টীকা
বৈজ্ঞানিক মনোভাবের জন্য যে মানসিক বয়ঃপ্রাপ্তির এবং নিত্যজাগ্রত প্রশীলতা প্রয়ােজন, অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এখনো তা গড়ে ওঠে নি। অধিকাংশ স্ত্রী-পুরুষ এখনো পর্যন্ত আদিম মানুষ এবং শিশুর মতো নিশ্চিত চরম উত্তর চায়—শিশুরা ভাবে এটি তাদের মা-বাবা দিতে পারে, বয়স্ক শিশুরা ভাবে এটি দিতে পারে পুরাণকাহিনী, ধৰ্ম, গুরু, সাধুসন্ত। বৈজ্ঞানিক জানেন তথ্য নির্ভর সব উত্তরই আংশিক এবং শর্তাধীন—কোন ব্যাখ্যাই বিচারোর্ব বা অপরিবর্তনীয় নয়। প্রশ্ন যেখানে সীমাবদ্ধ, খণ্ডিত, সুনির্দিষ্ট সেখানে তার নির্ভরযােগ্য উত্তর সম্ভব (যেমন ম্যালেরিয়া প্রভৃতির ব্যাধির কারণ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে), কিন্তু যেখানে সে-প্রশ্ন বহুমুখী ও ব্যাপক সেখানে তথ্য-সংগ্রহে, ব্যাখায়, প্রমাণে ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা থাকতেই পারে। বৈজ্ঞানিক সে কথা ভেবে ছাত্রদের স্তোভ দেবার জন্য ব্ৰহ্মজ্ঞতা দাবি করেন না, অপরপক্ষে চরম উত্তর অপ্রাপ্য বলে তিনি মন এবং হাত গুটিয়েও বসে থাকেন না। উপযােগী তথ্যসংগ্রহে, বিষয়মুখিতার অনুশীলনে, ধারণা এবং সাধিত্রের সূক্ষ্মাতাসাধনে, প্রকল্পের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি নিজেকে নিয়ত নিয়ােজিত রাখেন এবং অপর বৈজ্ঞানিকদের বক্তব্য ও সমালোচনা বিশেষ যত্নের সঙ্গে অনুধাবন করেন। ধার্মিকরা তাদের বিশ্বসাদি বিচারে ও অপরিবর্তনীয় মনে করার ফলে বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের মধ্যে একত্র হয়ে পর পর্ম নিয়ে চর্চার উদাহরণ কচিৎ চোখে পড়ে। এবং ইতিহাসে ধর্মযুদ্ধের ভয়ংকরতাই অনেক বেশি প্রাবল্যে বারবার দেখা যায়। অপরপক্ষে বৈজ্ঞানিকরা পরস্পরের যুক্তি, তথ্য, প্রমাণাদি বিচার করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মতৈক্যে পৌছতে পারেন এবং তাদের বিভিন্ন প্রকল্প ও ব্যাখ্যা ক্রমেই অধিকতর নির্ভরযােগ্যতা ও সর্বজনগ্রাহ্যতা অর্জন করে। প্রকৃত শিক্ষার সূত্রে বৈজ্ঞানিকতার এই মনোভাবের প্রসারের ফলে যখন পৃথিবীর অধিকাংশ স্ত্রী-পুরুষ বৈদ্ধিক বয়ঃপ্রাপ্তি লাভ করবে তখন জ্ঞানের দিক থেকে ধর্মীয় ব্যাখ্যার কালবিরুদ্ধতা তাদের কাছে সহজেই ধরা পড়বে।
খ। ধর্ম ও শিল্প-সাহিত্য; উভয় ক্ষেত্রেই কল্পনা-উদ্ভাবনার ভূমিকা প্রধান। যা আছে, যা অভিজ্ঞতা-জাত এবং অভিজ্ঞতা-সমর্থিত তা থেকে উপাদান নিয়ে মন এমন সব রূপ রচনা করে, রচনার পূর্বে যারা ছিল না। কল্পনা অনস্তিত্বকে অস্তিত্ববান করে। শিল্প বিভিন্ন মাধ্যমের ভিতর দিয়ে সেই রূপকে অপরের কাছে প্রত্যক্ষ করে তোলে। সেই কল্পনাপ্ৰসূত রূপ যে অভিজ্ঞতাপ্রসূত জগতের চাইতেও প্রকৃত, নানা মন্ত্রতন্ত্র, পূজাপ্রকরণের দ্বারা এই বিশ্বাসকে ধর্ম প্রতিষ্ঠিত করে।
এখন শিল্পসাহিত্যের একটা বড়ো অংশ দীর্ঘকাল ধরে ধর্মকে সমর্থ করেছিল এবং ধর্মের দ্বারা সমর্থিত হয়েছিল বলে অনেকের ধারণা এ দুটির মধ্যে কোন অচ্ছেদ্য বা সম্পূরক সম্বন্ধ আছে। কিন্তু তথ্য অথবা যুক্তি এই অচ্ছেদ্যতার ধারণাকে সমর্থন করে কিন্তু অতীত কালেও বেশ কিছু স্থাপত্য, ভাস্কর্য, প্রতিকৃতি ও প্রাকৃতিক চিত্র, গাথাকাহিনী, সংগীত, কবিতা, নাটক উপন্যাস পাওয়া যায় যাদের বিষয়বস্তু ও প্রতিন্যাস স্পষ্টই ঐহিক, যাদের সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসের সম্পর্ক যদি আদৌ থাকে তা নিতান্তই ক্ষীণ। অপরপক্ষে গত তিনশো বছর কাল ধরে শিল্প স্পষ্টতই ধর্মীয় বিষয় এবং মনোভাব থেকে সরে এসেছে ব্যতিক্রম থাকা সত্ত্বেও এই অভিমূখ্য স্পষ্ট। অর্থাৎ ধর্মের উপরে নির্ভরতা শিল্পের পক্ষে মােটেই অপরিহার্য নয়, যদিও ধর্মের আবেদন ও প্রসারের জন্য শিল্পের সহযােগ সম্ভবত বিশেষ প্রয়ােজনীয়। | শিল্প এবং ধর্ম দুই-ই কল্পনাজাত হলেও দুইয়ের মধ্যে অন্তত দুটি মৌলিক পার্থক্য আছে বলে মনে করি। শিল্প যে কাল্পনিক রূপের জগৎ রচনা করে এবং আমাদের কাছে প্রত্যক্ষ করে তোলে সেটিই একমাত্র প্রকৃত জগৎ, এমনকি আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার জগতের চাইতে অধিকতর সত্য জগৎ—এমনতর দাবি শিল্পের আবেদনের জন্য নিষ্প্রয়ােজন। শিল্প একটি স্বয়ম্ভর জগৎ রচনা করে আমাদের প্রাত্যহিক জগতের পাশাপাশিই যেটিকে আমরা তার নিজগুণে গ্রহণীয় বিবেচনা করি। এটি বিশুদ্ধ যন্ত্রসংগীতের ক্ষেত্রে সব চাইতে স্পষ্ট, কিন্তু স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্ৰকলা, নৃত্য, অভিনয় এমনকি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এটি অভিজ্ঞতসিদ্ধ। অয়দিপাউস, দ্ৰৌপদী, হ্যামলেট, ফাউস্ট, অথবা কাফকার “কে”—এরা প্রত্যেকেই এদের স্রষ্টার কল্পিত চরিত্র; এদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমাদের প্রত্যহিক অভিজ্ঞতার কিছু মেলে, অনেকটাই মেলে না; কিন্তু এদের প্রত্যেকের স্ৰষ্টা নিজের নিজের কল্পনা ও শিল্পনৈপুণ্যের জোরে এদের ভিতরে এমন শক্তি সঞ্চার করেছেন যে এদের চারিত্র্য এবং কাহিনী আমাদের কাছে প্রবলভাবে প্রত্যক্ষ। অপর পক্ষে সেই কারণে এদের সান্নিধ্যে আমাদের পরিচিত জগৎকে মায়া অথবা তুচ্ছ অথবা অসত্য মনে করার কারণ ঘটে না। শিল্পের জগৎ অভিজ্ঞতার জগৎকে গ্রাস করে না, তাকে নিজের অধীন করে না, তা থেকে উপাদান সংগ্রহ করে তার পাশাপাশি নিজের গৌরবে উপস্থাপিত হয়। অপরপক্ষে ধর্মের কল্পিত জগৎ সংসারে আস্তিত্বিক হীনতা আরোপ করে, তার কল্পিত নায়ক-নায়িকাকে ত্ৰাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ করে, তাদের উপরে দেবত্ব অথবা অলৌকিকত্ব আরোপ করে সেই কল্পিত জগৎকেই পরম সত্য বলে দাবি করে। সেই জগৎ অসহিষ্ণু, সর্বগ্রাসী এবং ফলে এক ধর্মের কল্পিত জগতের সঙ্গে আরএক ধর্মের কল্পিত জগতের সংঘর্ষ অনিবার্য। একই পাঠকের পক্ষে অভিজ্ঞানশকুন্তলা, আরব্যরজনী এবং কিং লিয়রের জগতে বিস্ময়াকুল চিত্তে প্রবেশ করা স্বাভাবিক। চারুদত্ত হ্যামলেট, হিলহেলম মাইস্টার কিংবা মাদাম বোভারির জগতে আমরা আমন্ত্ৰিত; সেখানে অনুভব, সম্ভোগ, বিচার বিশ্লেষণ, প্রবেশ-প্রস্থানের স্বাচ্ছন্দ্য আছে, আনুগত্যের জন্য কোনো জুলুমবাজী নেই। কিন্তু মােজেস-এর জগৎ, বৃস্টের জগৎ, কৃষ্ণের জগৎ, অথবা মহম্মদের জগৎ একত্রতা বা সার্বভৌমতা দাবি করে। একাগ্রয়িতা বা নিঃশর্ত আনুগামিতা ছাড়া ঐ জগতে অপরের প্রবেশ ধর্মবিশ্বাসীদের মতে নিষিদ্ধ। জিজ্ঞাসুরূপে ওইসব জগৎকে আমরা বোঝবার চেষ্টা করলে বিশ্বাসীরা বলেন পূর্ণ বিশ্বাস না থাকলে ওই জগতে ঢকা অন্যের অসাধ্য। এমনকি যারা ধৰ্মজগতের পােপ, খলিফা, পেট্রিয়ার্ক, শঙ্করাচার্য মার্কা প্রাচীন মহাসত্বের মালিক নন, নিতান্তই অৰ্বাচীন ছোটোখাটো সম্প্রদায়ের নেতা রামকৃষ্ণ, সৎসঙ্গ, হরেকৃষ্ণ, ডিভাইন লাইট, আনন্দময়ী, সত্যসাঁই ইত্যাদি—তাদের জগৎ ও একচেটিয়াপন্থী এবং পরস্পরের জগতের প্রতি অসহিষ্ণু। (চলবে)