টীকা
দ্বিতীয় পার্থক্য হল ধর্মীয় কল্পনা শুধু স্বকীয় জগৎ রচনা করে তৃপ্ত নয়, তাতে স্পষ্ট নির্দেশ থাকে, ঐ জগৎকে যারা চরম সত্য বলে মানে তাদের কী কী করণীয় এবং কী কী অকরণীয়। এবং যারা বিশেষ বিশেষ ধর্মকে রক্ষা করার দায়িত্ব ও অধিকার নিজেদের উপরে আরোপ করেছেন তারা সংগঠিত পরাক্রমে ব্যবস্থা করেন যাতে ঐ সব বিধিনিষেধ প্রতিপালিত হয় এবং পালিত না হলে পাপীজন যথাযথ শান্তি পায়। টমাস মান এই বিষয়টি নিয়ে একটি চমৎকার গল্প লিখেছিলেন। গল্পটির নাম—“দি টেলস্ অব দি ল”। এটি মােজেস এবং ওল্ড টেস্টামেন্টের দশমহানির্দেশ সম্পর্কিত। ইহুদিদের মধ্যে যারা মােজেস-এর নির্দেশ মানে নি মােজেস-এর আজ্ঞায় যােতয়া ধর্ম প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার নামে তাদের সকলকে হত্যা করেন। মােজেস নিজের হাতে নির্দেশগুলি পাথরে খােদাই করে তাঁর অনুযাত্রিকদের বলেন, অদৃশ্য ইয়াহওয়ে এই নির্দেশগুলি দিয়েছে। গল্পের শুরুতে মান মােজেস সম্পর্কে লিখেছেন : —
His birth was disorderly. Therefore he passionateiy boned order, the immutable, the bidden and the forbodden…He was sensual, therefore he longed for the spiritual, the pure and the holy–in a word, the invisible—for this alone seemed to him spiritual. holy and pure.১।
গল্পের শেষে তিনি নবধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মােজেসকে দিয়ে বলিয়েছেন: —
And the Lord says. I shall raise foot and shall trample him unto the mire, to the bottom of the earth I shalheast the blasphemer, one hundred and twelve fathoms deep…and all the people said Amen.
শিল্পসাহিত্য এই ধরনের কোন ব্যবহারিক নির্দেশ দেয় না, এবং শিল্পী-সাহিত্যিক সংগঠন তৈরি করে বেয়াড়া পাঠক-পাঠিকাদের কোন শাভিবিধান করেন না। হ্যামলেটের অপ্রেমে দ্বিধাদ্বন্দ্বে-যন্ত্রণায় আমরা অংশভাক হই, কিন্তু আমাদের কী করণীয় সে-সম্পর্কে এই নাটক থেকে কোন নির্দেশ পাই কি? খাজুরাহাে, কোনারকের মিথুনমূর্তি থেকে আমাদের মনে গভীর আনন্দ সঞ্চারিত হয়, কিন্তু আমাদের কর্তব্য সম্বন্ধে কোন উপদেশ ঐসব মন্দিরে লিখিত নেই। (শাকারেরা ঐসব ভাস্কর্যের যেসব ব্যাখ্যা করেন, সেসব তাদের ধর্মতত্ত্ব থেকে নির্গত, শিল্পকর্মের ভিতরে সেই ব্যাখ্যার কোন সমর্থনই মেলে না।) কোন গান, ছবি, নাটক, কাহিনী বা উপন্যাস যদি কারো ভালো না লাগে তার জন্য সেই ব্যক্তিকে কোন পাপ অর্সায় বলে কেউ মনে করে না। অবশ্য যতক্ষণ সেটিকে শিল্প হিসাবে ভাবা যায় ততক্ষণ একথা খাটে, তাকে ধর্মীয় বস্তু বা ধর্মশাস্ত্র হিসেবে। ধরলে তখন ধর্মের অন্য অসহিষ্ণু দাবি সেক্ষেত্রেও করা হয়। কিন্তু কর্তব্য নিরূপণের দায়িত্ব থেকে মুক্ত বলেই শিল্প শিল্প। কর্মের ও বস্তুজগতের চৌহদ্দির বাইরে শিল্পের যে সিদ্ধতা ও শুদ্ধতা ক্রোচে তাকেই বলেছেন তার বিশিষ্ট ইস্থেটিক”, গুণ। এই শিল্পকাস্তির জন্যই শিল্প এই মূল্যবান। ধর্ম শিল্পকে নিজের প্রচারের কাজে ব্যবহার করে, কিন্তু বিশেষ বিশেষ ধর্মসম্প্রদায় লোপ পাবার পরে, এবং ঐ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন স্ত্রী-পুরুদের কাছেও, ঐ ধর্মমতের সংশ্লিষ্ট শিল্প গভীর আবেদন করতে সক্ষম।
গ। ধর্মীয় অভিজ্ঞতা: ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, শাস্ত্ৰ, গুরু, আচার-অনুষ্ঠান এসব বাইরের জিনিস, আসল ব্যাপার হচ্ছে এক ধরনের অপরোক্ষানুভূতি যা ধর্মের উৎস। এই ধৰ্মীয় অভিজ্ঞতা ব্যাপারটি নাকি বড়ো হয়, যাদের হয়েছে তারাই শুধু জানেন, অনাদের কাছে এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। একদা-প্রসিদ্ধ মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী’ প্রবন্ধগ্রন্থের লেখক প্রয়াত কৌতুকী শিবরাম চক্রবর্তীর অনুসরণে আমিও বলতে পারতাম যে যা গুহ্য তা বরং ওহাতেই নিহিত থাক। কিন্তু আমি কৌতূহলী হয়ে আমার চেনাজানার মধ্যে ঐসব বিশ্বাসীদের নিয়েছি, আপনার কি সেই অপরোক্ষানুভূতি হয়েছে? অথবা আপনার, অথবা আপনার? না, অন্তত আমার পরিচিতদের মধ্যে কেউই ব্ৰহ্মাস্বাদের দাবি করেন নি। তবে বলেছেন, যাদের হয়েছে তাদের কথা নাকি তারা জানেন। কিন্তু আমার না জানা এবং তাদের জানা এইসব মহাত্মাদের যেটুকু বিবরণ গ্রন্থাদি ও পরিচিত ব্যক্তিদের সূত্রে পেয়েছি তা থেকে অনুমান করি অধ্যাত্মজ্ঞান বলে কিছু থাক বা নাই থাক এইসব তুরীয়মার্গীরা সকলেই সম্মােহন বিদ্যায় পারঙ্গম এবং ভেলকিবজিতে ওস্তাদ।।
তবু তত্ত্ব হিসেবে হয়তো স্বীকার করা চলে নানা ধরনের বিশিষ্ট অভিজ্ঞতার মধ্যে একজাতের অভিজ্ঞতাকে ‘ধর্মীয় অভিজ্ঞতা নামে দেওয়া যায়। আকাশ, সমুদ্র, হিমালয়ের আনস্ত্যের সান্নিধ্যজাত বিস্ময়, প্রথম প্রেমের গভীরতার উপলব্ধি, শিল্পসৃষ্টির অভিনিবেশ ও আনন্দ, জটিল বৌদ্ধিক সমস্যার আকস্মিক বিদ্যুৎক্ষিপ্ৰ সমাধান, মাদকসেবনের কল্যাণে সেবকের চেতনায় বিবিধ অবাস্তব রূপ ও ঘটনাবলীর সাময়িকরিশমানতা—এসব বিভিন্ন জাতীয় অভিজ্ঞতা আমাদের প্রাত্যহিক খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা, কাজকর্মের অভিজ্ঞতা থেকে বেশ কিছুটা অন্য ধরনের। হয়তো বা ধর্মীয় অভিজ্ঞতা এদেরই মতো বিশিষ্ট এবং স্মরণীয় কোন অভিজ্ঞতা যা সকলের প্রাত্যহিক জীবনে না ঘটতে পারে। কিন্তু কোন অভিজ্ঞতাকে সম্ভাব্য অভিজ্ঞতা হিসেবে মানার অর্থ নয় যে বিশ্বাসী ঐ অভিজ্ঞতার যে অর্থ আরোপ করেছেন সেটি বিনা প্ৰমাণ-পরীক্ষায় মেনে নেওয়া হচ্ছে। মদ্যপানের মাত্রা বাড়ালে মাতাল ব্যক্তি চোখের সামনের বস্তুকে দ্বিগুণিত রূপে দেখেন; তাঁর দেখাটা মােটেই অবিশ্বাস্য নয়, শারীরবৃত্তে তার ব্যাখ্যাও মেলে, কিন্তু যে বস্তুটি তিনি দেখেছেন সেটি বাস্তবে দ্বিগুণিত হয় না। সিদ্ধিসেবী তার পায়ের নিচের পথকে ঢেউ খেলানো ভাবতে পারেন, হাওয়ায় উজ্জীন গোলাপি হাতির লাবণ্য তাকেগৰ্দগদচিত্ত করতেও পারে, কিন্তু ফলে সমতল পথে চড়াই উৎরাই রচিত হয় না, গোলাপি হাত্তি হওয়ায় ওড়ে না। যাঁদের সচরাচর ‘মরমী’ বলা হয়। তারাই সম্ভবত ধর্মীয় অভিজ্ঞতায় সিদ্ধাঠাদের সেই অভিজ্ঞতার উপাদান নিয়ে তাদের কল্পনা নানা রূপ রচনা করে এবং অনেক সময় প্রতীকের সূত্রে কিংবা কবিতায়, গানে, ছবিতে আকার নিয়ে সেই রূপ অন্যদের কাছে পৌঁছোয়। এসব থেকে তাঁদের অভিজ্ঞতার সততা ও কল্পনার সমৃদ্ধতার পরিচয় মেলে, কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা ও কল্পনার বাইরে কোন দেবতার বা তুরীয় লোকের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে না। ধর্মীয় অভিজ্ঞতা অবশ্যই মনস্তত্ত্বের আলোচ্য বিষয়, কিন্তু ঐ অভিজ্ঞতার। ভিত্তিতে কোনো অধিবিদ্যাত্মক প্রস্তাব দাঁড় করানো অযৌক্তিক।
লেখক পরিচিতি : শিবনারায়ণ রায় (Sibnarayan Ray) (২০ জানুয়ারি, ১৯২১–২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০০৮) বিংশ শতাব্দীর স্বনামধন্য বাঙালি চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, এবং সাহিত্য সমালোচক। একজন রাডিকেল মানবতাবাদী মানবেন্দ্রনাথ রায়, এবং বিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল, রায়ের উপরে মন্তব্য করে একদা বলেছেন “… শিবনারায়ণ রায় দাঁড়িয়েছেন সেই মতের পক্ষে যেটাকে আমি পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। … … তার লেখা আমাদের সময়ের অধিকাংশ লেখকের চেয়ে বেশি যুক্তিগ্রাহ্য হিসেবে প্রকাশিত।”