আমি আকৈশোর নাস্তিক। ঠিক কখন নাস্তিক্য আমার চেতনায় আকার পায় বলা শক্ত, কিন্তু স্মৃতির সড়ক ধরে যত পিছনেই যাই না কেন এমন কোন কাল আমার নজরে আসে না যখন ঈশ্বর, দেবদেবী, আত্মা, প্ৰেত, পরকাল ইত্যাদি, কিংবা মানুষীকল্পনাজাত নয় এমন কোন অতিপ্রাকৃতের অস্তিত্বে আমার আস্থা ছিল, অথবা পূজাপ্রকরণে আমার অনীহা গভীর ছিল না। এবং যদিও বহু শুভানুধ্যায়ীর মুখে বারবার শুনেছি যে রক্ত শীতল হয়ে এলে তুরীয়ের প্রয়োজন (এবং ভাগ্যে থাকলে, উপলব্ধি) নাকি আপনি ঘটবে, শাস্ত্রনির্দিষ্ট বাণপ্রস্থের কোঠায় বেশ কয়েক বছর আগে পা দেবার পরও অদ্যাবধি আমার লোকায়ত প্রতিন্যাসে শৈথিল্য ঘটে নি। এমনকি অজ্ঞাবাদের বিদগ্ধ প্রলোভনও আমাকে কিঞ্চিমাত্র আকৃষ্ট করে না।
অথচ যে-পরিবারে আমি জন্মেছি এবং যে-পরিবেশে আমার শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের অন্তত কিছুটা অংশ কেটেছে, সেখানে ধর্মবিশ্বাসে অভ্যস্ত হওয়া আমার পক্ষে খুব স্বাভাবিক ছিল। মা ছিলেন খাস কলকেতিয়া মেয়ে; ইহকাল এবং পরকালের দাবির মধ্যে সুস্থিতি রচনায় তাঁর ছিল সহজ নৈপুণ্য; সংসারকে তিনি বশ করেছিলেন রান্নাঘর এবং নিরলস সেবার সূত্রে; আর তাঁর ঠাকুরঘরে ছিল বেসুমার দেবদেবীর রাজত্ব। বিরাট পরিবার এবং আত্মীয় অভ্যাগতদের বিচিত্র দাবিদাওয়া মিটিয়ে যেটুকু বাড়তি সময় তাঁর মিলত তা ছিল ব্ৰতপার্বণ, উপবাস অনুষ্ঠানে ঠাসা। কিন্তু ধর্মবিশ্বাসের ভিন্ন রূপও আমার একেবারে অপরিজ্ঞাত থাকে নি। শৈশবকৈশোরে একদিকে যেমন শুনেছি পুরোহিতের মুখে শনি-সত্যনারায়ণ-লক্ষ্মীর পাঁচালি এবং গ্রহস্বস্ত্যয়নের মন্ত্র, অন্যদিকে তেমনি শুনেছি সুগম্ভীর পিতৃকণ্ঠে বেদ-উপনিষদ পাঠ। খোলা বারান্দায় প্রত্যুষের অপসৃয়মান অন্ধকার; পিতার ভাস্করলোভন দেহের আর্জবে প্রথম আলোর রেখাঙ্কন; তাঁর বিশুদ্ধ উচ্চারণে সংস্কৃতের উদাত্ত ধ্বনিতরঙ্গ, পদার্থ না বুঝেও অনুভব করতাম এমন এক উপস্থিতির যা মধুময় এবং অসংকুচিত, প্রোজ্জ্বল, স্বয়ম্ভর এবং নির্ভীক।।
পরিবেশের মধ্যেও ছিল ধর্মের দুই সমান্তরাল ধারা। স্কুলরূপী গোয়ালটির দিন শুরু হ’ত ভবতারিণীর কাছে প্রার্থনা দিয়ে। পাড়ায় ছিল ছোটোবড়ো মন্দির এবং বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন সার্বজনীন পূজা-পার্বণের প্রাচুর্য; পরিজন পড়োশীদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন মাদুলি-তাবিজের চলন্ত বিজ্ঞাপন। উত্তর কলকাতার এই বাঙালী হিন্দুমধ্যবিত্ত অঞ্চলের বেশিরভাগ বাসিন্দাই ছিলেন কালীভক্ত; তাদের হাম্বাধ্বনির মধ্যে শক্তির পরিচয় কতোখানি ছিল জানি না, কিন্তু তাতে যুথচারিতা এবং সংবেশনের প্রকাশ ছিল সুস্পষ্ট। কৃষ্ণভক্ত এবং রামভক্তদের পাড়া ছিল যথাক্রমে আরও কিছুটা উত্তরে এবং পশ্চিমে; সামান্য খানিকটা পুবের দিকে এগোলে আল্লাভক্তদের দেখা মিলতো। সে দিকটা আমাদের কাছে ছিল নিষিদ্ধ, কিন্তু রাজনৈতিক আন্দোলনের দৌলতে কালীভক্ত এবং আল্লাভক্তদের মধ্যে সংঘর্ষ ক্রমশই সে-যুগে প্রবলতর হয়ে উঠছিল। সেই দাঙ্গাহাঙ্গামার যেসব বিবরণ বয়স্কজনদের মুখে আমরা শুনতাম তা পৌরাণিক সুরাসুর যুদ্ধের মতোই রঞ্জিত, রোমহর্ষক, এবং পৈশুন্যসৰ্পিল।
অপরপক্ষে পারিবেশিক অন্য ধারাটির সঙ্গেও কিছুটা আমার পরিচয় ঘটে কিশোর বয়সে। এটির প্রধান সূত্র ছিল রবীন্দ্রসংগীত। রবীন্দ্রনাথের গানে পূজা, প্রেম এবং তাঁর গল্প, উপন্যাস নাট, এমনকি কবিতার সঙ্গে তুলনা করলেই বোঝা যায় রবীন্দ্রসংগীতে ধর্মচেতনার অভিস্রবণ প্রায় অনবচ্ছিন্ন। ঔপনিষদিক ব্ৰহ্ম থেকে পৌরাণিক শিব, বৈষ্ণবের রাধাকৃষ্ণ থেকে বাউলের মনের মানুষ তার বিভিন্ন গানে কখনন পরিশ্রুত, কখননা কেলাসিত, কখনো পরস্পরে অভিসারী, কখনো বা পর্যায়বৃত্ত। পিতা, প্রভু, সখা, প্রেমিক, কবি, নৰ্তক, রহস্যময়ী নানা রূপে তাঁর দেবতা তার কল্পনায় প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছেন, এরিণামে সেইসব রূপ নাস্তিকের চেতনাতেও অন্তর্লিখিত হয়েছে। অর্থাৎ ধর্মর শোভন এবং সহিষ্ণু রূপও অল্পবয়সেই আমি দেখেছি।
ফলত ধর্মে অনুরাগ থাকলে কৈশোরে যৌবনে একটি না একটি ধর্মীয় বিকল্প অবলম্বন করা আমার পক্ষে কঠিন ছিল না। এমন কি আর-পাঁচজন শিক্ষিত বাঙালি হিন্দুর মতো আমিও বিকল্পবোধকে অগ্রাহ্য করে বিভিন্ন বিশ্বাসের মধ্যে অপাটবমুক্ত বিহারের কৌশল অর্জন করতে পারতাম। নিজের নিক্সন নিজে বিশ্লেষণ করতে পারি এমন সামর্থ্য আমার নেই; সুতরাং আমার নাস্তিক্যের পিছনে যদি কোন গৃঢ়ৈ থেকে থাকে তার নির্দেশ আমি দিতে পারব না। যতটুকু বুঝতে পারি আমার মধ্যে প্রথম থেকেই জিজ্ঞাসাবোধ অত্যন্ত প্রবল, এবং ধর্মবিশ্বাসে আশ্ৰয় না নেবার প্রধান কারণ সম্ভবত আমার মধ্যে এই বিপ্রতীপ প্রশ্নশীলতার উপস্থিতি। ধর্মবিশ্বাসে সব প্রশ্নের উত্তর মেলে; কিন্তু অল্পবয়স থেকেই লক্ষ্য করতে শুরু করি যে সেসব উত্তরের মধ্যে না আছে সুসংগতি, না যায় তাদের মেলানো দৈনন্দিন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে। ধর্মীয় উত্তর প্রশ্নোৰ্ব্বতা দাবি করে, এবং এই দাবিকে মেনে নেওয়া আমার কাছে কোনদিনই সংগত ঠেকে নি।
অবশ্য ধর্মের কোন সামান্যাভিধান পাওয়া শক্ত এটা কৈশোরেই নজরে আসে, এবং একদিকে ইতিহাসচর্চা ও অন্যদিকে নানাদেশে ঘঘারার ফলে এ তথ্য ক্রমেই আরো স্পষ্টতর হয়েছে যে সমাজসভ্যতার মতো ধর্মের রূপও বিচিত্র। প্রতি ধর্মের শাখাপ্রশাখাও বহু, এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলের চাইতে অমিলই বেশি প্রত্যক্ষ। এই বৈচিত্র্য লক্ষ্য করার পরও সম্ভবত বলা চলে যে অধিকাংশ স্ত্রী-পুরুষ যাকে ধর্ম আখ্যা দিয়ে থাকেন তার কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ আছে। এই সব লক্ষণের একটি বিস্তারিত তালিকা পেশ করা আমার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু নাস্তিকেরা যেসব কারণে ধর্মবিরোধী সেগুলিকে কিছুটা পরিস্ফুট করার জন্য এইসব লক্ষণের মধ্যে কয়েকটির উল্লেখ ও আলোচনা সংগত মনে করি। তারপর সেই প্রকরণে আমার কিছু জিজ্ঞাসা উপস্থাপিত করব। (চলবে)