সম্পর্ক কী? “চতুরঙ্গের জ্যাঠামশায়ের চরিত্রে যেসব গুণের সমাবেশ ঘটেছিল তাদের উদ্ভব এবং পােষণের জন্য কোন ধর্ম-বিশ্বাস প্রয়ােজন হয় না। আমার সমকালীন ও ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত যে অল্প কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আমার চরিত্রে ও চিন্তায় প্রভাব ফেলেছেন—যেমন বট্রান্ড রাসেল, মানবেন্দ্রনাথ ও এলেন রায়, রাজশেখর বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, আলবের কামু প্রভৃতি–তারা কেউই ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু যে অল্প কয়েকজন পরিচিত ধর্মবিশ্বাসীকে আমি শ্ৰদ্ধা করি, তাঁরা কি ধর্মের আশ্রয় ছাড়া তাঁদের সদগুণগুলিকে শুনাস্তিক্যের আক্ৰমণ থেকে রক্ষা করতে পারতেন? ধর্মবিশ্বাস যদি তাদের এইসব গুণাবলীর রক্ষণে এবং বিকাশে সাহায্য করে থাকে তাহলে নিজে নাস্তিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের সেই বিশ্বাসকে আমি অশ্রদ্ধা করতে পারি না।
দ্বিতীয় কারণটি প্রথমটির চাইতে স্থানে কালে অনেক বেশি ব্যাপক। গত পাঁচহাজার বছরের ইতিহাসে একদিকে যেমন ধর্মীয় মূঢ়তা এবং অসহিষ্ণুতার অজত্ব নজির মেলে, অন্যদিকে তেমনি শিল্পে, সংগীতে, কাব্য ধর্মের বিস্তীর্ণ এবং গভীর প্রভাব নিতান্তই প্রত্যক্ষ। আধুনিক যুগকে যদি বাদ দিই তাহলে সম্ভবত একথা বলা চলে যে মানুষের সৃজনশীল কল্পনা এবং বিবিধ শিল্পকর্মে তার রূপায়ণ অনেকখানিই ধর্মবিশ্বাসের দ্বারা চিহ্নিত। সারনাথের বুদ্ধ, মথুরার বিষ্ণু, এলিফ্যান্টার শিব, অথবা মমপুরের মহিষমর্দিনীকে বাদ দিয়ে এই উপমহাদেশে ভাস্কর্যের ইতিহাস অকল্পনীয় । ধৰ্মীয় স্থাপত্যের অসংখ্য বিস্ময়কর উদাহরণ দেখতে পাই মধ্যযুগীয় ইয়োেরাপের উৎকাঙক্ষায়ী গথিক ক্যাথিড্রালগুলিতে, পশ্চিম এশিয়ার নীলাভ মসজিদ মিনারেটগুলিতে, সাঁচী স্থূপে, ভুবনেশ্বর-কোনারক-খাজুরাহের রূপােকীর্ণ মন্দিরগুলিতে। শুধু যে ভারতীয় সংগীতের একটি প্রধান অংশ ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত তা নয়, ইয়ােররাপীয় সংগীতেও ধর্মীয় প্রভাব দীর্ঘকাল ধরে প্রবল ও ফলপ্ৰসূ। ইয়ােরোপীয় সংগীত যাঁরা উপভােগ করেন তাদের দার্শনিক চিন্তা যে-ধরনেরই হােক না কেন মােৎসার্ট, বেটোফেন দ্বাগনার কিংবা স্ট্রাভিনন্সকির তুলনায় বাখ তাদের কম প্রিয় নন। এরই সঙ্গে লক্ষণীয় যে সব দেশেই প্রাগাধুনিক যুগের কাব্যে ধর্ম খুব বড়ো অংশ জুড়ে আছে। দান্তের মহাকাব্য আজও আমাকে তেমনি মুগ্ধ করে যেমন করে অনেক বৈষ্ণব পদাবলী অথবা রামপ্রসাদের শ্যামাসংগীত। ফলত কোন নাস্তিক যদি সুবেদী এবং রসিক হন, শিল্প, সংগীত এবং সাহিত্যের যদি তার অনুরাগ থাকে, তাহলে তিনি লক্ষ করতে বাধ্য যে ঐ জগতের অনেকটাই একদা ধৰ্মাশ্রিত ছিল, এবং আধুনিক যুগেও এই সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয় নি। বিশ শতকের কবিদের মধ্যে যারা আমার বিশেষ প্রিয় তাদের মধ্যে যেমন আছেন সুধীন দত্ত, এলুয়ার ও নেরুদা তেমনি আছেন রবীন্দ্রনাথ, রিলকে ও এলিয়ট। অবশ্য প্রত্যক্ষভাবে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রাঙ্কন, সংগীত, সাহিত্য অতীতেও রচিত হয়েছে। বর্তমান যুগে এই বিয়ােগ অনেক বেশি ব্যাপক এবং পরিস্ফুট। তা সত্ত্বেও প্রশ্ন থাকে, ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিল্পকল্পনার সম্পর্ক কী ধরনের? এই সম্পর্ক কি সমাপতনের? দু’এর মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে যে সন্নিধি দেখা দিয়েছিল তা কি আসলে আপতিক? অথবা এরা উভয়েই এক মানসউৎস থেকে উদ্ধৃত ? একের কৃশায়ণ অথবা অভিক্রান্তির ফলে অন্যটি প্রবল অথবা দুর্বল হয়? এলিয়ট, ম্যারিতা প্রমুখ অনেকে অভিযােগ করেছেন আধুনিককালে আটকে ধর্মবিশ্বাসের জায়গায় বসাবার চেষ্টা হয়েছে এবং তাদের মতে এ-চেষ্টা নিতান্তই অপচেষ্টা। এলিয়ট শুধু ধর্মবিশ্বাসী নন, তিনি এ যুগের একজন প্রধান কবি এবং সাহিত্যসমালোচক। তার এই অভিযােগকে সাহিত্যানুরাগী নাস্তিক কতটা গুরুত্ব দেবেন?
তৃতীয় কারণটি দ্বিতীয় কারণটি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, যদিও প্রথম কারণটির সঙ্গে তার যােগ আছে। প্ৰত্যেক ধর্মের কেন্দ্রে যেসব প্রত্যয় থকে তাদের মধ্যে অনেকগুলিই নীতিজাতীয়, অর্থাৎ বিশ্বাসীদের কাছে সেগুলি উচিত অনুচিতের নির্ণায়ক। এইসব নীতির মধ্যে প্রচুর বিরোধ থকে এবং ফলে বাকছল ও ভণ্ডামিতে অভ্যস্ত না হলে ধর্মাচরণ নিতান্ত কঠিন কাজ। তা সত্ত্বেও বোধহয় বলা চলে যে প্রতি ধর্মের কেন্দ্রেই কতকগুলি নৈতিক নির্দেশ বিদ্যমান এবং বিশ্বাসীদের জীবনে এইসব নির্দেশের প্রভাব বহুপ্রসারী। মানুষের ক্ষেত্রে নীতিকে বাদ দিয়ে কী ব্যক্তিগত কী সামাজিক জীবন দুই-ই অকল্পনীয়; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এমনকি এই আধুনিক যুগেও ধর্মের প্রাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করে নীতি নির্দেশের প্রতি আনুগত্যের কথা ভাবতে পারেন না। মানুষের বোধবুদ্ধির কাছে অহিংসানীতির আবেদন প্রত্যাশিত; কিন্তু জীবনে যাঁরা অহিংসানীতির অনুসরণে উদ্যোগী তাদের মধ্যে অধিকাংশই ধর্মীয় সূত্রে এই নীতি গ্রহণ করেছেন। কেউবা এই আদর্শে দীক্ষিত হয়েছেন বৌদ্ধ অথবা জৈন ধর্মের সূত্রে, কেউবা খৃষ্টধর্ম বা বৈষ্ণবধর্মের শূত্রে। অহিংস নাস্তিক মানবতন্ত্রী অবশ্যই আছেন, কিন্তু এখনো পর্যন্ত সংগঠনমূলক কাজে তাদের উপস্থিতি কম চোখে পড়ে। সেবানীতির ঔচিত্য সহজ বুদ্ধিতেই বোঝা যায়; কিন্তু দুঃস্থিত জনের সেবায় যাদের জীবন নিয়ােজিত তাঁদের মধ্যে এমন ব্যক্তি খুব বেশি মেলে না যারা আপন আপন ধর্মবিশ্বাস থেকে সেবাব্রতের নির্দেশ পান নি। গৃহযুদ্ধের প্রচণ্ড আবর্তের মাঝখানে আমি দেখেছি করুণাময়ী ক্যাথলিক সেবিকাকে যিনি গভীর নিষ্ঠায় সর্বজনের পরিত্যক্ত কুষ্ঠরোগীদের একাকী শুশ্ৰষা করছেন। মহামারীর কেন্দ্রে দেখেছি বৌদ্ধ ভিক্ষুকে যিনি বিসূচিকাক্রান্ত রোগীদের সেবা এবং চিকিৎসা করছেন। তাদের সাহস, করুণা, সেবাবৃত্তি, সংগঠনসামর্থ্য ও দক্ষতা আমাকে তাদের প্ৰতি শ্ৰদ্ধান্বিত করেছে। কাব্য, ভাস্কর্য, সংগীতের মতোই অহিংসা এবং সেবাকে আমি জীবনে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করিবীন্দ্রনাথ, রোদা অথবা আলাউদ্দিন খাঁর মতো মাদার টেরেসার ভিতরেও আমি মনুষ্যত্বের প্রকৃষ্ট প্রকাশ দেখতে পাই। কোন ধর্ম বিশ্বাস যদি এই নীতিবোধৰ সঁহায়ক হয়, তাকে অগ্রাহ্য করা অন্তত আমার বিচারের অসংগত ঠেকে। (চলবে)